বিশ্ববাজারে বাড়তে থাকা চরম অনিশ্চয়তা এবং ভূ-রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে সুরক্ষিত রাখতে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের সংরক্ষিত সোনার একটি অংশ বিক্রি করে দিয়ে থাকতে পারে। ব্লুমবার্গ ইকোনমিক্সের জ্যেষ্ঠ ভারতীয় অর্থনীতিবিদ অভিষেক গুপ্তের সরকারিভাবে প্রকাশিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে যে বিশ্লেষণ করেছেন সেখানে এমন তথ্য উঠে এসেছে। বিশ্লেষণ অনুসারে, গত মে মাসের দ্বিতীয় ও তৃতীয় সপ্তাহের মধ্যে আরবিআই প্রায় ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের সোনা বিক্রি করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মার্কিন অর্থনীতি বিষয়ক প্রভাবশালী অনলাইন ব্লুমবার্গ এই রিপোর্ট প্রকাশের করেছে। এরপরেই ভারত জুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সোনা বিক্রির খবর ঠিক নয় বলে জানায়। তবে খবরটি প্রকাশের আগে ব্লুমবার্গের পক্ষ থেকে বারবার যোগাযোগ করেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
ব্লুমবার্গ ইকোনমিক্সের জ্যেষ্ঠ ভারতীয় অর্থনীতিবিদ অভিষেক গুপ্তের সরকারিভাবে প্রকাশিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সোনা বিক্রির ওপর এই বিশ্লেষণটি করেছেন। ওই বিশ্লেষণ তিনি বলেছেন, গত ২২ মের আগের দুই সপ্তাহের মধ্যে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই) প্রায় ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের সোনা বিক্রি করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই সোনা বিক্রির মাধ্যমে অর্জিত অর্থের একটি বড় অংশ, অর্থাৎ প্রায় ৭.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দেশের বৈদেশিক মুদ্রা তহবিলের (ফরেন কারেন্সি রিজার্ভ) বৃদ্ধিতে ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থনীতিবিদ অভিষেক গুপ্ত তার এই সিদ্ধান্তের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছেন যে, ভারতে সোনার ওপর আমদানি শুল্ক বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে স্বাভাবিক নিয়মেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে থাকা সোনার মজুতের সামগ্রিক মূল্যায়ন বৃদ্ধি পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সরকারি তথ্যে দেখা গেছে যে, সেই শুল্ক বৃদ্ধির পরও আরবিআই-এর সোনার মজুদের মোট আর্থিক মূল্য উল্টো হ্রাস পেয়েছে। এই বিপরীতমুখী ডেটা বা পরিসংখ্যানই জোরালোভাবে নির্দেশ করে যে, আরবিআই আন্তর্জাতিক বা অভ্যন্তরীণ বাজারে বড় অঙ্কের সোনা বিক্রি করার পথ বেছে নিয়েছিল।
এই ধরনের নজিরবিহীন বা কৌশলগত পদক্ষেপের পেছনে বিশ্বরাজনীতি ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতির বেশ কিছু জটিল সমীকরণ কাজ করছে যা এই নিবন্ধে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বর্তমান সময়ে পশ্চিম এশিয়ায়, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চরম উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যের পথে জাহাজ চলাচলে ক্রমাগত বিঘ্ন ঘটার কারণে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
ভারত বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় তেল আমদানিকারক দেশ হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি দেশের আমদানি ব্যয়ের ওপর বিশাল চাপ সৃষ্টি করে। যখন আমদানির ব্যয় বিপুল পরিমাণে বেড়ে যায়, তখন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ডলারের বহিঃপ্রবাহ তীব্রতর হয়, যা প্রকারান্তরে ভারতীয় মুদ্রা রুপির মানকে ক্রমান্বয়ে দুর্বল করে তোলে। এর পাশাপাশি বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা ভারত থেকে তাদের মূলধন বা তহবিল প্রত্যাহার করে নিয়ে যাচ্ছে, যা রুপির ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
