এক বছরের মধ্যে তিন দফা বাড়ল জ্বালানি তেলের দাম। সর্বশেষ গত ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারে বাড়ানো হয়েছে ২০ টাকা করে। এর ফলে ডিজেলের দাম ফেব্রুয়ারির ১০০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১৩৫ টাকা।
অর্থাৎ মাত্র কয়েক মাসে বেড়েছে ৩৫ শতাংশ। এর প্রভাব অন্যান্য খাতের মতো পড়েছে শিল্পখাতেও। কারণ এই বাড়তি খরচ ছড়িয়ে পড়ে কারখানা থেকে ট্রাক, ট্রাক থেকে বন্দর, বন্দর থেকে রপ্তানি অর্থাৎ প্রতিটি ধাপে।আর পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলেও বৈশ্বিক ক্রেতার কাছে পণ্যের দাম ইচ্ছেমতো বাড়ানো যায় না। তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন, বাড়তি এই খরচ শেষ পর্যন্ত কে বহন করবে? ব্যবসায়ী নেতাদের আশঙ্কা, উদ্যোক্তারা যদি ক্রেতার কাছ থেকে বাড়তি দাম আদায় করতে না পারেন, তাহলে চাপ পড়বে মুনাফায়, কমবে উৎপাদন ও বিনিয়োগের সক্ষমতা। অর্থাৎ পুরো শিল্পখাতই সংকটে পড়বে।
বাড়তি খরচের বড় বোঝা উদ্যোক্তার কাঁধে
তেলের দাম বাড়ার তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতে। ডিজেল নির্ভর ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও অন্যান্য পণ্যবাহী যানবাহনের ভাড়া এরই মধ্যে ইতোমধ্যে বেড়েছে। বিভিন্ন রুটে একেকটি ট্রাকের ভাড়া ২ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। যেমন, কুষ্টিয়া থেকে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে একটি ট্রাকের ভাড়া ৩২ হাজার থেকে বেড়ে ৪০ হাজার টাকা হয়েছে। কুষ্টিয়া থেকে ঢাকায় ২৬৫ বস্তা চাল পরিবহনের খরচও ২০ হাজার থেকে বেড়ে প্রায় ২২ হাজার টাকা হয়েছে। অর্থাৎ এই হারে বিভিন্ন রুটে পরিবহন খরচ বেড়ে গেছে।
এই বাড়তি ভাড়া শুধু পরিবহন ব্যবসার হিসাব নয়। ট্রাকের ভাড়া বাড়লে বাড়ে কাঁচামাল কারখানায় আনার খরচ। বাড়ে উৎপাদিত পণ্য গুদামে নেওয়ার খরচ। রপ্তানি পণ্য বন্দরে পাঠানোর খরচ বাড়ে। আমদানি করা পণ্য বন্দর থেকে কারখানা পর্যন্ত আনতেও একই চাপ তৈরি হয়।
এরই মধ্যে বেসরকারি ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোগুলো ছয় ধরনের সেবা চার্জ ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বাড়িয়েছে। এসব সেবার মধ্যে রয়েছে খালি কনটেইনার পরিবহন, রপ্তানি পণ্য স্টাফিং ও হ্যান্ডলিং এবং আমদানি পণ্য ডেলিভারি। দেশের প্রায় ৯৩ শতাংশ রপ্তানি পণ্য চট্টগ্রামের ১৯টি বেসরকারি আইসিডির মাধ্যমে কনটেইনারে ওঠে। ফলে এই বাড়তি চার্জ সরাসরি রপ্তানি ব্যয়ের সঙ্গে যোগ হচ্ছে।
ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, এখানেই তৈরি হচ্ছে ব্যবসার সবচেয়ে বড় সংকট। দেশের অভ্যন্তরে খরচ বাড়লেও আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা চাইলেই পণ্যের দাম বাড়াতে পারেন না। ফলে বাড়তি খরচের একটি বড় অংশ উদ্যোক্তার মুনাফা থেকে সমন্বয় করতে হতে পারে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান চরচাকে বলেন, “সাধারণত, তেলের দাম বাড়লে এর সঙ্গে জড়িত সব কিছুরই খরচ বাড়ে। যে ট্রাকটা তেলে চলে সেই ট্রাকের ভাড়া বেড়ে যায়। বাজারে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়। বাজার থেকে যখন পণ্য কিনি তখন সেখানে বাড়তি দাম দিতে হয়। এসব খরচ গিয়ে পড়ে আমাদের উৎপাদিত পণ্যে। অর্থাৎ পণ্যের দাম বাড়ল, কিন্তু আমরা সেই পণ্যের বাড়তি দাম বিদেশি বায়ারদের কাছ থেকে নিতে পারলাম না। তখন আমাদের মুনাফা কমে যায়। অনেক সময় মুনাফা সমন্বয় করে টিকে থাকতে হয়।”
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের পর ডিজেলের নতুন বোঝা
