কালো পোশাক পরা ও মুখোশে মুখ ঢাকা কয়েক ডজন উগ্রপন্থী ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী শুক্রবার সমন্বিত হামলা চালিয়ে জলপাইগাছ পুড়িয়ে দিয়েছে এবং ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে পাথর ছুড়েছে। ইসরায়েলের দখলকৃত পশ্চিম তীরের একটি গ্রামে জলপাই সংগ্রহের সময় চালানো এ হামলায় অন্তত দুজন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে একজন সাংবাদিক।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
রয়টার্সকে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রায় ৮০ জন বসতি স্থাপনকারী একটি পাহাড় থেকে নেমে আসে। তাদের কয়েকজনের হাতে গ্যাসের ক্যানিস্টার ছিল। পাহাড়ের ঢালে ধাপ আকারে সাজানো জলপাইবাগানে আবু ফালাহ গ্রামের বাসিন্দারা পাকা জলপাই সংগ্রহ করতে জড়ো হয়েছিলেন। জলপাই সংগ্রহ ফিলিস্তিনিদের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা একটি ঐতিহ্যবাহী বার্ষিক আয়োজন।
বসতি স্থাপনকারীরা সারি সারি জলপাইগাছের সামনের পথগুলোতে অবস্থান নেয়। তাদের কয়েকজন গুলতি ব্যবহার করে ফিলিস্তিনি গ্রামবাসীদের দিকে পাথর ছোড়ে। গ্রামবাসীরা পাহাড়ের নিচের দিকে নেমে যান। পরে আত্মরক্ষার জন্য তারা পাথর কুড়িয়ে পাল্টা ছুড়তে শুরু করেন।
আবু ফালাহতে হামলার প্রত্যক্ষদর্শী ৪২ বছর বয়সী কৃষক মুতাজ আবদেলহাদি বলেন, “বসতি স্থাপনকারীরা আমাদের ওপর হামলা চালাতে এবং আমাদের বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ করতে চায়।”
হামলার একপর্যায়ে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর অন্তত দুটি জিপ দ্রুতগতিতে এলাকাটি অতিক্রম করে। জিপের ধুলোর ঝাপটা এড়িয়ে গ্রামবাসীদের ছুটে সরে যেতে দেখা যায়।
সামরিক বাহিনী পৌঁছানোর পরও হামলা চলতে থাকে। জিপ এড়িয়ে সরে যাওয়া ফিলিস্তিনিদের দিকে ইসরায়েলি সেনারা কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। এলাকায় গুলির শব্দ শোনা যায়। রয়টার্সের একজন আলোকচিত্রী অন্তত একজন সশস্ত্র বসতি স্থাপনকারীকে গুলি ছুড়তে দেখেছেন।
এক বিবৃতিতে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানায়, সেনা ও সীমান্ত পুলিশ সদস্যরা এলাকায় মোতায়েন হওয়ার পর সতর্কতামূলক গুলি ছোড়ে। একপর্যায়ে সেনারা এমন একজন ব্যক্তির দিকে গুলি ছোড়ে, যাকে তারা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করেছিল।
ওয়াশিংটন পোস্টের সাংবাদিক আহত
ফিলিস্তিনি চিকিৎসাকর্মীরা জানান, এ ঘটনায় দুজন আহত হয়েছেন। তাদের রামাল্লা এলাকার হাসপাতালে নেওয়া হয়। আহতদের একজন হেইডি লেভিন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের আলোকচিত্রী।
হামলার একটি ভিডিওতে দেখা যায়, মাটির একটি পথের ওপর কাত হয়ে শুয়ে আছেন লেভিন। দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে রেখেছেন তিনি। এ সময় অন্তত তিনজন বসতি স্থাপনকারী তাকে ঘিরে রেখেছিল।
পরে হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে লেভিন বলেন, তার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল। তিনি বলেন, “আমার ওপর হামলা চালানো হয়েছে, ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। ভাগ্যিস, আমার গায়ে বুলেটপ্রতিরোধী জ্যাকেট ও মাথায় হেলমেট ছিল। তা না হলে হয়তো আজ আমি এখানে থাকতাম না। কারণ, তারা আমাকে বারবার লাথি মারছিল।”
লেভিন জানান, তার ফিলিস্তিনি সহকর্মীরা হস্তক্ষেপ করার পর হামলা থামে। এরপর চিকিৎসাকর্মীরা অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে প্রথমে আবু ফালাহর একটি ক্লিনিকে এবং পরে রামাল্লার হাসপাতালে নিয়ে যান।
কথা বলার সময় তার কণ্ঠ কাঁপছিল এবং বাঁ হাত ব্যান্ডেজে মোড়ানো ছিল। পরে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, লেভিনের শরীরের বিভিন্ন স্থানে কেটে যাওয়ার ক্ষত হয়েছে এবং তার একটি পাঁজরের হাড় ভেঙেছে। তার এক হাতের একটি আঙুল এমনভাবে ছিঁড়ে গেছে যে হাড় বেরিয়ে পড়েছে। এ কারণে ওই হাতে অস্ত্রোপচার করতে হবে।
