ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রতিবাদে আন্দোলন দমনে ব্যাপক ধরপাকড়, পুলিশি সহিংসতা এবং আধাসামরিক বাহিনীর বিপুল উপস্থিতি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের জন্য নতুন রাজনৈতিক সংকট তৈরি করেছে। যে সরকার দীর্ঘদিন ধরে শক্তিশালী নেতৃত্ব, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করেছে, সেই সরকারের বিরুদ্ধেই এখন গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম বাদ দেওয়ার প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলন ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি মোদির নেতৃত্ব, তার সরকারের অর্থনৈতিক নীতি এবং ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিয়েও বিস্তৃত বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজনৈতিক সংলাপের পরিবর্তে বলপ্রয়োগের ওপর নির্ভরতা সরকারের জন্য আরও বড় কৌশলগত ভুল হয়ে উঠতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক শিক্ষক এবং ভারতের কারাভান সাময়িকীর পরামর্শক সম্পাদক সুশান্ত সিং প্রভাবশালী মার্কিন সাময়িকী ফরেন পলিসিতে প্রকাশিত ‘মোদিস ক্র্যাকডাউন ইজ আ স্ট্র্যাটেজিক এরর’ শীর্ষক নিবন্ধে ভারতের চলমান পরিস্থিতির এই বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন। তার মতে, নয়াদিল্লিতে বিক্ষোভ দমনে সরকারের কঠোর অবস্থান জনঅসন্তোষ কমানোর পরিবর্তে তা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। ভোটার তালিকার বিতর্ককে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন মোদির রাজনৈতিক কর্তৃত্বের প্রতি বৃহত্তর চ্যালেঞ্জে পরিণত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সরকার যদি সংলাপের পরিবর্তে দমন-পীড়নের পথেই এগোয়, তাহলে তা শুধু বর্তমান রাজনৈতিক সংকটকে গভীর করবে না, ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎকেও অনিশ্চয়তার মুখে ফেলবে।
১০ অক্টোবর থেকে নয়াদিল্লিতে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান শুরু করে নিরাপত্তা বাহিনী। ওই দিনই সাত হাজারের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন বিরোধী দলের রাজনীতিক, সাবেক মুখ্যমন্ত্রী, শিক্ষার্থী নেতা, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সাংবাদিক। তাদের অনেকেই ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ দেওয়ার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছিলেন। আন্দোলন দমনের প্রস্তুতি হিসেবে কর্তৃপক্ষ দিল্লির ৫৭টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ করে দেয়, ট্রেন চলাচল বাতিল করে এবং রাজধানীর কিছু এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা স্থগিত করে। পাশাপাশি ৩০ হাজারের বেশি আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। বিক্ষোভকারীদের পুলিশি গাড়িতে টেনেহিঁচড়ে তোলা এবং আটক ব্যক্তিদের ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগও সামনে আসে। আটক ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে সংসদ সদস্যও ছিলেন।
এ ধরনের ব্যবস্থা সাধারণত জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার যুক্তিতে গ্রহণ করা হলেও, রাজনৈতিক প্রতিবাদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব ভিন্ন হতে পারে। রাষ্ট্র যখন নাগরিকদের অভিযোগ শোনার পরিবর্তে বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করে আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তখন জনগণের একাংশের কাছে সেটি সরকারের দুর্বলতা ও অনিরাপত্তার লক্ষণ হিসেবে প্রতিভাত হতে পারে। সুশান্ত সিংয়ের বিশ্লেষণে এই বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তার মতে, মোদি সরকার রাষ্ট্রীয় শক্তিকে নাগরিকদের সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে। এর ফলে সরকার ও জনগণের মধ্যকার রাজনৈতিক দূরত্ব বাড়ছে। যে আন্দোলনকে আলোচনার মাধ্যমে সীমিত রাখা সম্ভব ছিল, বলপ্রয়োগের কারণে সেটিই বৃহত্তর অসন্তোষের কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, ভোটার তালিকা থেকে এত বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়ল কেন এবং এর প্রক্রিয়াটি কতটা স্বচ্ছ ছিল। ভারতের নির্বাচন কমিশন গত বছর থেকে ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বা বিশেষ নিবিড় সংশোধন কর্মসূচি (এসআইআর) শুরু করে। নিবন্ধ অনুযায়ী, এই প্রক্রিয়ায় ১৩ কোটির বেশি নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। বিরোধী দলগুলো শুরু থেকেই এই প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছিল। তাদের অভিযোগ, নাম বাদ দেওয়ার কারণে বিপুলসংখ্যক নাগরিকের ভোটাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা বজায় রাখার দায়িত্ব যে প্রতিষ্ঠানের, সেই নির্বাচন কমিশনের কর্মকাণ্ড নিয়েই যখন প্রশ্ন ওঠে, তখন বিষয়টি আর কেবল প্রশাসনিক সংশোধনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি গণতন্ত্রের ভিত্তি এবং নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত হয়ে পড়ে।