ব্রাজিলে সপ্তাহান্তের বহুল আলোচিত নির্বাচনে সবচেয়ে বড় জয় পাওয়া ব্যক্তি ব্যালটেই ছিলেন না।
দেশটিতে নির্বাচিত হওয়ার অধিকার হারানো সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারো বর্তমানে গৃহবন্দী। ২০২২ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পর অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রের দায়ে তাকে ২৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ৭১ বছর বয়সী বোলসোনারো গতকাল রোববার গৃহবন্দী অবস্থায় দেখেছেন, তার বড় ছেলে সিনেটর ফ্লাভিও বোলসোনারো বামপন্থী প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফায় অপ্রত্যাশিত জয় পেয়েছেন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
এই ফলাফলকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা গোটা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া ডানপন্থী ঢেউ এবং লুলার প্রচারণায় নিজের দলের কিছু ভুল পদক্ষেপের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। এর ফলে ২৫ অক্টোবরের দ্বিতীয় দফার ভোটে ফ্লাভিওকে জয়ের ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকা প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই চমকপ্রদ জয় বোলসোনারোর ভাগ্যের নাটকীয় পরিবর্তন ঘটিয়েছে। একই সঙ্গে পুনর্বাসিত বোলসোনারো পরিবার ও তাদের আদর্শিক আন্দোলন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
বোলসোনারোর ডানপন্থী লিবারেল পার্টির প্রার্থীরা বিভিন্ন স্তরের নির্বাচনে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে। এতে তার আইনি জটিলতা সত্ত্বেও বোলসোনারো নামের রাজনৈতিক প্রভাব যে বাড়ছে, তা স্পষ্ট হয়েছে। জানুয়ারিতে নতুন কংগ্রেস দায়িত্ব নেওয়ার পর এই আইনি জটিলতার কিছু সমাধান হতে পারে। নতুন কংগ্রেসে ডানপন্থীদের শক্ত অবস্থান রয়েছে।
ফ্লাভিওর চমকপ্রদ সাফল্যের পাশাপাশি রোববার বোলসোনারোর পরিবারের আরও চার সদস্যও নির্বাচিত হয়েছেন। সাবেক প্রেসিডেন্টের স্ত্রী মিশেল বোলসোনারো এবং দ্বিতীয় ছেলে কার্লোস সিনেটের আসনে জয় পেয়েছেন। আর ভাই রেনাতো ও ছোট ছেলে জাইর রেনান নিম্নকক্ষে আসন পেয়েছেন।
২০১৮ সালে সাবেক প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা হস্তান্তরকারী দলের সদস্য হিসেবে কাজ করা রাজনৈতিক বিশ্লেষক আন্তোনিও ফ্লাভিও তেস্তা বলেন, “ব্রাজিলের রাজনৈতিক ইতিহাসে একসঙ্গে এতজন সদস্যকে নির্বাচিত করতে পেরেছে, এমন কোনো রাজনৈতিক পরিবার বা গোষ্ঠীর কথা আমার মনে পড়ে না।”
ডিসেম্বরে সাবেক প্রেসিডেন্ট যখন তার ছেলেকে ব্রাজিলের সর্বোচ্চ পদে প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করেন, তখন বাজারে দরপতন দেখা দেয় এবং মধ্য-ডানপন্থী মিত্ররা তা ভালোভাবে নেয়নি। ফ্লাভিও তার নিজের দলের স্বল্পপরিচিত আইনপ্রণেতা আলফ্রেদো গাসপারকে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী করেন। কারণ বড় কোনো দলই তাদের নির্বাচনী জোটে যোগ দিতে রাজি হয়নি।
ফ্লাভিওর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র তার বাবা প্রকাশ্যে এমনকি ভার্চুয়ালভাবেও প্রচারণায় অংশ নিতে পারেননি। তারপরও পুরো নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তার প্রভাব ছিল ব্যাপক। ফ্লাভিওর নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর অনুষ্ঠানে বয়োজ্যেষ্ঠ বোলসোনারোর এআই–নির্মিত অবয়ব দিয়ে ফ্লাভিওর পক্ষে একটি বিতর্কিত সমর্থনবার্তা দেওয়া হয়।
আসল জাইর বোলসোনারো মার্চ থেকে কারাগারে সাজা ভোগের বদলে গৃহবন্দী রয়েছেন। ২০১৮ সালে ছুরিকাঘাতে আহত হওয়ার পর থেকে তার শারীরিক নানা জটিলতা রয়েছে। গত তিন মাস ধরে সুপ্রিম কোর্ট তার বড় ছেলে ফ্লাভিওর বাবার সঙ্গে দেখা করাও নিষিদ্ধ রেখেছিল।
রোববার তাদের লিবারেল পার্টি ৮১ সদস্যের সিনেটে নিজেদের আসন প্রায় দ্বিগুণ করে ২৮টিতে উন্নীত করেছে। ১৯৮০-এর দশকে ব্রাজিল গণতন্ত্রে ফিরে আসার পর সংবিধান প্রণীত হওয়ার সময় থেকে কোনো দলের জন্য এটি সিনেটে সবচেয়ে শক্তিশালী ফল।
ফ্লাভিওর ঘনিষ্ঠ এক সহযোগী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এর ফলে আগামী বছর কংগ্রেসের আলোচ্যসূচির শীর্ষে থাকবে বয়োজ্যেষ্ঠ বোলসোনারোর জন্য সাধারণ ক্ষমা বা অ্যামনেস্টির বিষয়টি। ফ্লাভিও নির্বাচনে জিতলে এবং বর্তমান কংগ্রেস নতুন সরকারের অনুকম্পা পাওয়ার চেষ্টা করলে এ বিষয়ে ভোট আরও আগেই হতে পারে।
সেপ্টেম্বরের শুরুতে ফ্লাভিও বলেছিলেন, তিনি আশা করেন শপথ নেওয়ার সময় তার বাবা পাশে থাকবেন। তিনি বলেন, “আমি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি, আগামী বছর প্রেসিডেন্ট জাইর মেসিয়াস বোলসোনারোর সঙ্গে প্লানালতো প্রাসাদের সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সুযোগ যেন পাই।”
রোববারের ভোটে বোলসোনারো ও লুলা যথাক্রমে ৪৭ শতাংশ ও ৪৫ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। ফলে দ্বিতীয় দফার ভোটে তারা মুখোমুখি হচ্ছেন। রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান থিংক পলিসি বলেছে, লুলার জন্য জয় পাওয়া হবে “খুব কঠিন, তবে অসম্ভব নয়”।
থিংক পলিসির হিসাব অনুযায়ী, প্রথম দফায় ফ্লাভিও ছাড়া অন্য রক্ষণশীল প্রার্থীদের যারা ভোট দিয়েছেন, তাদের ৬২ শতাংশ ভোট লুলাকে পেতে হবে।
ফ্লাভিওর জয়ের সম্ভাবনা জোরালো হওয়ায় লিবারেল পার্টির প্রেসিডেন্ট ভালদেমার দা কোস্তা নেতো রয়টার্সকে বলেছেন, বয়োজ্যেষ্ঠ বোলসোনারো তার ছেলের সরকারের অধীন আবারও সরকারে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেন।