গত সোমবারের কথা। সেদিন হোয়াইট হাউসের সাউথ লনে নতুন হেলিপ্যাড উদ্বোধন করেন ট্রাম্প। যথারীতি প্রেসিডেন্ট বক্তব্যও দেন। কিন্তু মেরিন ওয়ান হেলিকপ্টারের প্রচণ্ড শব্দে ট্রাম্পের কথা প্রায় শোনাই যায়নি। এর বড় কারণ অনুষ্ঠানটি একটি ছোট টেলিভিশন নেটওয়ার্ক রেকর্ড করছিল। তাহলে প্রশ্ন হলো বাকিসব বড় বড় সংবাদমাধ্যমগুলো আসলে গেল কই?
যুক্তরাষ্ট্রের বড় টেলিভিশন নেটওয়ার্কগুলো সোমবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সংবাদ কভারেজ বন্ধ করে দেয়। হোয়াইট হাউসে সিএনএন, পলিটিকো ও এমএস নাওয়ের সাংবাদিকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে তারা এ সিদ্ধান্ত নেয়। খবর বিবিসির।
গত শুক্রবার ট্রাম্প এসব সংবাদমাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার ঘোষণা দেন। তিনি অভিযোগ করেন, তার প্রশাসন নিয়ে তারা ‘মনগড়া কথা বা মিথ্যা’ সংবাদ প্রকাশ করছে। সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়, শনিবার তাদের সাংবাদিকদের হোয়াইট হাউসে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।
এরপর সিএনএন, পলিটিকো ও এমএস নাও জানায়, তারা ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা করবে। তাদের উদ্দেশ্য, ‘সরকার সংবাদমাধ্যম কী প্রকাশ করবে, তা ঠিক করতে পারে না’ এই নীতি রক্ষা করা।
তবে এর কিছুক্ষণ পর হোয়াইট হাউস নিজস্ব স্ট্রিমিং চ্যানেল ‘ট্রাম্প টিভি’ চালু করে। সেখানে ২৪ ঘণ্টা ট্রাম্পের বিভিন্ন ভিডিও ক্লিপ দেখানো হচ্ছে।
বিবিসি বলছে হোয়াইট হাউসের প্রেস পুল নিয়ে চলা এই বিরোধ ভবিষ্যতে প্রেসিডেন্টের বিভিন্ন কর্মসূচির সংবাদ সংগ্রহ ও প্রচারেও প্রভাব ফেলতে পারে। এরই জের ধরে স্থানীয় সময় গতকাল মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে গিয়ে ট্রাম্প সিএনএনের এক সাংবাদিকের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সিএনএন ট্রাম্পের সঙ্গে বিরোধে জড়ানো সংবাদমাধ্যমগুলোর একটি।
এদিকে নিউ ইয়র্ক টাইমস ট্রাম্পকে সবচেয়ে বেশি ‘টেলিভিশন-আসক্ত প্রেসিডেন্ট’ তকমা দিয়ে প্রশ্ন তুলেছে যে সেই তিনিই যদি ক্যামেরার বাইরে চলে যান, তাহলে কি তিনি আর প্রেসিডেন্ট থাকেন?
টেলিভিশন ট্রাম্পের কাছে সবচেয়ে বড় নেশা এমনটা উল্লেখ করে নিউ ইয়র্ক টাইমস বলছে- এবার প্রথমবারের মতো তিনি বড় টেলিভিশন নেটওয়ার্কগুলোর কভারেজ থেকে অন্তত আংশিকভাবে বঞ্চিত হচ্ছেন। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এসব নেটওয়ার্ক তার প্রায় প্রতিটি কর্মকাণ্ড ও বক্তব্য প্রচার করে আসছে।
এখন আর ইচ্ছা করলেই তিনি লাখ লাখ মানুষের ঘরে সরাসরি পৌঁছে যেতে পারছেন না। টেলিভিশনের পর্দায়ও আগের মতো তার একচ্ছত্র উপস্থিতি নেই।
হোয়াইট হাউসের প্রেস পুল কী?
হোয়াইট হাউসের প্রেস পুল হলো কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের একটি দল। তারা প্রেসিডেন্ট যেখানেই যান, সেখানে গিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করে। যেমন, ওভাল অফিস, রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ, এয়ার ফোর্স ওয়ান বা ছুটির সময়ও তারা প্রেসিডেন্টকে অনুসরণ করে।
টেলিভিশন, ফটোগ্রাফার, সংবাদপত্র ও রেডিওর জন্য আলাদা প্রেস পুল রয়েছে। ‘নিউ মিডিয়া’র জন্যও একটি বিভাগ আছে।
এই ব্যবস্থা কয়েক দশক আগে চালু করা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো খরচ ও জায়গা কমানো। কারণ শত শত সংবাদমাধ্যমের পক্ষে সব সময় প্রেসিডেন্টকে অনুসরণ করা সম্ভব নয়।
প্রেস পুলের সদস্যরা ছবি ও প্রেসিডেন্টের কর্মকাণ্ডের বিবরণসহ নিজেদের সংগ্রহ করা তথ্য অন্য সংবাদমাধ্যমগুলোর সঙ্গে ভাগ করে নেয়। প্রেসিডেন্ট কখনো জাতির উদ্দেশে বক্তব্য দেবেন বা গুরুত্বপূর্ণ কোনো কথা বলবেন, এমন পরিস্থিতির জন্যও প্রেস পুল সব সময় প্রস্তুত থাকে।
এবার বিরোধ কেন?
