ফজলে রাব্বি

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গত ফেব্রুয়ারিতে একটি ‘অসম’ বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে বলে অভিযোগ করে আসছেন অর্থনীতিবিদ, কোনো কোনো রাজনৈতিক পক্ষ এবং বিশেষজ্ঞরা। ওই চুক্তিতে বাংলাদেশ পেয়েছে সাময়িক শুল্ক ছাড়ের আশ্বাস, বিনিময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়েছে ১৩১টি শর্ত মানার অঙ্গীকার-এই কৌশলগত চুক্তির চাপ আগামী অর্থ-বছরের বাজেটে কোথায় কোথায় পড়বে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন?
ময়মনসিংহের আব্দুর রশীদ একজন খামারি। বিশ বছর ধরে দুধ বিক্রি করেই সংসার চালান তিনি। নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ হতে যাচ্ছে বৃহস্পতিবার। রশীদ জানেন না সেই বাজেটে তার মতো খামারিদের জন্য কোনো সুখবর আছে কি না। কিন্তু যা তিনি জানেন না তা হলো—চলতি বছর থেকে বাংলাদেশ প্রতি বছর আমেরিকা থেকে ২.৬ মিলিয়ন টন সয়া পণ্য কিনতে চুক্তিগতভাবে বাধ্য। সেই সয়া দিয়ে তৈরি সস্তা পোলট্রি ফিড এবং প্রক্রিয়াজাত দুগ্ধজাত পণ্য যখন দেশের বাজারে বন্যা বইয়ে দেবে, তখন রশীদের উৎপাদিত খাঁটি তরল দুধের দাম কোথায় গিয়ে ঠেকবে?
বাণিজ্য চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ মার্কিন ডেইরি-সেফটি ব্যবস্থাকে নিজের দেশীয় মানের ‘অন্তত সমতুল্য’ সুরক্ষা প্রদানকারী হিসেবে স্বীকার করবে। অর্থাৎ, মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশের রশীদ যে সুবিধা পাচ্ছেন, যুক্তরাষ্ট্রের খামারি রবার্ট উইলিয়ামও প্রায় কাছাকাছি সুবিধা পাবেন। এবং ইউএসডিএ-এর অ্যাগ্রিকালচারাল মার্কেটিং সার্ভিস (এএমএস)-এর সার্টিফিকেট সংযুক্ত থাকলে গরু, মহিষ, ভেড়া ও ছাগলের দুধ থেকে তৈরি মার্কিন দুগ্ধপণ্য আমদানির অনুমতি দেওয়া হবে।
ওই চুক্তির অনুচ্ছেদ ২.৫ অনুযায়ী, বাংলাদেশ অ্যানেক্স-টুতে তালিকাভুক্ত চিজ ও মাংসের পদের একক ব্যবহারের কারণে মার্কিন বাজার সুবিধা সীমিত করতে পারবে না। এর মাধ্যমে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের চিজ ও মাংস উৎপাদকদের বাজার সুবিধা সংরক্ষিত হবে, যারা নির্দিষ্ট সাধারণ নামের ওপর নির্ভর করে ব্যবসা পরিচালনা করেন।

অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের নির্বাহী পরিচালক অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম রায়হান চরচাকে বলেন, “যদি আন্তর্জাতিক চুক্তির কারণে সস্তা বিকল্প আমাদের বাজারে ঢোকে, তবুও দেশীয় শিল্পকে বাঁচাতে আমরা শুল্ক বসিয়ে তা আটকে দিতে পারব না।”
কৃষক রশীদের মতো কোটি মানুষের জীবিকা এখন এই ‘না পারার’ ফাঁদে পড়তে যাচ্ছে। কিন্তু আগামী বাজেটে এই প্রান্তিক খামারিদের সুরক্ষায় কোনো বিশেষ ব্যবস্থার কথা এখনো নীতিনির্ধারকদের তরফ থেকে জানা যায়নি।
গত ৯ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত ‘দ্বিপক্ষীয় রেসিপ্রোকাল ট্রেড এগ্রিমেন্ট’ (এআরটি) বাজেটের দিকনির্দেশনা আগে থেকেই ঠিক করে দিয়েছে কি না- সেটি সম্ভবত অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতার অন্যতম আলোচিত দিক।
চুক্তির আসল হিসাব: যা দেওয়া হয়েছে বনাম যা পাওয়া গেছে
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চুক্তিটা বোঝার সহজ উপায় হলো একটি সাধারণ বাজারের কথা ভাবা। বড় অংশীদারের কাছ থেকে তৈরি পোশাকে শুল্ক ৩৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশ করার সুযোগ পেতে অন্যপক্ষ ১৩১টি শর্ত মানবে, অথচ আমদানিকারক দেশের দায় থাকবে মাত্র ছয়টি শর্ত মানার।
চুক্তির নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশ এই চুক্তিতে যা দিতে রাজি হয়েছে তার তালিকা অত্যন্ত দীর্ঘ ও সুদূরপ্রসারী। এগুলোর মধ্যে আছে-
এসবের বিনিময়ে কী পাওয়া গেছে?
