কয়েক বছর আগেও আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক তারকা- বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তানের শীর্ষ সারির সুরকার ও শিল্পীদের পরিবেশনায় মুখরিত থাকত ঢাকার কনসার্ট অঙ্গন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশি শিল্পীদের নিয়ে আয়োজিত কনসার্টের টিকিট কেনা দর্শক-শ্রোতাদের জন্য যেন এক বড় ধরনের অনিশ্চয়তার নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বার্তা সংস্থা ইউএনবির প্রতিবেদনে বলা হয়, বিগত কয়েক মাসে পাকিস্তানি ও অন্যান্য বিদেশি শিল্পীদের পরিবেশনায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বেশ কয়েকটি বহুপ্রতীক্ষিত কনসার্ট শেষ মুহূর্তে স্থগিত বা বাতিল করা হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই টিকিট বিক্রি সম্পন্ন হওয়া এবং আয়োজক সংস্থার সব ধরনের প্রস্তুতি শেষ হওয়ার পর এই সিদ্ধান্তগুলো সামনে আসে।
সংবাদমাধ্যমটি আরও জানায়, গত ২৫ সেপ্টেম্বর পূর্বাচলের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী প্রদর্শনী কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল ‘এমএএইচএক্স রিপাবলিক’। যেখানে পাকিস্তানি সংগীতশিল্পী আলী আজমত, মুস্তফা জাহিদ ও জাল ব্যান্ড এবং বাংলাদেশের নগরবাউল জেমস, নেমেসিস, লেভেল ফাইভ ও শিরোনামহীনের পারফর্ম করার কথা ছিল।
একই দিনে হাবিব ওয়াহিদের সঙ্গে পাকিস্তানি গায়ক মুর্তজা কিজিলবাশের গাওয়ার কথা ছিল ‘সেন্স ইট উইথ মুর্তজা কিজিলবাশ’ শীর্ষক আয়োজনে। পরের দিন ২৬ সেপ্টেম্বর শিরোনামহীন ও মেঘদলের সঙ্গে মঞ্চ মাতানোর কথা ছিল বিখ্যাত পাকিস্তানি ব্যান্ড ‘কাভিশ’-এর। তবে এই তিনটি কনসার্টের একটিও অনুষ্ঠিত হতে পারেনি।
নিরাপত্তা শঙ্কা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা এবং চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার জটিলতাকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন আয়োজকরা। ‘এমএএইচএক্স রিপাবলিক’-এর এক আয়োজক জানান, শিল্পীদের অগ্রিম অর্থ প্রদানসহ সব ধরনের প্রস্তুতি চূড়ান্ত ছিল; কিন্তু শেষ মুহূর্তে অনুমোদন না পাওয়ায় অনুষ্ঠানটি পিছিয়ে দিতে হয়।
কাভিশ ব্যান্ডের ক্ষেত্রে ঘটনাটি আরও বেশি নাটকীয়। এর আগে একবার নিরাপত্তা ছাড়পত্রের জটিলতায় কনসার্টটি স্থগিত করা হয়েছিল এবং দীর্ঘ ১০ মাস পর নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়। আয়োজকদের দাবি অনুযায়ী সব ধরনের আইনি আনুষ্ঠানিকতা ও প্রস্তুতি সম্পন্ন থাকা সত্ত্বেও ২৬ সেপ্টেম্বরের শোটি কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞার কারণে আবারও স্থগিত করতে হয়।
স্থগিত হওয়া একটি শোর সঙ্গে যুক্ত এক আয়োজক জানান, এই ধরনের কনসার্টের অনুমোদনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই), স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশসহ (ডিএমপি) একাধিক সরকারি সংস্থা জড়িত থাকে।
একটি কনসার্ট আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণার আগেই আয়োজককে শিল্পীর অগ্রিম সম্মানী প্রদান, ভেন্যু বুকিং, বিপণন ও টিকিটিংয়ের পেছনে মোটা অঙ্কের বিনিয়োগ করতে হয়। চূড়ান্ত অনুমোদনে বাধা এলে এই বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ে।
এর আগেও ২০২৫ সালের শেষের দিকে নিরাপত্তা উদ্বেগ ও প্রশাসনিক বিলম্বের কারণে পাকিস্তানের আলী আজমত ও জল ব্যান্ড এবং ভারতের অনুভ জৈনের কনসার্ট স্থগিত হয়েছিল।
একইভাবে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বহু প্রতীক্ষিত আতিফ আসলামের কনসার্টটিও প্রয়োজনীয় স্থানীয় অনুমোদন ও নিরাপত্তা ছাড়পত্র পেতে ব্যর্থ হওয়ায় বাতিল হয়ে যায়। আতিফ আসলাম নিজেই বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, প্রমোটার ও কনসার্ট ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সময়মতো প্রয়োজনীয় অনুমতি ও রসদ নিশ্চিত করতে পারেনি। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের জুলাই মাসে ভিন্ন একটি জনাকীর্ণ ভেন্যুতে কনসার্টটি অনুষ্ঠিত হলেও সেখানে আগত দর্শকরা চরম বিশৃঙ্খলা ও ভোগান্তির মুখোমুখি হন।
