মরক্কোর রাজনীতিতে ঘটেছে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। দেশটি প্রথমবারের মতো একজন নারীকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পেয়েছে। মরক্কোর রাজা গত সপ্তাহে ফাতিমা এল মানসুরিকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন।
প্রশ্ন হলো কেন তাকে বেছে নেওয়া হলো?
এর পেছনে রয়েছে সাম্প্রতিক আইনসভা নির্বাচনের ফল। নির্বাচনে ফাতিমা এল মানসুরির দল সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েছে। ৩৯৫ আসনের সংসদে দলটির দখলে এসেছে ৯৫টি আসন। সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়ার পর ফাতিমা এল মানসুরির দল সরকার গঠনের সুযোগ পায়। এরপরই রাজা তাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন।
একজন নারী দেশের সরকারপ্রধান হওয়া নিঃসন্দেহে মরক্কোর জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। কিন্তু এই পরিবর্তন কি সত্যিই দেশটির নারীদের অবস্থানে বড় কোনো প্রভাব ফেলবে? শুধু একজন নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়াই কি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে লৈঙ্গিকসমতা নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট? এই প্রশ্নই এখন সামনে আসছে।
মানসুরির হাতে সত্যিকারের ক্ষমতা কতটা?
ফাতিমা এল মানসুরির নিয়োগ নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য। কারণ, তিনিই মরক্কোর ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে আরব বিশ্বের তৃতীয় নারী, যিনি এই পদে বসেছেন। তবে তার আগে এই পদে থাকা দুই নারীর মতোই এল মানসুরির ভূমিকাও মূলত আনুষ্ঠানিক। তার আগে তিউনিসিয়ার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন নাজলা বুদেন। ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তিনি ওই দায়িত্বে ছিলেন। এরপর তিউনিসিয়ার বর্তমান সরকারপ্রধান সাররা জাফারানি এই পদে আসেন। এমনটা বলা হয়েছে আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কার্নেগি এন্ডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে।
তাহলে একজন নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়া কি সত্যিই বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে? বিষয়টি বুঝতে হলে আগে মরক্কোর রাজনৈতিক কাঠামোটা দেখা দরকার।
এখানে প্রশ্ন ওঠে মরক্কোর ক্ষমতা আসলে কার হাতে?
মরক্কো একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্র। দেশটিতে সংসদ ও স্বাধীন বিচার বিভাগ রয়েছে। তবে রাষ্ট্রের চূড়ান্ত ক্ষমতা রাজার হাতে।
প্রধানমন্ত্রীর সীমিত কিছু ক্ষমতা রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো মন্ত্রিসভায় থাকা মন্ত্রীদের প্রস্তাব করা। এই মন্ত্রিসভাই রাষ্ট্রদূত, গভর্নরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেয় এবং বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আইন অনুমোদন করে।
কিন্তু মন্ত্রিসভার প্রধান হিসেবে রাজা এসব নিয়োগে ভেটো দিতে পারেন। এমনকি কোনো মন্ত্রীকে বরখাস্ত করার ক্ষমতাও তার রয়েছে। শুধু তাই নয়, সশস্ত্র বাহিনীর ওপরও রাজার নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। সরকারকে পাশ কাটিয়েও তিনি নিজের উদ্যোগে সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব দিতে পারেন।
এমনকি সংসদ ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতাও রাজার হাতে রয়েছে। আর সংসদ ভেঙে দিলে তার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীকেও পদ ছাড়তে হতে পারে।
অর্থাৎ, মরক্কোর প্রধানমন্ত্রী সরকার পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও রাষ্ট্রের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তার হাতে নেই। তাই একজন নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এল মানসুরির নিয়োগ ঐতিহাসিক হলেও, এই পদটির সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতাও গুরুত্বপূর্ণ।
রাজতন্ত্রের বাইরে কতটা স্বাধীন হবেন এল মানসুরি?
আরেকটি বিষয়ও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ফাতিমা এল মানসুরির দল পার্টি অব অথেনটিসিটি অ্যান্ড মডার্নিটি (পিএএম) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রাজার শীর্ষস্থানীয় একজন উপদেষ্টা। দলটি এখনও রাজপ্রাসাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে চলছে।
এল মানসুরি দলটি প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই পিএএমের সঙ্গে যুক্ত। তাই তিনি রাজতন্ত্রের প্রভাবের বাইরে থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করবেন, এমন প্রত্যাশা খুব একটা নেই।
তাহলে সাম্প্রতিক বিক্ষোভে যে সমস্যাগুলো সামনে এসেছে, সেগুলো সমাধানের মতো অবস্থানে কি এল মানসুরি আছেন?
