রয়টার্সের বিশ্লেষণ

উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানের হামলা কি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করবে?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানের হামলা কি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করবে?
কাতারে একটি স্থাপনায় হামলার পর ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। ছবি: রয়টার্স

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার পর উপসাগরীয় দেশগুলোর বন্দর, শহর ও জ্বালানি স্থাপনায় বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করেছে তেহরান। এতে উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রঘনিষ্ঠ বৃহৎ সামরিক জোটের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে, যার ফলে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে সতর্ক করেছেন মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষকরা।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে আঘাত হানার মাধ্যমে তেহরান অনিচ্ছাকৃতভাবে এসব দেশকে ওয়াশিংটনের আরও ঘনিষ্ঠ অবস্থানে নিয়ে যাচ্ছে এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে সমন্বিত পদক্ষেপের পথ তৈরি করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ও মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থাকা ছয়টি উপসাগরীয় দেশে ইরানের হামলার উদ্দেশ্য ছিল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর যুদ্ধ বন্ধে চাপ সৃষ্টি করা। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এ ক্ষেত্রে ইরান কৌশলগত ভুল হিসাব করেছে।

সৌদি আরবভিত্তিক গালফ রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান আবদুলআজিজ সাগের রয়টার্সকে বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলো এখন কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে- হয় তারা যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ প্রচেষ্টায় প্রকাশ্যে যুক্ত হবে, নিজেদের আকাশসীমা ও ভূখণ্ড ব্যবহারের অনুমতি দেবে, এমনকি সামরিক অভিযানে অংশ নেবে। অথবা নিজ ভূখণ্ডে আরও সংঘাতের ঝুঁকি নেবে।

আবদুলআজিজ বলেন, ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর নিরপেক্ষ থাকার সুযোগ কার্যত শেষ হয়ে গেছে এবং অনেক দেশ নিজেদের অবস্থান বদলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রকাশ্য সমন্বয়ের দিকে ঝুঁকছে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর ঐক্য জোরদার

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে তেহরান ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে। এর পরপরই সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত ও ওমান নিয়ে গঠিত গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি) জরুরি বৈঠক বসে। সেখানে জাতিসংঘ সনদের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদ উল্লেখ করে তারা সম্মিলিত আত্মরক্ষার প্রস্তুতির ইঙ্গিত দেয় এবং নিরাপত্তা ও জ্বালানি সরবরাহ ঝুঁকিতে পড়ায় ‘রেড লাইন’ নির্ধারণ করে।

জিসিসি জানায়, ইরানের হামলা উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য আরও শক্তিশালী করেছে। একই সঙ্গে তারা সতর্ক করে বলে, হামলা অব্যাহত থাকলে অঞ্চলটি প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান থেকে সক্রিয় প্রতিক্রিয়ার ক্ষেত্রেও পরিণত করতে পারে। ইতোমধ্যে যৌথ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও নজরদারি কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।

কাতারের রাস লাফান শিল্পনগরী। ছবি: উইকিপিডিয়া
কাতারের রাস লাফান শিল্পনগরী। ছবি: উইকিপিডিয়া

বিশ্লেষকদের মতে, এখন উপসাগরীয় দেশগুলোর সামনে দুটি পথ—প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বৃহত্তর যুদ্ধের ঝুঁকি নেওয়া অথবা বারবার হামলার মুখে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ক্ষয়ের ঝুঁকি মেনে নেওয়া।

উপসাগরীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তেহরানকে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে বার্তা দেওয়া হয়েছে যে ভবিষ্যতে আরও হামলা হলে তার পরিণতি ইরানের জন্য অনেক বেশি খারাপ হবে।

একজন উপসাগরীয় সূত্র জানান, দেশগুলো আপাতত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে চাইছে। তবে ইরানের ভেতরে হামলার নির্দেশনা কেন্দ্রীয়ভাবে দেওয়া হচ্ছে নাকি বিচ্ছিন্ন ইউনিটগুলো স্বতন্ত্রভাবে কাজ করছে-তা এখনো স্পষ্ট নয়।

