ফজলে রাব্বি

চব্বিশের আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর প্রথম রাজনৈতিক বাজেট উপস্থাপন হতে যাচ্ছে বৃহস্পতিবার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে ঘিরে প্রত্যাশা, উদ্বেগ এবং রাজনৈতিক গুরুত্ব অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। ফলে এটি শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; বরং নতুন সরকারের অর্থনৈতিক দর্শন, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সক্ষমতা এবং দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার রূপরেখার প্রথম বড় পরীক্ষা।
দেশ এমন এক সময়ে এই বাজেট পাচ্ছে যখন মূল্যস্ফীতি এখনো মানুষের প্রধান উদ্বেগ। ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকট, জ্বালানি নিরাপত্তা অনিশ্চিত, বৈদেশিক খাত চাপে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থাও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে বাজেটের প্রতিটি বড় সিদ্ধান্ত কোটি মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত হয়ে উঠেছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, নতুন সরকার কি সংকট ব্যবস্থাপনার বাজেট দেবে, নাকি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের রূপরেখা উপস্থাপন করবে?
মূল্যস্ফীতি এবং প্রবৃদ্ধির চাপ, কী হবে কৌশল
গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশের অর্থনীতির দগদগে সমস্যা। খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রকৃত আয় কমেছে। অনেক পরিবার ভোগব্যয় কমাতে বাধ্য হয়েছে। ফলে এবারের বাজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সম্ভবত একটি-সাধারণ মানুষের বাজার খরচ কমাতে সরকার কী করবে?
বাজেটে দেখতে হবে সরকার কোন ভারসাম্য খুঁজে নিচ্ছে। কারণ সাধারণ মানুষের কাছে এখন জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ মাস শেষে বাজারের ব্যাগ ভরতে কত টাকা লাগছে।
বাস্তবতা হলো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার লক্ষ্য অনেক সময় দ্বন্দ্বাত্মক হয়। মূল্যস্ফীতি কমাতে সরকার যদি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, ভর্তুকি পুনর্বিন্যাস এবং বাজেট ঘাটতি সীমিত রাখার পথে হাঁটে, তাহলে সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে। কিন্তু এতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের গতি কমার ঝুঁকিও থাকবে।
আবার প্রবৃদ্ধি বাড়াতে যদি সরকারি ব্যয় সম্প্রসারণ করা হয়, তাহলে স্বল্পমেয়াদে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম বাড়তে পারে। কিন্তু চাহিদা বৃদ্ধির ফলে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপও তৈরি হতে পারে।
তাই বাজেটে দেখতে হবে সরকার কোন ভারসাম্য খুঁজে নিচ্ছে। কারণ সাধারণ মানুষের কাছে এখন জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ মাস শেষে বাজারের ব্যাগ ভরতে কত টাকা লাগছে।
জ্বালানি খাতে সংস্কারের রূপরেখা থাকবে?
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ এখন জ্বালানি খাত। গত এক দশকের বেশি সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি পেলেও সেই ব্যবস্থার আর্থিক ব্যয়ও দ্রুত বেড়েছে। বিশেষ করে ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে একসময় তুমুল সমালোচনা করেছে বিএনপি। এ খাতের দুর্নীতি ও অনিয়মের দায় ভোক্তার কাধে চাপানোর কড়া সমালোচনা করে সুশাসনের প্রতিশ্রুতি ছিল বিএনপির। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর জীবনের প্রথম বাজেট প্রস্তাবনায় বোঝা যাবে বিদ্যুৎ খাত নিয়ে বিএনপির হোমওয়ার্ক সম্পর্কে।
অন্যদিকে, দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন কমছে। ফলে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা এখন সরাসরি বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যয়কে প্রভাবিত করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা। ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি।
এই প্রেক্ষাপটে বাজেটে দেখতে হবে, সরকার কি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে নতুন বিনিয়োগের পরিকল্পনা দিচ্ছে? নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর কোনো উদ্যোগ রয়েছে? বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় কমানোর জন্য কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে?
কারণ জ্বালানি খাতের সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয় নয়। এটি শিল্প উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন খরচ, রপ্তানি প্রতিযোগিতা এবং দ্রব্যমূল্যের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। কাজেই অর্থনীতিবিদদের বাড়তি মনযোগ থাকবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বরাদ্দ ও প্রস্তাবিত কর্মকৌশলের দিকে।

নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন কীভাবে?
রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের সময় যে প্রতিশ্রুতি দেয়, বাজেটই তার বাস্তব পরীক্ষার ক্ষেত্র। বিএনপির ৩১ দফা কর্মসূচি এবং নির্বাচনী অঙ্গীকারের আলোকে এবারের বাজেট বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে।
বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা এবং সুশাসন-এই পাঁচটি ক্ষেত্রের বরাদ্দ ও নীতিগত অগ্রাধিকার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির তুলনায় কম ব্যয় করে আসছে। একই সময়ে তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, বাজেটে সামাজিক খাতে দৃশ্যমান অগ্রাধিকার দেখা যাবে? কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য নতুন প্রণোদনা বা দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি থাকবে? স্থানীয় সরকার ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের জন্য আর্থিক বরাদ্দ বাড়ানো হবে?
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি। কিন্তু রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতা সীমিত। ফলে এই বাজেটেই প্রথমবারের মতো স্পষ্ট হবে সরকার কোনো প্রতিশ্রুতিকে তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং কোনগুলো দীর্ঘমেয়াদে বাস্তবায়নের পথে রাখছে।
ব্যাংকে আমানতকারীর টাকা কতটা নিরাপদ?
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যখন সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সম্ভবত একটিই-ব্যাংকে রাখা টাকা কতটা নিরাপদ? গত কয়েক বছরে খেলাপি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধি, দুর্বল ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থার অবনতি এবং একাধিক ব্যাংক পুনর্গঠনের উদ্যোগ আমানতকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বর্তমানে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে, যার বড় অংশই ‘মন্দ ঋণ’ হিসেবে চিহ্নিত।
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের দিকে বিশেষ নজর থাকবে। কারণ ব্যাংকিং খাতের সংকট মোকাবিলায় সরকারের আর্থিক ও নীতিগত অবস্থান অনেকটাই স্পষ্ট হবে বাজেটের মাধ্যমেই। বিশেষ করে প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার বাজেট ঘাটতি পূরণে কতটা ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেবে এবং এর প্রভাব বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের ওপর কতটা পড়বে।
যদি সরকার ব্যাপকভাবে ব্যাংকনির্ভর ঋণ গ্রহণের পথে হাঁটে, তাহলে নতুন বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য ঋণ পাওয়া আরও কঠিন হয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে উচ্চ সুদের হার ও সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির পরিবেশে ব্যাংকগুলোর তারল্য ও মুনাফার ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে। ফলে ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষার সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চাহিদার একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে সরকারকে।
একইসঙ্গে নজর থাকবে ব্যাংক খাত সংস্কার নিয়ে সরকারের রূপরেখার দিকে। পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একীভূত করার চলমান প্রক্রিয়া, খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন, প্রভিশন ঘাটতি কমানো এবং আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য বাজেটে কোনো সুস্পষ্ট উদ্যোগ বা বরাদ্দের ইঙ্গিত থাকে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
তবে শেষ পর্যন্ত বিষয়টি সাধারণ মানুষের কাছে একটি আস্থার প্রশ্ন। আমানতকারীরা জানতে চান, তাদের সঞ্চয় সুরক্ষিত রাখতে সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে। তাই এবারের বাজেট শুধু রাজস্ব ও ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি ব্যাংকিং খাতে আস্থা পুনর্গঠন এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকারেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির প্রভাব পড়বে কতটা?
সম্প্রতি স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির পর এটিই প্রথম জাতীয় বাজেট হওয়ায়, স্বাভাবিকভাবেই এই চুক্তির সুবিধা লুফে নিতে এবং এর শর্তগুলো পূরণে সরকারের আসল প্রস্তুতি ও কৌশল এই বাজেটেই খোঁজা হবে। বর্তমানে বিশ্ববাজার ও যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি দ্রুত বদলাচ্ছে এবং পণ্য সরবরাহের বৈশ্বিক চেইন ও বাজারে প্রতিযোগিতা পুনর্বিন্যস্ত হচ্ছে। এই নতুন বাস্তবতায় বাংলাদেশের রপ্তানি খাতকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে প্রস্তুত করার কোনো বিকল্প নেই।
প্রশ্ন হলো, নতুন এই বাণিজ্য কূটনীতি মাথায় রেখে বাজেটে কি শুল্ক কাঠামো নতুন করে সাজানোর কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকবে? বিশেষ করে ব্যবসা করার খরচ কমানো, বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো এবং কাস্টমস ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ আধুনিক ও ডিজিটাল করার কোনো সাহসী উদ্যোগ অর্থমন্ত্রীর তরফ থেকে দেখা যাবে কি না, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে বড় কৌতূহল রয়েছে।
এই পুরো সমীকরণে সবচেয়ে বড় নজর থাকবে তৈরি পোশাক খাতের ওপর, কারণ লাখ লাখ শ্রমিকের রুটি-রুজির এই প্রধান খাতটি মার্কিন বাজারে নতুন চুক্তির সুবিধা কতটা আদায় করতে পারছে, তা এই বাজেটের নীতিনির্ধারণী সুরক্ষার ওপর অনেকটাই নির্ভর করছে। তবে মার্কিন বাজারের এই বড় সুযোগ ধরতে হলে শুধু ঐতিহ্যগত নগদ সহায়তা বা রপ্তানি প্রণোদনা দিলেই আর চলবে না। কারখানার উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং সামগ্রিক বাণিজ্য প্রক্রিয়াকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত করার একটি টেকসই রূপরেখা এই বাজেট আমাদের দিতে পারে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

কাদের জন্য বাজেট দিচ্ছে বিএনপি?