উত্তরটা একই সঙ্গে হ্যাঁ এবং না
এল মানসুরির রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা অবশ্য কম নয়। তিনি দুইবার মারাকেশের মেয়র ছিলেন। পাশাপাশি পার্লামেন্ট মেম্বার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। আর তার সাম্প্রতিক দায়িত্বের কথাও গুরুত্বপূর্ণ। এর আগে তিনি জাতীয় ভূমি পরিকল্পনা, নগর উন্নয়ন, আবাসন ও নগরনীতি বিষয়ক মন্ত্রী ছিলেন।
এই দায়িত্ব পালনের কারণে সাম্প্রতিক বিক্ষোভের পেছনে থাকা বেশ কিছু সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার সঙ্গে তিনি সরাসরি পরিচিত। এসব সমস্যার মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার দুর্বল অবকাঠামো, বাড়তে থাকা বেকারত্ব এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি।
এসব সমস্যাই গত আগস্টে কয়েক হাজার মরক্কোর মানুষকে স্পেনে যাওয়ার চেষ্টা করতে প্রভাবিত করেছিল।
তবে সরকারের বাজেটের কোন খাতে কত অর্থ ব্যয় হবে, তা নিয়ে আলোচনায় এল মানসুরি ভূমিকা রাখতে পারবেন। জনসাধারণের দাবিগুলো নিয়েও তিনি অন্তত প্রকাশ্যে কথা বলতে পারবেন।
কিন্তু এখানেই তার অতীতের একটি ঘটনা সামনে আসে।
২০২৩ সালে ভয়াবহ আল হাউজ ভূমিকম্পের সময় এল মানসুরি একই সঙ্গে মারাকেশের মেয়র ও আবাসনমন্ত্রী ছিলেন। সেই ভূমিকম্পের তিন বছর পরও বহু মানুষ পর্যাপ্ত নিরাপদ আশ্রয় পায়নি এবং তাদের কাছে সহায়তাও পৌঁছেছে সীমিতভাবে। কিছু পরিবারকে বাধ্য হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে ফিরে যেতে হয়েছে। আবার কেউ কেউ কোনো সহায়তাই পায়নি।
ফলে সাম্প্রতিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় এল মানসুরির রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি অতীতের দায়িত্ব পালনের রেকর্ডও তার সামনে বড় প্রশ্ন হিসেবে থাকছে।
সাম্প্রতিক বিক্ষোভের পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইসরায়েলের সঙ্গে মরক্কোর সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ধারাবাহিকতা।
সম্প্রতি দুই দেশ দূতাবাস স্থাপন এবং পরস্পরের দেশে রাষ্ট্রদূত বিনিময়ের বিষয়ে সম্মত হয়েছে। এই সিদ্ধান্তও মরক্কোর মানুষের মধ্যে ক্ষোভের একটি কারণ হয়ে উঠেছে।
তবে এই বিষয়ে ফাতিমা এল মানসুরির কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকবে না।
মানসুরির সামনে কী কী চ্যালেঞ্জ?
ফাতিমা এল মানসুরির সামনে সবচেয়ে বড় কাজগুলোর একটি হবে ২০৩০ সালের বিশ্বকাপের জন্য মরক্কোকে প্রস্তুত করা। স্পেন ও পর্তুগালের সঙ্গে যৌথভাবে এই বিশ্বকাপ আয়োজন করবে মরক্কো।
তবে বিশ্বকাপ আয়োজন ঘিরে আগেই প্রশ্ন উঠেছে। গত বছর জেন জি ২১২ আন্দোলনের পেছনে থাকা ক্ষোভের একটি কারণ ছিল আফ্রিকা কাপ অব নেশনস ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজনের প্রস্তুতিতে সরকারের অব্যবস্থাপনা এবং সম্পদের ভুল অগ্রাধিকার।
তখন হাজারো মরক্কোর মানুষ, বিশেষ করে তরুণরা, স্লোগান দিয়েছিল, “তরুণরা বিশ্বকাপ চায় না! তারা চায় স্বাস্থ্য! তারা চায় শিক্ষা!”
