রাজধানীতে ঢাকার প্রধান সড়ক এবং অলিগলিতে আজ সোমবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচল বন্ধ ছিল। সকাল ১০টা থেকে রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশার চালক ও মালিকরা মিছিল নিয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে জড়ো হন। পরে পাঁচ দফা দাবিতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে তারা। বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেয় ব্যাটারি চালিত রিকশা ইজিবাইক সমিতি-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ। বেলা ১২টায় ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়ে তারা অবরোধ তুলে নেন।
দাবি কী
ব্যাটারিচালিত রিকশা ইজিবাইক সমিতি-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সভাপতি মো. আবু বক্কর পাঁচ দফা দাবি জানিয়ে বলেন, “আমাদের ব্যাটারিচালিত রিকশার গ্যারেজে বৈধ বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। তা পুনরায় সংযোগের দাবি জানাচ্ছি। চালকদের পুলিশ কর্তৃক হয়রানি বন্ধ করতে হবে। ব্যাটারিচালিত রিকশাকে বৈধ করার জন্য সরকার কর্তৃক লাইসেন্সের আওতায় আনতে হবে। বিনা কারণে গাড়ি ডাম্পিং দেওয়া বন্ধ করতে হবে এবং গ্রেপ্তার শ্রমিকদের নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে।”
কাদের এবং কেন গ্রেপ্তার করা হয়েছে জানতে চাইলে রিকশা, ইজিবাইক সমিতি শ্রমিক ঐক্য পরিষদের দপ্তর সম্পাদক সোহেল রানা বলেন, “চারজন গ্যারেজ মালিকের গ্যারেজের বৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। তারা বাধা দিলে তাদের পুলিশ আটক করে নিয়ে মামলা দেয়। আটক চারজন হলেন- মোহাম্মদ আকবর, সেন্টু মিয়া, মোহাম্মদ ইয়াসিন এবং আব্দুর রহিম।”
যা বলছেন আন্দোলনে আসা রিকশা চালকরা
আন্দোলনে আসা রিকশা চালক নাসির মিয়া বলেন, “আমরা গাড়ি নিয়ে রাস্তায় উঠতে গেলে জরিমানা করে। হয় লাইসেন্স দিয়া বৈধ করবে, না হয় ধরবে না। কামানোর আগে টাকা নিয়ে যায় পুলিশ। এসব বন্ধ করতে হবে।”
রিকশা চালক মাঈন উদ্দিন চরচাকে বলেন, “এক দিনে রিকশা দুইবার ধরছে এমনও আছে। প্রতিবার ১২০০ করে টাকা দেওয়া লাগে। আবার এই টাকার কোনো অংশ মালিক বহন করে না। সব চাপে ড্রাইভারের ঘাড়ে। পুলিশের এসব অবিচার চাই না।”
কী বলছে ট্রাফিক পুলিশ
কোন আইনে ব্যাটারিচালিত রিকশাকে আটক করা হচ্ছে জিজ্ঞেস করলে ঢাকা মহানগর ট্রাফিক পুলিশের রমনা বিভাগের উপ পুলিশ কমিশনার মঈনুল হক চরচাকে বলেন, “তারা যেহেতু বিআরটিএর অনুমোদিত কোনো যানবাহন না, আমরা তাই তাদের সড়ক পরিবহন আইনে ফিটনেসের মামলা দিয়ে ডাম্পিংয়ে পাঠাই।”
ডাম্পিংয়ে পাঠানো রিকশা কীভাবে আবার ফেরত আসে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “বৈধ কোনো গাড়ি ডাম্পিংয়ে গেলে বিআরটিএর একটি অঙ্গীকারনামা এনে গাড়ির মালিক গাড়ি ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু যদি ছাড়িয়ে না নেয় তখন ওই গাড়ি আদালতের নির্দেশে ভেঙে ফেলা হয়। আমরা অটোরিকশার জন্য ১২০০ টাকা একটি জরিমানা ধার্য করেছি এবং গাড়ি আটকের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট থানায় গিয়ে গাড়ি ছাড়িয়ে আনতে হয়।”