কাগজে-কলমে শুল্ক ৩৭ থেকে ১৯ শতাংশে নামানোর সুযোগ। কিন্তু এখানেও একটি বড় কৌশল লুকিয়ে আছে। এই কম শুল্কের সুবিধা পেতে হলে পোশাক তৈরিতে মার্কিন তুলা বা তাদের উৎপাদিত কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করতে হবে।

তাও আবার একটি নির্দিষ্ট কোটার মধ্যে। যদি দেশীয় উদ্যোক্তারা মার্কিন তুলা ছাড়া অন্য কোনো উৎস থেকে সুতা এনে পোশাক বানান, তবে বিদ্যমান বৈশ্বিক শুল্ক বিধি অনুযায়ী মোট শুল্কভার দাঁড়াবে ৩৫.৫ শতাংশ-যা চুক্তির আগের মতোই প্রায় সমান।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই চুক্তির ধারাগুলো আসলে কেবল বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশকে একটি নির্দিষ্ট ব্লকের নিরাপত্তা ও জ্বালানি-নির্ভরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ইতিমধ্যে রাজনৈতিক মহলে এই চুক্তি নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে, সংসদেও এটি বাতিলের দাবি উঠেছে।
একই সাথে একটি বড় সাংবিধানিক প্রশ্নও সামনে এসেছে-বাংলাদেশের সংবিধানের ১৪৫(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক চুক্তি রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে সংসদে উপস্থাপন করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও, তা কেন করা হয়নি?
বাজেটে চুক্তির ছাপ: তিনটি জায়গায় থাকতে পারে সরাসরি প্রভাব
জ্বালানিতে ভ্যাট ছাড়
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র অনুযায়ী, এবারের বাজেটে এলএনজি আমদানিতে সম্পূর্ণ ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়ার সম্ভাবনা আছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এটি বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ কমাবে এবং সাধারণ মানুষ উপকৃত হবেন। কিন্তু পর্দার পেছনের সত্য হলো-চুক্তিতে বাংলাদেশ ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন গ্যাস কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছে। ফলে এই ভ্যাট ছাড়টা কি আসলেই দেশের আপৎকালীন প্রয়োজনে, নাকি মার্কিন গ্যাস কেনা সহজ করার চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা থেকে? বাজেট বক্তৃতায় এই স্বচ্ছতা কতটুকু বজায় থাকে, সেটাই দেখার বিষয়।
কৃষি: রশীদের গরুর সুরক্ষা
চুক্তিতে প্রতি বছর ৭ লাখ টন মার্কিন গম এবং ২.৬ মিলিয়ন টন সয়া পণ্য কেনার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলো তাদের কৃষকদের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি দেয়। সেই ভর্তুকি পাওয়া কম দামি পণ্য যখন শুল্কহীন বা কম শুল্কে বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশ করবে, তখন দেশীয় পোলট্রি ও ডেইরি খামারিরা প্রতিযোগিতায় টিকবেন কীভাবে?
যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত মাংস ও ডেইরি পণ্যের ওপর বাংলাদেশের বর্তমান সম্মিলিত শুল্ক হার প্রায় ৩৭% থেকে ৫৮%। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, এটি তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে হ্রাস পেয়ে ১০%-এর কোটায় নেমে আসবে। এই ট্যারিফ কমার কারণে ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড সেন্টারের ট্রেড ম্যাপ সিমুলেশন মডেল অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রথম দুই বছরে মার্কিন হিমায়িত মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্যের আমদানি বার্ষিক প্রায় ৩৫০% থেকে ৪০০% বৃদ্ধি পেতে পারে।
বাজেটে দেশীয় পশু খামার রক্ষা বা ক্ষতিপূরণ তহবিলের জন্য বিশেষ কোনো বরাদ্দের লক্ষণ নিয়ে এখন পর্যন্ত নীতিনির্ধারনী মহল থেকে কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। বাকিটা বোঝা যাবে বাজেট প্রস্তাবনা প্রকাশের পর।
ওষুধ: এফডিএ-র দরজা খুলে দেওয়ার পর কী?
চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ মার্কিন এফডিএ অনুমোদিত ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামকে আলাদা কোনো দেশীয় পরীক্ষা ছাড়াই সরাসরি বাজারে বিক্রির অনুমতি দিতে রাজি হয়েছে। এর ফলে বহুজাতিক কোম্পানির দামি ওষুধ সহজেই দেশের বাজারে আধিপত্য বিস্তার করতে পারে। বাংলাদেশের নিজস্ব ওষুধ শিল্প-যা জিডিপিতে এবং কর্মসংস্থানে বড় অবদান রাখছে; তা এক অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে। বাজেটে দেশীয় ওষুধ শিল্পের সুরক্ষায় কোনো প্রস্তুতিমূলক তহবিল বা ল্যাবরেটরি উন্নয়নের বরাদ্দ আসছে কি না, তা একটি বড় প্রশ্ন।
সরকার চাপে কি না বোঝা যাবে সাত সূচকে
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, বাজেট বক্তৃতায় সাতটি সূচক বলে দেবে সরকার চুক্তি মেনে আত্মসমর্পণ করছে, নাকি দেশীয় স্বার্থ রক্ষায় প্রতিরোধ করছে।
খাদ্য আমদানির বিশেষ রিজার্ভ: যদি বাজেটে খাদ্য আমদানিতে বিদেশি মুদ্রার আলাদা ডলার তহবিল বা বরাদ্দ দেখা যায়, তবে বুঝতে হবে সরকার চুক্তির ক্রয়-বাধ্যবাধকতা পূরণে বাধ্য হচ্ছে।
এলএনজি ভ্যাট ছাড়ের ফ্রেমিং: বাজেট বক্তৃতায় এলএনজির ভ্যাট ছাড়ের কারণ হিসেবে যদি স্রেফ ‘জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা’ বলা হয়, তবে মনে হতে পারে সরকার চুক্তির বিষয়টি আড়াল করতে চাইছে। আর যদি সরাসরি দ্বিপাক্ষিক চুক্তির প্রসঙ্গ আসে, তবে বুঝতে হবে আন্তর্জাতিক চাপ স্পষ্ট।
ডেইরি খাতের বিশেষ প্রণোদনা: কৃষি বাজেটে যদি দেশীয় দুগ্ধ ও পশু খামারিদের জন্য বিশেষ নগদ সহায়তা বা উচ্চ সুরক্ষামূলক শুল্ক দেখা যায়, তাহলে সরকার রশীদদের বাঁচাতে লড়ছে বলে ধরে নেয়া যায়। না থাকলে মার্কিন কৃষিপণ্যের জন্য পথ অবাধ রাখা হচ্ছে।

এশীয় অঞ্চলের মেগা প্রকল্পে বরাদ্দ: চুক্তির পরোক্ষ শর্ত অনুযায়ী অন্য কোনো বৃহৎ এশীয় শক্তির অর্থায়নে চলমান মেগা প্রকল্পগুলোতে (যেমন নির্দিষ্ট রেল বা বন্দর প্রকল্প) যদি নতুন বরাদ্দ হঠাৎ কমে যায়, তবে বুঝতে হবে ভূ-রাজনৈতিক চাপ কাজ করছে।
প্রতিরক্ষা বাজেট ও যন্ত্রপাতির উৎস: বাজেটে প্রতিরক্ষা বরাদ্দ যদি অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পায় এবং নির্দিষ্ট পশ্চিমা সামরিক সরঞ্জাম কেনার ইঙ্গিত থাকে, তবে বুঝতে হবে চুক্তির কৌশলগত সামরিক ধারা কার্যকর শুরু হয়েছে।