তাদের ক্ষোভ ছিল, সরকার যখন বড় বড় স্টেডিয়াম তৈরি ও সংস্কার এবং অন্যান্য প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে, তখন হাসপাতাল ও স্কুলগুলোর অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
বিশ্বকাপ যত এগিয়ে আসবে, এই প্রশ্নও তত জোরাল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ একদিকে তরুণদের আর্থসামাজিক পরিস্থিতির উন্নতি করতে হবে, অন্যদিকে বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তুতিতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হবে। এল মানসুরির জন্য একই সঙ্গে দুটি কাজ এগিয়ে নেওয়া কঠিন হবে।
এল মানসুরির সামনে আরেকটি রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হলো ইসলামপন্থী জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির (পিজেডি) শক্তি বৃদ্ধি। পিএএমের সঙ্গে দলটির দীর্ঘদিনের আদর্শিক বিরোধ রয়েছে।
২০১১ সালে আরব বসন্তের পর গঠিত প্রথম দুটি সরকারে নেতৃত্ব দিয়েছিল পিজেডি। তবে ২০২১ সালের নির্বাচনে দলটি প্রায় সব আসন হারায়। সেপ্টেম্বরের নির্বাচনে অবশ্য দলটি আবার কিছুটা শক্তি ফিরে পেয়েছে। এবার তারা চতুর্থ অবস্থানে থেকে সংসদে নিজেদের আসন ১৩টি থেকে বাড়িয়ে ৫৪টিতে নিয়েছে। এল মানসুরিকে জোট সরকার গঠন করতে হবে। বড় কোনো একটি দল তার সঙ্গে জোটে না এলে সরকার গঠনের জন্য পিজেডির সমর্থনও প্রয়োজন হতে পারে।
নারীদের জন্য কী বার্তা?
এল মানসুরি তার নিয়োগকে ‘রাজ্যের সব নারীর প্রতি একটি বার্তা’ হিসেবে তুলে ধরেছেন। কিন্তু তিনি আসলে কী বার্তা দিতে চাইছেন? আর বাস্তবে মানুষ এটিকে কীভাবে দেখবে? তার নিয়োগের মাধ্যমে যে বার্তাটি দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, তা হলো লিঙ্গসমতার পথে মরক্কো আরও এক ধাপ এগিয়েছে।
তবে দেশটির বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় এই নিয়োগ খুব বড় পরিবর্তন আনবে বলে মনে করছেন না বিশ্লেষকেরা। মরক্কো এখনও একটি অত্যন্ত রক্ষণশীল দেশ। একই সঙ্গে লিঙ্গসমতার ক্ষেত্রে দেশটি বিশ্বের পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর একটি হিসেবে তালিকাভুক্ত।
অর্থাৎ, একজন নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়া ঐতিহাসিক ঘটনা হলেও, শুধু এই নিয়োগের মাধ্যমে মরক্কোর নারীদের সামগ্রিক অবস্থানে বড় পরিবর্তন আসবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
আরেকটি বিষয়ও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ফাতিমা নিজেই মরক্কোর অভিজাত শ্রেণির অংশ। তার বাবা ছিলেন মারাকেশের জমিদার। তাকে ‘মারাকেশের পাশা’ নামেও ডাকা হতো। তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতে মরক্কোর রাষ্ট্রদূত হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। অন্যদিকে, এল মানসুরি পড়াশোনা করেছেন ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রে।
নির্বাচনের আগে তার দল পিএএমের বিরুদ্ধেও বেশ কয়েকটি দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এর মধ্যে ছিল মাদক পাচার–সংক্রান্ত একটি কেলেঙ্কারি। ওই ঘটনায় দলের একাধিক নেতা গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে গেছেন।
তাই এল মানসুরি নিজেকে ‘সাধারণ মরক্কোর মানুষের’ প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরলে তা খুব বেশি গ্রহণযোগ্যতা পাবে না বলেই মনে করা হচ্ছে।
নির্বাচনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল ভোটার উপস্থিতি। নিবন্ধিত ভোটারদের মাত্র ৩৮ শতাংশ ভোট দিয়েছেন। ২০০৭ সালের পর এটিই ছিল সবচেয়ে কম ভোটার উপস্থিতি। এর একটি কারণ হিসেবে তরুণদের ভোট বর্জনের কথা বলা হয়েছে।
অর্থাৎ, ফাতিমা ও তার সরকার এমন একটি জনগোষ্ঠীর মুখোমুখি হচ্ছেন, যাদের একটি বড় অংশের মধ্যেই সরকারের প্রতি আগে থেকেই অবিশ্বাস রয়েছে।
এখন নতুন সরকারের সামনে শুধু নীতিগত ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জই নয়, মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার কাজটিও বড় হয়ে উঠেছে।