ফজলে রাব্বি

বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জ কেবল রাজস্ব ঘাটতি কিংবা প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি বরং একটি গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংকট। তাদের মতে, এই সংকটের কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, অকার্যকর প্রকল্প, কর প্রশাসনের জটিলতা, দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি এবং কৃষির আধুনিকায়নের অভাব।
রাজধানীতে আজ শনিবার চরচা ডট কম আয়োজিত ‘সংকট মুহূর্তের বাজেট ২০২৬-২৭’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, শিক্ষাবিদ ও বিভিন্ন খাতের নীতিনির্ধারকেরা এসব কথা বলেন। চরচা সম্পাদক সোহরাব হাসানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, নতুন অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে বড় বাজেট বা উচ্চ প্রবৃদ্ধির কাগুজে ঘোষণা যথেষ্ট নয়। এখন প্রয়োজন সুশাসন, নীতি-স্থিতিশীলতা ও বাস্তবভিত্তিক সংস্কার।

বিনিয়োগের প্রধান বাধা কী
গোলটেবিল আলোচনায় বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতাকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, “২০৩০ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছাতে হলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।” তবে ঘন ঘন নীতি পরিবর্তনের কারণে বিনিয়োগকারীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে জানান আলোচকরা।
অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, “সরকারের যেকোনো নীতি বা পলিসি অন্তত তিন বছর স্থায়ী না হলে, তা ব্যবসায়ীদের জন্য চরম অনিশ্চয়তা তৈরি করে।” একই সুরে বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “ব্যবসায়ীরা যাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে পারেন, সেজন্য কর নীতি অন্তত ৫ বছরের জন্য স্থির রাখা উচিত। পাশাপাশি কর আদায়কারী ও নীতি-নির্ধারকদের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সম্পূর্ণ আলাদা করা প্রয়োজন।”
নীতিনির্ধারকেরা একমত হন যে, বিনিয়োগ সংকটকে কেবল আর্থিক ক্ষতি হিসেবে না দেখে কর্মসংস্থান, উৎপাদন, রপ্তানি ও রাজস্ব আহরণের সামগ্রিক চক্রের আলোকেই দেখতে হবে। পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি এ প্রসঙ্গে বলেছেন, সরকার বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় আস্থা, সুশাসন ও কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলতে কাজ করছে।

দেশে কি ‘ট্যাক্স টেররিজম’ চলছে?
কর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন না হওয়া এবং ব্যবসায়ীদের হয়রানি নিয়ে গোলটেবিল আলোচনায় তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ পায়। নাসিম মঞ্জুরের মন্তব্যের সূত্র ধরে বিকেএমইএ নেতা মোহাম্মদ হাতেম বলেন, এনবিআরের কর আদায়ের বর্তমান পদ্ধতি আসলে ‘ট্যাক্স টেররিজম’। তিনি অভিযোগ করেন, অগ্রিম আয়কর (এআইটি) এবং উৎসে করের টাকা সময়মতো ফেরত না দিয়ে ব্যবসায়ীদের ‘ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল’ আটকে রাখা হচ্ছে।
অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর অডিট ব্যবস্থার নামে হয়রানির সমালোচনা করে রিস্ক–বেজড ডিজিটাল অডিট প্রবর্তনের দাবি জানান। কর ব্যবস্থার এই জটিলতা নিরসনে সাবেক অর্থসচিব মুসলিম চৌধুরী বলেন, করদাতাদের হয়রানি কমাতে কর প্রশাসনকে সম্পূর্ণ ‘ফেসলেস’ বা ডিজিটাল করতে হবে, যা বৈশ্বিকভাবে প্রমাণিত একটি সফল মডেল।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকসের ডিন ড. ওয়ারেসুল করিম করের হার বাড়ানোর চেয়ে করের আওতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, দেশের অনেক লাভজনক খাত এখনো কর আওতার বাইরে রয়ে গেছে, যেগুলোকে করের আওতায় আনা জরুরি।
ব্যাংকিং খাত আস্থার সংকটে, দায়ী ‘দুষ্টু চক্র’
দেশের আর্থিক খাতের মূল দুর্বলতা হিসেবে আস্থার সংকট ও জবাবদিহির অভাবকে দায়ী করেন আলোচকেরা। আইসিএমএবি-এর সভাপতি কাওসার আলম বলেন, “শুধু বিদেশি বিনিয়োগকারী নয়, দেশি বিনিয়োগকারী, করদাতা ও সাধারণ জনগণের মধ্যেও আস্থার বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সরকারকে প্রমাণ করতে হবে যে, জনগণের ট্যাক্সের টাকা সঠিকভাবে ব্যয় হচ্ছে।”
দেশের আর্থিক খাত ক্রমেই একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীকেন্দ্রিক ব্যবস্থায় পরিণত হচ্ছে বলে মনে করেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি। তার কথায়, “রাজনৈতিক ক্ষমতাবান বড় ঋণগ্রহীতারা অন্যায্য সুবিধা পাচ্ছেন, আর প্রকৃত উৎপাদনমুখী উদ্যোক্তারা অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।” ব্যাংকিং খাতকে একটি ‘দুষ্টু চক্র’ আখ্যা দিয়ে প্রতিমন্ত্রী আমানতকারীদের আস্থা ফেরানোর তাগিদ দেন।
এডিপি বাস্তবায়নে অপচয় হয় কতটা?
উন্নয়ন প্রকল্প (এডিপি) বাস্তবায়নে পরিকল্পনার অভাব ও আন্তঃদপ্তর সমন্বয়হীনতার কারণে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন বেশির ভাগ আলোচক। আইসিএমএবি সভাপতি কাওসার আলম বলেন, বাজেটের আকার নয়, এর গুণগত বাস্তবায়নই আসল। তার মতে, প্রকৃত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে ‘কোয়ালিটি ড্রিভেন কোয়ানটিটি’ নীতিতে এগোতে হবে।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি চলমান ১ হাজার ৩৩৩টি উন্নয়ন প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বিচ্ছিন্নভাবে প্রকল্প না নিয়ে সেগুলোকে একটি সমন্বিত কর্মসূচীর আওতায় এনে পুনর্বিন্যাস করার তাগিদ দেন। সমন্বয়হীনতার উদাহরণ দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “অনেক জায়গায় বড় হাসপাতাল ভবন নির্মিত হলেও চিকিৎসক বা যন্ত্রপাতি নেই। কোটি কোটি টাকার এই অবকাঠামো অব্যবহৃত পড়ে থাকা শুধু আর্থিক অপচয় নয়, রাষ্ট্রীয় অদক্ষতারও প্রমাণ।”

কর্মসংস্থানের সংকট কেন দূর হচ্ছে না?
আলোচকদের মতে, উচ্চ প্রবৃদ্ধির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি। একই সাথে যুবসমাজকে দক্ষ করতে কারিগরি শিক্ষা উপজেলা পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান বক্তারা।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি কর্মসংস্থানের সংকটকে সামাজিক ও আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যার মূল উৎস হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “বিকল্প আয়ের সুযোগ না থাকায় মানুষ রিকশা চালনা বা অনানুষ্ঠানিক শ্রমে বাধ্য হচ্ছে। এর স্থায়ী সমাধান কেবল প্রশাসনিক বলপ্রয়োগে সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন অর্থনৈতিক রূপান্তর।”
গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করতে কৃষির আধুনিকায়ন ও যান্ত্রিকীকরণকে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে উল্লেখ করা হয়। গবেষক ও অধিকারকর্মী মাহা মির্জা মাঠপর্যায়ের চিত্র তুলে ধরে বলেন, “২০২৬ সালেও আমাদের দেশের কৃষকদের ধান শুকানোর জন্য রোদের ওপর নির্ভর করতে হয়, যা প্রযুক্তির পশ্চাৎপদতা। ইউনিয়ন পর্যায়ে সরকারি উদ্যোগে ক্রপ ড্রায়ার, কম্বাইন হারভেস্টার এবং কোল্ড স্টোরেজ সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাবেন।” একই সাথে কৃষি যন্ত্রপাতির সরকারি প্রণোদনায় স্বচ্ছতা আনারও দাবি জানান মাহা মির্জা।
দেশ ত্রিমুখী সংকটে
অর্থনীতিবিদ ড. মাশরুর রিয়াজ দেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘ত্রিমুখী সংকট’ (মুদ্রাস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট ও বিনিয়োগ স্থবিরতা) হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, রেমিট্যান্স ছাড়া অধিকাংশ সূচকই এখন চাপের মুখে। দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি মানুষের অভ্যন্তরীণ ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।
এক্ষেত্রে জোনায়েদ সাকির মত হলো, আন্তর্জাতিক বাজারের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেট ও দুর্বল বাজার মনিটরিং মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে।
শিল্পের চাকা সচল রাখতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের তাগিদ দিয়ে ড. মাশরুর রিয়াজ বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে নির্ধারিত ১০ হাজার মেগাবাইট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা দ্রুত বাস্তবায়ন করা গেলে, তা আমদানিনির্ভরতা কমাবে। এতে কমবে উৎপাদন ব্যয়ও। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমবে।

স্বাস্থ্য খাত ও বিকল্প অর্থায়ন