রয়টার্স বলছে, এতে হয় কমান্ড কাঠামো দুর্বল হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে, অথবা সিদ্ধান্ত এখনো কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকেই সমন্বয় করা হচ্ছে।

উচ্চ ঝুঁকিতে বৈশ্বিক জ্বালানি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি

উপসাগরীয় অঞ্চলের চলমান উত্তেজনার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। তেলের রপ্তানি, গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ও জ্বালানি অবকাঠামো হুমকির মুখে পড়ায় বৈশ্বিক বাণিজ্য ও অর্থবাজারেও এর প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পথ এখন গুরুতর ঝুঁকিতে রয়েছে।

বিশ্ব জ্বালানি বাজার কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম বড় ধাক্কার মুখে পড়তে পারে। ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কায় উপসাগরীয় অঞ্চলের কিছু জ্বালানি স্থাপনা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে। এর মধ্যে কাতারের এলএনজি স্থাপনাও রয়েছে, যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশের সঙ্গে যুক্ত। ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা আরও বেড়েছে।

এমিরেটস পলিসি সেন্টারের প্রেসিডেন্ট এবতেসাম আল কেতবি রয়টার্সকে বলেন, বর্তমান যে হারে হামলা চলছে, তা অব্যাহত থাকলে এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত মোকাবিলা করতে উপসাগরীয় অঞ্চল ব্যর্থ হলে তেল পরিবহন পথ ব্যাহত হওয়া বা হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। এতে বৈশ্বিক স্বার্থ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অন্যান্য দেশও পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপ করতে পারে।

দুবাই পাবলিক পলিসি রিসার্চ সেন্টারের মহাপরিচালক মোহাম্মদ বাহারুন বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের হামলাকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হিসেবে আখ্যা দেওয়ায় তেহরানের বিরুদ্ধে বৃহত্তর আন্তর্জাতিক জোট গঠনের যুক্তি আরও জোরালো হয়েছে।

তার মতে, উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা চালিয়ে ইরান নিজেই নতুন শত্রু তৈরি করছে এবং এমন এক বিস্তৃত যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে, যা কেউই চায় না।

সাইপ্রাসে ব্রিটিশ ঘাঁটি এবং আবুধাবিতে ফরাসি বাহিনীর ব্যবহৃত স্থাপনাসহ পশ্চিমা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার ঘটনায় ন্যাটো জোটও ভবিষ্যতে সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ইরানের হামলার সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। দেশটির বিমানবন্দর, বন্দর ও তেল অবকাঠামো লক্ষ্য করে মোট হামলার প্রায় ৬৩ শতাংশ পরিচালিত হয়েছে। কর্মকর্তাদের হিসাবে, প্রথম ৪৮ ঘণ্টায় ১৬৫টি ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্রায় ৬০০ ড্রোন নিক্ষেপ করা হয়।

দোহা, দুবাই ও মানামায় আঘাত হানা ক্ষেপণাস্ত্রগুলো উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপদ আর্থিক, বিনিয়োগ ও পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ এড়াতে চাইলেও সংযুক্ত আরব আমিরাত দ্রুত কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিয়েছে। দেশটি ইরানের রাষ্ট্রদূতকে তলব, তেহরান থেকে নিজস্ব দূত প্রত্যাহার, দূতাবাস বন্ধ এবং বিষয়টি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে উত্থাপন করেছে।

উপসাগরীয় কর্মকর্তাদের মতে, ব্যাপক মাত্রায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে ইরান আঞ্চলিক কূটনৈতিক বাস্তবতা আমূল বদলে দিয়েছে। তাদের দাবি, তেহরানের এ পদক্ষেপ ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে আলাদা রাখার সুযোগকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

সম্পর্কিত