ভারতের আউটলুক মানি-র প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তীব্র চাপের মুখে পড়ে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির মান সম্প্রতি রেকর্ড ৯৬.৯৬ রুপিতে গিয়ে ঠেকেছিল, যা পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্রিয় হস্তক্ষেপের কারণে কিছুটা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়। মুদ্রার এই রেকর্ড পতন ঠেকাতে এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে অস্থিরতা ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে আরবিআই-কে প্রতিনিয়ত বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে ডলার বিক্রি করে হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে। ফলে ভারতের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এক বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমে এসে বর্তমানে প্রায় ৬৮১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে এসে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নিজেদের ডলারের সাশ্রয় করতে এবং রিজার্ভের ভারসাম্য বজায় রাখতে সোনা বিক্রির মতো কঠোর ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায় যে, কোনো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাধারণত চরম সংকটের মুহূর্ত ছাড়া তাদের স্বর্ণ মজুদ বা সোনা সহজে বিক্রি করতে চায় না। কারণ সোনাকে দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রতীক এবং মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সুরক্ষাকবচ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে ব্লুমবার্গ ইকোনমিক্সের এই প্রতিবেদনটি যদি সম্পূর্ণ সত্য হয়, তবে বুঝতে হবে যে আরবিআই বর্তমান মুদ্রাবাজারের অস্থিরতাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছে এবং রুপির পতন রোধ করাকে এই মুহূর্তে অন্য সবকিছুর চেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে। সোনা বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থ সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলারে রূপান্তর করার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে ডলারের তারল্য বা জোগান বাড়াতে সক্ষম হয়েছে, যা রুপির মানকে আকস্মিক ধস থেকে রক্ষা করার জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল।
আন্তর্জাতিক বাজারে যখন ভূ-রাজনৈতিক কারণে তেলের দাম বৃদ্ধি পায় এবং একই সাথে বিদেশি তহবিল চলে যেতে শুরু করে, তখন যেকোনো উদীয়মান অর্থনীতির জন্যই তাদের মুদ্রা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ভারতের ক্ষেত্রেও এই দ্বিমুখী সংকট দেখা দেওয়ায় দেশের বাণিজ্য ঘাটতি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছিল, যা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্যই এই স্বর্ণ বিনিময় বা গোল্ড লিকুইডেশনের পথ অবলম্বন করা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। আমদানি শুল্ক বৃদ্ধির ইতিবাচক প্রভাবকে ছাপিয়ে সোনার সামগ্রিক মূল্যায়ন কমে যাওয়া কেবল তখনই সম্ভব যখন বড় পরিমাণের সোনা ভৌত বা আর্থিক উপায়ে বাজারজাত করা হয়, যা এই বিশ্লেষণের প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।
আউটলুক মানি-তে প্রকাশিত বুমবার্গ ইকোনমিক্সের এই বিশ্লেষণটি বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারতের কৌশলগত অবস্থানের একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাবস্থা এবং হরমুজ প্রণালির সংকট কীভাবে সরাসরি ভারতের অভ্যন্তরীণ আর্থিক নীতি ও মুদ্রা ব্যবস্থাপনাকে প্রভাবিত করছে, তা এখানে স্পষ্ট। ডলারের বিপরীতে রুপির মান ৯৭-এর কাছাকাছি চলে যাওয়া ভারতের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা ছিল, যার কারণে রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া প্রথাগত নীতির বাইরে গিয়ে সোনা বিক্রির মাধ্যমে নিজেদের বৈদেশিক মুদ্রার শক্তি বৃদ্ধির এই দূরদর্শী অথচ ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে।
রিজার্ভের পরিমাণ ৬৮১ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসা সত্ত্বেও এই বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়ে বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং রুপির পতন ঠেকানোর জন্য আরবিআই-এর এই অবিরাম প্রচেষ্টা ভারতের অর্থনীতিকে বড় ধরনের সংকটের হাত থেকে সাময়িকভাবে রক্ষা করতে পেরেছে। তবে বিশ্ববাজারে তেলের চড়া দাম এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের তহবিল প্রত্যাহারের এই প্রবণতা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে আগামী দিনগুলোতে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তাদের সোনা ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ভারসাম্য বজায় রাখতে আরও বড় ধরনের নীতিগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে, যা সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতির জন্যই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হিসেবে কাজ করবে।
