অর্ণব সান্যাল

বছর দেড়েকের বেশি সময় ধরেই একটি শব্দবন্ধ বারবার শোনা যাচ্ছে। এর একাংশ অবশ্য আরও আগে থেকেই আলোচিত। সেটি হলো ‘ফ্যাসিজম’ বা ‘ফ্যাসিস্ট’। এখন অবশ্য তার আগে ‘কালচার’ বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে, সচেতনভাবেই। আর এই পুরো ‘কালচারাল ফ্যাসিজম’ শব্দবন্ধটি আবার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উপাদানের সামনে বসিয়ে সেগুলোকে সিল মেরে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এটিও হচ্ছে সাজানো, গোছানো উপায়েই। তাতেই বোঝা যায়, ব্যাপারটি আদতে দীর্ঘ সময়ের পরিকল্পনার ফসল।
শিরোনাম দেখে নিশ্চয়ই বোঝা গেছে, পয়লা বৈশাখের প্রথাগত উদ্যাপনকে ‘কালচারাল ফ্যাসিজম’-এর উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরার দাবি বা ইনিয়ে-বিনিয়ে বলার চেষ্টা নিয়েই এই লেখা। আগেই একটি কথা বলে নেওয়া ভালো যে, শুধু পয়লা বৈশাখ নিয়েই এমন চলছে না। আরও কিছু সাংস্কৃতিক উপাদানকেও এমন ট্যাগ দেওয়ার চেষ্টা চলে। সেসব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করাই যায়। তবে আলোচনাকে গণ্ডিবদ্ধ করার স্বার্থেই এবার কেবল পয়লা বৈশাখ নিয়েই কথা বলা যাক।
পয়লা বৈশাখ কী
পয়লা বৈশাখ হলো বাংলা সালের প্রথম দিন। এই নামের দিবসটা মূলত বাঙালিরাই উদ্যাপন করে থাকে। নৃগোষ্ঠী হিসেব করলে এটি শুধু বাঙালিদেরই দিবস। অন্য নৃগোষ্ঠীর মানুষদের জন্য কোনো তাৎপর্য বহন করে না পয়লা বৈশাখ। তাদের বর্ষবরণ উৎসবের নাম অন্য, সংস্কৃতিও ভিন্ন। চাকমাদের যেমন বিজু, মারমাদের সাংগ্রাই, তঞ্চঙ্গ্যাদের বিষু ইত্যাদি ইত্যাদি। অবশ্য বাংলাদেশের বাস্তবতায় সংখ্যাগুরু জনতার পালিত উৎসব হিসেবে ‘পয়লা বৈশাখ’ নামটির আলাদা এক ধরনের আধিপত্য পরিলক্ষিত হয়। তা অবশ্য দেশে দেশেই দেখা যায়। অনেকটা গণতন্ত্রের মতো করেই।
পয়লা বৈশাখের উদ্ভবের ইতিহাস একটু জানা যাক। তাতে আলোচনায় একটু সুবিধা হবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ নামে পরিচিত বাংলাপিডিয়ার লেখা ধার করা যায়। এর পরিচয় নিয়ে বাংলাপিডিয়া বলছে, “পহেলা বৈশাখ বাংলা সনের প্রথম দিন। এ দিনটি বাংলাদেশে নববর্ষ হিসেবে পালিত হয়। এটি বাঙালির একটি সর্বজনীন লোকউৎসব। এদিন আনন্দঘন পরিবেশে বরণ করে নেওয়া হয় নতুন বছরকে। কল্যাণ ও নতুন জীবনের প্রতীক হলো নববর্ষ। অতীতের ভুলত্রুটি ও ব্যর্থতার গ্লানি ভুলে নতুন করে সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনায় উদ্যাপিত হয় নববর্ষ।”

পয়লা বৈশাখের উদ্ভব সম্পর্কে বাংলাপিডিয়া বলছে, “এক সময় নববর্ষ পালিত হতো আর্তব উৎসব বা ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে। তখন এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল কৃষির; কারণ কৃষিকাজ ছিল ঋতুনির্ভর। এই কৃষিকাজের সুবিধার্থেই মুগল সম্রাট আকবর ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০/১১ মার্চ বাংলা সন প্রবর্তন করেন এবং তা কার্যকর হয় তাঁর সিংহাসন-আরোহণের সময় থেকে (৫ নভেম্বর ১৫৫৬)। হিজরি চান্দ্রসন ও বাংলা সৌরসনকে ভিত্তি করে বাংলা সন প্রবর্তিত হয়। নতুন সনটি প্রথমে ‘ফসলি সন’ নামে পরিচিত ছিল, পরে তা বঙ্গাব্দ নামে পরিচিত হয়। বাংলা নববর্ষ পালনের সূচনা হয় মূলত আকবরের সময় থেকেই। সে সময় বাংলার কৃষকরা চৈত্রমাসের শেষদিন পর্যন্ত জমিদার, তালুকদার এবং অন্যান্য ভূ-স্বামীর খাজনা পরিশোধ করত। পরদিন নববর্ষে ভূস্বামীরা তাদের মিষ্টিমুখ করাতেন। এ উপলক্ষে তখন মেলা এবং অন্যান্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। ক্রমান্বয়ে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশে পহেলা বৈশাখ আনন্দময় ও উৎসবমুখী হয়ে ওঠে এবং বাংলা নববর্ষ শুভদিন হিসেবে পালিত হতে থাকে।”
অর্থাৎ, এটি কেবলই বাঙালি সংস্কৃতির নতুন বছর বরণ-সংক্রান্ত একটি উদ্যাপন, অন্তত ব্যুৎপত্তিগত দিক থেকে, এবং এর শুরুর সাথে কৃষি, রাজশাসন, ফসল, খাজনা বা ট্যাক্স ইত্যাদি অনেক বিষয় সংশ্লিষ্ট ছিল। শুধুই উদ্যাপনের জন্য পয়লা বৈশাখের সৃষ্টি হয়নি। হয়েছে প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক কারণে। বৈষয়িক প্রয়োজনে সৃষ্ট একটি দিনের উদ্যাপন ধীরে ধীরে সংস্কৃতির একটি উপাদানে পরিণত হয়েছে। এবং তার জন্য অতিক্রান্ত হতে হয়েছে ৪৫০ বছরের বেশি সময়।
আর এখন বলার চেষ্টা হচ্ছে বা বলা হচ্ছে–কালচারাল ফ্যাসিজমের প্রতীক পয়লা বৈশাখ, এই উপলক্ষে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ করা উচিত নয়, এটি ধর্মীয় বিভেদ সৃষ্টি করে ইত্যাদি ইত্যাদি। শুধু পয়লা বৈশাখ নয়, এর সঙ্গে আরও কিছু সাংস্কৃতিক উপাদানেও এই কালচারাল ফ্যাসিজমের ট্যাগ লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মূল আলাপ হলো–২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে হওয়া গণঅভ্যুত্থানে যে ‘ফ্যাসিবাদী’ শক্তি দাবিকৃত রাজনৈতিক দলকে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেই ফ্যাসিবাদী শক্তির বৈশিষ্ট্য বা লিগ্যাসি এসব সাংস্কৃতিক উপাদানের মধ্যে আছে বলে দাবি করা হয়।
প্রশ্ন উঠতেই পারে যে, ফ্যাসিবাদী শক্তি আসলে কী? ফ্যাসিবাদের লক্ষণ কী? কী বৈশিষ্ট্যের বলে একটি সত্তা ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠে? চলুন, এসবে চোখ বোলানো যাক।
ফ্যাসিবাদ কী? কারা বা কী ফ্যাসিবাদী?
ফ্যাসিজম একটি রাজনৈতিক আদর্শ। ফ্যাসিজম বা ফ্যাসিস্ট শব্দ দুটি উচ্চারিত হলেই মূলত দুটি ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। একটি হচ্ছে নাৎসি জার্মানির বা হিটলারের জার্মানির। অন্যটি হচ্ছে বেনিতো মুসোলিনির ইতালি। এই দুটি হলো প্রমাণিত সত্যের মতো ফ্যাসিজমের উদাহরণ। সাধারণত বিশেষজ্ঞদের বেশির ভাগ এ দুটিকে ফ্যাসিজমের উৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে ধরে থাকেন। ল্যাটিন শব্দ ‘ফ্যাসেস’ থেকে নিজের রাজনৈতিক দলের নামকরণ করেছিলেন মুসোলিনি, যা দিয়ে মূলত গাছের ডাল বা কাঠ দিয়ে শক্ত করে বাঁধা কুঠারকে বোঝানো হয়। ব্রিটানিকা বলছে, প্রাচীন রোমে দণ্ডপ্রদানকারী কর্তৃপক্ষের প্রতীক হিসেবে এই ফ্যাসেস’কে বোঝানো হতো।

তবে হ্যাঁ, এ নিয়ে বিতর্ক আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার এই দুই উদাহরণের পর মূলত বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ব্যবস্থা বা আন্দোলন ‘ফ্যাসিজম’ বা ‘ফ্যাসিস্ট’ হিসেবে উপাধি পেয়েছে। তবে সেগুলোকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। তুমুল বিতর্ক চলেছে সেসব দাবি নিয়ে। কারণ, রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে ফ্যাসিবাদ অত্যন্ত জটিল। ফ্যাসিজম-এর ধারণাটিকে নানাভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায়। এর বৈশিষ্ট্যও হরেক। বিশেষত একবিংশ শতাব্দীতে এসব বৈশিষ্ট্য আরও নানামুখী হয়েছে। একই সঙ্গে এটি নিয়ত পরিবর্তনশীলও। ফলে ফ্যাসিস্ট উপাধিটি রাজনৈতিকভাবে যে কাউকে দেওয়া গেলেও, সেটি প্রমাণ করা কঠিন।
ইয়েল ইউনিভার্সিটির দর্শনের অধ্যাপক জেসন স্ট্যানলি ‘হাউ ফ্যাসিজম ওয়ার্কস’ নামে একটি বই লিখেছিলেন, যা ২০২০ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। বইটিতে ফ্যাসিবাদের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে স্ট্যানলি বলেছেন, “ফ্যাসিজমের ভিত্তি হলো ‘আমরা’ ও ‘তারা’-এর মধ্যে একটি নৃতাত্ত্বিক বিভেদ তৈরি করা। একটি উগ্র নৃতাত্ত্বিকগত জাতীয়তাবাদ ফ্যাসিবাদের মূল ভিত হিসেবে কাজ করে। মিথজাত অতীতের নস্টালজিয়া তৈরি করে ফ্যাসিবাদ সেটিকে ভিত হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করে, যেখানে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সদস্যদের একটি সাম্রাজ্য ছিল–এবং বর্তমানকে এটি সেই সাম্রাজ্য হারানোর ক্ষেত্র হিসেবে উপস্থাপন করে। মিথের মতো করে ব্যবহৃত ওই অতীত সাম্রাজ্যে এই নির্দিষ্ট গোষ্ঠীরই প্রবল প্রতাপের উপস্থিতি দেখা যায়–সেটি যেমন সামরিকভাবে, তেমনি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবেও।”
নিউইয়র্কের কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞানের ইমেরিটাস অধ্যাপক রবার্ট প্যাক্সটন মনে করেন, ফ্যাসিবাদ হলো রাজনৈতিক চর্চার এমন এক ধরন, যা জনপ্রিয় উদ্দীপনা জাগিয়ে তুলতে উৎসাহ দেয় এবং এ কাজে খুবই সূক্ষ্ম প্রোপাগান্ডা কৌশল ব্যবহার করে থাকে। প্যাক্সটন আরও মনে করেন, ফ্যাসিবাদ কিছু নির্দিষ্ট ঘরানার প্রোপাগান্ডাকে উসকে দিতে চায়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে উদারবাদবিরোধিতা, ব্যক্তির ব্যক্তিগত অধিকারের প্রয়োগ বাতিল করা ও গণতন্ত্রের বিরোধিতা।
কথা হলো–ফ্যাসিবাদের লক্ষণ কী কী তাহলে? আছে অনেক। এ নিয়ে একটু সংক্ষেপে বলা যাক। মার্টিন লংম্যান ফ্যাসিবাদের কিছু সতর্কতামূলক চিহ্নের উল্লেখ করেছেন। ১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত দ্য ওয়াশিংটন মান্থলি’র এই ওয়েব এডিটর ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে এক লেখায় উল্লেখ করেছিলেন এসব চিহ্নের বিষয়ে। সেই তালিকায় ছিল শক্তিশালী জাতীয়তবাদের উত্থান, শত্রুপক্ষকে চিহ্নিত করে একতাবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা, পুরুষ-প্রাধান্য দিয়ে অন্য জেন্ডারকে কোণঠাসা করার চেষ্টা, নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম, ধর্ম ও সরকারকে মিশিয়ে ফেলা, শ্রমিক শ্রেণিকে দমনের চেষ্টা করাসহ বেশ কিছু লক্ষণ। মার্টিনের মতে, এসব লক্ষণ দৃশ্যমান হলেই বুঝতে হবে যে, ফ্যাসিজম আসছে অথবা এসে গেছে।
ফ্যাসিজম বা ফ্যাসিস্ট চেনার অনেক লক্ষণ সম্পর্কে বলা যায়। তবে মার্কিন সাংবাদিক মিশেল ওয়েইডমান বিষয়টিকে বেশ সহজ করে দিয়েছেন। নন-প্রফিট নিউজ অরগানাইজেশন শাসতাস্কাউট ডট ওআরজির এই সহযোগী সম্পাদক এক নিবন্ধে মোটে তিনটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বলেছেন। প্রশ্নগুলো হলো:
১. বিবেচ্য কোনো ব্যক্তি, সংগঠন বা ধারণা কি প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আক্রমণ করে?
২. তারা কি গোষ্ঠীগতভাবে আক্রমণের হুমকিকে ব্যবহার করে যেকোনো দাবি তোলে বা বিরোধী পক্ষকে ভয় দেখায়?
৩. বিবেচ্য কোনো ব্যক্তি, সংগঠন বা ধারণা কি ‘আমরা’ বনাম ‘তারা’ পরিস্থিতির সৃষ্টি করে? এবং এর মাধ্যমে একটি পুরো গোষ্ঠীভুক্ত মানুষকে (যাদের মধ্যে হয়তো একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি ব্যতীত আর কোনো মিলই নেই) খলনায়কে পরিণত করার চেষ্টা করে?
মিশেল বলছেন, যদি এই তিন প্রশ্নের উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে নির্দ্বিধায় সেই ব্যক্তি, সংগঠন বা ধারণাকে ফ্যাসিস্ট বলে ডাকা জায়েজ।

কালচারাল ফ্যাসিজম কী এবং উদাহরণবৃত্তান্ত
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, কালচারাল ফ্যাসিজম বা সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদ হলো সংস্কৃতির কোনো উপাদানকে ব্যবহার করে ফ্যাসিবাদের প্রচার ও প্রসার করা। অর্থাৎ, সংস্কৃতির সেই উপাদানটি তখন ফ্যাসিবাদের একটি অস্ত্র হিসেবে কাজ করে। সাংস্কৃতিক মোড়কে প্রচার করে যায় ফ্যাসিবাদের আদর্শ। এটি মানুষকে ফ্যাসিবাদী ধারণায় আকৃষ্ট করতে একটি ‘গুপ্ত’ উপায় হিসেবে কাজ করে।
কালচারাল ফ্যাসিজমের উদাহরণ দিতে গেলে ফিরে যেতে হয় সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়েই। ইতালি ও জার্মানিও আসে। কারণ, ফ্যাসিবাদের শাসনে থাকার সময়টায় এই দুই দেশেই কালচারাল ফ্যাসিজমের প্রসার লক্ষ্য করা গিয়েছিল। ইতালি ও জার্মানিতে ফ্যাসিবাদী শাসনের অনুরাগী একটি বুদ্ধিজীবী ও শিল্পী মহলও গড়ে উঠেছিল। ফলে শিল্প, সাহিত্য, সিনেমায় একটি ফ্যাসিস্ট চিন্তাধারার সৃষ্টি হয়েছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইতালি ও জার্মানির পরাজয়ের পর সংস্কৃতি খাতে ফ্যাসিবাদী ধারণা দূর করতে কিছু কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল মিত্রশক্তির পক্ষ থেকে। যেমন: জার্মানি দুই ভাগ হওয়ার পর ইস্ট জার্মানির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন, আর ওয়েস্ট জার্মানির নিয়ন্ত্রণে ছিল মূলত আমেরিকা। তো দুই অংশেই শুরু হয়েছিল ‘রিএডুকেট’ কার্যক্রম। এটি করা হয়েছিল কালচারাল ফ্যাসিজমকে ঠেকাতেই। তবে জার্মানির দুই অংশে উদ্দেশ্য দুই রকম ছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জার্মানির কালচারাল ফ্যাসিজম মোকাবিলা বিষয়ে একটি নিবন্ধ সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে কানাডার ম্যাকমাস্টার ইউনিভার্সিটির ওয়েবসাইটে। মায়া ফিলিপসের লেখা ‘ফেইলিওর টু রিএডুকেট: পারপেচুয়েশনস অব কালচারাল ফ্যাসিজম ইন পোস্ট-ওয়ার জার্মানি’ শিরোনামের ওই নিবন্ধে বলা হয়েছে, ইস্ট জার্মানিতে মূলত নাৎসিবাদ ও নব্যফ্যাসিবাদের মোড়ক হিসেবে ধরে পশ্চিমা পুঁজিবাদকে ঠেকানোর কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল সরকারিভাবে। কারণ, ওই অংশের নিয়ন্ত্রণে ছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন। অন্যদিকে ওয়েস্ট জার্মানিতে যেহেতু নিয়ন্ত্রণে ছিল আমেরিকা, তাই ফ্যাসিজমের সাথে সাথে কমিউনিজমকে ঠেকানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছিল। অর্থাৎ, স্নায়ুযুদ্ধের একটি রেশ বেশ ভালোভাবেই ছিল দুই জার্মানিতে। যদিও এ ধরনের কার্যক্রমে সফলতা পুরোপুরি আসেনি কখনো। ফলে জার্মানিতে কালচারাল ফ্যাসিজম রয়েই যায়। শুধু টিকে থাকাই নয়, বরং কালচারাল ফ্যাসিস্ট হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিরা জার্মান সংস্কৃতির নেতৃত্বেও এসে গিয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার কয়েক বছরের মধ্যেই। এতে জার্মান সংস্কৃতি আর ফ্যাসিবাদী বৈশিষ্ট্য থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি কখনো। এখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো করে রাজনীতিবিদেরা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে পুরো পশ্চিমেই নব্যফ্যাসিবাদের উত্থান তীব্র হয়ে উঠছে এবং এই বাস্তবতায় জার্মানির ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতিও নতুন রঙে রঙিন হয়ে উঠছে।