মার্কিন তুলা ব্যবহারে বিশেষ ছাড়: তৈরি পোশাক খাতে মার্কিন তুলা বা সুতা ব্যবহারের বিপরীতে যদি আলাদা কর রেয়াত বা বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া হয়, তবে সরকার শূন্য শুল্কের ‘কটন ক্লজ’ সুবিধা পেতে মরিয়া।
ওষুধ খাতের গবেষণা তহবিল: এফডিএ শর্তের মোকাবেলা করতে দেশীয় ওষুধ শিল্পের মানোন্নয়ন ও গবেষণায় যদি সরকার বড় অংকের বিশেষ ফান্ড ঘোষণা না করে, তবে বুঝতে হবে দেশীয় ওষুধ শিল্পকে চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেওয়া হচ্ছে।
যা বলছেন বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবদরা
উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ ও পলিসি থিংক ট্যাঙ্কের গবেষকরা বিভিন্ন সময়, নানা আলোচনায় এই চুক্তিকে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সানেমের সেলিম রায়হান এই প্রসঙ্গে বলেন, “এটি কেবল একটি বাণিজ্যিক লেনদেন নয়, এটি একটি ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণ। বাংলাদেশ বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার এমন এক ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে প্রবেশ করেছে, যেখানে আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে।”
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান একটি বড় বাস্তবসম্মত জটিলতার দিকে আঙুল তুলেছেন। তার পর্যবেক্ষণ হলো-বাংলাদেশে বাল্ক পণ্য (যেমন গম বা সয়া) সাধারণত সরকার সরাসরি আমদানি করে না, এটি করে বেসরকারি খাত। এখন সরকার কীভাবে বেসরকারি আমদানিকারকদের বাধ্য করবে যে তারা অন্য কোনো দেশের সস্তা বিকল্প ছেড়ে কেবল মার্কিন পণ্যই বেশি দামে কিনবে? এই জট খোলার কোনো সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা সরকারি নীতিতে নেই।
একই সাথে, পলিসি রিচার্স ইনস্টিটিউট (পিআরআই)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর তার বিশ্লেষণে বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছেন। তার আশঙ্কা-এই বাধ্যতামূলক উচ্চ আমদানির চাপ সরাসরি আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর পড়বে। দেশ যখন ইতিমধ্যে বিদেশি ঋণ পরিশোধের তীব্র চাপে জর্জরিত, তখন প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বাধ্যতামূলক আমদানির শর্ত রিজার্ভকে আরও বেশি সংকুচিত করে তুলতে পারে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই চুক্তিটি আসলে বাণিজ্যের মোড়কে একটি বড় ধরণের কৌশলগত ও নীতিগত পুনর্বিন্যাস। যদি অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় এই চুক্তির নাম নিতে দ্বিধাবোধ করেন-যদি এলএনজি বা গমের বরাদ্দের পেছনে আন্তর্জাতিক শর্তের কথা গোপন রাখা হয়—তবে বুঝতে হবে সরকার নিজেও এই চুক্তিকে কোনো ‘অর্জন’ নয়, বরং একটি বড় ‘বোঝা’ হিসেবে দেখছে।
আর যদি একে সাফল্য হিসেবে বড় করে দেখানো হয়, তবে ময়মনসিংহের আব্দুর রশীদের মতো কোটি প্রান্তিক মানুষকে বুঝে নিতে হবে-এই বিশাল বোঝার চূড়ান্ত ভার শেষ পর্যন্ত তার কাঁধের ওপর এসে পড়ছে।

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গত ফেব্রুয়ারিতে একটি ‘অসম’ বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে বলে অভিযোগ করে আসছেন অর্থনীতিবিদ, কোনো কোনো রাজনৈতিক পক্ষ এবং বিশেষজ্ঞরা। ওই চুক্তিতে বাংলাদেশ পেয়েছে সাময়িক শুল্ক ছাড়ের আশ্বাস, বিনিময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়েছে ১৩১টি শর্ত মানার অঙ্গীকার-এই কৌশলগত চুক্তির চাপ আগামী অর্থ-বছরের বাজেটে কোথায় কোথায় পড়বে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন?
