হিটলার হয়তো বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত নামগুলোর একটি। অনেকের কাছে ফ্যাসিস্ট বা একনায়ক শব্দটির সমার্থক যেন অ্যাডলফ হিটলার।
কিন্তু একজন সাধারণ রাজনীতিক থেকে কীভাবে তিনি ইতিহাসের সবচেয়ে কুখ্যাত একনায়কে পরিণত হলেন?
১৯৩৪ সালের ২ আগস্ট। জার্মানির প্রেসিডেন্ট পল ফন হিন্ডেনবুর্গ মারা গেলেন। তার মৃত্যুর পরই চ্যান্সেলর ও প্রেসিডেন্ট- দুটি পদ একীভূত করে নিজের নতুন উপাধি নিলেন অ্যাডলফ হিটলার- ‘ফ্যুরার’।
এর মধ্য দিয়ে জার্মানির রাষ্ট্রক্ষমতা কার্যত পুরোপুরি তার হাতে কেন্দ্রীভূত হয়। তবে এই অবস্থানে পৌঁছানোর পথ শুরু হয়েছিল আরও আগে।
১৯৩২ সালের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নাৎসি পার্টির ভোটের পরিমাণ কিছুটা কমে গিয়েছিল। তবু ১৯৩৩ সালের জানুয়ারিতে হিন্ডেনবুর্গ হিটলারকে চ্যান্সেলর হিসেবে নিয়োগ দেন।
তার বিশ্বাস ছিল, মন্ত্রিসভার একজন সদস্য হিসেবে হিটলারকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে। কিন্তু সেই ধারণা খুব দ্রুতই ভুল প্রমাণিত হয়।
ক্ষমতায় বসেই হিটলার জার্মান পার্লামেন্ট ভবন রাইখস্টাগে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাকে রাজনৈতিক সুযোগ হিসেবে কাজে লাগান।
এই ঘটনাকে অজুহাত বানিয়ে তিনি নতুন সাধারণ নির্বাচনের ডাক দেন। নির্বাচনের আগে নাৎসি নেতা হারমান গোরিংয়ের অধীনস্থ পুলিশ বাহিনী বিরোধী দলগুলোর কার্যক্রম কঠোরভাবে দমন করে।
এরপরের নির্বাচনে নাৎসিরা অল্প ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ‘এনাবলিং অ্যাক্টস’-এর মাধ্যমে হিটলার কার্যত রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করেন।
এরপর শুরু হয় ক্ষমতা আরও সুসংহত করার অভিযান। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের গ্রেপ্তার ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
এমনকি নিজের দল নাৎসি পার্টির আধাসামরিক বাহিনী এসএ–এর বিরুদ্ধেও কঠোর অভিযান চালিয়েছিলেন হিটলার। এর ফলে জার্মান সেনাবাহিনীর সমর্থনও তার দিকে ঝুঁকে পড়ে।
ফ্যুরার বা নেতা হওয়ার পর হিটলারের শাসনের ভিত্তি আরও শক্ত হতে থাকে।
এ সময় জার্মানির অর্থনীতি কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালে সাধারণ মানুষের একাংশের সমর্থনও বাড়ে। একই সঙ্গে নাৎসি প্রচারযন্ত্র হিটলারকে ঘিরে ব্যক্তিপূজার এক সংস্কৃতি গড়ে তোলে।
ওদিকে জার্মানি আবারও সামরিক শক্তি বাড়াতে শুরু করে। রাষ্ট্রীয়ভাবে ইহুদিবিরোধী নীতিও আরও প্রকাশ্য রূপ পায়।
এসব নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমালোচনা হলেও অন্যান্য রাষ্ট্র নাৎসি জার্মানির উত্থান ঠেকাতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি।
প্রতীকী ছবি। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
১৯৩৮ সালে হিটলার অস্ট্রিয়ার নিয়ন্ত্রণ নেন। পরের বছর পুরো চেকোস্লোভাকিয়া জার্মানির নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু তার সম্প্রসারণবাদী অভিযান সেখানেই থামেনি।
১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর পোল্যান্ডে জার্মান বাহিনীর আক্রমণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এরপর ব্রিটেন ও ফ্রান্স জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।
যুদ্ধের শুরুতে হিটলারের বাহিনী একের পর এক চমকপ্রদ সাফল্য অর্জন করেছিল। ইউরোপের বড় একটি এলাকা জার্মানির নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
তবে ১৯৪২ সালে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে জার্মানির বিপর্যয়কর অভিযানের পর যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়।
১৯৪৫ সালের শুরুতে জার্মানিকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে মিত্রশক্তি। পশ্চিম দিক থেকে এগিয়ে আসে ব্রিটিশ ও মার্কিন বাহিনী, আর পূর্ব দিক থেকে অগ্রসর হতে থাকে সোভিয়েত বাহিনী।
তখন বার্লিনে চ্যান্সেলারির নিচে একটি বাঙ্কারে অবস্থান করছিলেন হিটলার। পরাজয় ছিল সময়ের অপেক্ষা মাত্র।
১৯৪৫ সালের ৩০ এপ্রিল, সোভিয়েত বাহিনী তার সদর দপ্তর থেকে এক মাইলেরও কম দূরত্বে পৌঁছে গেলে, তার স্ত্রী ইভা ব্রাউনের সঙ্গে তিনি আত্মহত্যা করেন।
হিটলারের পতনের পর জার্মানি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। দেশটি মিত্রশক্তির নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। পরে জার্মানি বিভক্ত হয় এবং স্নায়ুযুদ্ধের সময় বিশ্বের অন্যতম প্রধান ভূরাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্রে পরিণত হয়।
তবে হিটলারের শাসনের সবচেয়ে ভয়াবহ অধ্যায় ছিল হলোকাস্ট। তার শাসনামলে প্রায় ৬০ লাখ ইহুদি এবং আনুমানিক আড়াই লাখ রোমানি জনগোষ্ঠীর সদস্যকে হত্যা করা হয়।
পাশাপাশি স্লাভ জনগোষ্ঠীর অসংখ্য মানুষ, রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, সমকামী এবং নাৎসি শাসনের চোখে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বিবেচিত আরও বহু মানুষকে পরিকল্পিতভাবে নির্মূল করা হয়েছিল।
হিটলার ইউরোপে যে যুদ্ধের সূচনা করেছিলেন, তাতে প্রাণহানির পরিমাণ ছিল আরও ভয়াবহ। শুধু সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নেই প্রায় ২0 লাখ মানুষ নিহত হয়েছিলেন।
ইতিহাসে অ্যাডলফ হিটলার তাই মানবসভ্যতার অন্যতম ঘৃণিত ও কুখ্যাত শাসক হিসেবেই পরিচিত।