ইতালিতে কালচারাল ফ্যাসিজমের প্রকৃতি কিছুটা ভিন্ন ছিল। যুক্তরাজ্যের সোয়ানজি ইউনিভার্সিটির ইতিহাসবিদেরা এ নিয়ে একটি পর্যালোচনামূলক নিবন্ধ লিখেছেন। ‘হোয়াট ওয়াজ দ্য ইমপ্যাক্ট অব ফ্যাসিস্ট রুল আপন ইতালি ফ্রম নাইন্টিনটুয়েন্টিটু টু নাইন্টিনফোরটিফাইভ?’ শীর্ষক এই নিবন্ধে বলা হয়েছে, ইতালিতে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রকাঠামো সংবাদ ও প্রোপাগান্ডায় মনযোগ দিয়েছিল বেশি। ফ্যাসিবাদের সমালোচনা নিষিদ্ধ করেছিল। এগুলো হিটলারের জার্মানিও করেছিল বটে। তবে জার্মানির মতো সাহিত্যিক লেখা, থিয়েটার বা বাণিজ্যিক সিনেমার কনটেন্টেও ফ্যাসিবাদী চিহ্ন ঢোকানোর মরিয়া চেষ্টা করেনি ইতালি, অন্তত ১৯৩০-এর দশকের শেষ পর্যন্ত। জনসাধারণের জন্য ওই সময় কিছু রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান, প্যারেড ইত্যাদির আয়োজন করা হতো। এবং এসবের মধ্য দিয়েই ফ্যাসিবাদী চেতনা রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা হতো। অবশ্য সিনেমা হলগুলোতে ফ্যাসিবাদী ভাবধারার সংবাদমূলক ভিডিও বা প্রামাণ্যচিত্র দেখানো হতো। হয়তো ইতালির সমৃদ্ধ সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি মুসোলিনির ফ্যাসিবাদী সরকারের এমন কিছুটা ঢিলেঢালা কর্মকাণ্ডের কারণ হতে পারে। ফলে ইতালিতে কালচারাল ফ্যাসিজমের প্রভাবের গভীরতার মাত্রা নিয়ে কিছুটা সংশয় থেকে গেছে।
ইতালি ও জার্মানি–দুই দেশেই কালচারাল ফ্যাসিজমের উর্বর ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল প্রোপাগান্ডাকে। আর প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর জন্যই সংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদানকে ব্যবহার করা হতো। সেক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক মোড়ককে খুব সূক্ষ্মভাবে ব্যবহারের প্রবণতা কিছুটা কম ছিল। বরং খানিকটা স্থূলভাবে শুধু প্রপাগান্ডা চালানোর দিকেই আগ্রহ ছিল বেশি। সাংস্কৃতিক উপাদানকে ফ্যাসিবাদের প্রসারের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের দিক থেকে ইতালির তুলনায় জার্মানি এগিয়েও ছিল বেশ। এতটাই যে, এখনো সেই প্রভাব রয়ে গেছে।
এক্ষণে, দুই দেশের কালচারাল ফ্যাসিজমের উদাহরণ আমাদের জানা হলো। এখন না-হয় আবার নিজের দেশে ফেরা যাক।
পয়লা বৈশাখ কি কালচারাল ফ্যাসিজম?
পয়লা বৈশাখ হলো একটি বর্ষবরণ-সংক্রান্ত উদ্যাপন। এ ধরনের উদ্যাপন সব দেশ, জাতি ও নৃগোষ্ঠীর মধ্যেই থাকে। নৃগোষ্ঠীভেদে এই উদ্যাপনও ভিন্ন ভিন্ন হয়। তেমনি পয়লা বৈশাখও কেবল বাঙালিদের উদ্যাপন এবং সেটি শুধু বাংলা সনকে কেন্দ্র করেই।
প্রশ্ন হলো–পয়লা বৈশাখ কি আচরণ বা ধারণাগতভাবে কোনো প্রকারে অন্য নৃগোষ্ঠীর বর্ষবরণকে খারিজ করে? কিংবা পয়লা বৈশাখই সব ধরনের বর্ষবরণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ–এমন কোনো বক্তব্য প্রকাশের সুযোগ করে দেয়?
দুটি প্রশ্নেরই উত্তর হলো–না। এটি মূলত বাঙালিদের শিকড় স্মরণমূলক ঐতিহ্য লালনের এক ধরনের উপলক্ষ। হয়তো এই বৈশাখের প্রথম দিন পালনের কোনো প্রশাসনিক বা শাসনতান্ত্রিক বাস্তবতা আর তেমন প্রাসঙ্গিক নয়। তবে নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ার দেশ হিসেবে এর সাথে কৃষি ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির বড় একটা যোগ আছে। সেই সাথে যেহেতু এ উৎসব শত শত বছর ধরে চলে আসছে এবং মানুষ সহসা পরিবর্তনের বদলে বছরের পর বছর ধরে চলে আসা একটি রীতিকে মেনে চলার এক ধরনের মানসিক বাধ্যবাধকতায় ভোগে, তাই পয়লা বৈশাখ এখনো টিকে আছে। টিকিয়ে রাখার একটি তাড়নাও আছে। এর সাথে কোনো রাজনৈতিক, জাতিতাত্ত্বিক বা ধর্মীয় সম্প্রদায়গত বৈশিষ্ট্য আদতে জুড়ে নেই। আছে বাঙালির সংস্কৃতির প্রবাহমান রূপ।

পয়লা বৈশাখের আয়োজন প্রকৃতিগতভাবে বাঙালির শ্রেষ্ঠত্বের বাণীও প্রচার করে না। বরং একই ভূমির অধিবাসী অন্যান্য নৃগোষ্ঠীর বর্ষবরণ আয়োজনের ঐতিহ্যের সাথে এর কিছু মিলও খুঁজলে পাওয়া যাবে। সেটি স্বাভাবিকও। দেশের সীমানার হিসাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির বর্ষবরণ আয়োজনের প্রভাবের আধিপত্য (ভৌগোলিক বা মানসিক) বিস্তারের বিষয়টি যদি বিবেচনায় নেওয়া হয়, তাহলে বলতেই হয়–সেটি আসলে করা হয় পুরোই রাজনৈতিক মতাদর্শ ও রাষ্ট্রীয় বা সরকারি কারণে। নিশ্চয়ই এ দেশের পার্বত্য এলাকায় নিবিড় পর্যবেক্ষণ চালালে তেমন বৈশিষ্ট্য ধরা পড়বে। কিন্তু সেই আগ্রাসন বা আধিপত্যের কারণ কোনোভাবেই পয়লা বৈশাখ নামের দিবস নয়। বরং এর উদ্দেশ্যমূলক ব্যবহারের বিষয়টিই মূল এবং সেই ব্যবহারটিও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ‘এসটাবলিশমেন্ট’জনিত। আর কে না জানে, সব দেশ, জাতি বা রাষ্ট্রেরই এই বস্তুটি থাকে।
পয়লা বৈশাখ নামীয় ধারণাটি বা দিবসটি কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আক্রমণ করে না, স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার গুণগানও গায় না। হ্যাঁ, স্বৈরতান্ত্রিক রাজকর্মসূচি হিসেবেই এর শুরু। তবে পরে এর চরিত্র আপামরের হয়ে উঠেছে অনেকটাই। কারণ, সাধারণের মধ্যে আগে থেকে চালু থাকা একটি বিষয়কেই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল শাসনতান্ত্রিকভাবে।
পয়লা বৈশাখ গোষ্ঠীগতভাবে আক্রমণের হুমকি দেয় না। এমনকি ‘আমরা’ বনাম ‘তারা’ পরিস্থিতির সৃষ্টিও করে না। অন্তত এই উৎসবের মূলে তেমনটা নেই। এটি পালনের কোনো রীতিতে সেরকম হুমকি কখনো প্রতিভাত হয় না। সেটি যদি কখনো হয়ও, তাহলে তা অন্য আরেকটি নৃগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে হতে হবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, পয়লা বৈশাখকে ‘কালচারাল ফ্যাসিজম’ অভিহিত করা দাবিটি আদতে উঠছে বাঙালিদের মধ্য থেকেই। একেবারে সুনির্দিষ্ট করে বললে, ধর্মভিত্তিক দৃষ্টিকোণকে উপজীব্য করে। কিন্তু পয়লা বৈশাখ উদ্যাপনের কোনো অনুষঙ্গেই সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি নেই। এটি বরং অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির জন্য সুবিদিত। এর সাথে ধর্মের কোনো সম্পর্কও নেই। যেটি আছে, সেটি হলো–বাংলার সংস্কৃতির বিবর্তনের ধারা। এটি ইতিহাসের অংশ। সেসব চিহ্ন চাইলেও মুছে ফেলা সম্ভব না। আর যদি পরিবর্তনের স্বাভাবিক ধারার বদলে জোর করে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়, তখনই ওই প্রক্রিয়াটি হয়ে ওঠে স্বৈরতান্ত্রিক।
তাই যখন এর বিরোধিতা এমন সম্পর্কহীন একটি চিন্তা থেকে হয়, দিবস পালনের ক্ষেত্রে ‘শালীন’ হওয়ার পূর্বশর্ত দেওয়া হয়, তখন বুঝতে হয়–একটি ধারণা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে, আরোপ করা হচ্ছে। এর সাথে সাথে অস্তিত্বহীন করে দেওয়ার একটি হুমকিও থাকে জোরেশোরে। অর্থাৎ, একটি উৎসবকে টিকে থাকার স্বার্থে একটি গোষ্ঠীর মনমতো রূপ পরিগ্রহের চাপ দেওয়া হচ্ছে।
তাহলে, ফ্যাসিবাদী আসলে কোনটা? যেটি নতুন রূপ ধারণের চাপে আছে, নাকি যে চাপ দিচ্ছে? আশা করা যায়, এত দীর্ঘ আলোচনার পর অন্তত এ দুটি প্রশ্নের উত্তর পাওয়া আর কঠিন নয়।
কথা হলো–পয়লা বৈশাখের মতো একটি বর্ষবরণ উৎসবকে যদি ফ্যাসিবাদের প্রতীক হিসেবে দেখানোর চেষ্টা চলে, তাহলে সেই হিসাবে ইংরেজি বছরের ‘নিউ ইয়ার’কেও একই দোষ দেওয়া যায়। এমনকি চাকমাদের বিজু, মারমাদের সাংগ্রাই, তঞ্চঙ্গ্যাদের বিষু ইত্যাদিকেও একই তকমা দেওয়া যায়। তখন এক কথায়, উৎসব (তা যেটিই হোক) মাত্রেই ‘কালচারাল ফ্যাসিজম’ হয়ে উঠতে পারে! কারণ, পয়লা বৈশাখ শুধু একটি নির্দিষ্ট ভূমির অধিবাসীদের কেন্দ্র করে পালিত হয়, তাতে সম্প্রদায় বা বর্ণভেদ নেই। কিন্তু স্বাভাবিক রীতিতেই অন্যান্য নানা উৎসবে ভিন্ন ভিন্ন সীমা থাকে, প্রয়োজনের খাতিরেই।