ময়মনসিংহের আব্দুর রশীদ একজন খামারি। বিশ বছর ধরে দুধ বিক্রি করেই সংসার চালান তিনি। নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ হতে যাচ্ছে বৃহস্পতিবার। রশীদ জানেন না সেই বাজেটে তার মতো খামারিদের জন্য কোনো সুখবর আছে কি না। কিন্তু যা তিনি জানেন না তা হলো—চলতি বছর থেকে বাংলাদেশ প্রতি বছর আমেরিকা থেকে ২.৬ মিলিয়ন টন সয়া পণ্য কিনতে চুক্তিগতভাবে বাধ্য। সেই সয়া দিয়ে তৈরি সস্তা পোলট্রি ফিড এবং প্রক্রিয়াজাত দুগ্ধজাত পণ্য যখন দেশের বাজারে বন্যা বইয়ে দেবে, তখন রশীদের উৎপাদিত খাঁটি তরল দুধের দাম কোথায় গিয়ে ঠেকবে?
বাণিজ্য চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ মার্কিন ডেইরি-সেফটি ব্যবস্থাকে নিজের দেশীয় মানের ‘অন্তত সমতুল্য’ সুরক্ষা প্রদানকারী হিসেবে স্বীকার করবে। অর্থাৎ, মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশের রশীদ যে সুবিধা পাচ্ছেন, যুক্তরাষ্ট্রের খামারি রবার্ট উইলিয়ামও প্রায় কাছাকাছি সুবিধা পাবেন। এবং ইউএসডিএ-এর অ্যাগ্রিকালচারাল মার্কেটিং সার্ভিস (এএমএস)-এর সার্টিফিকেট সংযুক্ত থাকলে গরু, মহিষ, ভেড়া ও ছাগলের দুধ থেকে তৈরি মার্কিন দুগ্ধপণ্য আমদানির অনুমতি দেওয়া হবে।
ওই চুক্তির অনুচ্ছেদ ২.৫ অনুযায়ী, বাংলাদেশ অ্যানেক্স-টুতে তালিকাভুক্ত চিজ ও মাংসের পদের একক ব্যবহারের কারণে মার্কিন বাজার সুবিধা সীমিত করতে পারবে না। এর মাধ্যমে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের চিজ ও মাংস উৎপাদকদের বাজার সুবিধা সংরক্ষিত হবে, যারা নির্দিষ্ট সাধারণ নামের ওপর নির্ভর করে ব্যবসা পরিচালনা করেন।

অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের নির্বাহী পরিচালক অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম রায়হান চরচাকে বলেন, “যদি আন্তর্জাতিক চুক্তির কারণে সস্তা বিকল্প আমাদের বাজারে ঢোকে, তবুও দেশীয় শিল্পকে বাঁচাতে আমরা শুল্ক বসিয়ে তা আটকে দিতে পারব না।”
কৃষক রশীদের মতো কোটি মানুষের জীবিকা এখন এই ‘না পারার’ ফাঁদে পড়তে যাচ্ছে। কিন্তু আগামী বাজেটে এই প্রান্তিক খামারিদের সুরক্ষায় কোনো বিশেষ ব্যবস্থার কথা এখনো নীতিনির্ধারকদের তরফ থেকে জানা যায়নি।
গত ৯ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত ‘দ্বিপক্ষীয় রেসিপ্রোকাল ট্রেড এগ্রিমেন্ট’ (এআরটি) বাজেটের দিকনির্দেশনা আগে থেকেই ঠিক করে দিয়েছে কি না- সেটি সম্ভবত অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতার অন্যতম আলোচিত দিক।
চুক্তির আসল হিসাব: যা দেওয়া হয়েছে বনাম যা পাওয়া গেছে
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চুক্তিটা বোঝার সহজ উপায় হলো একটি সাধারণ বাজারের কথা ভাবা। বড় অংশীদারের কাছ থেকে তৈরি পোশাকে শুল্ক ৩৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশ করার সুযোগ পেতে অন্যপক্ষ ১৩১টি শর্ত মানবে, অথচ আমদানিকারক দেশের দায় থাকবে মাত্র ছয়টি শর্ত মানার।
চুক্তির নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশ এই চুক্তিতে যা দিতে রাজি হয়েছে তার তালিকা অত্যন্ত দীর্ঘ ও সুদূরপ্রসারী। এগুলোর মধ্যে আছে-
এসবের বিনিময়ে কী পাওয়া গেছে?