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোট কেবল সরকার নির্বাচনের একটি পদ্ধতি নয়; এটি রাষ্ট্রের কাছে নাগরিকের সমান মর্যাদার স্বীকৃতিও। সামাজিক অবস্থান, অর্থনৈতিক সামর্থ্য কিংবা রাজনৈতিক প্রভাবের ক্ষেত্রে মানুষের মধ্যে যতই পার্থক্য থাকুক, নির্বাচনে প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের ভোটের মূল্য সমান। বিশেষ করে অর্থনৈতিক বৈষম্যে জর্জরিত সমাজে এই সমতা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সুশান্ত সিংয়ের যুক্তি অনুযায়ী, ভারতের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ভোটাধিকার হারানোর আশঙ্কা শুধু নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ হারানোর বিষয় নয়; এর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা এবং নাগরিক হিসেবে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নও জড়িত। বিচার ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রতিকার পাওয়ার পথ সংকুচিত হয়ে এলে রাস্তায় প্রতিবাদ করাই অনেকের কাছে নিজেদের দাবি জানানোর কার্যকর মাধ্যম হয়ে ওঠে।
এই আন্দোলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি। ২০২৪ সালে মোদি সরকার তাকে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বে মনোনীত করে। এর আগে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়ে দেওয়া একটি নতুন আইন কার্যকর হয়। সুশান্ত সিংয়ের নিবন্ধে বলা হয়েছে, এই আইনের ফলে কমিশনার নিয়োগে সরকারের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ বেড়েছে। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্কের সঙ্গে বিষয়টি যুক্ত হওয়ায় প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবি আন্দোলনের তাৎক্ষণিক কেন্দ্রে চলে এসেছে।
তবে আন্দোলনের ব্যাপ্তি বিবেচনায় নিলে স্পষ্ট হয়, এর পেছনে শুধু নির্বাচন কমিশনের কর্মকাণ্ড নিয়ে অসন্তোষ কাজ করছে না। জুলাই মাসে ফাঁস হওয়া পরীক্ষার প্রশ্নপত্র নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের মুখে ভারতের শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের ঘটনাও সরকারের জন্য সতর্কবার্তা ছিল। সুশান্ত সিংয়ের নিবন্ধে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে পরিচিত নতুন একটি আন্দোলনের প্রসঙ্গ এসেছে, যা তরুণদের ক্ষোভকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। এই আন্দোলন শিক্ষাব্যবস্থার অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ থেকে রাজনৈতিক জবাবদিহির বৃহত্তর দাবিতে পৌঁছেছে। ফলে ভোটার তালিকা নিয়ে বিরোধ এখন আগে থেকেই জমে থাকা ক্ষোভ প্রকাশের একটি উপলক্ষে পরিণত হয়েছে।
মোদির রাজনৈতিক অবস্থানও আগের মতো নিরঙ্কুশ নয়।
২০১৪ সালের নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের পর তার দল ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি দীর্ঘদিন সংসদীয় রাজনীতিতে প্রাধান্য ধরে রেখেছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিজেপি ২৪০টি আসন পায়, যা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য যথেষ্ট ছিল না। ফলে মোদিকে সরকার পরিচালনার জন্য জোটসঙ্গীদের ওপর নির্ভর করতে হয়। সুশান্ত সিংয়ের মতে, এই নির্বাচনী ফল তার রাজনৈতিক কর্তৃত্বের সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করেছে। আগের দুই মেয়াদে সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা তাকে বিরোধীদের আপত্তি উপেক্ষা করার সুযোগ দিয়েছিল। এখন সেই রাজনৈতিক সুরক্ষা আর আগের মতো নেই। এ বছর সংসদীয় আসন সম্প্রসারণ ও পুনর্বিন্যাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগেও মোদি সরকার প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি।
এই পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিরোধীদের সঙ্গে সমঝোতা এবং জনমতের প্রতি সংবেদনশীলতা দেখানো মোদি সরকারের জন্য আরও জরুরি হয়ে উঠেছে। কিন্তু আন্দোলনের জবাবে পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীকে সামনে নিয়ে আসা সরকারের রাজনৈতিক কৌশলকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সুশান্ত সিংয়ের মতে, নিরাপত্তা বাহিনীর মাধ্যমে আন্দোলন মোকাবিলা করতে গিয়ে সরকার এমন একটি বার্তা দিচ্ছে যে তারা নাগরিকদের অভিযোগের রাজনৈতিক সমাধান খুঁজতে আগ্রহী নয়। বিক্ষোভকারীদের স্লোগান ও পোস্টারে মোদিকে এমন একজন শাসক হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যিনি নিজের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ধরে রাখতে নিরাপত্তা বাহিনীর আশ্রয় নিচ্ছেন। এ ধরনের ধারণা প্রতিষ্ঠিত হলে তা শুধু আন্দোলনকারীদের মধ্যেই নয়, সরকারের প্রতি সহানুভূতিশীল মধ্যপন্থী ভোটারদের মধ্যেও বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।