তাহলে কি এই সবই ফ্যাসিবাদের প্রতীক হয়ে যাবে? নাকি কেউ মেনে নেবে তেমনটা?
শোভাযাত্রার মঙ্গল-অমঙ্গল
পয়লা বৈশাখের বেশ নবীনতম সংযোজন হলো ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। যদি শত শত বছরের ইতিহাস হিসেবে নেওয়া হয়, তাহলে উচ্চারণ করতেই হয় ‘নবীনতম’ শব্দটি। এর বয়স সর্বোচ্চ ৩৫/৪০ বছর।
উদ্ভবের ইতিহাস অনুযায়ী, ১৯৮৫ সালে যশোরে চারুপীঠ নামের একটি সংগঠন এ ধরনের একটি শোভাযাত্রার শুরুটা করেছিল। এর উদ্যোক্তারা পরে রাজধানী ঢাকায়ও এমন আয়োজনের উদ্যোগ নেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা থেকে এই শোভাযাত্রার শুরু হয়েছিল ১৯৮৯ সালে। যদিও শুরুতে এই আয়োজন এতটা জাঁকজমকপূর্ণ ছিল না। তখনকার সেই শোভাযাত্রার একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও ছিল। তৎকালীন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ছিল এই শোভাযাত্রা আয়োজনের অন্যতম প্রেরণা। শোভাযাত্রার মাধ্যমে নিজ নিজ অবস্থান থেকে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছিলেন অনেক শিল্পী-সাহিত্যিক। সেই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই বিশেষ করে চিত্রশিল্পীরা এই মঙ্গল শোভাযাত্রার পরিকল্পনা করেছিলেন। এরপর ক্রমে আয়োজনটি প্রতি বছরই হতে থাকে এবং একেক বছরের সমসাময়িক বিষয় এর বিভিন্ন অনুষঙ্গে ফুটে উঠতে থাকে। তার মধ্যে ‘প্রতিবাদ’ অবশ্যই একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল।
এ বিষয়ে বিবিসি বাংলা’কে ২০১৭ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে চারুকলা অনুষদের একসময়ের ডিন ও মঙ্গল শোভাযাত্রার শুরুর সময়কার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিসার হোসেন বলেছিলেন, তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ধর্মকে ব্যবহারের বিপরীতে সব ধর্মের মানুষের জন্য বাঙালি সংস্কৃতি তুলে ধরার চেষ্টা ছিল শিক্ষার্থীদের মধ্যে। তারাই মূলত আয়োজনটি করেছিল।
তবে শুরুতে এই আয়োজনের নাম ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ ছিল না। ছিল ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’। এ বিষয়ে অধ্যাপক নিসার হোসেন বলেন, নামটা মঙ্গল শোভাযাত্রা দেওয়ারই ইচ্ছে ছিল তাদের। কিন্তু তখনকার পরিস্থিতিতে এর ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হতে পারে আশঙ্কায় নামটি দেওয়া হয়নি। পরে অবশ্য এই শোভাযাত্রা ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামেই পরিচিত হয়।
সমস্যাটি হলো, পয়লা বৈশাখকে কালচারাল ফ্যাসিজম হিসেবে অভিহিত করার পেছনে এই শোভাযাত্রার নামটি বিতর্কের আগুন উসকে দেওয়ার দেশলাই হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সেই সাথে আপত্তি তোলা হয় শোভাযাত্রায় থাকা বাঁশ, কাগজ বা অন্যান্য উপাদানে তৈরি নানা ভাস্কর্য ও মুখোশ নিয়েও। এসব তৈরি হয় সাধারণত বছরভিত্তিক একেকটি প্রতিপাদ্যের ওপর ভিত্তি করে। সেই প্রতিপাদ্য নির্ধারণ নিয়েও বিতর্ক আছে। কারণ, এসবের কোনোটাই কোনো নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নির্ধারিত হয় না। উল্টো একেক সময়ের ক্ষমতাকাঠামো ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তির তাতে নির্ধারক ভূমিকা পালনের জোর অভিযোগ আছে। এই বাস্তবতার পরিবর্তন এখনো হয়নি।

তাই এই শোভাযাত্রার রাজনৈতিক চরিত্র পরিগ্রহ করার অভিযোগটি পুরনো। ফলে যে শোভাযাত্রার জন্মই হয়েছিল রাজনৈতিক প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে, সেই শোভাযাত্রা গত ১০/১২ বছরে অনেকাংশে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে একটি পক্ষের দিকে ঝুঁকে পড়েছিল কিনা–সেই বিতর্ক আছে ভালোমতোই। এই রাজনৈতিক পক্ষপাতমূলক চরিত্র পরিগ্রহের অভিযোগ ওইসব ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র আয়োজকেরাও এড়াতে পারেন না। এখন কোনো সময়ের কোনো রাজনৈতিক পক্ষপাত ফ্যাসিবাদী ঘরানার ছিল কিনা, তা বিতর্কের বিষয়। কারণ, ফ্যাসিবাদের লক্ষণ ধরে ধরে বিবেচনা করতে গেলে অনেক কিছুই জালে আটকাবে। আবার পূর্ণ লক্ষণ মেলানোও কঠিন। ফলে ফ্যাসিস্ট বলে দেওয়া যতটা সহজ, সর্বস্বীকৃত মানদণ্ডে তা প্রমাণ করা ঠিক ততটাই কঠিন।
মজার বিষয় হলো, এমন পক্ষপাতকে সামনে এনেই ‘মঙ্গল’ শব্দটি বাদ দেওয়ার দাবি ওঠে। কিন্তু এর পেছনে থাকে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি জুড়ে দেওয়ার চেষ্টা। একইসঙ্গে এমন দৃষ্টিভঙ্গিকে সামনে রেখে পুরো শোভাযাত্রার রূপ বদলে দেওয়ার দাবি উঠতে থাকে। ছড়ানো হতে থাকে অযৌক্তিক ন্যারেটিভ, প্রোপাগান্ডা। কাজটি কিন্তু করা হয় একটি সুদূরপ্রসারী ভাবনা থেকেই। তাতে থাকে একটি ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণের ঠিক সেই উপাদানটিকে সরিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা, যার ভিত হলো অসাম্প্রদায়িক রূপ এবং যার মধ্য দিয়ে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে শুধু বাঙালি সত্তাকেই সর্বাগ্রে স্থাপনের আগ্রহ অনেকটাই ফুটে ওঠে কিছু সাধারণ উপাদানের মাধ্যমে। কেউ বা কোনো পক্ষ যখন নানামাত্রিক বিভেদ ভুলে সাধারণ জনতার একটি মঞ্চে দাঁড়ানোর সম্ভাবনাটিকে তিরোহিত করতে চায়, তখন বুঝতে হয়–ভেদাভেদ সৃষ্টিই হয়তো তার একমাত্র অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য। কারণ, বিভেদ থাকলেই ক্ষমতার দখল বা অপব্যবহার কিংবা যেনতেনভাবে শাসন করা তুলনামূলক সহজ হয়। কারণ, ঐক্যবদ্ধ জনতাকে মোকাবিলা করা কঠিন। কিন্তু সেটিই যখন নানা কারণে খণ্ড খণ্ড দ্বীপের মতো হয়ে যায়, তখন একেক পক্ষকে ক্ষমতার বশীভূত করা সহজ হয়। তাই খেলাটি শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা ও শাসনের হয়ে দাঁড়ায়, দাঁড়িয়ে যায় রাজনৈতিক ফায়দা লোটার প্রক্রিয়া হিসেবে।
এমন ভাবনাতেই কখনো ওঠে ‘মঙ্গল’ বা ‘আনন্দ’ বাদ দেওয়ার প্রসঙ্গ। আবার কখনো আসে নিরপেক্ষ অবস্থানের প্রতীক ধরে ‘বৈশাখী’ শব্দটিকে আঁকড়ে ধরার চেষ্টা। তবে দিনশেষে সবই হয়ে থাকে কেবল রাজনৈতিক ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক ডেবিট-ক্রেডিট মেলানোর সস্তা লাভ-লোকসানের হিসাবই। আর সেখানে মানুষে মানুষে বিভেদ তৈরির বাণিজ্যমূল্যই সবচেয়ে বেশি!

শেষ কথা
বাংলার মানুষ ঐতিহাসিকভাবে উৎসবপ্রিয়। নানা সংকটে দীর্ঘকাল নিমজ্জিত থাকা এই বঙ্গদেশের মানুষ তাই উৎসব পেলে একটু ভুলোমনা হতে চায়। উৎসবটাকে উপভোগ করতে চায়। কারণ, আনন্দের অভাব এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে ছিল ও আছে ষোলো আনা।
একসময় এখনকার পুরো বাংলাদেশই ছিল একটি অনুন্নত অঞ্চল। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে বাংলা নানাভাবে বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার হয়েছিল। সেই ধারা অব্যাহত ছিল পাকিস্তান আমলেও। আগেও যেমন নিজেদের অধিকারের জন্য এই অঞ্চলের মানুষদের লড়তে হয়েছে, জীবন দিতে হয়েছে, ঠিক তেমনি পাকিস্তান আমলেও বাঙালিদের ভাষা থেকে শুরু করে সংস্কৃতি, একপর্যায়ে স্বাধীনতার জন্য জীবন দিতে হয়েছে। এসব লড়াই, সংগ্রামের পেছনে অবশ্যই একটি সাধারণ স্বপ্ন ছিল সংগ্রামী মানুষের। সেটি ছিল একটি বৈষম্যহীন ভূখণ্ড, জুলুমহীন শাসনব্যবস্থা ও ভেদাভেদহীন জীবন যাপনের ইচ্ছা।
অথচ এখন সেই স্বাধীন দেশে আমরা নিজেরাই ভেদাভেদ সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছি ক্রমাগত। কর্তৃপক্ষীয় ইচ্ছাও সেখানে অনুঘটক বটে। তাই আবহমান বাংলার অসাম্প্রদায়িক প্রতীকও এ দেশে কলুষিত হয়, নষ্ট হয়। এতে করে ক্রমশ আরেকটি চরম বিভক্ত সমাজের দিকেই আমরা এগিয়ে চলেছি একটি সম্মিলিত ঘেন্না উৎপাদন কার্যক্রমের মাধ্যমে। এই প্রবল অযৌক্তিক ঘেন্নায় দিনের শেষে আমাদের যেকোনো উৎসবকে মাটি করে দেওয়া ছাড়া, আর কোনো কিছু অর্জন হবে না।
এই বঙ্গের মানুষ এখন সেটিকেই সঞ্চয় ভেবে মনের বাক্সে জমা করে রাখবে কি?
ওপরের প্রশ্নটির উত্তরেই লুকিয়ে বাংলাদেশের মানুষের ভালো থাকার ভবিষ্যৎ!
লেখক: সাংবাদিক