স্বাস্থ্য খাতকে নিছক সেবা খাত হিসেবে না দেখে একটি সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক খাত হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানান নাসিম মঞ্জুর। তিনি বলেন, “উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৩ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার বিদেশে চলে যাচ্ছে। দেশেই মানসম্মত সেবা ও বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করে এই বিপুল অর্থ সাশ্রয় করা সম্ভব।”
বর্তমানে চিকিৎসা ব্যয়ের ৭৪ শতাংশই নাগরিককে নিজের পকেট থেকে দিতে হচ্ছে, যা একটি বড় সামাজিক বৈষম্য। অবশ্য অর্থ উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর তৃণমূলের স্বাস্থ্যসেবা উন্নত করতে ৫ হাজার নতুন চিকিৎসক নিয়োগ এবং ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল উৎপাদনে সরকারি সহায়তার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।
বিনিয়োগের জন্য ব্যাংকনির্ভরতা কমিয়ে শক্তিশালী পুঁজিবাজার গড়ে তোলার তাগিদ দেন সাবেক অর্থসচিব মুসলিম চৌধুরী। এছাড়াও আলোচকেরা আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা ও রাজস্ব বাড়াতে ‘সেন্ট্রাল ব্যাংক ডিজিটাল কারেন্সি’ চালুর সম্ভাব্যতা যাচাই এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে ডিজিটাল প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অর্থনীতির ক্ষত সারবে কীভাবে
বাজেট মূলত একটি দেশের বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব হলেও, সংকটকালীন মুহূর্তে তা হওয়া উচিত কাঠামোগত পরিবর্তনের পথনকশা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট এমন এক সময়ে আসছে যখন সামষ্টিক অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলো তীব্র চাপের মুখে। চরচা আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় যে বিষয়টি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে তা হলো—অর্থনীতির এই ক্ষত সাময়িক কোনো জোড়াতালি বা নীতিমালার মাধ্যমে নিরাময় সম্ভব নয়।
বিনিয়োগ খরায় কর্মসংস্থান স্থবির হয়ে পড়া, ব্যাংকিং খাতের ওপর থেকে গ্রাহকের আস্থা হ্রাস পাওয়া এবং ‘ট্যাক্স টেররিজম’-এর কারণে ব্যবসায়ী মহলে অসন্তোষ তৈরি হওয়া স্পষ্ট সংকেত দেয় যে, আমাদের নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা ও সততা এখন বড় প্রশ্নের মুখে।
আসন্ন বাজেটে সরকারকে তাই কেবল জিডিপি প্রবৃদ্ধির সংখ্যার পেছনে না ছুটে, প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন ও কর কাঠামোর আমূল সংস্কারে মনোযোগী হওয়া জরুরি। করের আওতা বাড়িয়ে করদাতাদের হয়রানিমুক্ত সেবার নিশ্চয়তা দেওয়া এবং এডিপি বাস্তবায়নে অপচয় রোধ করা এখন সময়ের দাবি। মনে রাখতে হবে যে, একটি শক্তিশালী, জবাবদিহিমূলক এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্ন কিন্তু অধরাই থেকে যাবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জ কেবল রাজস্ব ঘাটতি কিংবা প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি বরং একটি গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংকট। তাদের মতে, এই সংকটের কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, অকার্যকর প্রকল্প, কর প্রশাসনের জটিলতা, দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি এবং কৃষির আধুনিকায়নের অভাব।
রাজধানীতে আজ শনিবার চরচা ডট কম আয়োজিত ‘সংকট মুহূর্তের বাজেট ২০২৬-২৭’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, শিক্ষাবিদ ও বিভিন্ন খাতের নীতিনির্ধারকেরা এসব কথা বলেন। চরচা সম্পাদক সোহরাব হাসানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, নতুন অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে বড় বাজেট বা উচ্চ প্রবৃদ্ধির কাগুজে ঘোষণা যথেষ্ট নয়। এখন প্রয়োজন সুশাসন, নীতি-স্থিতিশীলতা ও বাস্তবভিত্তিক সংস্কার।

