বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে। তবে দুই দেশের মধ্যে পানি বণ্টন নিয়ে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি রয়েছে কেবল গঙ্গা নদীকে ঘিরে। আগামী ১২ ডিসেম্বর গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। নতুন বা সংশোধিত চুক্তিতে শুষ্ক মৌসুমে পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত গ্যারান্টি ক্লজ অন্তর্ভুক্ত করাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে ঢাকা।
বার্তা সংস্থা ইউএনবি জানায়, সীমান্তবর্তী নদীগুলোর পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা আগামী দিনে বাংলাদেশের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করতে বিদ্যমান চুক্তির পরিবর্তে নতুন বা সংশোধিত চুক্তির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান বলেন, “ভবিষ্যতে বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্বের জন্য পানি অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। তাই জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় যথাযথ পানি ব্যবস্থাপনাকে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।”
পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানি বলেন, “বিদ্যমান গঙ্গা চুক্তি শুধু নবায়ন নয়, বরং নতুন বা সংশোধিত চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় পানির হিস্যা নিশ্চিত করতে চায় সরকার। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহের নিশ্চয়তা দিতে চুক্তিতে সুনির্দিষ্ট বিধান রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।”
বৃহস্পতিবার তিনি বলেন, “আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার হবে ১৯৭৭ সালের চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত গ্যারান্টি ক্লজ ফিরিয়ে আনা।”
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের সময় ১৯৭৭ সালে সম্পাদিত গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তিতে একটি সুরক্ষামূলক বিধান ছিল। ওই বিধান অনুযায়ী, ফারাক্কায় গঙ্গার পানিপ্রবাহ চুক্তিতে নির্ধারিত মাত্রার নিচে নেমে গেলে এবং যেকোনো ১০ দিনের সময়কালে বাংলাদেশকে তার নির্ধারিত হিস্যার চেয়ে কম পানি দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হলে, বাংলাদেশকে অন্তত নির্ধারিত হিস্যার ৮০ শতাংশ পানি দেওয়ার কথা ছিল।
একজন কর্মকর্তা ১৯৭৭ সালের চুক্তির তৃতীয় অনুচ্ছেদের কথাও উল্লেখ করেন। ওই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছিল, ফারাক্কা থেকে বাংলাদেশকে যে পানি ছাড়া হবে, তা কমানো যাবে না। তবে ফারাক্কা ও গঙ্গার উভয় তীর বাংলাদেশের ভেতরে অবস্থিত হওয়ার মধ্যবর্তী অংশে ভারতের যুক্তিসংগত পানির ব্যবহার হিসেবে সর্বোচ্চ ২০০ কিউসেক পানি ব্যবহারের বিষয়টি এতে উল্লেখ ছিল।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, “বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা সুরক্ষিত হয়- এমন সমাধানই চাইবে ঢাকা। এ ক্ষেত্রে চুক্তিতে গ্যারান্টি ক্লজ যুক্ত করার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।”
বিদ্যমান চুক্তি নবায়ন করা হবে, নাকি নতুন চুক্তি করা হবে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “বাংলাদেশের স্বার্থের জন্য যা সবচেয়ে ভালো, সেটিই করা হবে।”
হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কমিটি প্রস্তুত রয়েছে। এখন ভারতের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে চূড়ান্ত জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে ঢাকা।
পানি বণ্টনসংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক আইনও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সম্প্রতি বলেছেন, “গঙ্গা চুক্তি এবং বাংলাদেশ ও ভারতের অভিন্ন অন্যান্য নদীসংক্রান্ত বিষয়গুলো যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) মাধ্যমে আলোচনা করা হবে। গঙ্গা চুক্তি নিয়ে কারিগরি পর্যায়ের বৈঠক অব্যাহত রয়েছে।”
হুমায়ুন কবির বলেন, “দীর্ঘদিনের পানি বণ্টনসংক্রান্ত সমস্যার গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে পেতে দুই দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও কর্মকর্তাদের আন্তরিকতা জরুরি।” উভয় দেশের নেতৃত্ব সহযোগিতার মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে এলে এসব সমস্যার ইতিবাচক সমাধান সম্ভব বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
পানি কূটনীতিতে সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব
পানিসম্পদমন্ত্রী এ্যানি বলেন, “পানি কূটনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতিযোগিতার পরিবর্তে সহযোগিতা ও পারস্পরিক সুবিধা নিশ্চিত করা। এ জন্য ধারাবাহিক সংলাপ, বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা, তথ্য বিনিময় এবং অংশগ্রহণমূলক পানি ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।”