বর্তমান বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু টেলিভিশন প্রেস পুল। এতে পাঁচটি সংবাদমাধ্যম রয়েছে। এগুলো হলো সিএনএন, এবিসি, সিবিএস, ফক্স নিউজ ও এনবিসি।
শুক্রবার ট্রাম্প সিএনএন, পলিটিকো ও এমএস নাওকে হোয়াইট হাউসে নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দেন। তিনি অভিযোগ করেন, এসব সংবাদমাধ্যম তার প্রশাসন নিয়ে ‘ভুয়া খবর’, ‘মনগড়া কথা ও মিথ্যা’ প্রচার করছে।
পরদিন ওই তিন সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকরা দেখতে পান, হোয়াইট হাউসে প্রবেশের জন্য তাদের পরিচয়পত্র অকার্যকর করে দেওয়া হয়েছে।
এরপর সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের বড় টেলিভিশন নেটওয়ার্কগুলো হোয়াইট হাউসের প্রেস পুলের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ায়। এর ফলে প্রেসিডেন্টের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের কভারেজে তারা অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
সোমবারই এই সিদ্ধান্তের প্রথম বড় পরীক্ষা হয় হোয়াইট হাউসে নতুন হেলিপ্যাড উদ্বোধনের সময়।
সেদিন প্রেস পুলের কোনো ক্যামেরা সেখানে ছিল না। ফলে অনেক সংবাদমাধ্যম অনুষ্ঠানটির কোনো ছবি পায়নি। যারা ছবি পেয়েছিল, তাদের কাছেও ট্রাম্পের বক্তব্য পরিষ্কারভাবে রেকর্ড করার জন্য মাইক্রোফোন ছিল না।
তবে ওই দিন পরে নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানির সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠকে এমন সমস্যা হয়নি। কারণ ওই অনুষ্ঠানটি প্রেস পুলের ক্যামেরার ওপর নির্ভরশীল ছিল না এবং সেখানে অনেক সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন।
কেন টিভি নেটওয়ার্কগুলো সরে গেল?
হোয়াইট হাউস কভারেজের দায়িত্বে থাকা ফক্স নিউজের ওয়াশিংটন ব্যুরো প্রধান ব্রায়ান বটন সোমবার এক ইমেইলে জানান, ওই দিন থেকে টিভি প্রেস পুল ট্রাম্পের যেসব অনুষ্ঠানকে ‘পুল কভারেজ’ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে, সেগুলো আর কভার করবে না।
পাঁচটি নেটওয়ার্ক যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, জনগণের সরকারের বিষয়ে সঠিক ও স্বাধীন তথ্য পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কোনো প্রশাসন তার সংবাদ প্রকাশের কারণে কোনো সংবাদমাধ্যমকে সীমাবদ্ধ করা উচিত নয় বলেও তারা উল্লেখ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনীতে মতপ্রকাশ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সুরক্ষিত রয়েছে। এই আইনি সুরক্ষার অর্থ হিসেবে আদালতগুলো দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, সংবাদমাধ্যম কী ধরনের খবর প্রকাশ করছে, তার ভিত্তিতে সরকার তাদের সঙ্গে বৈষম্য করতে পারে না।
এদিকে সিএনএন, পলিটিকো ও এমএস নাও ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। তারা বলেছে, ‘সংবাদমাধ্যম কী প্রকাশ করবে, সরকার তা ঠিক করতে পারে না’ এই নীতি রক্ষার জন্য তারা আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে। এ বিষয়ে বুধবার শুনানি হওয়ার কথা।
তিন সংবাদমাধ্যম সোমবার এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, কোনো নোটিশ বা আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই তাদের সাংবাদিকদের পরিচয়পত্র বাতিল করা হয়েছে, কারণ হোয়াইট হাউস তাদের সংবাদ প্রকাশে আপত্তি জানিয়েছে। তাদের দাবি, বিষয়টি চ্যালেঞ্জ না করা হলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সরকারি হস্তক্ষেপ ছাড়া স্বাধীন সাংবাদিকতার অধিকার হুমকির মুখে পড়বে।
জাতিসংঘে ট্রাম্পের বক্তব্যে কী হলো?
মঙ্গলবার জাতিসংঘে ট্রাম্পের বক্তব্য টেলিভিশন প্রেস পুলের এই বয়কটে প্রভাবিত হয়নি। কারণ প্রেস পুলের সদস্য নয়, এমন সংবাদমাধ্যমগুলোও তার বক্তব্য সরাসরি প্রচার করেছে। তবে নিউইয়র্কে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যাওয়া-আসার সময় ট্রাম্পের কর্মকাণ্ড সাধারণত যেভাবে ক্যামেরায় ধারণ করা হয়, এবার সেসব কভারেজে প্রভাব পড়তে পারে।
সিএনএন জাতিসংঘে ট্রাম্পের বক্তব্য সরাসরি সম্প্রচার না করার সিদ্ধান্ত নেয় বলে জানা গেছে। যদিও জাতিসংঘের সরকারি সূত্রে বক্তব্যটি প্রচারের সুযোগ ছিল।
মঙ্গলবার জাতিসংঘের বৈঠনে সিএনএনের প্রধান হোয়াইট হাউস সংবাদদাতা কাইটলান কলিন্স উপস্থিত ছিলেন। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি ট্রাম্পকে প্রশ্ন করেন।
তখন ট্রাম্প কলিন্সকে উদ্দেশ করে বলেন, “আমি অবাক হয়েছি, সিএনএন এখানে আমাকে কভার করছে।” এরপর তিনি তাকে উদ্দেশ করে বলেন, “আপনার এখানে আমাকে কভার করা উচিত নয়।” ট্রাম্প এর আগেও কলিন্সের সমালোচনা করেছেন।