সরকারি কোষাগার থেকে বেতন ভাতা গ্রহণকারী বেসামরিক, সামরিক ও বিচার বিভাগীয় কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করে সম্প্রতি কয়েকটি আদেশ জারি করা হয়েছে। আদেশগুলো সমসাময়িক কালে বহুল আলোচিত সরকারি কমচারীদের বেতন ভাতা বৃদ্ধি সংক্রান্ত। এরই ধারাবাহিকতায় এ সুবিধাদি স্বায়ত্ত্বশাসিত সংস্থাসহ সরকারি অনুদানে চলে এমন সব প্রতিষ্ঠানেও প্রযোজ্য হওয়ার কথা। বৃদ্ধির কারণ বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচিত হয়েছে।
এর আগের বেতন-ভাতা কার্যকরী হয়েছিল ২০১৫ সনে। জাতীয় সংসদের বিগত বাজেট অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বেতন ভাতাদি বৃদ্ধি প্রসঙ্গে এর যৌক্তিকতা তুলে ধরেছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত বেতন কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধন, সংযোজন, পরিমার্জন এর মাধ্যমে হাল আমলের বেতন স্কেলটি ঘোষণা করা হয়েছে। এতে ন্যূনতম বেতন বাড়বে শতভাগ। নিচের দিকের পদে প্রায় দেড়শত ভাগ। অবসরজীবীদের পেনশনও কিছুটা বাড়ানো হয়েছে। সে বিষয়ে ভিন্ন নিবন্ধে আলোচনা করা হবে।
বেতন-ভাতা বৃদ্ধি নিয়ে দীর্ঘদিনই আলোচনা চলছিল। এ ধরনের বৃদ্ধি বাজার মূল্য বৃদ্ধিকে আরও উসকে দিতে পারে বলে কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন। একে অমূলক বলার সুযোগ নেই। তবে গত ১১ বছরে বেতন-ভাতা কোনো রকম বৃদ্ধি না হলেও দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধি থেমে থাকেনি। অন্যদিকে বেতন বৃদ্ধির প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের দুর্দশা কিছুটা লাগব করবে। উল্লেখ করতে হয়, বেতন বৃদ্ধি কার্যকর হবে চার দফায় ২ বছরে। তবুও বিভিন্ন চ্যলেঞ্জের মুখে সরকারের এ সাহসী সিদ্ধান্ত প্রশংসনীয়।
এটা বাস্তবায়নে যে সব সমস্যা সামনে আসবে তার একটি-বাড়তি টাকার সংস্থান। পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন হলেও এ পরিমাণ টাকার যোগান রাজস্ব থেকে হবে কি না এ বিষয়ে কেউ কেউ সংশয় প্রকাশ করছেন। তবে উল্লেখ করতে হয়, বর্ধিত বেতন-ভাতার একটি অংশ আয়কর হিসাবে সরকারি কোষাগারেই আসবে। অন্যদিকে কর্মচারীদের সচ্ছলতা তাদের ব্যায়ের ক্ষমতা বাড়িয়ে বাজারকে অধিক গতিশীল করতেও ভূমিকা রাখতে পারে। সেখানেও সরকারের ভ্যাট ও কর ইত্যাদি কিছুটা বেড়ে যাবার কথা। তাই টাকার সংস্থান গুরুত্বপূর্ণ কোনো নেতিবাচক অবস্থায় থাকবে বলে মনে হয় না। এর পর থাকছে সরকারি খাত থেকে যারা বেতন ভাতা পান না তাদের বিষয়টি। এর বিভিন্ন দিক আছে। শিল্প খাতে যারা কাজ করেন তাদের জন্য বর্তমান বেতন স্কেলের ধারাবাহিকতায় একটি মজুরি কমিশন ও সহসাই গঠন করা দরকার। তেমনি গণমাধ্যম কর্মীদের জন্য দরকার ওয়েজ বোর্ড। এ সব খাতে যৌক্তিক পরিমাণে বেতন ভাতা বাড়াতে হবে।
বেসরকারি শিল্পের বেতন ভাতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিলেই আমাদের শিল্পপতিরা তাদের প্রতিযোগিতার সুযোগ কমে যাবার আশংঙ্কা করেন। দেখা যায় চীন, ভিয়েতনাম এ সব দেশে শ্রমিকের মজুরি আমাদের চেয়ে অনেক বেশি হয়েও তারা আন্তর্জাতিক বাজারে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগী হিসেবে থাকছে। আর গণমাধ্যমের বিষয়ে শুধু ওয়েজ বোর্ডের ঘোষণা দিলে হবে না। সকল সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক মাধ্যম যাতে এটা প্রয়োগ করতে বাধ্য হয় সরকারকে সে ব্যবস্থা নিতে হবে। বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো ভালো বেতন দিয়েও প্রতিযোগিতায় থাকছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলিকেও সে সংস্কৃতি চর্চা করতে হবে।
প্রজাতন্ত্রের সর্বনিম্ন পর্যায়ের একজন কর্মচারী বেতন স্কেল পুরোপুরি কার্যক্রম হলে মাসে প্রায় ৩৩ হাজার টাকা পাবেন। এরকম পাওয়ারই কথা। বেতন কমিশন ৫ সদস্যের পরিবারের খরচকে ভিত্তি ধরে তাদের সুপারিশ করেছে। এতে জনপ্রতি আসছে ৬ হাজার ৫০০ টাকা। দারিদ্র সীমার সামান্য উপরে। উল্লেখ করতে হয়, ভারত সরকারের একই স্তরের একজন কর্মচারী ২৮ থেকে ৩০ হাজার রুপি বেতনাদি পান। তার পরও তাদের রয়েছে রেশনের ব্যাপক সুবিধা। দাবি করা হয়, আমাদের এখন মাথাপিছু বার্ষিক গড় আয় ৩ হাজার ২০ মার্কিন ডলার। পক্ষান্তরে ভারতে এটা ২ হাজার ৮১৩ মার্কিন ডলার। তাহলে সহজেই বোঝা যায়, এ দেশে আয় বৈষম্য কতটা প্রকট। আমাদের দেশে উপরের দিকে যারা বেতন পান তারাও সকলেই অসৎ নয়।