বছর দেড়েকের বেশি সময় ধরেই একটি শব্দবন্ধ বারবার শোনা যাচ্ছে। এর একাংশ অবশ্য আরও আগে থেকেই আলোচিত। সেটি হলো ‘ফ্যাসিজম’ বা ‘ফ্যাসিস্ট’। এখন অবশ্য তার আগে ‘কালচার’ বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে, সচেতনভাবেই। আর এই পুরো ‘কালচারাল ফ্যাসিজম’ শব্দবন্ধটি আবার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উপাদানের সামনে বসিয়ে সেগুলোকে সিল মেরে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এটিও হচ্ছে সাজানো, গোছানো উপায়েই। তাতেই বোঝা যায়, ব্যাপারটি আদতে দীর্ঘ সময়ের পরিকল্পনার ফসল।
শিরোনাম দেখে নিশ্চয়ই বোঝা গেছে, পয়লা বৈশাখের প্রথাগত উদ্যাপনকে ‘কালচারাল ফ্যাসিজম’-এর উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরার দাবি বা ইনিয়ে-বিনিয়ে বলার চেষ্টা নিয়েই এই লেখা। আগেই একটি কথা বলে নেওয়া ভালো যে, শুধু পয়লা বৈশাখ নিয়েই এমন চলছে না। আরও কিছু সাংস্কৃতিক উপাদানকেও এমন ট্যাগ দেওয়ার চেষ্টা চলে। সেসব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করাই যায়। তবে আলোচনাকে গণ্ডিবদ্ধ করার স্বার্থেই এবার কেবল পয়লা বৈশাখ নিয়েই কথা বলা যাক।
পয়লা বৈশাখ কী
পয়লা বৈশাখ হলো বাংলা সালের প্রথম দিন। এই নামের দিবসটা মূলত বাঙালিরাই উদ্যাপন করে থাকে। নৃগোষ্ঠী হিসেব করলে এটি শুধু বাঙালিদেরই দিবস। অন্য নৃগোষ্ঠীর মানুষদের জন্য কোনো তাৎপর্য বহন করে না পয়লা বৈশাখ। তাদের বর্ষবরণ উৎসবের নাম অন্য, সংস্কৃতিও ভিন্ন। চাকমাদের যেমন বিজু, মারমাদের সাংগ্রাই, তঞ্চঙ্গ্যাদের বিষু ইত্যাদি ইত্যাদি। অবশ্য বাংলাদেশের বাস্তবতায় সংখ্যাগুরু জনতার পালিত উৎসব হিসেবে ‘পয়লা বৈশাখ’ নামটির আলাদা এক ধরনের আধিপত্য পরিলক্ষিত হয়। তা অবশ্য দেশে দেশেই দেখা যায়। অনেকটা গণতন্ত্রের মতো করেই।
পয়লা বৈশাখের উদ্ভবের ইতিহাস একটু জানা যাক। তাতে আলোচনায় একটু সুবিধা হবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ নামে পরিচিত বাংলাপিডিয়ার লেখা ধার করা যায়। এর পরিচয় নিয়ে বাংলাপিডিয়া বলছে, “পহেলা বৈশাখ বাংলা সনের প্রথম দিন। এ দিনটি বাংলাদেশে নববর্ষ হিসেবে পালিত হয়। এটি বাঙালির একটি সর্বজনীন লোকউৎসব। এদিন আনন্দঘন পরিবেশে বরণ করে নেওয়া হয় নতুন বছরকে। কল্যাণ ও নতুন জীবনের প্রতীক হলো নববর্ষ। অতীতের ভুলত্রুটি ও ব্যর্থতার গ্লানি ভুলে নতুন করে সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনায় উদ্যাপিত হয় নববর্ষ।”

পয়লা বৈশাখের উদ্ভব সম্পর্কে বাংলাপিডিয়া বলছে, “এক সময় নববর্ষ পালিত হতো আর্তব উৎসব বা ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে। তখন এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল কৃষির; কারণ কৃষিকাজ ছিল ঋতুনির্ভর। এই কৃষিকাজের সুবিধার্থেই মুগল সম্রাট আকবর ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০/১১ মার্চ বাংলা সন প্রবর্তন করেন এবং তা কার্যকর হয় তাঁর সিংহাসন-আরোহণের সময় থেকে (৫ নভেম্বর ১৫৫৬)। হিজরি চান্দ্রসন ও বাংলা সৌরসনকে ভিত্তি করে বাংলা সন প্রবর্তিত হয়। নতুন সনটি প্রথমে ‘ফসলি সন’ নামে পরিচিত ছিল, পরে তা বঙ্গাব্দ নামে পরিচিত হয়। বাংলা নববর্ষ পালনের সূচনা হয় মূলত আকবরের সময় থেকেই। সে সময় বাংলার কৃষকরা চৈত্রমাসের শেষদিন পর্যন্ত জমিদার, তালুকদার এবং অন্যান্য ভূ-স্বামীর খাজনা পরিশোধ করত। পরদিন নববর্ষে ভূস্বামীরা তাদের মিষ্টিমুখ করাতেন। এ উপলক্ষে তখন মেলা এবং অন্যান্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। ক্রমান্বয়ে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশে পহেলা বৈশাখ আনন্দময় ও উৎসবমুখী হয়ে ওঠে এবং বাংলা নববর্ষ শুভদিন হিসেবে পালিত হতে থাকে।”
অর্থাৎ, এটি কেবলই বাঙালি সংস্কৃতির নতুন বছর বরণ-সংক্রান্ত একটি উদ্যাপন, অন্তত ব্যুৎপত্তিগত দিক থেকে, এবং এর শুরুর সাথে কৃষি, রাজশাসন, ফসল, খাজনা বা ট্যাক্স ইত্যাদি অনেক বিষয় সংশ্লিষ্ট ছিল। শুধুই উদ্যাপনের জন্য পয়লা বৈশাখের সৃষ্টি হয়নি। হয়েছে প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক কারণে। বৈষয়িক প্রয়োজনে সৃষ্ট একটি দিনের উদ্যাপন ধীরে ধীরে সংস্কৃতির একটি উপাদানে পরিণত হয়েছে। এবং তার জন্য অতিক্রান্ত হতে হয়েছে ৪৫০ বছরের বেশি সময়।
আর এখন বলার চেষ্টা হচ্ছে বা বলা হচ্ছে–কালচারাল ফ্যাসিজমের প্রতীক পয়লা বৈশাখ, এই উপলক্ষে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ করা উচিত নয়, এটি ধর্মীয় বিভেদ সৃষ্টি করে ইত্যাদি ইত্যাদি। শুধু পয়লা বৈশাখ নয়, এর সঙ্গে আরও কিছু সাংস্কৃতিক উপাদানেও এই কালচারাল ফ্যাসিজমের ট্যাগ লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মূল আলাপ হলো–২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে হওয়া গণঅভ্যুত্থানে যে ‘ফ্যাসিবাদী’ শক্তি দাবিকৃত রাজনৈতিক দলকে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেই ফ্যাসিবাদী শক্তির বৈশিষ্ট্য বা লিগ্যাসি এসব সাংস্কৃতিক উপাদানের মধ্যে আছে বলে দাবি করা হয়।
প্রশ্ন উঠতেই পারে যে, ফ্যাসিবাদী শক্তি আসলে কী? ফ্যাসিবাদের লক্ষণ কী? কী বৈশিষ্ট্যের বলে একটি সত্তা ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠে? চলুন, এসবে চোখ বোলানো যাক।
ফ্যাসিবাদ কী? কারা বা কী ফ্যাসিবাদী?
ফ্যাসিজম একটি রাজনৈতিক আদর্শ। ফ্যাসিজম বা ফ্যাসিস্ট শব্দ দুটি উচ্চারিত হলেই মূলত দুটি ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। একটি হচ্ছে নাৎসি জার্মানির বা হিটলারের জার্মানির। অন্যটি হচ্ছে বেনিতো মুসোলিনির ইতালি। এই দুটি হলো প্রমাণিত সত্যের মতো ফ্যাসিজমের উদাহরণ। সাধারণত বিশেষজ্ঞদের বেশির ভাগ এ দুটিকে ফ্যাসিজমের উৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে ধরে থাকেন। ল্যাটিন শব্দ ‘ফ্যাসেস’ থেকে নিজের রাজনৈতিক দলের নামকরণ করেছিলেন মুসোলিনি, যা দিয়ে মূলত গাছের ডাল বা কাঠ দিয়ে শক্ত করে বাঁধা কুঠারকে বোঝানো হয়। ব্রিটানিকা বলছে, প্রাচীন রোমে দণ্ডপ্রদানকারী কর্তৃপক্ষের প্রতীক হিসেবে এই ফ্যাসেস’কে বোঝানো হতো।