খাত সংশ্লিষ্টরা আরও বলছেন, আরেকটি জায়গায় চাপ আরও বেশি। সেটি হলো জ্বালানি নিরাপত্তা। দেশের শিল্পকারখানাগুলো দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের সমস্যা রয়েছে। গ্যাসের চাপ কমে গেলে বা বিদ্যুৎ না থাকলে অনেক কারখানায় ডিজেল জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন সচল রাখতে হয়। এখন সেই বিকল্প ব্যবস্থাটিও আগের তুলনায় ব্যয়বহুল
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম চরচাকে বলেন, “তেলের দাম বাড়ার কারণে পোশাক কারখানার উৎপাদন ও পরিবহন, দুই ধরনের খরচই বাড়বে। কাপড়, অ্যাকসেসরিজ, আমদানি করা উপকরণ এবং রপ্তানি পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত ব্যয় হবে। শিল্প এরই মধ্যে বিভিন্ন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, এই বাড়তি চাপ এখন আর শিল্পের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব নয়।”
অপরদিকে মাহমুদ হাসান খান বলছেন, “গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি আগের কয়েক দিনের তুলনায় কিছুটা উন্নত হলেও জ্বালানি সংকটের প্রকৃত প্রভাব বুঝতে আরও কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।”
ব্যবসায়ীরা আরও বলছেন, এখানে তেলের দাম বাড়ার বিষয়টি আলাদা করে দেখলে ভুল হবে। কারণ একটি কারখানা যদি গ্যাসের ঘাটতির কারণে ডিজেল জেনারেটর চালায়, একই সঙ্গে কাঁচামাল ও পণ্য পরিবহনে ডিজেল নির্ভর যান ব্যবহার করে, তাহলে জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব উৎপাদন ব্যয়ের একাধিক জায়গায় একসঙ্গে পড়ে।
রপ্তানি পণ্যের দাম বাড়ানোর সুযোগ নেই
ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, তেলের দাম বৃদ্ধির দীর্ঘমেয়াদি চাপ এই খাতেই। দেশের ভেতরে কোনো ব্যবসায়ী চাইলে পরিবহন খরচ, জ্বালানি খরচ বা কাঁচামালের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পণ্যের দাম বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু রপ্তানি পণ্যের ক্ষেত্রে বিষয়টি সহজ নয়।
উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, একজন বাংলাদেশি পোশাক রপ্তানিকারক ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতার সঙ্গে অর্ডারের দাম নির্ধারণ করলেন। এরপর দেশের অভ্যন্তরে হঠাৎ ডিজেলের দাম ২০ টাকা বেড়ে গেল। তখন ক্রেতাকে বাড়তি খরচ হিসেবে বাড়তি দাম দিতে রাজি করানো যায় না। তখন বাড়তি ব্যয়ের বড় অংশ উদ্যোক্তার ওপর পড়ে।
মাহমুদ হাসান খান বলছেন, “জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি পোশাক শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়াবে এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতার ওপর আরও চাপ তৈরি করবে। বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি শুধু একটি কারখানার মুনাফা কমার ঝুঁকি নয়। রপ্তানি বাজারে একই পণ্যের জন্য ক্রেতা যদি ভিয়েতনাম, ভারত বা অন্য কোনো দেশ বেছে নেওয়ার সুযোগ পান, তখন বাড়তি খরচের কারণে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে বাংলাদেশ।”
ভোক্তার ঘাড়ে বাড়তি দাম চাপালে কমতে পারে চাহিদা
