২০২৪-এর পর থেকে এই অন্তর্ভুক্তিমূলক শব্দটা আমরা বেশি শুনছি। এটা ভালো লক্ষণ। কিন্তু যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল এবং শিডিউলড কাস্টের ব্যাপারে, নিম্নবর্গের ব্যাপারে অন্তর্ভুক্তিমূলকের দশা কিন্তু খুবই খারাপ। এখানে ছোট দুটো উদাহরণ দিই—
আমি কিছুদিন আগে বরিশালের আগৈলঝাড়া, ওয়াইজনগর গিয়েছিলাম যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের বাড়িতে। সেখানে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের কোনো চিহ্নও নেই। যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল নামে যে কেউ ছিলেন, তা বোঝার অবস্থা নেই। কোনো সাইনবোর্ড নেই। যোগেন মণ্ডলের যে বসতভিটা আছে, সেখানে এখন অন্যদের বসবাস। সেই বসতভিটায় যাওয়ার পথে একটা ছোট খাল আছে। ওইটার ওপর মাত্র একটা বাঁশ দিয়ে সাঁকো বানানো।
অর্থাৎ, ঢাকা থেকে শহরের মানুষজন কেউ গেলে ওই সাঁকো দিয়ে সেই বাড়িতে যেতে পারবে না। অথচ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল একসময় মন্ত্রী ছিলেন। তখন তিনি এই এলাকায় অনেক স্কুল-কলেজ করেছেন। কিন্তু এখন ওনার এলাকায় ওনার কোনো চিহ্ন নাই। এই হলো ওনার অবস্থা।
আরেকটা উদাহরণ দিই–
এ বছর আমাদের দেশে একটা বহুল আলোচিত নির্বাচন হলো। এই নির্বাচন ছিল অংশগ্রহণমূলক, অন্তর্ভুক্তিমূলক। কিন্তু এই ৩০০ আসনের নির্বাচনে অমুসলিম; অর্থাৎ, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কয়জন নির্বাচিত হয়েছেন? উত্তর হলো– চারজন। তার মধ্যে দুজন হিন্দু, দুজন বৌদ্ধ।
এই যে দুজন হিন্দু নির্বাচিত হলো, তারা কিন্তু শিডিউলড কাস্ট বা নিম্নবর্গের কেউ না। শিডিউলড কাস্ট থেকে এবারের সংসদে প্রতিনিধিত্ব একদম শূন্য! বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম জাতীয় সংসদে শিডিউলড কাস্টের কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই।
এখন বাংলাদেশের যা আয়তন, পূর্ব বাংলা; অর্থাৎ, পূর্ব পাকিস্তানেরও কিন্তু ততটুকই আয়তন ছিল। পূর্ব পাকিস্তানে যখন প্রথম প্রাদেশিক নির্বাচন হয় ১৯৫৪ সালে, তখন ৩০৯ আসনের ভেতর সংখ্যালঘুদের আসন ছিল ৭২টি। তার মধ্যে ৩৭ জন ছিলেন শিডিউলড কাস্ট। কিন্তু সেই সংখ্যা এখন ৩৭ থেকে ০-তে এসে পড়েছে। এটা হলো জাতীয় পর্যায়ের চিত্র। আর যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের বাড়ির অবস্থা তো আগেই বললাম।
এখন প্রশ্ন হলো–এই যে অন্তর্ভুক্তি নিয়ে এত কথা হচ্ছে, তাহলে অন্তর্ভুক্তিমূলকের অবস্থাটা কি দাঁড়াচ্ছে? এই অন্তর্ভুক্তি নিয়ে এত কথা হওয়ার জন্য হয়তো আমরা আজকে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল নিয়ে একটা আলোচনা সভা পেয়েছি।
