ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে সম্প্রতি বেশ আলোচনা চলছে। গত জুলাই তরুণদের বিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করেন ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। এরপরও দেশটির স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আলোচনা থামেনি।
এরপর গত ৬ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে একটি হোস্টেল ধসে শিক্ষার্থীদের প্রাণহানির ঘটনাও দেশটির শিক্ষাব্যবস্থার অব্যবস্থাপনার আরেকটি উদাহরণ হয়ে ওঠে।
এদিকে ভারতীয় তরুণদের ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) তাদের সমর্থকদের সারা দেশের স্কুলগুলোর অবস্থা তুলে ধরতে উৎসাহিত করছে। ফলে ভারতীয় শিশুদের যে দুর্বল পরিবেশে পড়াশোনা করতে হচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাখো মানুষ তা দেখতে পাচ্ছেন।
ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতে তরুণদের রাস্তায় নামার তাৎক্ষণিক কারণ ছিল, একটি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা। তবে শুধু এই ঘটনাই বিক্ষোভের কারণ নয়। দীর্ঘদিন ধরে ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার নানা সমস্যা নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভ জমছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইয়ামিনি আইয়ার ভারতের এই শিক্ষাব্যবস্থাকে ‘দুর্ভোগের যন্ত্র’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। দেশটির সবচেয়ে কঠিন ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলোতে কোটি কোটি শিক্ষার্থী অল্পসংখ্যক ভালো বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি চাকরির সুযোগ পাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা করে। এসব পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অনেক পরিবারকে বেসরকারি কোচিং, স্কুল ও কলেজের পেছনে বিপুল অর্থ খরচ করতে হয়। কিন্তু বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর শেষ পর্যন্ত হতাশ হতে হয়।
ব্যাঙ্গালুরের আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের মাত্র ৭ শতাংশ এক বছরের মধ্যে চাকরি পান। চাকরির তুলনায় স্নাতক শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় বেশির ভাগ শিক্ষার্থীকে বছরের পর বছর বেকার থাকতে হয়।
দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, ভারতে পর্যাপ্ত চাকরির সুযোগ তৈরি না হওয়ার একমাত্র কারণ দুর্বল শিক্ষাব্যবস্থা নয়। দুর্বল প্রশাসন এবং বেসরকারি খাতের কাজে বাধা সৃষ্টি করা নানা নিয়মও বড় সমস্যা। তবে শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে।
ভারতে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী স্নাতক হলেও অনেক প্রতিষ্ঠান দক্ষ কর্মী খুঁজে পেতে সমস্যায় পড়ে। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কার্তিক মুরলিধরনের বলেন, “ভারত দক্ষ নয়, শুধু ডিগ্রিধারী মানুষ তৈরি করছে”।
গত তিন দশকে ভারতে শিক্ষার বিস্তার খুব দ্রুত হয়েছে। কিন্তু এর সঙ্গে নতুন সমস্যাও তৈরি হয়েছে। কীভাবে এই সমস্যাগুলো তৈরি হচ্ছে, তা বুঝতে একটি শিশুর শিক্ষাজীবনের শুরু থেকে দেখিয়েছে দ্য ইকোনমিস্ট।
স্কুলে প্রথম দিন শিশুটি হয়তো খুশি হবে। কারণ ১৯৯০ সালে ভারতের প্রায় চার ভাগের এক ভাগ শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেত না। এখন স্কুলের বাইরে থাকা শিশুর সংখ্যা কমে মাত্র ২ শতাংশে নেমেছে।
তবে স্কুলে ভর্তি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার মান কমেছে। ২০২২ সালে গ্রামীণ স্কুলগুলোতে করা এক জরিপে দেখা যায়, পঞ্চম শ্রেণির প্রতি পাঁচজন শিক্ষার্থীর মধ্যে তিনজনই দ্বিতীয় শ্রেণির একটি লেখা ঠিকমতো পড়তে পারে না।
এরপর কিছুটা উন্নতি হয়েছে। কয়েকটি রাজ্যে শিক্ষকরা শিশুদের পড়া, লেখা ও গণিত শেখানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। কিন্তু বেশির ভাগ স্কুল এখনো এসব মৌলিক বিষয় ঠিকভাবে শেখাতে পারছে না। ফলে শিক্ষার্থীরা শেখার জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। ফলে অনেক শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষে চুপচাপ বসে থাকে, তবে খুব সামান্যই শিখতে পারে।