তবে হ্যাঁ, এ নিয়ে বিতর্ক আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার এই দুই উদাহরণের পর মূলত বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ব্যবস্থা বা আন্দোলন ‘ফ্যাসিজম’ বা ‘ফ্যাসিস্ট’ হিসেবে উপাধি পেয়েছে। তবে সেগুলোকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। তুমুল বিতর্ক চলেছে সেসব দাবি নিয়ে। কারণ, রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে ফ্যাসিবাদ অত্যন্ত জটিল। ফ্যাসিজম-এর ধারণাটিকে নানাভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায়। এর বৈশিষ্ট্যও হরেক। বিশেষত একবিংশ শতাব্দীতে এসব বৈশিষ্ট্য আরও নানামুখী হয়েছে। একই সঙ্গে এটি নিয়ত পরিবর্তনশীলও। ফলে ফ্যাসিস্ট উপাধিটি রাজনৈতিকভাবে যে কাউকে দেওয়া গেলেও, সেটি প্রমাণ করা কঠিন।
ইয়েল ইউনিভার্সিটির দর্শনের অধ্যাপক জেসন স্ট্যানলি ‘হাউ ফ্যাসিজম ওয়ার্কস’ নামে একটি বই লিখেছিলেন, যা ২০২০ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। বইটিতে ফ্যাসিবাদের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে স্ট্যানলি বলেছেন, “ফ্যাসিজমের ভিত্তি হলো ‘আমরা’ ও ‘তারা’-এর মধ্যে একটি নৃতাত্ত্বিক বিভেদ তৈরি করা। একটি উগ্র নৃতাত্ত্বিকগত জাতীয়তাবাদ ফ্যাসিবাদের মূল ভিত হিসেবে কাজ করে। মিথজাত অতীতের নস্টালজিয়া তৈরি করে ফ্যাসিবাদ সেটিকে ভিত হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করে, যেখানে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সদস্যদের একটি সাম্রাজ্য ছিল–এবং বর্তমানকে এটি সেই সাম্রাজ্য হারানোর ক্ষেত্র হিসেবে উপস্থাপন করে। মিথের মতো করে ব্যবহৃত ওই অতীত সাম্রাজ্যে এই নির্দিষ্ট গোষ্ঠীরই প্রবল প্রতাপের উপস্থিতি দেখা যায়–সেটি যেমন সামরিকভাবে, তেমনি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবেও।”
নিউইয়র্কের কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞানের ইমেরিটাস অধ্যাপক রবার্ট প্যাক্সটন মনে করেন, ফ্যাসিবাদ হলো রাজনৈতিক চর্চার এমন এক ধরন, যা জনপ্রিয় উদ্দীপনা জাগিয়ে তুলতে উৎসাহ দেয় এবং এ কাজে খুবই সূক্ষ্ম প্রোপাগান্ডা কৌশল ব্যবহার করে থাকে। প্যাক্সটন আরও মনে করেন, ফ্যাসিবাদ কিছু নির্দিষ্ট ঘরানার প্রোপাগান্ডাকে উসকে দিতে চায়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে উদারবাদবিরোধিতা, ব্যক্তির ব্যক্তিগত অধিকারের প্রয়োগ বাতিল করা ও গণতন্ত্রের বিরোধিতা।
কথা হলো–ফ্যাসিবাদের লক্ষণ কী কী তাহলে? আছে অনেক। এ নিয়ে একটু সংক্ষেপে বলা যাক। মার্টিন লংম্যান ফ্যাসিবাদের কিছু সতর্কতামূলক চিহ্নের উল্লেখ করেছেন। ১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত দ্য ওয়াশিংটন মান্থলি’র এই ওয়েব এডিটর ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে এক লেখায় উল্লেখ করেছিলেন এসব চিহ্নের বিষয়ে। সেই তালিকায় ছিল শক্তিশালী জাতীয়তবাদের উত্থান, শত্রুপক্ষকে চিহ্নিত করে একতাবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা, পুরুষ-প্রাধান্য দিয়ে অন্য জেন্ডারকে কোণঠাসা করার চেষ্টা, নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম, ধর্ম ও সরকারকে মিশিয়ে ফেলা, শ্রমিক শ্রেণিকে দমনের চেষ্টা করাসহ বেশ কিছু লক্ষণ। মার্টিনের মতে, এসব লক্ষণ দৃশ্যমান হলেই বুঝতে হবে যে, ফ্যাসিজম আসছে অথবা এসে গেছে।
ফ্যাসিজম বা ফ্যাসিস্ট চেনার অনেক লক্ষণ সম্পর্কে বলা যায়। তবে মার্কিন সাংবাদিক মিশেল ওয়েইডমান বিষয়টিকে বেশ সহজ করে দিয়েছেন। নন-প্রফিট নিউজ অরগানাইজেশন শাসতাস্কাউট ডট ওআরজির এই সহযোগী সম্পাদক এক নিবন্ধে মোটে তিনটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বলেছেন। প্রশ্নগুলো হলো:
১. বিবেচ্য কোনো ব্যক্তি, সংগঠন বা ধারণা কি প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আক্রমণ করে?
২. তারা কি গোষ্ঠীগতভাবে আক্রমণের হুমকিকে ব্যবহার করে যেকোনো দাবি তোলে বা বিরোধী পক্ষকে ভয় দেখায়?
৩. বিবেচ্য কোনো ব্যক্তি, সংগঠন বা ধারণা কি ‘আমরা’ বনাম ‘তারা’ পরিস্থিতির সৃষ্টি করে? এবং এর মাধ্যমে একটি পুরো গোষ্ঠীভুক্ত মানুষকে (যাদের মধ্যে হয়তো একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি ব্যতীত আর কোনো মিলই নেই) খলনায়কে পরিণত করার চেষ্টা করে?
মিশেল বলছেন, যদি এই তিন প্রশ্নের উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে নির্দ্বিধায় সেই ব্যক্তি, সংগঠন বা ধারণাকে ফ্যাসিস্ট বলে ডাকা জায়েজ।

কালচারাল ফ্যাসিজম কী এবং উদাহরণবৃত্তান্ত
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, কালচারাল ফ্যাসিজম বা সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদ হলো সংস্কৃতির কোনো উপাদানকে ব্যবহার করে ফ্যাসিবাদের প্রচার ও প্রসার করা। অর্থাৎ, সংস্কৃতির সেই উপাদানটি তখন ফ্যাসিবাদের একটি অস্ত্র হিসেবে কাজ করে। সাংস্কৃতিক মোড়কে প্রচার করে যায় ফ্যাসিবাদের আদর্শ। এটি মানুষকে ফ্যাসিবাদী ধারণায় আকৃষ্ট করতে একটি ‘গুপ্ত’ উপায় হিসেবে কাজ করে।
কালচারাল ফ্যাসিজমের উদাহরণ দিতে গেলে ফিরে যেতে হয় সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়েই। ইতালি ও জার্মানিও আসে। কারণ, ফ্যাসিবাদের শাসনে থাকার সময়টায় এই দুই দেশেই কালচারাল ফ্যাসিজমের প্রসার লক্ষ্য করা গিয়েছিল। ইতালি ও জার্মানিতে ফ্যাসিবাদী শাসনের অনুরাগী একটি বুদ্ধিজীবী ও শিল্পী মহলও গড়ে উঠেছিল। ফলে শিল্প, সাহিত্য, সিনেমায় একটি ফ্যাসিস্ট চিন্তাধারার সৃষ্টি হয়েছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইতালি ও জার্মানির পরাজয়ের পর সংস্কৃতি খাতে ফ্যাসিবাদী ধারণা দূর করতে কিছু কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল মিত্রশক্তির পক্ষ থেকে। যেমন: জার্মানি দুই ভাগ হওয়ার পর ইস্ট জার্মানির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন, আর ওয়েস্ট জার্মানির নিয়ন্ত্রণে ছিল মূলত আমেরিকা। তো দুই অংশেই শুরু হয়েছিল ‘রিএডুকেট’ কার্যক্রম। এটি করা হয়েছিল কালচারাল ফ্যাসিজমকে ঠেকাতেই। তবে জার্মানির দুই অংশে উদ্দেশ্য দুই রকম ছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জার্মানির কালচারাল ফ্যাসিজম মোকাবিলা বিষয়ে একটি নিবন্ধ সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে কানাডার ম্যাকমাস্টার ইউনিভার্সিটির ওয়েবসাইটে। মায়া ফিলিপসের লেখা ‘ফেইলিওর টু রিএডুকেট: পারপেচুয়েশনস অব কালচারাল ফ্যাসিজম ইন পোস্ট-ওয়ার জার্মানি’ শিরোনামের ওই নিবন্ধে বলা হয়েছে, ইস্ট জার্মানিতে মূলত নাৎসিবাদ ও নব্যফ্যাসিবাদের মোড়ক হিসেবে ধরে পশ্চিমা পুঁজিবাদকে ঠেকানোর কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল সরকারিভাবে। কারণ, ওই অংশের নিয়ন্ত্রণে ছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন। অন্যদিকে ওয়েস্ট জার্মানিতে যেহেতু নিয়ন্ত্রণে ছিল আমেরিকা, তাই ফ্যাসিজমের সাথে সাথে কমিউনিজমকে ঠেকানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছিল। অর্থাৎ, স্নায়ুযুদ্ধের একটি রেশ বেশ ভালোভাবেই ছিল দুই জার্মানিতে। যদিও এ ধরনের কার্যক্রমে সফলতা পুরোপুরি আসেনি কখনো। ফলে জার্মানিতে কালচারাল ফ্যাসিজম রয়েই যায়। শুধু টিকে থাকাই নয়, বরং কালচারাল ফ্যাসিস্ট হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিরা জার্মান সংস্কৃতির নেতৃত্বেও এসে গিয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার কয়েক বছরের মধ্যেই। এতে জার্মান সংস্কৃতি আর ফ্যাসিবাদী বৈশিষ্ট্য থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি কখনো। এখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো করে রাজনীতিবিদেরা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে পুরো পশ্চিমেই নব্যফ্যাসিবাদের উত্থান তীব্র হয়ে উঠছে এবং এই বাস্তবতায় জার্মানির ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতিও নতুন রঙে রঙিন হয়ে উঠছে।