কাগজে-কলমে শুল্ক ৩৭ থেকে ১৯ শতাংশে নামানোর সুযোগ। কিন্তু এখানেও একটি বড় কৌশল লুকিয়ে আছে। এই কম শুল্কের সুবিধা পেতে হলে পোশাক তৈরিতে মার্কিন তুলা বা তাদের উৎপাদিত কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করতে হবে।

তাও আবার একটি নির্দিষ্ট কোটার মধ্যে। যদি দেশীয় উদ্যোক্তারা মার্কিন তুলা ছাড়া অন্য কোনো উৎস থেকে সুতা এনে পোশাক বানান, তবে বিদ্যমান বৈশ্বিক শুল্ক বিধি অনুযায়ী মোট শুল্কভার দাঁড়াবে ৩৫.৫ শতাংশ-যা চুক্তির আগের মতোই প্রায় সমান।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই চুক্তির ধারাগুলো আসলে কেবল বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশকে একটি নির্দিষ্ট ব্লকের নিরাপত্তা ও জ্বালানি-নির্ভরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ইতিমধ্যে রাজনৈতিক মহলে এই চুক্তি নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে, সংসদেও এটি বাতিলের দাবি উঠেছে।
একই সাথে একটি বড় সাংবিধানিক প্রশ্নও সামনে এসেছে-বাংলাদেশের সংবিধানের ১৪৫(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক চুক্তি রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে সংসদে উপস্থাপন করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও, তা কেন করা হয়নি?
বাজেটে চুক্তির ছাপ: তিনটি জায়গায় থাকতে পারে সরাসরি প্রভাব
জ্বালানিতে ভ্যাট ছাড়
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র অনুযায়ী, এবারের বাজেটে এলএনজি আমদানিতে সম্পূর্ণ ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়ার সম্ভাবনা আছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এটি বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ কমাবে এবং সাধারণ মানুষ উপকৃত হবেন। কিন্তু পর্দার পেছনের সত্য হলো-চুক্তিতে বাংলাদেশ ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন গ্যাস কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছে। ফলে এই ভ্যাট ছাড়টা কি আসলেই দেশের আপৎকালীন প্রয়োজনে, নাকি মার্কিন গ্যাস কেনা সহজ করার চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা থেকে? বাজেট বক্তৃতায় এই স্বচ্ছতা কতটুকু বজায় থাকে, সেটাই দেখার বিষয়।
কৃষি: রশীদের গরুর সুরক্ষা
চুক্তিতে প্রতি বছর ৭ লাখ টন মার্কিন গম এবং ২.৬ মিলিয়ন টন সয়া পণ্য কেনার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলো তাদের কৃষকদের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি দেয়। সেই ভর্তুকি পাওয়া কম দামি পণ্য যখন শুল্কহীন বা কম শুল্কে বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশ করবে, তখন দেশীয় পোলট্রি ও ডেইরি খামারিরা প্রতিযোগিতায় টিকবেন কীভাবে?
যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত মাংস ও ডেইরি পণ্যের ওপর বাংলাদেশের বর্তমান সম্মিলিত শুল্ক হার প্রায় ৩৭% থেকে ৫৮%। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, এটি তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে হ্রাস পেয়ে ১০%-এর কোটায় নেমে আসবে। এই ট্যারিফ কমার কারণে ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড সেন্টারের ট্রেড ম্যাপ সিমুলেশন মডেল অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রথম দুই বছরে মার্কিন হিমায়িত মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্যের আমদানি বার্ষিক প্রায় ৩৫০% থেকে ৪০০% বৃদ্ধি পেতে পারে।
বাজেটে দেশীয় পশু খামার রক্ষা বা ক্ষতিপূরণ তহবিলের জন্য বিশেষ কোনো বরাদ্দের লক্ষণ নিয়ে এখন পর্যন্ত নীতিনির্ধারনী মহল থেকে কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। বাকিটা বোঝা যাবে বাজেট প্রস্তাবনা প্রকাশের পর।
ওষুধ: এফডিএ-র দরজা খুলে দেওয়ার পর কী?
চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ মার্কিন এফডিএ অনুমোদিত ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামকে আলাদা কোনো দেশীয় পরীক্ষা ছাড়াই সরাসরি বাজারে বিক্রির অনুমতি দিতে রাজি হয়েছে। এর ফলে বহুজাতিক কোম্পানির দামি ওষুধ সহজেই দেশের বাজারে আধিপত্য বিস্তার করতে পারে। বাংলাদেশের নিজস্ব ওষুধ শিল্প-যা জিডিপিতে এবং কর্মসংস্থানে বড় অবদান রাখছে; তা এক অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে। বাজেটে দেশীয় ওষুধ শিল্পের সুরক্ষায় কোনো প্রস্তুতিমূলক তহবিল বা ল্যাবরেটরি উন্নয়নের বরাদ্দ আসছে কি না, তা একটি বড় প্রশ্ন।
সরকার চাপে কি না বোঝা যাবে সাত সূচকে
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, বাজেট বক্তৃতায় সাতটি সূচক বলে দেবে সরকার চুক্তি মেনে আত্মসমর্পণ করছে, নাকি দেশীয় স্বার্থ রক্ষায় প্রতিরোধ করছে।
খাদ্য আমদানির বিশেষ রিজার্ভ: যদি বাজেটে খাদ্য আমদানিতে বিদেশি মুদ্রার আলাদা ডলার তহবিল বা বরাদ্দ দেখা যায়, তবে বুঝতে হবে সরকার চুক্তির ক্রয়-বাধ্যবাধকতা পূরণে বাধ্য হচ্ছে।
এলএনজি ভ্যাট ছাড়ের ফ্রেমিং: বাজেট বক্তৃতায় এলএনজির ভ্যাট ছাড়ের কারণ হিসেবে যদি স্রেফ ‘জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা’ বলা হয়, তবে মনে হতে পারে সরকার চুক্তির বিষয়টি আড়াল করতে চাইছে। আর যদি সরাসরি দ্বিপাক্ষিক চুক্তির প্রসঙ্গ আসে, তবে বুঝতে হবে আন্তর্জাতিক চাপ স্পষ্ট।
ডেইরি খাতের বিশেষ প্রণোদনা: কৃষি বাজেটে যদি দেশীয় দুগ্ধ ও পশু খামারিদের জন্য বিশেষ নগদ সহায়তা বা উচ্চ সুরক্ষামূলক শুল্ক দেখা যায়, তাহলে সরকার রশীদদের বাঁচাতে লড়ছে বলে ধরে নেয়া যায়। না থাকলে মার্কিন কৃষিপণ্যের জন্য পথ অবাধ রাখা হচ্ছে।

এশীয় অঞ্চলের মেগা প্রকল্পে বরাদ্দ: চুক্তির পরোক্ষ শর্ত অনুযায়ী অন্য কোনো বৃহৎ এশীয় শক্তির অর্থায়নে চলমান মেগা প্রকল্পগুলোতে (যেমন নির্দিষ্ট রেল বা বন্দর প্রকল্প) যদি নতুন বরাদ্দ হঠাৎ কমে যায়, তবে বুঝতে হবে ভূ-রাজনৈতিক চাপ কাজ করছে।