মাধ্যমিক স্কুলেও একই সমস্যা চলতে থাকে। সিজেপি জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষের বিষয়টি প্রচারের জন্য সামনে এনেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের আসল সমস্যা হলো শিক্ষকরা। রাজ্য সরকারগুলো শিক্ষকদের দায়িত্বশীল করতে ব্যর্থ। এর একটি কারণ হলো, শিক্ষক সংগঠনগুলো বড় ভোটব্যাংক হিসেবে কাজ করে।
২০২৪ সালে গ্রামীণ মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষকরা প্রতি আট দিনের মধ্যে এক দিন করে স্কুলে অনুপস্থিত ছিলেন।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) পিসা পরীক্ষায় ২০০৯ সালে অংশ নিয়েছিল ভারত। ওই পরীক্ষায় দেশটির ফল খুবই খারাপ ছিল। পড়া, গণিত ও বিজ্ঞানে ৭৪টি দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে ভারত নিচের তিনটির মধ্যে ছিল। এরপর আর অংশ নেয়নি।
নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরের কাছে বিক্ষোভ। ছবি: রয়টার্স
দ্য ইকোনমিস্টের তথ্যমতে, ভারতে প্রায় ১০ কোটি শিশু বেতন দিয়ে পড়াশোনা করে এমন স্কুলে যায়। মোট শিক্ষার্থীর ৩৯ শতাংশ এখন বেসরকারি স্কুলে পড়ে, যা ২০১৫ সালে ছিল ৩২ শতাংশ। এর মধ্যে কিছু বেসরকারি স্কুল খুব ভালো। তবে বেশির ভাগই এমন কম খরচের বেসরকারি স্কুল, যেখানে আর্থিকভাবে কষ্টে থাকা পরিবারের সন্তানরা পড়ে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, অভিভাবকেরা সন্তানদের জন্য ভালো শিক্ষা চাইছেন–এটি ইতিবাচক বিষয়। তাত্ত্বিকভাবে বেসরকারি স্কুলের সংখ্যা বাড়লে সরকারের হাতে প্রতিটি শিশুর জন্য বেশি অর্থ থাকার কথা। কিন্তু অনেক অভিভাবক সরকারি স্কুল ছেড়ে দেওয়ায় শিক্ষার মান বাড়ানোর জন্য সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপও কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি বেসরকারি স্কুলগুলোও যথেষ্ট ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয় না। ফলে পুরোনো সমস্যার ওপর নতুন সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। বর্তমানে ভারতের প্রায় ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী স্কুলের পরও পড়াশোনা চালিয়ে যায়। এক দশক আগে এই হার ছিল ২০ শতাংশ। এই বাড়তি শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ নিম্নবর্ণের পরিবারের। তাদের পড়াশোনার সুযোগ দিতে দেশে ‘অধিভুক্ত কলেজ’-এর সংখ্যা বেড়েছে। এসব ছোট বেসরকারি কলেজ কোনো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থেকে শিক্ষা কার্যক্রম চালায়।
দক্ষিণ দিল্লির এমনই একটি অধিভুক্ত কলেজ কম-আইটি ক্যারিয়ার একাডেমির কয়েকজন তরুণ শিক্ষার্থী দ্য ইকোনমিস্টকে জানায়, তাদের বছরে ৪০ হাজার রুপি বা প্রায় ৪২০ ডলার ফি দিতে হয়। তাদের বেশির ভাগই দরিদ্র পরিবারের সন্তান। তাদের পরিবারের জন্য এই টাকা জোগাড় করা বড় এবং ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য প্রয়োজনীয় নম্বর তারা পায়নি। সেখানে পড়াশোনার খরচও অনেক কম।
তবে কলেজটির শিক্ষার্থীরা জানায়, শিক্ষকরা ভালো। কিন্তু কলেজের সুযোগ-সুবিধা খুবই সাধারণ। কলেজটি প্রশাসন নিজেদের ‘দিল্লির সেরা কলেজগুলোর একটি’ হিসেবে প্রচার করে। তাদের ওয়েবসাইটে বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা সাবেক শিক্ষার্থীদের ‘বিশিষ্ট প্রাক্তন শিক্ষার্থী’ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
গত এক দশকে ভারতে এ ধরনের কলেজের সংখ্যা ১০ হাজারেরও বেশি বেড়েছে। তবে এ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ রয়েছে। এর একটি সমস্যা হলো, অর্থসংকটে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এসব অধিভুক্ত কলেজ থেকে পাওয়া আয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ফলে শিক্ষার মান নিশ্চিত করার জন্য কঠোর নিয়ম করার আগ্রহ তাদের কম।