ইতালিতে কালচারাল ফ্যাসিজমের প্রকৃতি কিছুটা ভিন্ন ছিল। যুক্তরাজ্যের সোয়ানজি ইউনিভার্সিটির ইতিহাসবিদেরা এ নিয়ে একটি পর্যালোচনামূলক নিবন্ধ লিখেছেন। ‘হোয়াট ওয়াজ দ্য ইমপ্যাক্ট অব ফ্যাসিস্ট রুল আপন ইতালি ফ্রম নাইন্টিনটুয়েন্টিটু টু নাইন্টিনফোরটিফাইভ?’ শীর্ষক এই নিবন্ধে বলা হয়েছে, ইতালিতে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রকাঠামো সংবাদ ও প্রোপাগান্ডায় মনযোগ দিয়েছিল বেশি। ফ্যাসিবাদের সমালোচনা নিষিদ্ধ করেছিল। এগুলো হিটলারের জার্মানিও করেছিল বটে। তবে জার্মানির মতো সাহিত্যিক লেখা, থিয়েটার বা বাণিজ্যিক সিনেমার কনটেন্টেও ফ্যাসিবাদী চিহ্ন ঢোকানোর মরিয়া চেষ্টা করেনি ইতালি, অন্তত ১৯৩০-এর দশকের শেষ পর্যন্ত। জনসাধারণের জন্য ওই সময় কিছু রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান, প্যারেড ইত্যাদির আয়োজন করা হতো। এবং এসবের মধ্য দিয়েই ফ্যাসিবাদী চেতনা রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা হতো। অবশ্য সিনেমা হলগুলোতে ফ্যাসিবাদী ভাবধারার সংবাদমূলক ভিডিও বা প্রামাণ্যচিত্র দেখানো হতো। হয়তো ইতালির সমৃদ্ধ সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি মুসোলিনির ফ্যাসিবাদী সরকারের এমন কিছুটা ঢিলেঢালা কর্মকাণ্ডের কারণ হতে পারে। ফলে ইতালিতে কালচারাল ফ্যাসিজমের প্রভাবের গভীরতার মাত্রা নিয়ে কিছুটা সংশয় থেকে গেছে।
ইতালি ও জার্মানি–দুই দেশেই কালচারাল ফ্যাসিজমের উর্বর ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল প্রোপাগান্ডাকে। আর প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর জন্যই সংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদানকে ব্যবহার করা হতো। সেক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক মোড়ককে খুব সূক্ষ্মভাবে ব্যবহারের প্রবণতা কিছুটা কম ছিল। বরং খানিকটা স্থূলভাবে শুধু প্রপাগান্ডা চালানোর দিকেই আগ্রহ ছিল বেশি। সাংস্কৃতিক উপাদানকে ফ্যাসিবাদের প্রসারের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের দিক থেকে ইতালির তুলনায় জার্মানি এগিয়েও ছিল বেশ। এতটাই যে, এখনো সেই প্রভাব রয়ে গেছে।
এক্ষণে, দুই দেশের কালচারাল ফ্যাসিজমের উদাহরণ আমাদের জানা হলো। এখন না-হয় আবার নিজের দেশে ফেরা যাক।
পয়লা বৈশাখ কি কালচারাল ফ্যাসিজম?
পয়লা বৈশাখ হলো একটি বর্ষবরণ-সংক্রান্ত উদ্যাপন। এ ধরনের উদ্যাপন সব দেশ, জাতি ও নৃগোষ্ঠীর মধ্যেই থাকে। নৃগোষ্ঠীভেদে এই উদ্যাপনও ভিন্ন ভিন্ন হয়। তেমনি পয়লা বৈশাখও কেবল বাঙালিদের উদ্যাপন এবং সেটি শুধু বাংলা সনকে কেন্দ্র করেই।
প্রশ্ন হলো–পয়লা বৈশাখ কি আচরণ বা ধারণাগতভাবে কোনো প্রকারে অন্য নৃগোষ্ঠীর বর্ষবরণকে খারিজ করে? কিংবা পয়লা বৈশাখই সব ধরনের বর্ষবরণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ–এমন কোনো বক্তব্য প্রকাশের সুযোগ করে দেয়?
দুটি প্রশ্নেরই উত্তর হলো–না। এটি মূলত বাঙালিদের শিকড় স্মরণমূলক ঐতিহ্য লালনের এক ধরনের উপলক্ষ। হয়তো এই বৈশাখের প্রথম দিন পালনের কোনো প্রশাসনিক বা শাসনতান্ত্রিক বাস্তবতা আর তেমন প্রাসঙ্গিক নয়। তবে নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ার দেশ হিসেবে এর সাথে কৃষি ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির বড় একটা যোগ আছে। সেই সাথে যেহেতু এ উৎসব শত শত বছর ধরে চলে আসছে এবং মানুষ সহসা পরিবর্তনের বদলে বছরের পর বছর ধরে চলে আসা একটি রীতিকে মেনে চলার এক ধরনের মানসিক বাধ্যবাধকতায় ভোগে, তাই পয়লা বৈশাখ এখনো টিকে আছে। টিকিয়ে রাখার একটি তাড়নাও আছে। এর সাথে কোনো রাজনৈতিক, জাতিতাত্ত্বিক বা ধর্মীয় সম্প্রদায়গত বৈশিষ্ট্য আদতে জুড়ে নেই। আছে বাঙালির সংস্কৃতির প্রবাহমান রূপ।

পয়লা বৈশাখের আয়োজন প্রকৃতিগতভাবে বাঙালির শ্রেষ্ঠত্বের বাণীও প্রচার করে না। বরং একই ভূমির অধিবাসী অন্যান্য নৃগোষ্ঠীর বর্ষবরণ আয়োজনের ঐতিহ্যের সাথে এর কিছু মিলও খুঁজলে পাওয়া যাবে। সেটি স্বাভাবিকও। দেশের সীমানার হিসাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির বর্ষবরণ আয়োজনের প্রভাবের আধিপত্য (ভৌগোলিক বা মানসিক) বিস্তারের বিষয়টি যদি বিবেচনায় নেওয়া হয়, তাহলে বলতেই হয়–সেটি আসলে করা হয় পুরোই রাজনৈতিক মতাদর্শ ও রাষ্ট্রীয় বা সরকারি কারণে। নিশ্চয়ই এ দেশের পার্বত্য এলাকায় নিবিড় পর্যবেক্ষণ চালালে তেমন বৈশিষ্ট্য ধরা পড়বে। কিন্তু সেই আগ্রাসন বা আধিপত্যের কারণ কোনোভাবেই পয়লা বৈশাখ নামের দিবস নয়। বরং এর উদ্দেশ্যমূলক ব্যবহারের বিষয়টিই মূল এবং সেই ব্যবহারটিও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ‘এসটাবলিশমেন্ট’জনিত। আর কে না জানে, সব দেশ, জাতি বা রাষ্ট্রেরই এই বস্তুটি থাকে।
পয়লা বৈশাখ নামীয় ধারণাটি বা দিবসটি কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আক্রমণ করে না, স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার গুণগানও গায় না। হ্যাঁ, স্বৈরতান্ত্রিক রাজকর্মসূচি হিসেবেই এর শুরু। তবে পরে এর চরিত্র আপামরের হয়ে উঠেছে অনেকটাই। কারণ, সাধারণের মধ্যে আগে থেকে চালু থাকা একটি বিষয়কেই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল শাসনতান্ত্রিকভাবে।
পয়লা বৈশাখ গোষ্ঠীগতভাবে আক্রমণের হুমকি দেয় না। এমনকি ‘আমরা’ বনাম ‘তারা’ পরিস্থিতির সৃষ্টিও করে না। অন্তত এই উৎসবের মূলে তেমনটা নেই। এটি পালনের কোনো রীতিতে সেরকম হুমকি কখনো প্রতিভাত হয় না। সেটি যদি কখনো হয়ও, তাহলে তা অন্য আরেকটি নৃগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে হতে হবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, পয়লা বৈশাখকে ‘কালচারাল ফ্যাসিজম’ অভিহিত করা দাবিটি আদতে উঠছে বাঙালিদের মধ্য থেকেই। একেবারে সুনির্দিষ্ট করে বললে, ধর্মভিত্তিক দৃষ্টিকোণকে উপজীব্য করে। কিন্তু পয়লা বৈশাখ উদ্যাপনের কোনো অনুষঙ্গেই সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি নেই। এটি বরং অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির জন্য সুবিদিত। এর সাথে ধর্মের কোনো সম্পর্কও নেই। যেটি আছে, সেটি হলো–বাংলার সংস্কৃতির বিবর্তনের ধারা। এটি ইতিহাসের অংশ। সেসব চিহ্ন চাইলেও মুছে ফেলা সম্ভব না। আর যদি পরিবর্তনের স্বাভাবিক ধারার বদলে জোর করে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়, তখনই ওই প্রক্রিয়াটি হয়ে ওঠে স্বৈরতান্ত্রিক।
তাই যখন এর বিরোধিতা এমন সম্পর্কহীন একটি চিন্তা থেকে হয়, দিবস পালনের ক্ষেত্রে ‘শালীন’ হওয়ার পূর্বশর্ত দেওয়া হয়, তখন বুঝতে হয়–একটি ধারণা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে, আরোপ করা হচ্ছে। এর সাথে সাথে অস্তিত্বহীন করে দেওয়ার একটি হুমকিও থাকে জোরেশোরে। অর্থাৎ, একটি উৎসবকে টিকে থাকার স্বার্থে একটি গোষ্ঠীর মনমতো রূপ পরিগ্রহের চাপ দেওয়া হচ্ছে।
তাহলে, ফ্যাসিবাদী আসলে কোনটা? যেটি নতুন রূপ ধারণের চাপে আছে, নাকি যে চাপ দিচ্ছে? আশা করা যায়, এত দীর্ঘ আলোচনার পর অন্তত এ দুটি প্রশ্নের উত্তর পাওয়া আর কঠিন নয়।
কথা হলো–পয়লা বৈশাখের মতো একটি বর্ষবরণ উৎসবকে যদি ফ্যাসিবাদের প্রতীক হিসেবে দেখানোর চেষ্টা চলে, তাহলে সেই হিসাবে ইংরেজি বছরের ‘নিউ ইয়ার’কেও একই দোষ দেওয়া যায়। এমনকি চাকমাদের বিজু, মারমাদের সাংগ্রাই, তঞ্চঙ্গ্যাদের বিষু ইত্যাদিকেও একই তকমা দেওয়া যায়। তখন এক কথায়, উৎসব (তা যেটিই হোক) মাত্রেই ‘কালচারাল ফ্যাসিজম’ হয়ে উঠতে পারে! কারণ, পয়লা বৈশাখ শুধু একটি নির্দিষ্ট ভূমির অধিবাসীদের কেন্দ্র করে পালিত হয়, তাতে সম্প্রদায় বা বর্ণভেদ নেই। কিন্তু স্বাভাবিক রীতিতেই অন্যান্য নানা উৎসবে ভিন্ন ভিন্ন সীমা থাকে, প্রয়োজনের খাতিরেই।