পুলিশ সদস্যরা বিক্ষোভকারীদের পেছনে ঠেলে দিলে প্রতিক্রিয়া জানান এক নারী বিক্ষোভকারী। ছবি: রয়টার্স
মোদির সরকারের জন্য আরেকটি বড় সমস্যা হলো জনমত নিয়ন্ত্রণের পুরোনো কৌশলের কার্যকারিতা কমে যাওয়া। ২০১৪ সালের নির্বাচনী বিজয়ের পর তার রাজনৈতিক ভাবমূর্তি গঠনে সরকারের প্রতি অনুকূল অবস্থান নেওয়া বড় গণমাধ্যমগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। কিন্তু সংবাদ গ্রহণের ধরন বদলে যাওয়ায় এখন স্বাধীন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব বেড়েছে। ফলে প্রচলিত গণমাধ্যমের ওপর নির্ভর করে জাতীয় রাজনৈতিক বয়ান নিয়ন্ত্রণ করা আগের চেয়ে কঠিন হয়ে উঠেছে। বিক্ষোভের সময় অন্তত ৩৭ জন সাংবাদিককে আটক করার ঘটনাকে সুশান্ত সিং এই প্রেক্ষাপটেই দেখেছেন। তার মতে, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত করার চেষ্টা সরকারের জন্য উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে। কারণ, তথ্যপ্রবাহ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা এখন অনেক বেশি কঠিন। বরং সাংবাদিকদের আটক এবং তাদের ওপর হামলার অভিযোগ আন্দোলনের ঘটনা আরও বিস্তৃতভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরতে পারে।
মোদির রাজনৈতিক ক্লান্তির বিষয়টিও নিবন্ধে গুরুত্ব পেয়েছে। ১২ বছরের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকার পর অতীতের সরকারগুলোর ব্যর্থতার দায় দিয়ে বর্তমান সমস্যার ব্যাখ্যা দেওয়া আগের মতো কার্যকর হচ্ছে না। বিশেষ করে ভারতের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি মানুষের বয়স ২৫ বছরের নিচে। এই তরুণদের বড় একটি অংশের প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে অন্য কোনো প্রধানমন্ত্রীকে দেখার অভিজ্ঞতা নেই। ফলে তাদের কাছে কর্মসংস্থানের সংকট, নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগ এবং পুলিশের বাড়াবাড়ির দায় বর্তমান সরকারের ওপরই বর্তায়।
কর্মসংস্থান নিয়ে হতাশা এই অসন্তোষকে আরও তীব্র করছে। নিবন্ধে উদ্ধৃত সেপ্টেম্বরের একটি জরিপ অনুযায়ী, প্রায় অর্ধেক উত্তরদাতা বলেছেন, গত এক বছরে কর্মসংস্থানের পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। আরও ৩৫ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতা আশঙ্কা করেছেন, আগামী বছর পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। এই পরিসংখ্যানের তাৎপর্য হলো, ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সরকারি হিসাব এবং সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতার মধ্যে একটি ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। সরকার উচ্চ প্রবৃদ্ধির কথা বললেও কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষের উদ্বেগ রাজনৈতিক আস্থাকে দুর্বল করছে।
অর্থনৈতিক পরিস্থিতির আরও কিছু সূচকও সরকারের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। সুশান্ত সিংয়ের নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৬ সালে এ পর্যন্ত বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীরা ভারতের শেয়ারবাজার থেকে রেকর্ড ৩৩ বিলিয়ন ডলার প্রত্যাহার করেছেন। এই অর্থপ্রত্যাহারের পরিমাণ ২০২৫ সালের পুরো বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। একই সময়ে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির দর ৬ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি কমেছে। বৈশ্বিক অস্থিরতা ও প্রবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগকে এই প্রবণতার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও নিবন্ধে উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ প্রান্তিকে ভারতের বার্ষিকীকৃত মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৭ দশমিক ৮ শতাংশ, তবু বিনিয়োগ প্রত্যাহার ও মুদ্রার অবমূল্যায়ন অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে উদ্বেগ তৈরি করছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান এবং মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার মধ্যে ব্যবধান থাকলে সরকারের রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা, মুদ্রার স্থিতিশীলতা এবং কর্মসংস্থানের প্রত্যাশা অর্থনীতির ভিন্ন ভিন্ন দিক হলেও এগুলো একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। সরকার যদি উচ্চ প্রবৃদ্ধিকে নিজেদের সাফল্যের প্রধান প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরে, কিন্তু সাধারণ মানুষ কর্মসংস্থানের উন্নতি দেখতে না পান, তাহলে সেই সাফল্যের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা কমে যায়। মোদি সরকারের বর্তমান সংকটের একটি অংশ এই ব্যবধানের মধ্যেই নিহিত।
