মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব সামাল দিতে গিয়ে এবার চাপে পড়তে পারে বিশ্ব অর্থনীতি। কারণ কমে আসছে জরুরি তেলের মজুত, বাড়ছে তেলের দাম নিয়ে অনিশ্চয়তা। অন্যদিকে, ঋণের বোঝা ও বাজেট ঘাটতির কারণে অনেক দেশের সরকারের হাতেও কমে আসছে সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্ব অর্থনীতি শিগগিরই বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ।
প্রতি ছয় মাস অন্তর আইএমএফ বিশ্ব অর্থনীতির পূর্বাভাস প্রকাশ করে। স্থানীয় সময় আজ মঙ্গলবার থাইল্যান্ডের ব্যাংককে বিশ্ব অর্থনীতির সর্বশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে আইএমএফ। ওই প্রতিবেদনে বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ে এই আশঙ্কার তথ্য উঠে এসেছে।
চলতি সপ্তাহে ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক বৈঠক হচ্ছে। এতে বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
চলতি সপ্তাহে ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক বৈঠক হচ্ছে। ছবি: রয়টার্স
আইএমএফ বলেছে, গত ছয় মাসে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের মধ্যেও বিশ্ব অর্থনীতি আশঙ্কার চেয়ে ভালোভাবে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পেরেছে। হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে বিকল্প পথে তেল সরবরাহ করা এবং জরুরি প্রয়োজনে মজুত রাখা জ্বালানি বাজারে ছাড়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের প্রভাব তেলের দামের ওপর সীমিত রাখা সম্ভব হয়েছে।
তবে জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহার করার জন্য রাখা তেলের মজুত এখন কমে এসেছে বলে সতর্ক করেছে আইএমএফ। সংস্থাটি বলেছে, অনেক দেশের ঋণের পরিমাণ বেশি এবং বাজেট ঘাটতিও রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে তেলের দাম আবার বেড়ে গেলে সাধারণ মানুষকে এর প্রভাব থেকে রক্ষা করার মতো আর্থিক সক্ষমতা সরকারের কম থাকতে পারে।
বাড়তে পারে সংকট
আইএমএফের ভাষ্য, জ্বালানি সরবরাহের সক্ষমতা বাড়ানো এবং সংকট মোকাবিলার জন্য সরকারের হাতে থাকা আর্থিক সুরক্ষা পুনরায় গড়ে তুলতে হবে। তা না হলে বিশ্ব অর্থনীতি শিগগিরই সংকট সামাল দেওয়ার সক্ষমতার সীমায় পৌঁছে যেতে পারে।
সংস্থাটি আরও বলেছে, জ্বালানির বাজারে মজুত কমে আসছে। এ অবস্থায় ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন কোনো ধাক্কা এলে তেলের দাম বেড়ে যেতে পারে। সেইসঙ্গে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে। এর প্রভাব দ্রুত বিশ্ব অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার একটি তেল শোধনাগারে আগুনের শিখাসহ ঘন ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখা যাচ্ছে। ছবি: রয়টার্স
ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের মার্চে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) বাজারে তেলের সরবরাহ বাড়াতে জরুরি মজুত থেকে ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি পরিমাণ তেল ছাড়ার ঘোষণা দেয়। গত মাসে করা এক বৈঠকের পর সংস্থাটি এই তেল ছাড়ার কার্যক্রম আরও দ্রুত করার প্রতিশ্রুতি দেয়।
গার্ডিয়ান বলছে, পরিস্থিতি কতটা নাজুক, তা যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত তেলের মজুতের দিকে তাকালে আন্দাজ করা যায়। সম্প্রতি জানা গেছে, দেশটির এই মজুত ১৯৮২ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে একটি সমঝোতা করেন। এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে রাশিয়ার ডিজেল আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে তুলে নেওয়া হয়েছে। পেট্রল পাম্পে জ্বালানির দাম কমানোর লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
তবে বিশ্লেষকেরা বলেছেন, এতে জ্বালানির দামে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা কম।
এদিকে ব্যাংককে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় আইএমএফের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা সিলভানা টেনরেইরো বলেন, বিশ্ব অর্থনীতি এখন পর্যন্ত নানা সংকট সামাল দিতে পেরেছে। কিন্তু সেই সক্ষমতা এবার সীমায় পৌঁছে যাচ্ছে। তিনি নীতিনির্ধারকদের শুধু সংকট সামাল দেওয়ার চেষ্টা না করে অর্থনীতিকে নতুন করে শক্তিশালী করার আহ্বান জানান।
বৈঠকের আগে আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বিশ্বজুড়ে ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় সরকারগুলোকে ব্যয় কমানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “প্রয়োজনীয় নীতিগত পদক্ষেপ আর পিছিয়ে দেওয়া যায় না। আপনাদের হাতে প্রয়োজনীয় উপায় রয়েছে, এখন সেগুলো ব্যবহারের জন্য বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে হবে।”
অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি বাড়বে না কমবে?
