ভারতের জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি আজ রোববার অভিযোগ করেছেন যে, গতকাল শনিবার পুলিশ তাকে দিল্লির বাড়ি থেকে জোর করে নিয়ে যায় এবং প্রায় এক দিন আটক করে রাখে। এ সময় তাকে কোনো আইনজীবী বা নিজের ফোন ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়নি। তিনি এই ঘটনাকে ‘অপহরণ’ বলে অভিহিত করেন এবং দাবি করেন যে, এটি পুলিশের কোনো বৈধ পদক্ষেপ ছিল না; বরং তাকে ‘একজন অপরাধীর মতো’ টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়্যার লিখেছে, নিজের ‘এক্স’ প্ল্যাটফর্মে পোস্ট করা একটি ভিডিওতে ধ্রুব রাঠি শুরুতেই তার নাগরিকত্ব নিয়ে ওঠা নানা জল্পনা-কল্পনা নাকচ করে দেন। নিজের ভারতীয় পাসপোর্টটি দেখিয়ে তিনি বলেন, “আমি ভারতীয় নাগরিক ছিলাম, আছি ও ভবিষ্যতেও থাকব” এবং অন্য যেকোনো নাগরিকের মতোই তার সমান অধিকার রয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন যে, তাকে আটকের ঘটনাকে যৌক্তিক প্রমাণ করার লক্ষ্যে গণমাধ্যম তার জাতীয়তা নিয়ে মিথ্যা খবর ছড়াচ্ছে।
গতকাল শনিবার সকালের ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে রাঠি জানান, সকাল সাতটার দিকে—যখন তিনি তখনো ঘুমাচ্ছিলেন—প্রায় ২০ জন লোক তার বাড়িতে ঢোকে; এদের মধ্যে কেউ কেউ পুলিশের পোশাকে এবং অন্যরা সাধারণ পোশাকে ছিল। তিনি অভিযোগ করেন যে, তার মা দরজা খুললে তাকে একপাশে ঠেলে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং ওই দলটি দ্রুত তার শোবার ঘরে ঢুকে পড়ে।
“কি ঘটছে তা আমি বুঝতে পারার আগেই, তারা আমাকে ‘অপহরণ’ করেছে। এটি একটি গ্রেপ্তার বা আটক ছিল না,” বলে তিনি অভিযোগ করেন। রাঠি যুক্তি দিয়েছিলেন যে প্রতিবাদে আটক হওয়া আর প্রতিবাদ শুরু হওয়ার আগে নিজের বাড়ি থেকে সরিয়ে দেওয়া দুটো আলাদা। তিনি বলেন, “আমি যদি কোনো প্রতিবাদ কর্মসূচিতে যেতাম আর পুলিশ আমাকে সেখানে আটক করত, তবে বিষয়টি ভিন্ন হতো। কোনো পুলিশ কর্মকর্তা যদি ইউনিফর্ম পরে আসতেন, নিজের পরিচয় দিতেন, আইনি বিধানগুলো ব্যাখ্যা করতেন এবং আমাকে থানায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলতেন, তবে আমি স্বেচ্ছায় যেতাম। কিন্তু এমন কিছুই ঘটেনি।”
এ ছাড়াও ধ্রুব রাঠি উল্লেখ করেন যে, সেই সময় তার বাবা-মা বাড়িতেই ছিলেন এবং বাড়ির বাইরে ৫০ জনেরও বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল—যদিও তিনি এ বিষয়ে পরে জানতে পারেন। তিনি বলেছেন, “তারা যখন আমার শোবার ঘরে ঢুকল এবং আমার ঘুম ভাঙল, তখন আমি তাদের পরিচয় জানতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তারা আমাকে কোনো কথাই বলতে দেয়নি। ভাবুন তো, একজন অপরাধীর মতো তারা আমাকে শোবার ঘর থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে নিয়ে গেল। সিঁড়ি দিয়ে টেনে নামানোর সময় আমার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত লাগে (তিনি তার হাত দেখান)। এমনকি আমাকে চটি জুতা পরারও সময় দেওয়া হয়নি। তারা আমাকে জোর করে একটি জিপে তুলে একের পর এক থানায় নিয়ে যেতে থাকে।”
ধ্রুব রাঠির ভাষ্যমতে, তার ও তার বাবা-মায়ের ফোনগুলো সঙ্গে সঙ্গেই কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, তাই সেখানে কী ঘটছিল তার কোনো ভিডিও ধারণ করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। “তারা আমাকে ২২-২৩ ঘণ্টা আটকে রেখেছিল; এই সময়ে আমাকে ফোন ব্যবহার করতে বা কোনো আইনজীবীর সাথে কথা বলতে দেওয়া হয়নি। তারা বারবার বলছিল যে এটি কোনো গ্রেপ্তার বা আটকাদেশ নয় এবং আমাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। তবে আমি একে অপহরণই বলব।”
ভোটার তালিকা সংশোধন সংক্রান্ত এসআইআর এবং সামগ্রিকভাবে ভোটাধিকার নিয়ে উদ্বেগের জেরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে দিল্লি ও সারা দেশে যখন বিক্ষোভ চলছে, ঠিক তখনই এই অভিযোগগুলো সামনে এল। জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত বিক্ষোভ যাতে না হতে পারে, তা নিশ্চিত করতে শনিবার দিল্লি প্রশাসন নজিরবিহীন সব পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এর মধ্যে ছিল ব্যাপক নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন, মধ্য দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় ব্যারিকেড বসানো, যান চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ, ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখা, মেট্রো ও রেল পরিষেবা স্থগিত করা এবং বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে আটক করা।