বিনিয়োগের প্রধান বাধা কী
গোলটেবিল আলোচনায় বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতাকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, “২০৩০ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছাতে হলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।” তবে ঘন ঘন নীতি পরিবর্তনের কারণে বিনিয়োগকারীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে জানান আলোচকরা।
অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, “সরকারের যেকোনো নীতি বা পলিসি অন্তত তিন বছর স্থায়ী না হলে, তা ব্যবসায়ীদের জন্য চরম অনিশ্চয়তা তৈরি করে।” একই সুরে বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “ব্যবসায়ীরা যাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে পারেন, সেজন্য কর নীতি অন্তত ৫ বছরের জন্য স্থির রাখা উচিত। পাশাপাশি কর আদায়কারী ও নীতি-নির্ধারকদের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সম্পূর্ণ আলাদা করা প্রয়োজন।”
নীতিনির্ধারকেরা একমত হন যে, বিনিয়োগ সংকটকে কেবল আর্থিক ক্ষতি হিসেবে না দেখে কর্মসংস্থান, উৎপাদন, রপ্তানি ও রাজস্ব আহরণের সামগ্রিক চক্রের আলোকেই দেখতে হবে। পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি এ প্রসঙ্গে বলেছেন, সরকার বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় আস্থা, সুশাসন ও কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলতে কাজ করছে।

দেশে কি ‘ট্যাক্স টেররিজম’ চলছে?
কর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন না হওয়া এবং ব্যবসায়ীদের হয়রানি নিয়ে গোলটেবিল আলোচনায় তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ পায়। নাসিম মঞ্জুরের মন্তব্যের সূত্র ধরে বিকেএমইএ নেতা মোহাম্মদ হাতেম বলেন, এনবিআরের কর আদায়ের বর্তমান পদ্ধতি আসলে ‘ট্যাক্স টেররিজম’। তিনি অভিযোগ করেন, অগ্রিম আয়কর (এআইটি) এবং উৎসে করের টাকা সময়মতো ফেরত না দিয়ে ব্যবসায়ীদের ‘ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল’ আটকে রাখা হচ্ছে।
অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর অডিট ব্যবস্থার নামে হয়রানির সমালোচনা করে রিস্ক–বেজড ডিজিটাল অডিট প্রবর্তনের দাবি জানান। কর ব্যবস্থার এই জটিলতা নিরসনে সাবেক অর্থসচিব মুসলিম চৌধুরী বলেন, করদাতাদের হয়রানি কমাতে কর প্রশাসনকে সম্পূর্ণ ‘ফেসলেস’ বা ডিজিটাল করতে হবে, যা বৈশ্বিকভাবে প্রমাণিত একটি সফল মডেল।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকসের ডিন ড. ওয়ারেসুল করিম করের হার বাড়ানোর চেয়ে করের আওতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, দেশের অনেক লাভজনক খাত এখনো কর আওতার বাইরে রয়ে গেছে, যেগুলোকে করের আওতায় আনা জরুরি।
ব্যাংকিং খাত আস্থার সংকটে, দায়ী ‘দুষ্টু চক্র’
দেশের আর্থিক খাতের মূল দুর্বলতা হিসেবে আস্থার সংকট ও জবাবদিহির অভাবকে দায়ী করেন আলোচকেরা। আইসিএমএবি-এর সভাপতি কাওসার আলম বলেন, “শুধু বিদেশি বিনিয়োগকারী নয়, দেশি বিনিয়োগকারী, করদাতা ও সাধারণ জনগণের মধ্যেও আস্থার বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সরকারকে প্রমাণ করতে হবে যে, জনগণের ট্যাক্সের টাকা সঠিকভাবে ব্যয় হচ্ছে।”
দেশের আর্থিক খাত ক্রমেই একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীকেন্দ্রিক ব্যবস্থায় পরিণত হচ্ছে বলে মনে করেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি। তার কথায়, “রাজনৈতিক ক্ষমতাবান বড় ঋণগ্রহীতারা অন্যায্য সুবিধা পাচ্ছেন, আর প্রকৃত উৎপাদনমুখী উদ্যোক্তারা অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।” ব্যাংকিং খাতকে একটি ‘দুষ্টু চক্র’ আখ্যা দিয়ে প্রতিমন্ত্রী আমানতকারীদের আস্থা ফেরানোর তাগিদ দেন।
এডিপি বাস্তবায়নে অপচয় হয় কতটা?