তবে আন্তর্জাতিক তারকা ও বড় জমায়াতের সুরক্ষার কথা বিবেচনা করে সরকারি সংস্থাগুলোরও চুলচেরা বিশ্লেষণের নিজস্ব যৌক্তিক কারণ রয়েছে। এত বড় আয়োজনে ভেন্যু সিকিউরিটি, ভিড় ব্যবস্থাপনা, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং বিদেশি শিল্পীদের সুরক্ষার মতো স্পর্শকাতর বিষয় জড়িত থাকে।
জুলাই মাসের আতিফ আসলামের কনসার্টের পর পূর্বানুমতি ছাড়া ভেন্যু পরিবর্তনের জন্য সংশ্লিষ্ট আয়োজক সংস্থাকে নিয়ে তদন্ত শুরু করতে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। অনুমতিপত্রের শর্ত ভঙ্গের দায়ে ওই আয়োজক সংস্থাকে কালো তালিকাভুক্ত করার সুপারিশও করা হয়।
কনসার্টপ্রেমীদের প্রধান দুশ্চিন্তা এখন দুটি- স্থগিত হওয়া শো আদৌ অনুষ্ঠিত হবে কি না, আর কেনা টিকিটের ভবিষ্যৎ কী? কাভিশের ক্ষেত্রে আয়োজকরা জানিয়েছেন কেনা টিকিট পরবর্তী তারিখে কার্যকর থাকবে। কিন্তু বারবার স্থগিতের ঘটনা দর্শক-শ্রোতাদের আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরাচ্ছে। বহু দর্শক অগ্রিম অর্থ খরচের পাশাপাশি যাতায়াত বা থাকার ব্যবস্থা করেন। ধারাবাহিক বাতিলের কারণে আন্তর্জাতিক মেগা শোর প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ ও আস্থা কমে যাচ্ছে।
এই সংকট বিদেশি শিল্পীদের ক্ষেত্রেও বিরূপ প্রভাব ফেলছে। আন্তর্জাতিক শিল্পীদের বিমান টিকিট, হোটেল বুকিং, মহড়া ও ব্যান্ডের ক্রু মেম্বারদের সময়সূচি একটি নির্দিষ্ট তারিখের ওপর নির্ভর করে।
বাংলাদেশের জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘নেমেসিস’-এর ভোকাল জোহাদ রেজা চৌধুরী উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, এ ধরনের বারবার কনসার্ট বাতিল হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিদেশি শিল্পী ও স্থানীয় দর্শকদের বিশ্বাস হারিয়ে যাবে।
এই শিল্পী পরামর্শ দেন, বিদেশি শিল্পী আনতে যদি প্রশাসনিক বা আইনি জটিলতা তৈরি হয়, তবে আয়োজকদের উচিত দেশীয় শিল্পীদের নিয়ে বড় পরিসরে কনসার্ট অব্যাহত রাখা। ‘গান বন্ধ হওয়া উচিত নয়’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, “বিদেশি শিল্পী ছাড়াই বাংলাদেশের নিজস্ব ব্যান্ড ও শিল্পীরা এ দেশের কনসার্ট সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে সক্ষম। প্রমোটাররা হয়তো বিকল্প হিসেবে কেবল দেশি শিল্পী, নিজস্ব ফেস্টিভ্যাল বা কম ছাড়পত্র লাগা ফরম্যাটের দিকে ঝুঁকতে পারেন; তবে তা মূল সমস্যার টেকসই সমাধান নয়।”
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক সংগীতের এক বিশাল ও উদীয়মান ভক্তগোষ্ঠী রয়েছে। তৈরি হয়েছে বিশ্বমানের প্রমোটার, ভেন্যু, টিকিটিং প্ল্যাটফর্ম ও প্রোডাকশন হাউস। বড় অর্থ বিনিয়োগ ও টিকিট ছাড়ার আগে আয়োজকদের স্পষ্ট জানা প্রয়োজন- ইভেন্টটি অনুমোদিত হবে কি না।
একইভাবে চূড়ান্ত ঘোষণার আগেই নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ঝুঁকি পর্যালোচনা করার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতেও পর্যাপ্ত সময় থাকা দরকার। একটি সুনির্দিষ্ট, স্বচ্ছ ও পূর্বাভাসযোগ্য অনুমোদন নীতিমালা উভয়ের জন্যই উপকারী হতে পারে। সুনির্দিষ্ট সময়সীমা, স্পষ্ট শর্তাবলী এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোনো আপত্তি থাকলে তা শুরুতে জানিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলে ইভেন্টের মাত্র কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন আগে কনসার্ট বন্ধ হওয়ার মতো হতাশাজনক পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব।
অন্যথায়, ঢাকার কনসার্টপ্রেমীদের এই একই বৃত্তে বন্দী থাকতে হবে- আকর্ষণীয় আন্তর্জাতিক তারকার আগমনী বার্তা, টিকিট বিক্রি, উত্তেজনা এবং শেষ মুহূর্তে কনসার্ট স্থগিতের খবর।