প্রতিরক্ষা বাজেট ও যন্ত্রপাতির উৎস: বাজেটে প্রতিরক্ষা বরাদ্দ যদি অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পায় এবং নির্দিষ্ট পশ্চিমা সামরিক সরঞ্জাম কেনার ইঙ্গিত থাকে, তবে বুঝতে হবে চুক্তির কৌশলগত সামরিক ধারা কার্যকর শুরু হয়েছে।
মার্কিন তুলা ব্যবহারে বিশেষ ছাড়: তৈরি পোশাক খাতে মার্কিন তুলা বা সুতা ব্যবহারের বিপরীতে যদি আলাদা কর রেয়াত বা বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া হয়, তবে সরকার শূন্য শুল্কের ‘কটন ক্লজ’ সুবিধা পেতে মরিয়া।
ওষুধ খাতের গবেষণা তহবিল: এফডিএ শর্তের মোকাবেলা করতে দেশীয় ওষুধ শিল্পের মানোন্নয়ন ও গবেষণায় যদি সরকার বড় অংকের বিশেষ ফান্ড ঘোষণা না করে, তবে বুঝতে হবে দেশীয় ওষুধ শিল্পকে চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেওয়া হচ্ছে।
যা বলছেন বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবদরা
উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ ও পলিসি থিংক ট্যাঙ্কের গবেষকরা বিভিন্ন সময়, নানা আলোচনায় এই চুক্তিকে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সানেমের সেলিম রায়হান এই প্রসঙ্গে বলেন, “এটি কেবল একটি বাণিজ্যিক লেনদেন নয়, এটি একটি ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণ। বাংলাদেশ বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার এমন এক ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে প্রবেশ করেছে, যেখানে আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে।”
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান একটি বড় বাস্তবসম্মত জটিলতার দিকে আঙুল তুলেছেন। তার পর্যবেক্ষণ হলো-বাংলাদেশে বাল্ক পণ্য (যেমন গম বা সয়া) সাধারণত সরকার সরাসরি আমদানি করে না, এটি করে বেসরকারি খাত। এখন সরকার কীভাবে বেসরকারি আমদানিকারকদের বাধ্য করবে যে তারা অন্য কোনো দেশের সস্তা বিকল্প ছেড়ে কেবল মার্কিন পণ্যই বেশি দামে কিনবে? এই জট খোলার কোনো সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা সরকারি নীতিতে নেই।
একই সাথে, পলিসি রিচার্স ইনস্টিটিউট (পিআরআই)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর তার বিশ্লেষণে বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছেন। তার আশঙ্কা-এই বাধ্যতামূলক উচ্চ আমদানির চাপ সরাসরি আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর পড়বে। দেশ যখন ইতিমধ্যে বিদেশি ঋণ পরিশোধের তীব্র চাপে জর্জরিত, তখন প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বাধ্যতামূলক আমদানির শর্ত রিজার্ভকে আরও বেশি সংকুচিত করে তুলতে পারে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই চুক্তিটি আসলে বাণিজ্যের মোড়কে একটি বড় ধরণের কৌশলগত ও নীতিগত পুনর্বিন্যাস। যদি অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় এই চুক্তির নাম নিতে দ্বিধাবোধ করেন-যদি এলএনজি বা গমের বরাদ্দের পেছনে আন্তর্জাতিক শর্তের কথা গোপন রাখা হয়—তবে বুঝতে হবে সরকার নিজেও এই চুক্তিকে কোনো ‘অর্জন’ নয়, বরং একটি বড় ‘বোঝা’ হিসেবে দেখছে।
আর যদি একে সাফল্য হিসেবে বড় করে দেখানো হয়, তবে ময়মনসিংহের আব্দুর রশীদের মতো কোটি প্রান্তিক মানুষকে বুঝে নিতে হবে-এই বিশাল বোঝার চূড়ান্ত ভার শেষ পর্যন্ত তার কাঁধের ওপর এসে পড়ছে।