বাংলাদেশের ভূগোল, অর্থনীতি, কৃষি, সংস্কৃতি, পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে পানির নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “নদী বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি গড়ে তুলেছে। একই সঙ্গে দেশের পানির চাহিদা অনেকাংশে নির্ভর করে সীমান্তের বাইরে থেকে আসা পানিপ্রবাহের ওপর।”
এ্যানি যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমে কার্যক্রম জোরদার করার পাশাপাশি বহুপক্ষীয় পানি ব্যবস্থাপনা কাঠামো, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণায় অংশীদারত্ব বাড়ানোর আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে জাতিসংঘের পানি কনভেনশনে যোগ দিয়েছে। এছাড়া, দীর্ঘমেয়াদি পানি ব্যবস্থাপনার জন্য বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান-২১০০ এবং জাতীয় নদী ব্যবস্থাপনা উদ্যোগ রয়েছে।
পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, “আমাদের প্রয়োজন সংঘাতের পরিবর্তে সহযোগিতা, অনুমানের পরিবর্তে প্রমাণ, অংশগ্রহণের পরিবর্তে বাদ দেওয়ার প্রবণতা পরিহার এবং স্বল্পমেয়াদি প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।”
তিনি বলেন, “আমাদের লক্ষ্য শুধু পানি সংকট দেখা দিলে তা মোকাবিলা করা হওয়া উচিত নয়; বরং ন্যায়সংগত, মর্যাদাপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক পানি ব্যবস্থাপনার ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা উচিত।”
তিস্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে
তিস্তা নদীর প্রসঙ্গে পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, “উত্তরাঞ্চলের মানুষের জন্য নদীটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট এবং বর্ষায় নদীভাঙন ও বন্যার কারণে এ অঞ্চলের মানুষকে নানা সমস্যার মুখে পড়তে হয়।”
তিনি বলেন, “সরকার তিস্তা প্রকল্পের ওপর উল্লেখযোগ্য গুরুত্ব দিয়েছে। এ নিয়ে সম্ভাব্যতা যাচাই এবং কারিগরি সহায়তার কাজ চলছে।”
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরও অভিন্ন নদীর পানি ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের স্বার্থ এগিয়ে নিতে বহুপক্ষীয় ফোরামে পানি কূটনীতি জোরদার, আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব বৃদ্ধি, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং বৈজ্ঞানিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেন।
গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় ঘনিয়ে আসায় বাংলাদেশের সামনে এখন ন্যায্য ও টেকসই পানি বণ্টনব্যবস্থা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অন্যান্য অভিন্ন নদী নিয়ে সহযোগিতা বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
চুক্তি সংশোধনের তাগিদ বিশেষজ্ঞদের
আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শাহাব এনাম খান সম্প্রতি ইউএনবিকে বলেন, “বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গঙ্গা চুক্তি নবায়ন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে চুক্তিটি সংশোধন করা প্রয়োজন। কারণ, প্রায় তিন দশক আগে এটি সম্পাদিত হয়েছিল।”
বাংলাদেশ সেন্টার ফর ইন্দো-প্যাসিফিক অ্যাফেয়ার্সের নির্বাহী পরিচালক শাহাব এনাম খান বলেন, “চুক্তি সংশোধনের পাশাপাশি যৌথ নদী কমিশনকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং তথ্য বিনিময়ের ক্ষেত্রে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন।”
তার মতে, এ ধরনের উদ্যোগ দুই দেশের মধ্যে পানিকূটনীতি, পানি ব্যবস্থাপনা ও পানি বণ্টন নিয়ে আস্থা বাড়াতে সহায়তা করবে।
শাহাব এনাম খান বলেন, “কূটনৈতিক আলোচনায় শুধু কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নয়, প্রকৌশল, বিজ্ঞান এবং অবশ্যই অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এগোনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
মরিশাসে নবম ভারত মহাসাগর সম্মেলনের ফাঁকে এনডিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেন, “এই নদীগুলো অভিন্ন। এগুলোকে ঘিরে আমাদের অভিন্ন ঐতিহ্য ও স্বার্থ রয়েছে। তাই দীর্ঘস্থায়ী এবং জনগণের আস্থা অর্জন করবে- এমন সমাধান খোঁজার কোনো বিকল্প নেই। আগামী ২৫ থেকে ৫০ বছরের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তি তৈরির জন্যও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ৫৫ বছর পূর্ণ হওয়ার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, “ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা শুধু পাঁচ বা ১০ বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; বরং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগোতে হবে।”
ড. খলিলুর রহমান বলেন, “আমাদের পররাষ্ট্রনীতি ও জনগণকত্ব দেওয়া হচ্ছে।”
গত বৃহস্পতিবার তিনি বলেন, “আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার হবে ১৯৭৭ সালের চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত গ্যারান্টি ধারাটি ফিরিয়ে আনা।”