তাহলে কি এই সবই ফ্যাসিবাদের প্রতীক হয়ে যাবে? নাকি কেউ মেনে নেবে তেমনটা?
শোভাযাত্রার মঙ্গল-অমঙ্গল
পয়লা বৈশাখের বেশ নবীনতম সংযোজন হলো ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। যদি শত শত বছরের ইতিহাস হিসেবে নেওয়া হয়, তাহলে উচ্চারণ করতেই হয় ‘নবীনতম’ শব্দটি। এর বয়স সর্বোচ্চ ৩৫/৪০ বছর।
উদ্ভবের ইতিহাস অনুযায়ী, ১৯৮৫ সালে যশোরে চারুপীঠ নামের একটি সংগঠন এ ধরনের একটি শোভাযাত্রার শুরুটা করেছিল। এর উদ্যোক্তারা পরে রাজধানী ঢাকায়ও এমন আয়োজনের উদ্যোগ নেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা থেকে এই শোভাযাত্রার শুরু হয়েছিল ১৯৮৯ সালে। যদিও শুরুতে এই আয়োজন এতটা জাঁকজমকপূর্ণ ছিল না। তখনকার সেই শোভাযাত্রার একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও ছিল। তৎকালীন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ছিল এই শোভাযাত্রা আয়োজনের অন্যতম প্রেরণা। শোভাযাত্রার মাধ্যমে নিজ নিজ অবস্থান থেকে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছিলেন অনেক শিল্পী-সাহিত্যিক। সেই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই বিশেষ করে চিত্রশিল্পীরা এই মঙ্গল শোভাযাত্রার পরিকল্পনা করেছিলেন। এরপর ক্রমে আয়োজনটি প্রতি বছরই হতে থাকে এবং একেক বছরের সমসাময়িক বিষয় এর বিভিন্ন অনুষঙ্গে ফুটে উঠতে থাকে। তার মধ্যে ‘প্রতিবাদ’ অবশ্যই একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল।
এ বিষয়ে বিবিসি বাংলা’কে ২০১৭ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে চারুকলা অনুষদের একসময়ের ডিন ও মঙ্গল শোভাযাত্রার শুরুর সময়কার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিসার হোসেন বলেছিলেন, তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ধর্মকে ব্যবহারের বিপরীতে সব ধর্মের মানুষের জন্য বাঙালি সংস্কৃতি তুলে ধরার চেষ্টা ছিল শিক্ষার্থীদের মধ্যে। তারাই মূলত আয়োজনটি করেছিল।
তবে শুরুতে এই আয়োজনের নাম ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ ছিল না। ছিল ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’। এ বিষয়ে অধ্যাপক নিসার হোসেন বলেন, নামটা মঙ্গল শোভাযাত্রা দেওয়ারই ইচ্ছে ছিল তাদের। কিন্তু তখনকার পরিস্থিতিতে এর ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হতে পারে আশঙ্কায় নামটি দেওয়া হয়নি। পরে অবশ্য এই শোভাযাত্রা ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামেই পরিচিত হয়।
সমস্যাটি হলো, পয়লা বৈশাখকে কালচারাল ফ্যাসিজম হিসেবে অভিহিত করার পেছনে এই শোভাযাত্রার নামটি বিতর্কের আগুন উসকে দেওয়ার দেশলাই হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সেই সাথে আপত্তি তোলা হয় শোভাযাত্রায় থাকা বাঁশ, কাগজ বা অন্যান্য উপাদানে তৈরি নানা ভাস্কর্য ও মুখোশ নিয়েও। এসব তৈরি হয় সাধারণত বছরভিত্তিক একেকটি প্রতিপাদ্যের ওপর ভিত্তি করে। সেই প্রতিপাদ্য নির্ধারণ নিয়েও বিতর্ক আছে। কারণ, এসবের কোনোটাই কোনো নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নির্ধারিত হয় না। উল্টো একেক সময়ের ক্ষমতাকাঠামো ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তির তাতে নির্ধারক ভূমিকা পালনের জোর অভিযোগ আছে। এই বাস্তবতার পরিবর্তন এখনো হয়নি।

তাই এই শোভাযাত্রার রাজনৈতিক চরিত্র পরিগ্রহ করার অভিযোগটি পুরনো। ফলে যে শোভাযাত্রার জন্মই হয়েছিল রাজনৈতিক প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে, সেই শোভাযাত্রা গত ১০/১২ বছরে অনেকাংশে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে একটি পক্ষের দিকে ঝুঁকে পড়েছিল কিনা–সেই বিতর্ক আছে ভালোমতোই। এই রাজনৈতিক পক্ষপাতমূলক চরিত্র পরিগ্রহের অভিযোগ ওইসব ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র আয়োজকেরাও এড়াতে পারেন না। এখন কোনো সময়ের কোনো রাজনৈতিক পক্ষপাত ফ্যাসিবাদী ঘরানার ছিল কিনা, তা বিতর্কের বিষয়। কারণ, ফ্যাসিবাদের লক্ষণ ধরে ধরে বিবেচনা করতে গেলে অনেক কিছুই জালে আটকাবে। আবার পূর্ণ লক্ষণ মেলানোও কঠিন। ফলে ফ্যাসিস্ট বলে দেওয়া যতটা সহজ, সর্বস্বীকৃত মানদণ্ডে তা প্রমাণ করা ঠিক ততটাই কঠিন।
মজার বিষয় হলো, এমন পক্ষপাতকে সামনে এনেই ‘মঙ্গল’ শব্দটি বাদ দেওয়ার দাবি ওঠে। কিন্তু এর পেছনে থাকে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি জুড়ে দেওয়ার চেষ্টা। একইসঙ্গে এমন দৃষ্টিভঙ্গিকে সামনে রেখে পুরো শোভাযাত্রার রূপ বদলে দেওয়ার দাবি উঠতে থাকে। ছড়ানো হতে থাকে অযৌক্তিক ন্যারেটিভ, প্রোপাগান্ডা। কাজটি কিন্তু করা হয় একটি সুদূরপ্রসারী ভাবনা থেকেই। তাতে থাকে একটি ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণের ঠিক সেই উপাদানটিকে সরিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা, যার ভিত হলো অসাম্প্রদায়িক রূপ এবং যার মধ্য দিয়ে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে শুধু বাঙালি সত্তাকেই সর্বাগ্রে স্থাপনের আগ্রহ অনেকটাই ফুটে ওঠে কিছু সাধারণ উপাদানের মাধ্যমে। কেউ বা কোনো পক্ষ যখন নানামাত্রিক বিভেদ ভুলে সাধারণ জনতার একটি মঞ্চে দাঁড়ানোর সম্ভাবনাটিকে তিরোহিত করতে চায়, তখন বুঝতে হয়–ভেদাভেদ সৃষ্টিই হয়তো তার একমাত্র অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য। কারণ, বিভেদ থাকলেই ক্ষমতার দখল বা অপব্যবহার কিংবা যেনতেনভাবে শাসন করা তুলনামূলক সহজ হয়। কারণ, ঐক্যবদ্ধ জনতাকে মোকাবিলা করা কঠিন। কিন্তু সেটিই যখন নানা কারণে খণ্ড খণ্ড দ্বীপের মতো হয়ে যায়, তখন একেক পক্ষকে ক্ষমতার বশীভূত করা সহজ হয়। তাই খেলাটি শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা ও শাসনের হয়ে দাঁড়ায়, দাঁড়িয়ে যায় রাজনৈতিক ফায়দা লোটার প্রক্রিয়া হিসেবে।
এমন ভাবনাতেই কখনো ওঠে ‘মঙ্গল’ বা ‘আনন্দ’ বাদ দেওয়ার প্রসঙ্গ। আবার কখনো আসে নিরপেক্ষ অবস্থানের প্রতীক ধরে ‘বৈশাখী’ শব্দটিকে আঁকড়ে ধরার চেষ্টা। তবে দিনশেষে সবই হয়ে থাকে কেবল রাজনৈতিক ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক ডেবিট-ক্রেডিট মেলানোর সস্তা লাভ-লোকসানের হিসাবই। আর সেখানে মানুষে মানুষে বিভেদ তৈরির বাণিজ্যমূল্যই সবচেয়ে বেশি!

শেষ কথা
বাংলার মানুষ ঐতিহাসিকভাবে উৎসবপ্রিয়। নানা সংকটে দীর্ঘকাল নিমজ্জিত থাকা এই বঙ্গদেশের মানুষ তাই উৎসব পেলে একটু ভুলোমনা হতে চায়। উৎসবটাকে উপভোগ করতে চায়। কারণ, আনন্দের অভাব এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে ছিল ও আছে ষোলো আনা।
একসময় এখনকার পুরো বাংলাদেশই ছিল একটি অনুন্নত অঞ্চল। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে বাংলা নানাভাবে বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার হয়েছিল। সেই ধারা অব্যাহত ছিল পাকিস্তান আমলেও। আগেও যেমন নিজেদের অধিকারের জন্য এই অঞ্চলের মানুষদের লড়তে হয়েছে, জীবন দিতে হয়েছে, ঠিক তেমনি পাকিস্তান আমলেও বাঙালিদের ভাষা থেকে শুরু করে সংস্কৃতি, একপর্যায়ে স্বাধীনতার জন্য জীবন দিতে হয়েছে। এসব লড়াই, সংগ্রামের পেছনে অবশ্যই একটি সাধারণ স্বপ্ন ছিল সংগ্রামী মানুষের। সেটি ছিল একটি বৈষম্যহীন ভূখণ্ড, জুলুমহীন শাসনব্যবস্থা ও ভেদাভেদহীন জীবন যাপনের ইচ্ছা।
অথচ এখন সেই স্বাধীন দেশে আমরা নিজেরাই ভেদাভেদ সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছি ক্রমাগত। কর্তৃপক্ষীয় ইচ্ছাও সেখানে অনুঘটক বটে। তাই আবহমান বাংলার অসাম্প্রদায়িক প্রতীকও এ দেশে কলুষিত হয়, নষ্ট হয়। এতে করে ক্রমশ আরেকটি চরম বিভক্ত সমাজের দিকেই আমরা এগিয়ে চলেছি একটি সম্মিলিত ঘেন্না উৎপাদন কার্যক্রমের মাধ্যমে। এই প্রবল অযৌক্তিক ঘেন্নায় দিনের শেষে আমাদের যেকোনো উৎসবকে মাটি করে দেওয়া ছাড়া, আর কোনো কিছু অর্জন হবে না।
এই বঙ্গের মানুষ এখন সেটিকেই সঞ্চয় ভেবে মনের বাক্সে জমা করে রাখবে কি?
ওপরের প্রশ্নটির উত্তরেই লুকিয়ে বাংলাদেশের মানুষের ভালো থাকার ভবিষ্যৎ!
লেখক: সাংবাদিক