ছবি: রয়টার্স
বিশ্ববাজারে বাড়তে থাকা চরম অনিশ্চয়তা এবং ভূ-রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে সুরক্ষিত রাখতে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের সংরক্ষিত সোনার একটি অংশ বিক্রি করে দিয়ে থাকতে পারে। ব্লুমবার্গ ইকোনমিক্সের জ্যেষ্ঠ ভারতীয় অর্থনীতিবিদ অভিষেক গুপ্তের সরকারিভাবে প্রকাশিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে যে বিশ্লেষণ করেছেন সেখানে এমন তথ্য উঠে এসেছে। বিশ্লেষণ অনুসারে, গত মে মাসের দ্বিতীয় ও তৃতীয় সপ্তাহের মধ্যে আরবিআই প্রায় ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের সোনা বিক্রি করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মার্কিন অর্থনীতি বিষয়ক প্রভাবশালী অনলাইন ব্লুমবার্গ এই রিপোর্ট প্রকাশের করেছে। এরপরেই ভারত জুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সোনা বিক্রির খবর ঠিক নয় বলে জানায়। তবে খবরটি প্রকাশের আগে ব্লুমবার্গের পক্ষ থেকে বারবার যোগাযোগ করেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
ব্লুমবার্গ ইকোনমিক্সের জ্যেষ্ঠ ভারতীয় অর্থনীতিবিদ অভিষেক গুপ্তের সরকারিভাবে প্রকাশিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সোনা বিক্রির ওপর এই বিশ্লেষণটি করেছেন। ওই বিশ্লেষণ তিনি বলেছেন, গত ২২ মের আগের দুই সপ্তাহের মধ্যে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই) প্রায় ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের সোনা বিক্রি করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই সোনা বিক্রির মাধ্যমে অর্জিত অর্থের একটি বড় অংশ, অর্থাৎ প্রায় ৭.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দেশের বৈদেশিক মুদ্রা তহবিলের (ফরেন কারেন্সি রিজার্ভ) বৃদ্ধিতে ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থনীতিবিদ অভিষেক গুপ্ত তার এই সিদ্ধান্তের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছেন যে, ভারতে সোনার ওপর আমদানি শুল্ক বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে স্বাভাবিক নিয়মেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে থাকা সোনার মজুতের সামগ্রিক মূল্যায়ন বৃদ্ধি পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সরকারি তথ্যে দেখা গেছে যে, সেই শুল্ক বৃদ্ধির পরও আরবিআই-এর সোনার মজুদের মোট আর্থিক মূল্য উল্টো হ্রাস পেয়েছে। এই বিপরীতমুখী ডেটা বা পরিসংখ্যানই জোরালোভাবে নির্দেশ করে যে, আরবিআই আন্তর্জাতিক বা অভ্যন্তরীণ বাজারে বড় অঙ্কের সোনা বিক্রি করার পথ বেছে নিয়েছিল।
এই ধরনের নজিরবিহীন বা কৌশলগত পদক্ষেপের পেছনে বিশ্বরাজনীতি ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতির বেশ কিছু জটিল সমীকরণ কাজ করছে যা এই নিবন্ধে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বর্তমান সময়ে পশ্চিম এশিয়ায়, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চরম উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যের পথে জাহাজ চলাচলে ক্রমাগত বিঘ্ন ঘটার কারণে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
ভারত বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় তেল আমদানিকারক দেশ হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি দেশের আমদানি ব্যয়ের ওপর বিশাল চাপ সৃষ্টি করে। যখন আমদানির ব্যয় বিপুল পরিমাণে বেড়ে যায়, তখন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ডলারের বহিঃপ্রবাহ তীব্রতর হয়, যা প্রকারান্তরে ভারতীয় মুদ্রা রুপির মানকে ক্রমান্বয়ে দুর্বল করে তোলে। এর পাশাপাশি বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা ভারত থেকে তাদের মূলধন বা তহবিল প্রত্যাহার করে নিয়ে যাচ্ছে, যা রুপির ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