প্রতিটি বাজেট শেষ পর্যন্ত একটি রাজনৈতিক দলিল। এর মাধ্যমে বোঝা যায় সরকার কোন শ্রেণি, কোন খাত এবং কোন অর্থনৈতিক দর্শনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। করনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, ভর্তুকি, বিনিয়োগ প্রণোদনা এবং উন্নয়ন ব্যয়ের কাঠামো বিশ্লেষণ করলে সেই চিত্র স্পষ্ট হয়।
এবারের বাজেটে বিশেষভাবে দেখা হবে-সরকার কি বেসরকারি বিনিয়োগকে প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করছে, নাকি রাষ্ট্রের সরাসরি ভূমিকা বাড়ানোর দিকে যাচ্ছে? করছাড়ের সুবিধা কারা পাচ্ছে? সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা কতটা বাড়ছে?
একইসঙ্গে বিএনপির ২০০১-০৬ আমলের অর্থনৈতিক মডেলের সঙ্গে তুলনাও সামনে আসবে। তখনকার সময়ে বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধি ও ব্যবসাবান্ধব নীতিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা অনেক ভিন্ন। এখন বৈদেশিক ঋণচাপ, জলবায়ু ঝুঁকি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।
ফলে প্রশ্ন হচ্ছে, বিএনপি কি পুরনো অর্থনৈতিক দর্শনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে, নাকি নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি ভিন্ন অর্থনৈতিক কাঠামোর দিকে অগ্রসর হবে?
সব মিলিয়ে বলা যায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে শুধু আরেকটি বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এমন এক সময়ে আসছে, যখন বাংলাদেশের অর্থনীতি একইসঙ্গে মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি অনিশ্চয়তা, ব্যাংকিং সংকট, কর্মসংস্থানের চাপ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের পরিবর্তিত বাস্তবতার মুখোমুখি।
তাই এই বাজেটের সাফল্য নির্ধারিত হবে না কেবল রাজস্ব আদায় বা ব্যয়ের অঙ্ক দিয়ে। বরং নির্ধারিত হবে এটি কতটা বিশ্বাসযোগ্যভাবে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা এবং ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির ভিত্তি নিয়ে কাজ করতে পারে তার ওপর।
সবচেয়ে বড় কথা, এটি বিএনপির এবারের সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক নীতিপত্র। ফলে বাজেটের প্রতিটি সিদ্ধান্তের মধ্যেই একটি বৃহত্তর প্রশ্ন লুকিয়ে আছে-নতুন সরকার কি শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটিয়েছে, নাকি অর্থনৈতিক পরিচালনার ধরনেও সত্যিকার পরিবর্তনের সূচনা করতে যাচ্ছে? এই বাজেট সেই প্রশ্নের প্রথম উত্তর খোঁজার দলিল। বৃহস্পতিবার বিকেলে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ব্রিফকেস থেকে সেই দলিল বের করে জাতির সামনে হাজির করবেন।

চব্বিশের আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর প্রথম রাজনৈতিক বাজেট উপস্থাপন হতে যাচ্ছে বৃহস্পতিবার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে ঘিরে প্রত্যাশা, উদ্বেগ এবং রাজনৈতিক গুরুত্ব অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। ফলে এটি শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; বরং নতুন সরকারের অর্থনৈতিক দর্শন, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সক্ষমতা এবং দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার রূপরেখার প্রথম বড় পরীক্ষা।
দেশ এমন এক সময়ে এই বাজেট পাচ্ছে যখন মূল্যস্ফীতি এখনো মানুষের প্রধান উদ্বেগ। ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকট, জ্বালানি নিরাপত্তা অনিশ্চিত, বৈদেশিক খাত চাপে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থাও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে বাজেটের প্রতিটি বড় সিদ্ধান্ত কোটি মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত হয়ে উঠেছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, নতুন সরকার কি সংকট ব্যবস্থাপনার বাজেট দেবে, নাকি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের রূপরেখা উপস্থাপন করবে?