এক বিবৃতিতে দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের নির্বাহী সম্পাদক ম্যাট মারে ঘটনাটির তদন্ত দাবি করেন।
মারে বলেন, “আজ সকালে পশ্চিম তীরে সংবাদ সংগ্রহের সময় দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের আলোকচিত্রী হেইডি লেভিন ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলার শিকার হয়েছেন।”
তিনি আরও বলেন, “তার পোশাকে সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় স্পষ্টভাবে চিহ্নিত ছিল। হেইডি চিকিৎসা পেয়েছেন এবং নিরাপদে আছেন—এতে আমরা স্বস্তি পেয়েছি। কিন্তু পেশাগত দায়িত্ব পালনরত একজন সাংবাদিকের ওপর এ অযৌক্তিক হামলায় আমরা ক্ষুব্ধ। আমরা কর্তৃপক্ষের কাছে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।”
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানায়, পশ্চিম তীরে যেকোনো পক্ষের অপরাধমূলক সহিংসতার নিন্দা জানায় তারা এবং অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনার পক্ষে।
দপ্তরের একজন মুখপাত্র বলেন, “পররাষ্ট্র দপ্তর এসব প্রতিবেদন সম্পর্কে অবগত। বিদেশে কোনো আমেরিকান নাগরিক ক্ষতিগ্রস্ত হলে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন হই এবং প্রয়োজনীয় সব ধরনের কনস্যুলার সহায়তা দিতে প্রস্তুত থাকি।”
তিনি আরও জানান, কনস্যুলার সহায়তার প্রস্তাব দিতে দপ্তরটি দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা কেন বাড়ছে
ইসরায়েলি পর্যবেক্ষক সংগঠন ইয়েশ দিন-এর তথ্য অনুযায়ী, দখলকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বেড়েছে। বার্ষিক জলপাই সংগ্রহ মৌসুম শুরুর সময়, অর্থাৎ ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ১৭০টি হামলার ঘটনা ঘটেছে।
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী সরকারের কারণে বসতি স্থাপনকারীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বলে মনে করা হচ্ছে। তার সরকারের আমলে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি ও ছোট ছোট অবৈধ বসতির দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটেছে।
নেতানিয়াহু এসব সহিংসতার সমালোচনা করেছেন। তবে আন্তর্জাতিক মহলের নিন্দা এবং দীর্ঘদিনের মিত্র যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশের নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরিকল্পনা সত্ত্বেও এ ধরনের ঘটনা দমনে তিনি খুব কম পদক্ষেপ নিয়েছেন।
নেতানিয়াহুর কার্যালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, শুক্রবারের ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে।
পশ্চিম তীরে প্রায় পাঁচ লাখ ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী এবং অন্তত ৩০ লাখ ফিলিস্তিনি বসবাস করে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ও অধিকাংশ দেশ সামরিক দখলদারত্বসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এসব বসতিকে অবৈধ বলে মনে করে। ইসরায়েল এ অবস্থান প্রত্যাখ্যান করে। তাদের দাবি, ভূখণ্ডটি দখলকৃত নয়, বরং এর মর্যাদা বিতর্কিত।
আবু ফালাহতে হামলার আগে শুক্রবার সকালে তুরমুস আয়া গ্রামের এলাকাতেও একই ধরনের হামলার ঘটনা ঘটে। সেখানে জলপাই সংগ্রহরত একদল কৃষকের ওপর হামলা চালানোর পর বসতি স্থাপনকারীরা তিনটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চেয়ে করা রয়টার্সের অনুরোধে সামরিক বাহিনী তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি।
তুরমুস আয়ায় হামলার প্রত্যক্ষদর্শী সালাহ আবু নিসওয়া বলেন, বসতি স্থাপনকারীরা “চোরের মতো লুকিয়ে এসে হামলা চালায়। তারা একজনকে একা পেয়ে ধরে এবং মারধর শুরু করে।”