পররাষ্ট্রনীতিও মোদির জন্য প্রত্যাশিত রাজনৈতিক সুবিধা এনে দিতে পারছে না। তার নেতৃত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতের অবস্থান শক্তিশালী করার বিষয়টি দীর্ঘদিন প্রচারিত হয়েছে। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক নতুন চাপের মুখে পড়েছে। উচ্চ শুল্ক, আরও শুল্ক আরোপের হুমকি এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে অচলাবস্থা এই সম্পর্ককে জটিল করেছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের একটি জরিপের উদ্ধৃতি দিয়ে নিবন্ধে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ৫০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ভারত সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে, যেখানে ইতিবাচক ধারণা পোষণ করেন ৪৫ শতাংশ।
মোদির জন্য এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ট্রাম্পের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ককে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু সেই সম্পর্ক প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করতে না পারলে ভারতের পররাষ্ট্রনীতির সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। একই সময়ে ট্রাম্প প্রশাসন চীনকে ক্রমবর্ধমানভাবে সমমর্যাদার শক্তি হিসেবে বিবেচনা করছে। অন্যদিকে, বেইজিংয়ের সঙ্গে সীমান্ত উত্তেজনা নিরসন, প্রযুক্তি সহযোগিতা বাড়ানো কিংবা বাণিজ্যঘাটতি কমানোর ক্ষেত্রেও ভারত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার যে চেষ্টা নয়াদিল্লি করছে, তা মূলত বেইজিংয়ের শর্তে এগোচ্ছে বলে সুশান্ত সিং মনে করেন।
পশ্চিম এশিয়ায় ভারতের অবস্থানও নতুন জটিলতার মুখে পড়েছে। ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইসরায়েল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার ওপর নির্ভরশীল ভারতের নীতির সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পাচ্ছে বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও পশ্চিম এশিয়া—এই তিন ক্ষেত্রেই মোদি সরকারের সামনে এমন সব চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে, যেগুলো সহজে সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটের সময় পররাষ্ট্রনীতিতে বড় সাফল্য দেখিয়ে জনমনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগও এতে সীমিত হয়ে পড়ছে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে গভীর সংকট অর্থনীতি কিংবা কূটনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতার সঙ্গে সম্পর্কিত। সুশান্ত সিংয়ের নিবন্ধে ভ্যারাইটিজ অব ডেমোক্রেসি বা ভি-ডেম প্রকল্পের মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপিকে সুবিধা দিতে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগে বিক্ষোভ করছেন লোকজন। ছবি: রয়টার্স
ওই মূল্যায়নে ভারতের নির্বাচনী গণতন্ত্রের স্কোর শূন্য দশমিক ৩৮, যা ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার পর সর্বনিম্ন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সংস্থাটি ভারতকে ‘নির্বাচনী স্বৈরতন্ত্র’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। ফ্রিডম হাউসও ২০২৬ সালে ভারতকে ‘আংশিক মুক্ত’ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং দেশটির জন্য তাদের সর্বনিম্ন স্কোর দিয়েছে। অন্যদিকে, ইন্টারন্যাশনাল আইডিয়াও ভারতের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ কমে যাওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
এই মূল্যায়নগুলোর সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র রয়েছে। গণতন্ত্রে নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, সংবাদমাধ্যম এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতাসীন সরকারের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সাহায্য করে। এসব প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা দুর্বল হয়ে পড়লে নাগরিকদের অভিযোগ নিষ্পত্তির স্বাভাবিক পথ সংকুচিত হয়। তখন রাস্তায় প্রতিবাদ শুধু রাজনৈতিক মত প্রকাশের একটি মাধ্যম থাকে না; এটি জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।