উন্নয়ন প্রকল্প (এডিপি) বাস্তবায়নে পরিকল্পনার অভাব ও আন্তঃদপ্তর সমন্বয়হীনতার কারণে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন বেশির ভাগ আলোচক। আইসিএমএবি সভাপতি কাওসার আলম বলেন, বাজেটের আকার নয়, এর গুণগত বাস্তবায়নই আসল। তার মতে, প্রকৃত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে ‘কোয়ালিটি ড্রিভেন কোয়ানটিটি’ নীতিতে এগোতে হবে।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি চলমান ১ হাজার ৩৩৩টি উন্নয়ন প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বিচ্ছিন্নভাবে প্রকল্প না নিয়ে সেগুলোকে একটি সমন্বিত কর্মসূচীর আওতায় এনে পুনর্বিন্যাস করার তাগিদ দেন। সমন্বয়হীনতার উদাহরণ দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “অনেক জায়গায় বড় হাসপাতাল ভবন নির্মিত হলেও চিকিৎসক বা যন্ত্রপাতি নেই। কোটি কোটি টাকার এই অবকাঠামো অব্যবহৃত পড়ে থাকা শুধু আর্থিক অপচয় নয়, রাষ্ট্রীয় অদক্ষতারও প্রমাণ।”

কর্মসংস্থানের সংকট কেন দূর হচ্ছে না?
আলোচকদের মতে, উচ্চ প্রবৃদ্ধির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি। একই সাথে যুবসমাজকে দক্ষ করতে কারিগরি শিক্ষা উপজেলা পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান বক্তারা।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি কর্মসংস্থানের সংকটকে সামাজিক ও আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যার মূল উৎস হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “বিকল্প আয়ের সুযোগ না থাকায় মানুষ রিকশা চালনা বা অনানুষ্ঠানিক শ্রমে বাধ্য হচ্ছে। এর স্থায়ী সমাধান কেবল প্রশাসনিক বলপ্রয়োগে সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন অর্থনৈতিক রূপান্তর।”
গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করতে কৃষির আধুনিকায়ন ও যান্ত্রিকীকরণকে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে উল্লেখ করা হয়। গবেষক ও অধিকারকর্মী মাহা মির্জা মাঠপর্যায়ের চিত্র তুলে ধরে বলেন, “২০২৬ সালেও আমাদের দেশের কৃষকদের ধান শুকানোর জন্য রোদের ওপর নির্ভর করতে হয়, যা প্রযুক্তির পশ্চাৎপদতা। ইউনিয়ন পর্যায়ে সরকারি উদ্যোগে ক্রপ ড্রায়ার, কম্বাইন হারভেস্টার এবং কোল্ড স্টোরেজ সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাবেন।” একই সাথে কৃষি যন্ত্রপাতির সরকারি প্রণোদনায় স্বচ্ছতা আনারও দাবি জানান মাহা মির্জা।
দেশ ত্রিমুখী সংকটে
অর্থনীতিবিদ ড. মাশরুর রিয়াজ দেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘ত্রিমুখী সংকট’ (মুদ্রাস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট ও বিনিয়োগ স্থবিরতা) হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, রেমিট্যান্স ছাড়া অধিকাংশ সূচকই এখন চাপের মুখে। দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি মানুষের অভ্যন্তরীণ ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।
এক্ষেত্রে জোনায়েদ সাকির মত হলো, আন্তর্জাতিক বাজারের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেট ও দুর্বল বাজার মনিটরিং মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে।
শিল্পের চাকা সচল রাখতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের তাগিদ দিয়ে ড. মাশরুর রিয়াজ বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে নির্ধারিত ১০ হাজার মেগাবাইট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা দ্রুত বাস্তবায়ন করা গেলে, তা আমদানিনির্ভরতা কমাবে। এতে কমবে উৎপাদন ব্যয়ও। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমবে।

