ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের মাঠের লড়াইয়ে নামতে ১ হাজার ৯৮১ জন প্রার্থীকে প্রতীক বরাদ্দ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
বুধবার দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ভোট চাওয়ার সুযোগ পাবেন প্রার্থীরা। তফসিল অনুযায়ী, আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে সাতটা পর্যন্ত প্রচার চালাতে পারবেন প্রার্থীরা।
ইসি সচিবালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যাচাই-বাছাই শেষে ২৯৮ আসনে মোট ১ হাজার ৯৭২ প্রার্থী ভোটের লড়াইয়ে টিকেছেন। সীমানা জটিলতায় হাইকোর্টের নির্দেশে পাবনা-১ ও ২ সংসদীয় আসনের নির্বাচনী কার্যক্রম স্থগিত ছিল, পরে ওই দুই আসনে ৯ জন প্রার্থীকে বৈধ ঘোষণা করে ইসি।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে ইসি এরই মধ্যে আচরণবিধিতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন (রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণবিধি-২০২৫) এনেছে ইসি। ফলে প্রতীক পেয়ে জনসংযোগে নামতে এবার প্রার্থীদের নানা বিধিনিষেধ মানতে হবে। গত ১১ ডিসেম্বর সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণার পরদিনই এ বিধিমালার গেজেট জারি করেছিল সাংবিধানিক সংস্থাটি।
সংশোধিত গেজেট অনুযায়ী, আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে প্রার্থীতা বাতিল এবং এক লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এর আগে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা হতো।
জনসংযোগ ও সমাবেশ
ভোটারদের দরজায় গিয়ে ভোট চাওয়া কিংবা সভা-সমাবেশ আয়োজন করার আগে এ সংক্রান্ত পরিকল্পনা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। অন্তত ২৪ ঘণ্টা আগে জনসভার দিন-তারিখ এবং সময়-স্থান জানাতে হবে লিখিতভাবে।
জনসাধারণের চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সড়ক, মহাসড়কে কিংবা জনপথে জনসভা বা পথসভা করলে কার্যকরী ব্যবস্থা নিবে ইসি। নিষিদ্ধ করা হয়েছে প্রার্থীর পক্ষে বিদেশে কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশ আয়োজনের সুযোগ।
পোস্টার-ফেস্টুন নিষিদ্ধ, সীমিত বিলবোর্ড
নির্বাচনী প্রচারে পোস্টার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রচারে পরিবেশবান্ধব সামগ্রী ব্যবহারে জোর দেওয়া হয়েছে; প্রচার সামগ্রীতে পলিথিন, রেকসিন ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
একজন প্রার্থী তার আসনে সর্বোচ্চ ২০টি বিলবোর্ড ব্যবহার করতে পারবেন। যার দৈর্ঘ্য ১৬ ফুট ও প্রস্থ ৯ ফুটের বেশি নয়।
নির্বাচনী প্রচারে ব্যবহৃত ব্যানার, লিফলেট বা হ্যান্ডবিল ও ফেস্টুন হতে সাদা-কালো রঙের। ব্যানারের ক্ষেত্রে আয়তনে অনধিক ১০ (দশ) ফুট × ৪ (চার) ফুট, লিফলেট বা হ্যান্ডবিল আয়তনে অনধিক এ-ফোর সাইজের (৮.২৭ ইঞ্চি × ১১.৬৯ ইঞ্চি) এবং ফেস্টুন আয়তনে অনধিক ১৮ ইঞ্চি × ২৪ ইঞ্চিতে বেঁধে দেয়া হয়েছে।
ব্যানার, লিফলেট বা হ্যান্ডবিল ও ফেস্টুনে প্রতীক ও নিজের ছবি ব্যতীত অন্য কোনো ব্যক্তির ছবি বা প্রতীক ছাপাতে পারবে না। প্রার্থীর ছবি হতে হবে শুধু পোর্ট্রেট আকারে। প্রচারে ব্যবহার করা সাধারণ ছবির (পোর্ট্রেট) আয়তন হতে হবে ৬০ (ষাট) সেন্টিমিটার × ৪৫ (পঁয়তাল্লিশ) সেন্টিমিটার।
নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থীরা শুধু দলীয় প্রধানের ছবি ব্যবহার করতে পারবেন। কোনো প্রার্থীর নির্বাচনী প্রতীকের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ বা উচ্চতা ৩ (তিন) মিটারের বেশি হতে পারবে না। মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠানের নাম, ঠিকানা ও মুদ্রণের তারিখবিহীন কোনো ব্যানার, লিফলেট বা হ্যান্ডবিল ও ফেস্টুন ব্যবহার করা যাবে না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচনী প্রচার
প্রার্থীরা, তাদের নির্বাচনী এজেন্ট বা প্রতিনিধি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালাতে পারবেন, তবে-
- প্রচার শুরুর আগে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে প্রার্থী, দল বা সংশ্লিষ্ট পেজের নাম, অ্যাকাউন্ট আইডি, ই-মেইলসহ শনাক্তকরণ তথ্য জমা দিতে হবে
- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যাবে না
- ঘৃণাত্মক, মিথ্যা বা বিকৃত তথ্য প্রচার করা যাবে না
- প্রতিপক্ষ, নারী, সংখ্যালঘু বা কোনো জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে আক্রমণাত্মক, উসকানিমূলক ভাষা ব্যবহার করা যাবে না
- ধর্মীয় বা জাতিগত অনুভূতির অপব্যবহার করা যাবে না
- সব প্রচার কনটেন্ট প্রকাশের আগে সত্যতা যাচাই করতে হবে
- মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর, অশ্লীল বা মানহানিকর কনটেন্ট তৈরি বা শেয়ার করা যাবে না
গুজব ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার ঠেকাতে এবার নতুন ধারা যুক্ত করে নির্বাচনী অপরাধ হিসেবে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
আরও যা যা নিষিদ্ধ
- নির্বাচনী প্রচারণায় কোনো বাস, ট্রাক, নৌযান, মোটরসাইকেল কিংবা অন্য কোনো যান্ত্রিক বাহন সহকারে কোনো মিছিল, জনসভা কিংবা কোনো ধরনের শোডাউন করা যাবে না।
- প্রচারে যানবাহন সহকারে কিংবা যানবাহন ব্যতীত কোনো ধরনের মশাল মিছিলও করা যাবে না।
- রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষেত্রে দলীয় প্রধান ও সাধারণ সম্পাদক ছাড়া অন্য কেউ হেলিকপ্টার বা অন্য কোনো আকাশযান ব্যবহার করতে পারবেন না।
- ভোটার স্লিপে প্রার্থীর নাম, ছবি, প্রতীক উল্লেখ করা যাবে না
- প্রচারে তোরণ নির্মাণ কিংবা আলোকসজ্জা নিষিদ্ধ
দশের অধিক প্রার্থী ৩১ আসনে
সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের পর ৩১টি আসনে ১০-এর অধিক প্রার্থী ভোটের লড়াইয়ে নামতে যাচ্ছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী রয়েছে ঢাকা–১২ আসনে, যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১৫ জন। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রার্থী রয়েছে নারায়ণগঞ্জ–৪ আসনে, যেখানে লড়ছেন ১৩ জন।
১২ জন করে প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন খুলনা–১, ঢাকা–৯, ঢাকা–১৪ ও গাজীপুর–২ আসনে। ১১ জন করে প্রার্থী রয়েছেন ঢাকা–৫, ঢাকা–৭, ঢাকা–১১, ঢাকা–১৬, ঢাকা–১৭, নারায়ণগঞ্জ–৩, গোপালগঞ্জ–২, ফেনী–২, নোয়াখালী–৫ এবং খাগড়াছড়ি আসনে। ১০ জন করে প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন ঠাকুরগাঁও–৩, রংপুর–৫, গাইবান্ধা–৩, খুলনা–৩, টাঙ্গাইল–৪, ঢাকা–১৮, নরসিংদী–৫, নারায়ণগঞ্জ–৫, মাদারীপুর–১, মাদারীপুর–২, ব্রাহ্মণবাড়িয়া–৬, কুমিল্লা–৫, নোয়াখালী–৬, চট্টগ্রাম–৯ ও চট্টগ্রাম–১১ আসনে।