বর্তমান বাজার দরের তুলনায় তাদের বেতনও অতি নগন্যই ছিল। এমনকি প্রতিবেশি ভারতের তুলনায় তা ছিল হাস্যকর। বর্তমান বৃদ্ধি তাদের একটু নিশ্বাস ফেলার সুযোগ করে দিল। আর বেতন বৃদ্ধি করলেও দুর্নীতি কমবে না এমন কথা বলা হয়। এটা ধরেই নিলাম। অন্যদিকে বেতন যারা বেশি পাবে তারাও আগে দুর্নীতিপরায়ণ থাকলে এখনো তাই থাকতে চাইবে। যে দেশে দুর্নীতি লব্ধ অর্থ ভোগের সুযোগ আছে সেখানে দুর্নীতি কমানো যায় না। এটা কমাতে হলে সরকারের রাজনৈতিক প্রত্যয়ের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দৃঢ়, কার্যকরী ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ দরকার।
বেসামরিক চাকুরেদের খাতওয়ারি একটি পরিসংখ্যান আলোচনা প্রাসঙ্গিক। এখন এখানে কর্মরত রয়েছে প্রায় ১৪ লাখ ৬৪ হাজার। এর মাঝে প্রাথমিক শিক্ষায় ৩ লাখ ৯৮ হাজার। পুলিশে ২ লাখ ২০ হাজার আর স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণে ১ লাখ ১৬ হাজার। এ সব তথ্যগুলো জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের। শিক্ষা খাতে প্রাথমিক শিক্ষকদের বাইরেও মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা খাত যুক্ত হবে। পাশাপাশি আসবে এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা। আর এ সকল খাতই অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এগুলিকে নিছক ব্যয় না বলে বিনিয়োগই বলা চলে।
দেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে ধরে রাখা ও ক্রমান্বয়ে উন্নত করার জন্যে পুলিশের বিকল্প কোনো কিছু চিন্তা করা যায় না। তবে বলা যেতে পারে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা বেতন ভাতা পেয়েও প্রত্যাশিত নাগরিক সেবা প্রদান করে না।
অনেকক্ষেত্রেই অভিযোগটি অসত্য এমন বলার সুযোগ নেই। বরং ক্ষেত্র বিশেষে শোচনীয় রকমের ব্যত্যয় লক্ষ্য করা যায়। এখন রাষ্টের দায়িত্বশীল কোনো কোনো মহল তাদের বড় অংশকে ‘চোর’ বলেও উল্লেখ করছেন। এমন বলাটা অশোভন এবং সৎ কর্মচারীদের জন্যে পীড়াদায়ক। তদুপরি উক্ত কথার জবাবে যৌক্তিক ভাবে বলা যায় ‘চুরি’ বন্ধ করার জন্যে যদি দৃঢ় রাজনৈতিক প্রত্যয় থাকে তবে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা এমনটা করতে পারে না। কিন্তু বাস্তব অবস্থাতো বেশ কিছু ক্ষেত্রে এ প্রত্যয়ের সাথে সংগতিপূর্ণ মনে হয় না।
দু বছর পর যখন এ বেতন স্কেল পুরো কার্যকর হবে তখন মুদ্রাস্ফীতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে সেটা দেখার বিষয়। এর মাঝে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। বাড়ানো ছাড়া হয়তো উপায়ও ছিল না। তবে এর ফলে বাড়বে সকল ধরনের পরিবহন ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়সহ ভোগ্যপণ্যের দাম। আন্তর্জাতিক বাজারের উপর জ্বালানি তেলের দাম পুরোটাই নির্ভরশীল। তাই বেতন না বাড়ালেও এটা হয়তোবা বাড়াতেই হতো। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় সামষ্টিক অর্থনীতির কয়েকটি খাত ইতিবাচক পেয়েছে। যেমন ভালো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও স্থিতিশীল মূল্যস্ফীতি। তবে ব্যাংক খাত দু বছর আগে থেকেই যে বিপর্যস্ত ছিল তার তেমন উন্নতি ঘটেনি।
অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অন্য অনেক দেশের মতো আমাদের অর্থনীতিকেও ক্ষত-বিক্ষত করে ফেলেছে। এর মাঝেও সরকার সাহস করে বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে বেতন বৃদ্ধির মতো একটি যৌক্তিক সিদ্ধান্ত যথাযথ পর্যালোচনার মাধ্যমে নিয়েছে। এখন প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের উচিত হবে যারা এ ব্যয় ভার বহন করবে সে করদাতা জনগণকে প্রত্যাশিত সেবা দেওয়া।
আলী ইমাম মজুমদার: অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা