ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন তাকে হোয়াইট হাউসের প্রেসিডেনশিয়াল পারসোনেল অফিসের পরিচালক করেছিলেন, তখন একটি মার্কিন গণমাধ্যম সার্জিও গোরকে নিয়ে লিখেছিল—‘হয়তো তিনি সবচেয়ে ক্ষমতাধর সেই ব্যক্তি, যার নাম আপনি কখনো শোনেননি।’
কথাটা অযৌক্তিক ছিল না। ট্রাম্পের লেখা বই প্রকাশ করেছেন, ২০২৪ সালে ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারের জন্য কোটি কোটি ডলার তহবিল সংগ্রহ করেছেন, আর ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ওয়াশিংটনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে হাজারো অনুগত ব্যক্তিকে বসানোর কাজটিও করেছেন সার্জিও গোর। এখন সেই সার্জিও গোরই ভারতে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত। একই সঙ্গে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূতের দায়িত্বও পালন করছেন।
এই মুহূর্তে বাংলাদেশ সফর করছেন সার্জিও গোর। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। আবার ঢাকায় ভারতের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে গোরের বৈঠক নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে দিনে দিনে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা এই ব্যক্তি আসলে কে? কেন তাকে ট্রাম্পের ‘ডানহাত’ বলা হয়? আর কেনই–বা তাকে ঘিরে এত বিতর্ক?
সার্জিও গোর কে
প্রথমেই তার একটা অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য বলা যাক, যেটা সার্জিও গোরকে নিয়ে বিতর্ক বাড়িয়ে দিয়েছে অনেকটা।
তার জন্মস্থান কোনটি, এটা অনেক দিন গোপন রেখেছেন সার্জিও গোর। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে এ নিয়ে প্রশ্নে উত্তর এড়িয়ে গেছেন। মাল্টায় তার শৈশব কেটেছে, সেটা বলতেন। মাল্টিজ কোন খাবারটা ভালো লাগত, কোন জায়গাটা সুন্দর ছিল– এমন কথায় জন্মস্থানের ব্যাপারটা এড়িয়ে যেতেন। দুয়েক জায়গায় শুধু বলেছেন, তিনি রাশিয়ায় জন্মাননি। কিন্তু কোথায় জন্মেছেন, তা বলতেন না। অদ্ভুত না?
শেষ পর্যন্ত অনুসন্ধানী এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ১৯৮৬ সালের ৩০ নভেম্বর তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ উজবেকিস্তানের রাজধানী তাশখন্দে তার জন্ম। তার পুরোনো নাম ছিল সের্গেই গোরোখোভস্কি।
এরপর গোর নিশ্চিত করেছেন, তার জন্ম তাশখন্দেই। তবে তার দাবি, দুই–তিন বছর বয়সেই পরিবার মাল্টায় চলে যায়। সেখানেই নামের প্রথম অংশটা সের্গেই থেকে সার্জিও করে ফেলা হয়েছিল বলে সংবাদমাধ্যমে জানান গোর। মাল্টায় তার শৈশবের কয়েক বছর কেটেছে। পরে ১৯৯৯ সালে অভিবাসী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যায় তার পরিবার। কয়েক বছর পর মার্কিন নাগরিকত্ব নেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়েও শুরুতে তার পুরো নামই ব্যবহার করতেন, অর্থাৎ সার্জিও গোরোখোভস্কি। পরে নামটা বদলেছেন। ব্যাখ্যায় বলেছিলেন, অন্যদের উচ্চারণের সুবিধার কথা ভেবেই নামটা ছোট করেছেন।
তার বাবা-মায়ের পরিচয়টাও একটা রহস্য! বাবা ইউরি গোরোখোভস্কি ছিলেন একজন এভিয়েশন ইঞ্জিনিয়ার, বা বিমান প্রকৌশলী। তিনি সোভিয়েত আমলে আইএল–৭৬-এর মতো সামরিক বিমানের ডিজাইনের কাজ করেছিলেন বলে কিছু সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে। এই মডেলের বিমান ভারতীয় বিমানবাহিনীতেও ব্যবহৃত হয়। গোরের মা সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য প্রকাশ্যে নেই। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাকে ইসরায়েলি বংশোদ্ভূত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এখানেই রহস্য শেষ নয়। গোরের বাবা–মায়ের জীবন, তারা কীভাবে মাল্টায় গেলেন, পরে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে কী করতেন—এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য খুবই সীমিত। এই শূন্যতাই পরে তাকে ঘিরে নানা জল্পনা–কল্পনার জন্ম দিয়েছে।
গোরের উত্থান ও ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হওয়া
কিন্তু এই জল্পনা-কল্পনা স্বত্ত্বেও এক সময় দেখা গেল, ট্রাম্পের খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন সার্জিও গোর। বিশেষ করে ২০২০-এ ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর।
জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে গোর রিপাবলিকান রাজনীতিতে সক্রিয় হন। বলে রাখা ভালো, জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়কে ধরে নেওয়া হয় সেই বিশ্ববিদ্যালয়, যেখান থেকে মার্কিন প্রশাসনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ লোকেরা উঠে আসেন!
তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক নিয়ে সার্জিও গোরের পোস্ট। ছবি: এক্স
বিশ্ববিদ্যালয় পেরিয়ে মার্কিন ডানপন্থী কয়েকজন রাজনীতিবিদ, যেমন স্টিভ কিং, মিশেল বাকম্যান, ও পরে সিনেটর র্যান্ড পলের সঙ্গে কাজ করেন সার্জিও গোর। ২০২০ সালের নির্বাচনের সময় ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বলয়ে প্রবেশ করেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়রের সঙ্গে মিলে উইনিং টিম পাবলিশিং প্রতিষ্ঠা করেন। কাজটা কখন করেছেন? যখন মার্কিন অনেক প্রকাশনা সংস্থা ট্রাম্পের বইয়ে বিতর্কিত তথ্য আছে জানিয়ে বইগুলো প্রকাশে অপারগতা জানাচ্ছিল! এই ‘উইনিং টিম পাবলিশিং’ প্রকাশনা সংস্থা থেকেই ট্রাম্পের একাধিক বেস্টসেলার বই প্রকাশিত হলো। ট্রাম্পের প্রিয় হয়ে উঠলেন সার্জিও গোর। আরও আস্থাভাজন হলেন যখন ২০২৪ সালের নির্বাচনে বড় অঙ্কের তহবিল সংগ্রহেও বড় ভূমিকা রাখেন গোর।
এই পছন্দ ও আস্থার পুরস্কারই বলতে পারেন, ট্রাম্প দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফেরার পর গোরকে হোয়াইট হাউসের ডিরেক্টর অব প্রেসিডেনশিয়াল পারসোনেলস অফিস করা হয়। ডিরেকটর অব প্রেসিডেনশিয়াল পারসোনেলস অফিসের কাজ কী? এক কথায়, তার হাতেই পুরো প্রশাসনের চাবি! পুরো ফেডারেল সরকারের প্রায় চার হাজার কর্মী নিয়োগের জন্য প্রার্থী বাছাই, যাচাই এবং নিয়োগ – সবই করে প্রেসিডেনশিয়াল পারসোনেল অফিস! ট্রাম্প পরে প্রকাশ্যেই বলেন, প্রশাসনের বিভিন্ন পদে ট্রাম্পের অনুগত কর্মীদের বসানোর কাজটা সার্জিও গোর দারুণভাবে করেছেন!
এরপর কূটনীতিতে
সেসব কাজ শেষ করার পর সার্জিও গোর মনোযোগ দিলেন কূটনীতিতে! মাত্র ৩৮ বছর বয়সেই তাকে ভারতে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত বানিয়ে পাঠান ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুধু তা-ই নয়, এর পাশাপাশি দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের স্পেশাল এনভয় বা বিশেষ দূতও বানিয়ে দেওয়া হলো।
কোন কোন দেশ এই তালিকায় পড়বে? দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ, সঙ্গে ভারত পাকিস্তান দুই দেশই, এর পাশাপাশি শ্রীলঙ্কা, আফগানিস্তান, নেপাল, ভূটান, মালদ্বীপ। ওদিকে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আছে সার্জিও গোরের জন্মভূমি উজবেকিস্তান, এর পাশাপাশি আছে কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান।
রাষ্ট্রদূত হওয়াই শুধু নয়, গোরের কাজের ধরনও প্রচলিত মার্কিন কূটনীতিকদের সঙ্গে মেলে না বলে খবর এসেছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি মূলত ব্যবসা, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক চুক্তিকে অগ্রাধিকার দেন। একদিকে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ এবং অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের লোকগুলো তারই নিয়োগ বলে যেটা হচ্ছে, সার্জি গোর ভারত ও মধ্য এশিয়ার নেতাদের সঙ্গে সরাসরি ট্রাম্প প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ের নেতাদের যোগাযোগ করিয়ে দেন।
তবে এর পাশাপাশি আরেকটা কাজ এড়িয়ে যান সার্জিও গোর, যে ব্যাপারটা নজরে এসেছে অনেকেরই। মানবাধিকার, গণতন্ত্র, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা… অর্থাৎ, যে ব্যাপারগুলো নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতেরা সাধারণত জোর গলায় কথা বলেন, সার্জিও গোর এসব ব্যাপারে খুব একটা কথাই বলেন না। বলাবাহুল্য, মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের প্রশাসনই এতে খুশি!
সার্জিও গোরকে নিয়ে বিতর্ক কোন কোন জায়গায়?
জন্মস্থান লুকানোর অদ্ভুত ব্যাপারটি তো শুরুতেই লেখা হলো। সার্জিও গোরকে নিয়ে আরেক বড় বিতর্ক সামনে আসে তিনি প্রেসিডেনশিয়াল পারসোনেল অফিসের দায়িত্ব পাওয়ার পর। অদ্ভুত বলতে পারেন, ট্রাম্প-ঘেঁষা এক সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক পোস্ট এক প্রতিবেদনে জানাল, হোয়াইট হাউসে হাজারো কর্মকর্তা-কর্মচারীর সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্সের জন্য যে ‘এসএফ ৮৬’ নামের ফরমটা পূরণ করতে হয়; গোর সে ফরমটা কখনো পূরণ করেননি!
হোয়াইট হাউস অবশ্য এই অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছিল। নিউ ইয়র্ক পোস্ট গালগল্প ছড়াচ্ছে জানিয়ে তারা বলেছে, গোরের সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স বৈধ এবং তিনি সব নিয়ম মেনেই দায়িত্ব পালন করছেন।
ইলন মাস্কের সঙ্গে তার দ্বন্দ্বও অনেক বিতর্কের জোগান দিয়েছিল। মাস্ক তাকে একবার ‘সাপ’ বলেছিলেন! মাস্কের সঙ্গে গোরের দ্বন্দ্বের পেছনে কয়েকটা কারণই ছিল, তবে সবচেয়ে বড় কারণ–জ্যারেড আইজ্যাকম্যান নাসার প্রধান না হওয়া। আইজ্যাকম্যান ছিলেন মাস্কের ঘনিষ্ঠ। এই আইজ্যাকম্যানের মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেন ট্রাম্প। কয়েকটি প্রতিবেদন জানায়, ট্রাম্পকে এই পরামর্শ দিয়েছিলেন সার্জিও গোর। এ নিয়েই খেপেছিলেন মাস্ক। হোয়াইট হাউস অবশ্য এসব অভিযোগও অস্বীকার করেছে।
এর বাইরে সার্জিও গোরের সঙ্গে রাশিয়াকে জড়িয়ে একটা বিতর্ক আছে। বিতর্ক না বলে সন্দেহ বলতে পারেন।
২০১৮ সালে সিনেটর র্যান্ড পল হঠাৎ যে মস্কো সফর করে বিতর্কিত হয়েছিলেন, সেখানে সার্জিও গোরের ভূমিকা ছিল বলে জানা যায়। সেই সফরে র্যান্ড পল রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছে ট্রাম্পের একটি চিঠি পৌঁছে দেন।
এ ছাড়া ফাঁস হওয়া একটা নথি থেকে জানা যায়, সার্জিও গোর ২০১৭ সালেও মস্কো গিয়েছিলেন। তবে ওই সফরের সঙ্গে কোনো বেআইনি কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তার আইনজীবীর দাবি, গোর ভ্রমণপ্রিয় মানুষ, ঘুরতে গেছেন।
তারপরও জন্মস্থান গোপন রাখার চেষ্টা, বাবা-মার পরিচয় নিয়ে ঢাকঢাক-গুড়গুড়, অস্পষ্টতা, রাশিয়া সফর এবং নিরাপত্তা ছাড়পত্র বা সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স… বিতর্কগুলো মিলিয়ে অনেক আমেরিকানই সার্জিও গোরকে সন্দেহের চোখে দেখেন।
যদিও এমন সন্দেহ অবশ্য রাশিয়া-আমেরিকা-চীনের মতো দেশে গুরুত্বপূর্ণ সব ব্যক্তিকে নিয়েই কম-বেশি থাকে।