স্কুল পর্যায়েই অনেক শিক্ষার্থী প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা ঠিকভাবে অর্জন করতে পারে না। ফলে কলেজে ভর্তি হওয়ার সময় তারা পড়াশোনায় অন্যদের চেয়ে কয়েক বছর পিছিয়ে থাকে। এ কারণে এসব কলেজ থেকে পাওয়া ডিগ্রি চাকরির বাজারে খুব বেশি কাজে আসে না–এমন ধারণা তৈরি হয়েছে কিছু প্রতিষ্ঠানের মধ্যে।
দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, ভারতের পুরো শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালে তিনটি বিষয় স্পষ্ট হয়। প্রথমত, ভারত এখনো পুরোপুরি তার পুরোনো শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যা থেকে বের হতে পারেনি। আগে নেতারা সবার জন্য শিক্ষার ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব দেননি। তারা মনে করতেন, অল্পসংখ্যক ভালো স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করেই শিল্প ও অর্থনীতির আধুনিকায়ন সম্ভব।
এখন ভারতে সবার জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু তা এখনো অনেকটাই উচ্চবিত্তকেন্দ্রিক। অল্পসংখ্যক ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মূলত সুবিধাপ্রাপ্ত পরিবারের সন্তানরা পড়ে। আর এর বাইরে রয়েছে বিপুলসংখ্যক নিম্নমানের প্রতিষ্ঠান।
আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অমিত বাসোলে বলেন, “আমরা কখনো এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করিনি, যেখানে সাধারণ শিক্ষার্থীর প্রয়োজনকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।”
দ্বিতীয় সমস্যা হলো, শিক্ষা অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। বেসরকারি স্কুলগুলো বছরে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার এবং কোচিং প্রতিষ্ঠানগুলো ৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করে। উভয় ক্ষেত্রই মানুষের ভালো ভবিষ্যতের আকাঙ্ক্ষাকে কাজে লাগায়। দরিদ্র পরিবারের মানুষও এমন সব ডিগ্রির পেছনে টাকা খরচ করেন, যেগুলোর মান কম এবং ভালো চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনাও খুব কম।
জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সন্তোষ মেহরোত্রার মতে, ভারতের মতো দেশে বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থা দ্রুত বাড়লে সেটিকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। কিন্তু অনেক রাজনীতিক এটিকে অর্থ আয়ের সুযোগ হিসেবে দেখেন। তিনি বলেন, “এই অধিভুক্ত কলেজগুলো কে প্রতিষ্ঠা করেছে? রাজনীতিকরাই।”
তৃতীয় সমস্যা হলো শিক্ষার পেছনে দেওয়া অর্থ ও সুযোগের সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না। অনেক টাকা খরচ করেও শিক্ষার্থীরা সেই অনুযায়ী দক্ষতা বা চাকরির সুযোগ পাচ্ছে না। তারপরও শিক্ষার প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। কারণ অনেক পরিবারের কাছে একটি ডিগ্রি শুধু চাকরি পাওয়ার মাধ্যম নয়, সামাজিক মর্যাদারও বিষয়। মেয়েদের ক্ষেত্রে ভালো বিয়ের সুযোগ বাড়াতেও ডিগ্রিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়। এমনকি যেসব চাকরির জন্য আসলে ডিগ্রির প্রয়োজন নেই, সেসব চাকরিতেও এখন অনেক সময় ডিগ্রি চাওয়া হচ্ছে।
দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, সিজেপির সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো, তারা শিক্ষার বিষয়টি মানুষের সামনে আরও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছে। তাদের বক্তব্য শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অভিভাবকদের মধ্যেও ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। শিক্ষার্থীরা এই দুর্বল শিক্ষাব্যবস্থার কারণে ভুগছে, আর অভিভাবকেরাই সেই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে অর্থ খরচ করছেন।
তবে ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যা পুরো ব্যবস্থাজুড়েই ছড়িয়ে আছে। একটি স্কুলের ফুটো ছাদ মেরামত করার মতো সহজে এসব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে না।