কোন কোন কারণে ব্যাটারি চালিত অটোরিকাশাকে আটক করা হয় জানতে চাইলে মঈনুল বলেন, “অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী আমরা ডাম্পিং অথবা রেকারে দিই। যদি কেউ ভিআইপি রাস্তায় যায় তাহলে তার গাড়ি ডাম্পিং এ নিয়ে যায়। আবার কেউ বড় রাস্তায় উঠলে তাদের জরিমানা করে ছেড়ে দেই।”
জরিমানার টাকা কোথায় যায় এই বিষয়ে মঈনুল বলেন, “এখন তো সব মামলা ডিজিটালি হয় মেশিনের মাধ্যমে। কিন্তু অটোরিকশারটা আমরা ম্যানুয়ালি করি। ডিজিটালি করলে টাকা যেমন সরকারের খাতে যায় ঠিক তেমনই ব্যাটারিচালিত অটো রিকশার জরিমানার টাকা সরকারি কোষাগারে যায়। মামলা হলে স্লিপ কাটা হয় এই স্লিপ আবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দেওয়া লাগে।”
আন্দোলনে যায়নি আরেকটি পক্ষ
রাজধানীর পল্টন এলাকায় দেখা মেলে রিকশা চালক মোহাম্মদ বাপ্পির সাথে। তার ব্যাটারিচালিত রিকশাটি টেনে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। বাপ্পি চরচাকে বলেন, “আন্দোলন না কি এসব কিছু জানি না। গাড়ি নিয়ে বের হয়েছি কয়েকজনে মিলে আমার গাড়ির তার ছিড়ে দিয়েছে। এখন ঠেলে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছি।”
রিকশা, ভ্যান, ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আরিফুর ইসলাম নাদিম চরচাকে বলেন, “যারা আন্দোলন করছে তাদের গ্যারেজের বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে এবং তাদের চারজন মালিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মুক্তির দাবিতে এই আন্দোলন যতটুকু জেনেছি।”
রিকশা, ভ্যান, ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়নের ১২ দফা দাবির কথা জানান আরিফুল ইসলাম। সেগুলো হলো-
১. দেশের সড়ক উপযোগী নকশায় আধুনিকায়নসহ ব্যাটারিচালিত যানবাহনের বিআরটিএ কর্তৃক লাইসেন্স ও যৌক্তিক রুট পারমিট দিতে হবে।
২. চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান করতে হবে।
৩. ব্যাটারিচালিত যানবাহন চলাচলে সকল অংশীজনের অংশগ্রহণে নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
৪. শ্রমিকদের ওপর জুলুম, নির্যাতন, চাঁদাবাজি ও হয়রানি বন্ধ করতে হবে এবং অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নের নামে বৈদ্যুতিক মিটারের সংযোগ বিচ্ছিন্ন বন্ধ করতে হবে।
৫. শ্রমিক প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে সড়ক ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনা কমিটি গঠন করতে হবে। সড়কের লেন পদ্ধতি সচল করে সার্ভিস লেন ও চার্জিং স্টেশন নির্মাণ করতে হবে।
৬. ব্যাটারিচালিত যানবাহন সংক্রান্ত সব রিট দ্রুত নিষ্পত্তি এবং শ্রমিক নেতৃবৃন্দের নামে দায়ের করা হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে।
৭. জীবিকা সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করতে হবে।
৮. ব্যাটারিচালিত যানবাহনকে গণপরিবহন ও শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
৯. বর্তমান গ্যারেজগুলোকে ট্রেড লাইসেন্সের আওতায় আনতে হবে।
১০. অসাধু বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে রিকশার যন্ত্রাংশসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম কমাতে হবে।
১১. শ্রমিকদের জন্য রেশন ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
১২. দেশের অর্থনৈতিক ও মানবিক বিবেচনায় ব্যাটারিচালিত যানবাহনের পুঁজিকে নিরাপদ করে পর্যায়ক্রমে মানুষকে প্যাডেলচালিত বাহনের অমানবিক শ্রম থেকে মুক্ত করতে হবে।