মোদির সামনে এখন দুটি ভিন্ন পথ রয়েছে। তিনি চাইলে রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের উদ্বেগের জবাব দিতে পারেন, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারেন এবং নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলোর বিশ্বাসযোগ্য সমাধান খুঁজতে পারেন। অন্যদিকে, আরও কঠোর দমন-পীড়নের পথে এগোলে স্বল্পমেয়াদে রাস্তায় বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে সরকারের রাজনৈতিক বৈধতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ, বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নাগরিকদের সাময়িকভাবে সরিয়ে দেওয়া গেলেও তাদের ক্ষোভের কারণ দূর করা যায় না।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং হাঙ্গেরির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবানের সঙ্গে মোদির রাজনৈতিক পথচলার তুলনাও সুশান্ত সিংয়ের নিবন্ধে এসেছে। এই দুই নেতা ধারাবাহিক নির্বাচনী বিজয়ের মাধ্যমে ক্ষমতা সুসংহত করার পাশাপাশি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্বাহী বিভাগের অধীনস্থ করে তুলেছিলেন। তবে ভারতের ফেডারেল কাঠামো, আঞ্চলিক বৈচিত্র্য এবং জোটনির্ভর রাজনীতি মোদির জন্য একই ধরনের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার পথে বাধা তৈরি করছে। দক্ষিণ ভারতের শক্তিশালী রাজ্য সরকার, পুনরুজ্জীবিত বিরোধী দল এবং রাজনৈতিকভাবে সচেতন হয়ে ওঠা তরুণ জনগোষ্ঠী তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
সুতরাং, নয়াদিল্লিতে ব্যাপক ধরপাকড়কে মোদির নিরঙ্কুশ শক্তির প্রমাণ হিসেবে দেখার চেয়ে তার রাজনৈতিক কর্তৃত্বের সীমাবদ্ধতার লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করার যুক্তি রয়েছে। যে সরকার একসময় শক্তিশালী নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল, সেই সরকারের বিরুদ্ধে এখন ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহি রক্ষার দাবিতে নাগরিকদের রাস্তায় নামতে হচ্ছে। আন্দোলনকারীদের ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ এই বৈপরীত্যকে আরও স্পষ্ট করছে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগের সামর্থ্য এবং জনগণের আস্থা ধরে রাখার ক্ষমতা এক বিষয় নয়। প্রথমটি দিয়ে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলেও দ্বিতীয়টি অর্জনের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা ও প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচার।
বিক্ষোভকারীকে আটক করার পর পুলিশের ভূমিকা নিয়েও জনমনে আলোচনা তৈরি হয়েছে। ছবি: রয়টার্স
শেষ পর্যন্ত ভারতের বর্তমান সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন: নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা সরকার কি নির্বাচনী ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও নাগরিকের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে প্রস্তুত? গণতন্ত্র কেবল নির্বাচনের দিন ভোট গ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর জন্য প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য ভোটার তালিকা, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন, কার্যকর বিচারব্যবস্থা, স্বাধীন সংবাদমাধ্যম এবং সরকারের সমালোচনা করার অবাধ সুযোগ। এসব শর্ত দুর্বল হয়ে পড়লে নির্বাচনী প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে চালু থাকলেও গণতন্ত্রের অন্তর্নিহিত শক্তি ক্ষয় হতে থাকে।
সুশান্ত সিংয়ের বিশ্লেষণের মূল বক্তব্য হলো, মোদি সরকারের বর্তমান দমনমূলক কৌশল তার ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনের বদলে রাজনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করতে পারে। ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক ইতিমধ্যে নাগরিক অধিকার, অর্থনৈতিক অসন্তোষ এবং সরকারের জবাবদিহির প্রশ্নকে এক জায়গায় নিয়ে এসেছে। পুলিশের কঠোর পদক্ষেপ সেই প্রশ্নগুলোকে আরও বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর সামনে তুলে ধরেছে। এখন মোদি সংলাপের পথ বেছে নেবেন, নাকি আরও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করবেন, তার ওপর ভারতের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ নির্ভর করছে।
তার রাজনৈতিক আধিপত্য দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা যদি প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা আরও দুর্বল করে এবং জনগণের ক্ষোভ বাড়িয়ে দেয়, তাহলে সেই আধিপত্য শেষ পর্যন্ত তার সরকারের জন্যই ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে। দিল্লির রাজপথে চলমান আন্দোলন তাই শুধু একটি ভোটার তালিকা সংশোধনবিরোধী প্রতিবাদ নয়; এটি ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা, নাগরিকের সমান অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমা নির্ধারণের এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।