মূল্যস্ফীতি এবং প্রবৃদ্ধির চাপ, কী হবে কৌশল
গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশের অর্থনীতির দগদগে সমস্যা। খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রকৃত আয় কমেছে। অনেক পরিবার ভোগব্যয় কমাতে বাধ্য হয়েছে। ফলে এবারের বাজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সম্ভবত একটি-সাধারণ মানুষের বাজার খরচ কমাতে সরকার কী করবে?
বাজেটে দেখতে হবে সরকার কোন ভারসাম্য খুঁজে নিচ্ছে। কারণ সাধারণ মানুষের কাছে এখন জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ মাস শেষে বাজারের ব্যাগ ভরতে কত টাকা লাগছে।
বাস্তবতা হলো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার লক্ষ্য অনেক সময় দ্বন্দ্বাত্মক হয়। মূল্যস্ফীতি কমাতে সরকার যদি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, ভর্তুকি পুনর্বিন্যাস এবং বাজেট ঘাটতি সীমিত রাখার পথে হাঁটে, তাহলে সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে। কিন্তু এতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের গতি কমার ঝুঁকিও থাকবে।
আবার প্রবৃদ্ধি বাড়াতে যদি সরকারি ব্যয় সম্প্রসারণ করা হয়, তাহলে স্বল্পমেয়াদে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম বাড়তে পারে। কিন্তু চাহিদা বৃদ্ধির ফলে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপও তৈরি হতে পারে।
তাই বাজেটে দেখতে হবে সরকার কোন ভারসাম্য খুঁজে নিচ্ছে। কারণ সাধারণ মানুষের কাছে এখন জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ মাস শেষে বাজারের ব্যাগ ভরতে কত টাকা লাগছে।
জ্বালানি খাতে সংস্কারের রূপরেখা থাকবে?
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ এখন জ্বালানি খাত। গত এক দশকের বেশি সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি পেলেও সেই ব্যবস্থার আর্থিক ব্যয়ও দ্রুত বেড়েছে। বিশেষ করে ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে একসময় তুমুল সমালোচনা করেছে বিএনপি। এ খাতের দুর্নীতি ও অনিয়মের দায় ভোক্তার কাধে চাপানোর কড়া সমালোচনা করে সুশাসনের প্রতিশ্রুতি ছিল বিএনপির। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর জীবনের প্রথম বাজেট প্রস্তাবনায় বোঝা যাবে বিদ্যুৎ খাত নিয়ে বিএনপির হোমওয়ার্ক সম্পর্কে।
অন্যদিকে, দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন কমছে। ফলে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা এখন সরাসরি বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যয়কে প্রভাবিত করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা। ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি।
এই প্রেক্ষাপটে বাজেটে দেখতে হবে, সরকার কি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে নতুন বিনিয়োগের পরিকল্পনা দিচ্ছে? নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর কোনো উদ্যোগ রয়েছে? বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় কমানোর জন্য কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে?
কারণ জ্বালানি খাতের সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয় নয়। এটি শিল্প উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন খরচ, রপ্তানি প্রতিযোগিতা এবং দ্রব্যমূল্যের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। কাজেই অর্থনীতিবিদদের বাড়তি মনযোগ থাকবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বরাদ্দ ও প্রস্তাবিত কর্মকৌশলের দিকে।

নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন কীভাবে?
রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের সময় যে প্রতিশ্রুতি দেয়, বাজেটই তার বাস্তব পরীক্ষার ক্ষেত্র। বিএনপির ৩১ দফা কর্মসূচি এবং নির্বাচনী অঙ্গীকারের আলোকে এবারের বাজেট বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে।
বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা এবং সুশাসন-এই পাঁচটি ক্ষেত্রের বরাদ্দ ও নীতিগত অগ্রাধিকার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির তুলনায় কম ব্যয় করে আসছে। একই সময়ে তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, বাজেটে সামাজিক খাতে দৃশ্যমান অগ্রাধিকার দেখা যাবে? কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য নতুন প্রণোদনা বা দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি থাকবে? স্থানীয় সরকার ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের জন্য আর্থিক বরাদ্দ বাড়ানো হবে?