ব্যবসায়ীরা চাইলে বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ পণ্যের দাম বাড়িয়ে ভোক্তার ওপর চাপাতে পারেন। কিন্তু এখানেও সমস্যা আছে। কারণ পণ্যের দাম বাড়লে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কয়েক দিনের মধ্যেই বিভিন্ন রুটে পরিবহন ব্যয় বাড়তে শুরু করেছে। বাস ভাড়াও বেড়ে গেছে। পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন রুটে হাজার হাজার টাকা বাড়তি খরচ হচ্ছে। তাই একই সঙ্গে দুটি চাপ তৈরি হচ্ছে। একদিকে ব্যবসার খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে পণ্যের দাম বাড়লে বাজারে চাহিদা কমার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রথম ধাক্কা পড়বে পরিবহন, সেচ ও পণ্য বিতরণ ব্যয়ে। দ্বিতীয় ধাপে খাদ্য, সেবা ও মজুরি প্রত্যাশার ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। সীমিতভাবে পণ্যের দাম বাড়ানোর ক্ষমতা থাকা কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে বাড়তি লজিস্টিকস ও ইউটিলিটি ব্যয় মুনাফা এবং উৎপাদন সক্ষমতার ওপর চাপ ফেলবে।
নতুন বিনিয়োগের বদলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ
জ্বালানি তেলের দামবৃদ্ধির আরেকটি প্রভাব পড়তে পারে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে। কারণ ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বাড়লে উদ্যোক্তার হাতে নতুন কারখানা, নতুন মেশিন বা সম্প্রসারণে বিনিয়োগ করার মতো অর্থ কমে যায়।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ চরচাকে বলেন, “উচ্চ মূল্যস্ফীতি, পর্যাপ্ত গ্যাস-বিদ্যুৎ না পাওয়া এবং বেসরকারি খাতে কম ঋণপ্রবাহের মধ্যে ১৫ শতাংশের বেশি জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি সব খাতে বাড়তি চাপ তৈরি করবে। এতে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়বে, ব্যবসার কার্যক্রম সংকুচিত হতে পারে এবং কর্মসংস্থানেও চাপ পড়তে পারে।” ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাসকিন আহমেদও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সময় ও মাত্রা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, “সরকার শেষ পর্যন্ত দাম বাড়াবে, এটি ব্যবসায়ীরা জানতেন। কিন্তু কখন এবং কতটা বাড়ানো হলো, সেটিই উদ্বেগের বিষয়।”
এফবিসিসিআইয়ের সাম্প্রতিক এক সভাতেও ব্যবসায়ীরা উৎপাদনমুখী কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছিলেন। তারা জানিয়েছিলেন, জ্বালানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন হলে উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হবে।
খরচ কমাবে কে?
সরকারের যুক্তি, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। সরকার বলছে, দাম না বাড়ালে ভর্তুকির বোঝা আরও বাড়ত। সর্বশেষ দাম সমন্বয়ের পরও ডিজেলে সরকারকে প্রতি লিটারে ভর্তুকি দিতে হবে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী।
কিন্তু ব্যবসার হিসাবটি ভিন্ন। রাষ্ট্রীয় জ্বালানি সংস্থার লোকসান কমাতে গিয়ে যদি শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, পরিবহন ব্যয় বাড়ে, রপ্তানি আয় কমে, ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা কমে এবং বিনিয়োগ স্থবির হয়, তাহলে অর্থনীতির অন্য প্রান্তে নতুন ধরনের চাপ তৈরি হয়।
সাম্প্রতিক দামবৃদ্ধির পর সেই চাপের প্রথম চিত্রও দেখা যাচ্ছে। পরিবহন ভাড়া বাড়ছে, আইসিডির চার্জ বেড়েছে, শিল্প উদ্যোক্তারা বাড়তি উৎপাদন ব্যয়ের কথা বলছেন এবং রপ্তানিকারকেরা প্রতিযোগিতা হারানোর আশঙ্কা করছেন। একই সময়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও কম চাহিদার কারণে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারও চাপে পড়তে পারে।
তাই ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, তেলের দাম বৃদ্ধির আসল পরীক্ষা পাম্পে নয়, হবে কারখানায়। কতটা বাড়বে উৎপাদন খরচ, কতটা কমবে মুনাফা, কতটা বাড়বে পণ্যের দাম, আর কতটা কমবে নতুন বিনিয়োগ, তার ওপরই নির্ভর করবে এই দামবৃদ্ধির প্রকৃত অর্থনৈতিক ক্ষতি।