প্রতিবেদনে চলতি বছরের বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সামান্য বাড়িয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির নতুন পূর্বাভাস অনুযায়ী, এ বছর বিশ্ব অর্থনীতি ৩ দশমিক ১ শতাংশ বাড়তে পারে। জুলাইয়ের পূর্বাভাসে এই হার ধরা হয়েছিল ৩ শতাংশ। তবে আগামী বছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস অপরিবর্তিত রেখে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ রাখা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও এ বছরের জন্য ২ দশমিক ৩ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে আইএমএফ। ২০২৭ সালের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও বাড়িয়ে ২ দশমিক ৩ শতাংশ করা হয়েছে। এর আগে এই হার ধরা হয়েছিল ২ দশমিক ২ শতাংশ।
তবে আইএমএফ সতর্ক করেছে, দীর্ঘ সময় ধরে তেলের দাম বেশি থাকা এবং সুদের হার বেড়ে যাওয়ার কারণে ২০২৭ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমতে পারে। সংস্থাটির মতে, জ্বালানির বাড়তি দাম ও দীর্ঘমেয়াদি সুদের হার বৃদ্ধি মানুষের খরচ করার প্রবণতা এবং ব্যবসায় বিনিয়োগ–দুটোর ওপরই চাপ সৃষ্টি করবে।
আগামী বছর যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও সামান্য কমিয়েছে আইএমএফ। আগে ১ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হলেও এখন তা কমিয়ে ১ দশমিক ২ শতাংশ করা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি পার হচ্ছে তেলের ট্যাংকার। ছবি: রয়টার্স
আইএমএফ বলেছে, বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষেত্রে ঝুঁকি এখন বেশি। এর মানে, অর্থনৈতিক পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যদি না থামে বা পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়, তাহলে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বাড়তে পারে।
সংস্থাটি আরও বলেছে, জ্বালানি অবকাঠামোয় নতুন হামলা, সাইবার হামলা কিংবা আবহাওয়ার খারাপ হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
গার্ডিয়ান বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইরানে আবারও হামলা চালানোর হুমকি দিয়ে আসছেন। তাছাড়া যুদ্ধ বন্ধে কোনো সমঝোতা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, এমন স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
বাড়বে মূলস্ফীতি
এই পরিস্থিতিতে তেলের দাম দীর্ঘদিন ধরে বেশি থাকায় মূল্যস্ফীতিও আগের ধারণার চেয়ে বেশি সময় ধরে চলতে পারে বলে মনে করছে আইএমএফ।
বৈশ্বিক সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর বিশ্বে মূল্যস্ফীতি হতে পারে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। জুলাইয়ের পূর্বাভাসেও একই হার ধরা হয়েছিল। ২০২৭ সালে মূল্যস্ফীতি কমে ৪ দশমিক ১ শতাংশে নামতে পারে। এর আগে আগামী বছরের জন্য এই পূর্বাভাস ছিল ৪ শতাংশ।
আইএমএফ বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করে বলেছে, মূল্যস্ফীতি সাময়িকভাবে বাড়লেই যেন তারা অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া না দেখায়। তবে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
সংস্থাটি বলেছে, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। তাই পরিস্থিতি বুঝে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জ্বালানি বাজারের নতুন অস্থিরতার পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইকে ঘিরে বিনিয়োগের বাজারে বড় ধরনের ধস নামার ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করেছে আইএমএফ। এ ধরনের ঘটনা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য নতুন সংকট তৈরি করতে পারে।