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি। কিন্তু রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতা সীমিত। ফলে এই বাজেটেই প্রথমবারের মতো স্পষ্ট হবে সরকার কোনো প্রতিশ্রুতিকে তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং কোনগুলো দীর্ঘমেয়াদে বাস্তবায়নের পথে রাখছে।
ব্যাংকে আমানতকারীর টাকা কতটা নিরাপদ?
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যখন সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সম্ভবত একটিই-ব্যাংকে রাখা টাকা কতটা নিরাপদ? গত কয়েক বছরে খেলাপি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধি, দুর্বল ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থার অবনতি এবং একাধিক ব্যাংক পুনর্গঠনের উদ্যোগ আমানতকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বর্তমানে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে, যার বড় অংশই ‘মন্দ ঋণ’ হিসেবে চিহ্নিত।
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের দিকে বিশেষ নজর থাকবে। কারণ ব্যাংকিং খাতের সংকট মোকাবিলায় সরকারের আর্থিক ও নীতিগত অবস্থান অনেকটাই স্পষ্ট হবে বাজেটের মাধ্যমেই। বিশেষ করে প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার বাজেট ঘাটতি পূরণে কতটা ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেবে এবং এর প্রভাব বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের ওপর কতটা পড়বে।
যদি সরকার ব্যাপকভাবে ব্যাংকনির্ভর ঋণ গ্রহণের পথে হাঁটে, তাহলে নতুন বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য ঋণ পাওয়া আরও কঠিন হয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে উচ্চ সুদের হার ও সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির পরিবেশে ব্যাংকগুলোর তারল্য ও মুনাফার ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে। ফলে ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষার সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চাহিদার একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে সরকারকে।
একইসঙ্গে নজর থাকবে ব্যাংক খাত সংস্কার নিয়ে সরকারের রূপরেখার দিকে। পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একীভূত করার চলমান প্রক্রিয়া, খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন, প্রভিশন ঘাটতি কমানো এবং আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য বাজেটে কোনো সুস্পষ্ট উদ্যোগ বা বরাদ্দের ইঙ্গিত থাকে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
তবে শেষ পর্যন্ত বিষয়টি সাধারণ মানুষের কাছে একটি আস্থার প্রশ্ন। আমানতকারীরা জানতে চান, তাদের সঞ্চয় সুরক্ষিত রাখতে সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে। তাই এবারের বাজেট শুধু রাজস্ব ও ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি ব্যাংকিং খাতে আস্থা পুনর্গঠন এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকারেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির প্রভাব পড়বে কতটা?
সম্প্রতি স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির পর এটিই প্রথম জাতীয় বাজেট হওয়ায়, স্বাভাবিকভাবেই এই চুক্তির সুবিধা লুফে নিতে এবং এর শর্তগুলো পূরণে সরকারের আসল প্রস্তুতি ও কৌশল এই বাজেটেই খোঁজা হবে। বর্তমানে বিশ্ববাজার ও যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি দ্রুত বদলাচ্ছে এবং পণ্য সরবরাহের বৈশ্বিক চেইন ও বাজারে প্রতিযোগিতা পুনর্বিন্যস্ত হচ্ছে। এই নতুন বাস্তবতায় বাংলাদেশের রপ্তানি খাতকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে প্রস্তুত করার কোনো বিকল্প নেই।
প্রশ্ন হলো, নতুন এই বাণিজ্য কূটনীতি মাথায় রেখে বাজেটে কি শুল্ক কাঠামো নতুন করে সাজানোর কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকবে? বিশেষ করে ব্যবসা করার খরচ কমানো, বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো এবং কাস্টমস ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ আধুনিক ও ডিজিটাল করার কোনো সাহসী উদ্যোগ অর্থমন্ত্রীর তরফ থেকে দেখা যাবে কি না, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে বড় কৌতূহল রয়েছে।
এই পুরো সমীকরণে সবচেয়ে বড় নজর থাকবে তৈরি পোশাক খাতের ওপর, কারণ লাখ লাখ শ্রমিকের রুটি-রুজির এই প্রধান খাতটি মার্কিন বাজারে নতুন চুক্তির সুবিধা কতটা আদায় করতে পারছে, তা এই বাজেটের নীতিনির্ধারণী সুরক্ষার ওপর অনেকটাই নির্ভর করছে। তবে মার্কিন বাজারের এই বড় সুযোগ ধরতে হলে শুধু ঐতিহ্যগত নগদ সহায়তা বা রপ্তানি প্রণোদনা দিলেই আর চলবে না। কারখানার উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং সামগ্রিক বাণিজ্য প্রক্রিয়াকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত করার একটি টেকসই রূপরেখা এই বাজেট আমাদের দিতে পারে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

কাদের জন্য বাজেট দিচ্ছে বিএনপি?