ভারতের আউটলুক মানি-র প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তীব্র চাপের মুখে পড়ে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির মান সম্প্রতি রেকর্ড ৯৬.৯৬ রুপিতে গিয়ে ঠেকেছিল, যা পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্রিয় হস্তক্ষেপের কারণে কিছুটা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়। মুদ্রার এই রেকর্ড পতন ঠেকাতে এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে অস্থিরতা ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে আরবিআই-কে প্রতিনিয়ত বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে ডলার বিক্রি করে হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে। ফলে ভারতের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এক বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমে এসে বর্তমানে প্রায় ৬৮১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে এসে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নিজেদের ডলারের সাশ্রয় করতে এবং রিজার্ভের ভারসাম্য বজায় রাখতে সোনা বিক্রির মতো কঠোর ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায় যে, কোনো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাধারণত চরম সংকটের মুহূর্ত ছাড়া তাদের স্বর্ণ মজুদ বা সোনা সহজে বিক্রি করতে চায় না। কারণ সোনাকে দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রতীক এবং মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সুরক্ষাকবচ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে ব্লুমবার্গ ইকোনমিক্সের এই প্রতিবেদনটি যদি সম্পূর্ণ সত্য হয়, তবে বুঝতে হবে যে আরবিআই বর্তমান মুদ্রাবাজারের অস্থিরতাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছে এবং রুপির পতন রোধ করাকে এই মুহূর্তে অন্য সবকিছুর চেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে। সোনা বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থ সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলারে রূপান্তর করার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে ডলারের তারল্য বা জোগান বাড়াতে সক্ষম হয়েছে, যা রুপির মানকে আকস্মিক ধস থেকে রক্ষা করার জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল।
আন্তর্জাতিক বাজারে যখন ভূ-রাজনৈতিক কারণে তেলের দাম বৃদ্ধি পায় এবং একই সাথে বিদেশি তহবিল চলে যেতে শুরু করে, তখন যেকোনো উদীয়মান অর্থনীতির জন্যই তাদের মুদ্রা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ভারতের ক্ষেত্রেও এই দ্বিমুখী সংকট দেখা দেওয়ায় দেশের বাণিজ্য ঘাটতি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছিল, যা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্যই এই স্বর্ণ বিনিময় বা গোল্ড লিকুইডেশনের পথ অবলম্বন করা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। আমদানি শুল্ক বৃদ্ধির ইতিবাচক প্রভাবকে ছাপিয়ে সোনার সামগ্রিক মূল্যায়ন কমে যাওয়া কেবল তখনই সম্ভব যখন বড় পরিমাণের সোনা ভৌত বা আর্থিক উপায়ে বাজারজাত করা হয়, যা এই বিশ্লেষণের প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।
আউটলুক মানি-তে প্রকাশিত বুমবার্গ ইকোনমিক্সের এই বিশ্লেষণটি বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারতের কৌশলগত অবস্থানের একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাবস্থা এবং হরমুজ প্রণালির সংকট কীভাবে সরাসরি ভারতের অভ্যন্তরীণ আর্থিক নীতি ও মুদ্রা ব্যবস্থাপনাকে প্রভাবিত করছে, তা এখানে স্পষ্ট। ডলারের বিপরীতে রুপির মান ৯৭-এর কাছাকাছি চলে যাওয়া ভারতের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা ছিল, যার কারণে রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া প্রথাগত নীতির বাইরে গিয়ে সোনা বিক্রির মাধ্যমে নিজেদের বৈদেশিক মুদ্রার শক্তি বৃদ্ধির এই দূরদর্শী অথচ ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে।
রিজার্ভের পরিমাণ ৬৮১ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসা সত্ত্বেও এই বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়ে বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং রুপির পতন ঠেকানোর জন্য আরবিআই-এর এই অবিরাম প্রচেষ্টা ভারতের অর্থনীতিকে বড় ধরনের সংকটের হাত থেকে সাময়িকভাবে রক্ষা করতে পেরেছে। তবে বিশ্ববাজারে তেলের চড়া দাম এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের তহবিল প্রত্যাহারের এই প্রবণতা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে আগামী দিনগুলোতে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তাদের সোনা ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ভারসাম্য বজায় রাখতে আরও বড় ধরনের নীতিগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে, যা সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতির জন্যই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হিসেবে কাজ করবে।