ধ্রুব রাঠি প্রশ্ন করেন, “গণতান্ত্রিক দেশে এমন ঘটনা কখনো শুনেছেন—যেখানে একজন সাধারণ নাগরিক, যিনি কোনো আইন ভঙ্গ করেননি এবং কেবল দেশের মঙ্গলের জন্য বা একটি ভালো নির্বাচন কমিশনের দাবিতে সোচ্চার হয়েছিলেন, তাকে তার শোবার ঘর থেকে টেনেহিঁচড়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হলো?” তার অভিযোগ, পুলিশ তার বাবা-মায়ের সঙ্গে ধস্তাধস্তি ও দুর্ব্যবহার করা হয়। এই ঘটনাকে গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপর আঘাত হিসেবে অভিহিত করে তিনি মোদি সরকারের বিরুদ্ধে দেশকে ‘স্বৈরতন্ত্রের’ দিকে ঠেলে দেওয়া এবং ‘অঘোষিত জরুরি অবস্থা’ চালানোর অভিযোগ আনেন।
এই ইউটিউবার বলেন, “আমি শুনেছি যে সিজেপি-র নেতা, বিরোধী দলের নেতা এবং প্রায় ৭,০০০ মানুষকে আটক করা হয়েছে। জরুরি অবস্থার সময় এমনটা ঘটত, উত্তর কোরিয়াতেও এমনটা ঘটে। এখন আমাদের দেশেও তাই ঘটছে। বন্ধুরা, আপনারা যদি এমন দেশ দেখতে চান যেখানে নিজেদের অধিকারের পক্ষে কথা বলারও সুযোগ নেই, তবে আপনাদের বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে। যারা আমাকে পছন্দ করেন না, তারা হয়তো আমার সঙ্গে এমনটা ঘটায় খুশি হচ্ছেন। কিন্তু স্বৈরতন্ত্র যখন শুরু হয়, তখন আগামীকাল যে কারও সঙ্গেই এমনটা ঘটতে পারে। বিষয়টি একটু ভেবে দেখুন।”
রাঠি দাবি করেন যে, তার ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হচ্ছে এবং তিনি কার্যত ‘অঘোষিত গৃহবন্দি’ অবস্থায় আছেন। “আমি নরেন্দ্র মোদি বলতে চাই—কাউকে এতটা ভয় দেখাবেন না যাতে ভয়টাই কেটে যায়। আপনারা যত বেশি দমনের চেষ্টা করবেন, প্রতিবাদের স্বর ততই জোরালো হবে। ইতিহাস পড়ে দেখুন—হিটলার বা মুসোলিনির মতো যারা স্বৈরাচারী হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, তাদের পরিণতি কী হয়েছিল। একটু আত্মসমীক্ষা করুন; স্বৈরাচারীর পরিণতি কখনোই ভালো হয় না।” সেই সঙ্গে তিনি এ-ও জানান যে, দেশের স্বার্থে তিনি তার কণ্ঠস্বর অব্যাহত রাখবেন।
এদিকে, রোববার আটকাবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার পর ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-র সদস্যরা সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব হন। তারা সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন এবং জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন।
সিজেপি-র প্রতিষ্ঠাতা ও জাতীয় আহ্বায়ক অভিজিৎ ডিপকে ‘এক্স’-এ লেখেন, “প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদি ভারতের জন্য লজ্জার কারণ। এই দেশ এর চেয়ে বড় কোনো কাপুরুষ ও গুণ্ডাকে কখনও দেখেনি।”
একইভাবে, সহ-আহ্বায়ক আশুতোষ রাঙ্কা লিখেছেন, “জ্ঞানেশ কুমার একজন বিশ্বাসঘাতক। তাকে পদত্যাগ করতেই হবে। এমন বিশ্বাসঘাতকদের অপসারণের লক্ষ্যে আমি প্রয়োজনে সারা জীবন কারাগারে কাটাতেও প্রস্তুত।”
অন্যদিকে, সহ-আহ্বায়ক সৌরভ দাস বলেছেন, “মোদি-শাহ দিল্লিকে দুর্গে পরিণত করার পর এবং নিজেদের নাগরিকদের বিরুদ্ধেই কার্যত এক যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করার পর একটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে গেছে: এই সরকারের টিকে থাকার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন জ্ঞানেশ কুমার। গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগকারী নাগরিকদের ওপর নজিরবিহীন বলপ্রয়োগ, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হুমকির ঘটনা সরকারের আসল রূপ উন্মোচন করে দিয়েছে। কিন্তু আমরা—তরুণ প্রজন্ম—জবাবদিহিতার দাবি জানিয়ে যাব। আমরা ভয় পাব না, আমাদের কণ্ঠও রোধ করা যাবে না। আমরা পিছু হটছি না। আমরা পূর্ণ শক্তি নিয়ে ফিরে আসছি!”