প্রতিটি বাজেট শেষ পর্যন্ত একটি রাজনৈতিক দলিল। এর মাধ্যমে বোঝা যায় সরকার কোন শ্রেণি, কোন খাত এবং কোন অর্থনৈতিক দর্শনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। করনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, ভর্তুকি, বিনিয়োগ প্রণোদনা এবং উন্নয়ন ব্যয়ের কাঠামো বিশ্লেষণ করলে সেই চিত্র স্পষ্ট হয়।
এবারের বাজেটে বিশেষভাবে দেখা হবে-সরকার কি বেসরকারি বিনিয়োগকে প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করছে, নাকি রাষ্ট্রের সরাসরি ভূমিকা বাড়ানোর দিকে যাচ্ছে? করছাড়ের সুবিধা কারা পাচ্ছে? সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা কতটা বাড়ছে?
একইসঙ্গে বিএনপির ২০০১-০৬ আমলের অর্থনৈতিক মডেলের সঙ্গে তুলনাও সামনে আসবে। তখনকার সময়ে বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধি ও ব্যবসাবান্ধব নীতিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা অনেক ভিন্ন। এখন বৈদেশিক ঋণচাপ, জলবায়ু ঝুঁকি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।
ফলে প্রশ্ন হচ্ছে, বিএনপি কি পুরনো অর্থনৈতিক দর্শনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে, নাকি নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি ভিন্ন অর্থনৈতিক কাঠামোর দিকে অগ্রসর হবে?
সব মিলিয়ে বলা যায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে শুধু আরেকটি বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এমন এক সময়ে আসছে, যখন বাংলাদেশের অর্থনীতি একইসঙ্গে মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি অনিশ্চয়তা, ব্যাংকিং সংকট, কর্মসংস্থানের চাপ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের পরিবর্তিত বাস্তবতার মুখোমুখি।
তাই এই বাজেটের সাফল্য নির্ধারিত হবে না কেবল রাজস্ব আদায় বা ব্যয়ের অঙ্ক দিয়ে। বরং নির্ধারিত হবে এটি কতটা বিশ্বাসযোগ্যভাবে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা এবং ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির ভিত্তি নিয়ে কাজ করতে পারে তার ওপর।
সবচেয়ে বড় কথা, এটি বিএনপির এবারের সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক নীতিপত্র। ফলে বাজেটের প্রতিটি সিদ্ধান্তের মধ্যেই একটি বৃহত্তর প্রশ্ন লুকিয়ে আছে-নতুন সরকার কি শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটিয়েছে, নাকি অর্থনৈতিক পরিচালনার ধরনেও সত্যিকার পরিবর্তনের সূচনা করতে যাচ্ছে? এই বাজেট সেই প্রশ্নের প্রথম উত্তর খোঁজার দলিল। বৃহস্পতিবার বিকেলে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ব্রিফকেস থেকে সেই দলিল বের করে জাতির সামনে হাজির করবেন।

বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমের শুষ্ক বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষকেরা বলছেন, তারা গ্রামীণ জীবনের মূল ভিত্তি চোখের সামনে হারিয়ে যেতে দেখছেন। কয়েক দশক ধরে ভূগর্ভস্থ পানি বাংলাদেশের অন্যতম শুষ্ক এই বরেন্দ্র অঞ্চলকে একটি উৎপাদনশীল কৃষি অঞ্চলে পরিণত করেছিল। গভীর নলকূপের কল্যাণে কৃষকেরা একসময়ের খরাপ্রবণ এই জমিতে বছরজ

নির্বাচনী ধাক্কার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অত্যন্ত হিসাব কষে তার পরবর্তী রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন। তিনি কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নেননি। বাংলায় এই মুহূর্তে কোনো বিধানসভা নির্বাচন নেই। রাতারাতি সরকার পরিবর্তনের কোনো আইনি সম্ভাবনাও তৈরি হয়নি। কিন্তু রাজ্যের অভ্যন্তরে তৃণমূল কংগ্রেস যে নজিরবিহীন সাংগঠনিক