স্বাস্থ্য খাত ও বিকল্প অর্থায়ন
স্বাস্থ্য খাতকে নিছক সেবা খাত হিসেবে না দেখে একটি সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক খাত হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানান নাসিম মঞ্জুর। তিনি বলেন, “উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৩ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার বিদেশে চলে যাচ্ছে। দেশেই মানসম্মত সেবা ও বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করে এই বিপুল অর্থ সাশ্রয় করা সম্ভব।”
বর্তমানে চিকিৎসা ব্যয়ের ৭৪ শতাংশই নাগরিককে নিজের পকেট থেকে দিতে হচ্ছে, যা একটি বড় সামাজিক বৈষম্য। অবশ্য অর্থ উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর তৃণমূলের স্বাস্থ্যসেবা উন্নত করতে ৫ হাজার নতুন চিকিৎসক নিয়োগ এবং ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল উৎপাদনে সরকারি সহায়তার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।
বিনিয়োগের জন্য ব্যাংকনির্ভরতা কমিয়ে শক্তিশালী পুঁজিবাজার গড়ে তোলার তাগিদ দেন সাবেক অর্থসচিব মুসলিম চৌধুরী। এছাড়াও আলোচকেরা আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা ও রাজস্ব বাড়াতে ‘সেন্ট্রাল ব্যাংক ডিজিটাল কারেন্সি’ চালুর সম্ভাব্যতা যাচাই এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে ডিজিটাল প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অর্থনীতির ক্ষত সারবে কীভাবে
বাজেট মূলত একটি দেশের বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব হলেও, সংকটকালীন মুহূর্তে তা হওয়া উচিত কাঠামোগত পরিবর্তনের পথনকশা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট এমন এক সময়ে আসছে যখন সামষ্টিক অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলো তীব্র চাপের মুখে। চরচা আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় যে বিষয়টি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে তা হলো—অর্থনীতির এই ক্ষত সাময়িক কোনো জোড়াতালি বা নীতিমালার মাধ্যমে নিরাময় সম্ভব নয়।
বিনিয়োগ খরায় কর্মসংস্থান স্থবির হয়ে পড়া, ব্যাংকিং খাতের ওপর থেকে গ্রাহকের আস্থা হ্রাস পাওয়া এবং ‘ট্যাক্স টেররিজম’-এর কারণে ব্যবসায়ী মহলে অসন্তোষ তৈরি হওয়া স্পষ্ট সংকেত দেয় যে, আমাদের নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা ও সততা এখন বড় প্রশ্নের মুখে।
আসন্ন বাজেটে সরকারকে তাই কেবল জিডিপি প্রবৃদ্ধির সংখ্যার পেছনে না ছুটে, প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন ও কর কাঠামোর আমূল সংস্কারে মনোযোগী হওয়া জরুরি। করের আওতা বাড়িয়ে করদাতাদের হয়রানিমুক্ত সেবার নিশ্চয়তা দেওয়া এবং এডিপি বাস্তবায়নে অপচয় রোধ করা এখন সময়ের দাবি। মনে রাখতে হবে যে, একটি শক্তিশালী, জবাবদিহিমূলক এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্ন কিন্তু অধরাই থেকে যাবে।

এনভিডিয়ার এই পদক্ষেপটি জানিয়ে দেয় যে, চিপের ব্যবসা এখন কতটা প্রতিযোগিতাপূর্ণ হয়ে উঠেছে; যেখানে কোম্পানিগুলো নিজেদের চেনা গণ্ডি পেরিয়ে অন্যান্য ক্ষেত্রেও প্রবেশ করছে। গত মার্চ মাসে ব্রিটিশ ডিজাইন প্রতিষ্ঠান আর্ম এআই ডেটা সেন্টারের জন্য নিজস্ব সিপিইউ তৈরির ঘোষণা দিয়েছে।