২০২৪-এর অভ্যুত্থানের পরে সম্প্রতি ১৯৪৭ সাল নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। এটা একটা ভালো লক্ষণ। এবারে আসি ১৯৪৭-এ মুসলিম লীগ পূর্ববাংলাকে পাকিস্তান প্রোজেক্টে পেল, তা কিন্তু শুধু মুসলমানের জোরে হয় নাই। নমশূদ্ররা তাদের পাশে ছিল, রাজবংশী সমাজও তাদের পাশে ছিল। সেই সূত্রেই তো তারা পূর্ববাংলা পেল, পুরো লড়াইয়ে কিন্তু তারা ছিল।
আর তাদের লড়াই কিন্তু শুধু ৪৭-এ না। খেয়াল করুন, ৪৭-এর মন্ত্রিসভায় তো যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলকে রাখা হলো। এটা কিন্তু উপহার হিসেবে না। তাকে রাখা হয়েছিল জোটবদ্ধ সংগ্রামের ধারাবাহিকতায়। ১৯৪৭ সালের আগে যখন অখণ্ড বাংলার সোহরাওয়ার্দীর মন্ত্রিসভা ছিল, সেখানে কিন্তু যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল ছিলেন, দ্বারিকানাথ বারুরি ছিলেন। এরা ছিলেন ওই জোটের অংশ হিসেবে। আরও পিছিয়ে গেলে, নাজিমুদ্দিনের মন্ত্রিসভায় যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল ছিলেন। তারও আগে ফজলুল হকের মন্ত্রিসভায়ও শিডিউলড কাস্টের তিনজন ছিলেন।
প্রশ্ন হলো কেন ছিলেন? ছিলেন মুসলিম লীগের সংগ্রামে শিডিউলড কাস্ট-সঙ্গী হিসেবে। সেসময় যখন বেঙ্গল অ্যাসেম্বলিতে মুসলিম লীগ সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব উঠেছে, প্রতিবারই মুসলিম লীগের সরকার, ফজলুল হকের সরকার, নাজিমুদ্দিনের সরকার, সোহরাওয়ার্দীর সরকারকে ভোট দিয়ে রক্ষা করছে শিডিউলড কাস্টের প্রতিনিধিরা।
কিন্তু ৪৭-এর এখনকার আলোচনায় কোথাও কি শিডিউলড কাস্টের ওই ভূমিকাটা পাওয়া যায়? কেউ কি সেসব বলে? কিছুদিন আগেই আমি এমন এক আলোচনায় আসি শ্রোতা হিসেবে। ডেইলি স্টারের এক আলোচনা শুনতে এসেছিলাম। সেখানে বাঙালি মুসলমানের রাষ্ট্র সাধনা নিয়ে অনেক কথা হলো। কিন্তু কোথাও শুনলাম না যে, বাঙালি মুসলমানের এই রাষ্ট্র সাধনায় শিডিউলড কাস্ট প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত চোখ-কান বুজে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে এবং সেই কারণেই কিন্তু সেই রাষ্ট্র সাধনা সফল হয়। এসবের কোনো উল্লেখই নাই।
যা হোক, অনেকে বলতে পারেন যে, ১৯৫৪ সালে যে শিডিউলড কাস্টের প্রতিনিধিরা ৩৭টা আসন পেল বা পুরো সংখ্যালঘুরা যে ৭২টা আসন পেল, এইটা পৃথক নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে হয়েছিল। তখন তো একটা সেপারেট ইলেক্টরেট ব্যবস্থা ছিল। কথাটা সত্য।
কিন্তু এই পৃথক নির্বাচনী ব্যবস্থা কার দাবিতে হয়েছিল? শিডিউলড কাস্টের দাবিতে হয়নি। মুসলমানদের দাবিতেই তো পৃথক নির্বাচনী ব্যবস্থা হয়েছে।
১৯০৯ সালে হলো পৃথক ভোট ব্যবস্থা। তার সম্পূরক ব্যবস্থা ১৯৩২ সালে হলো কমিউনাল অ্যাওয়ার্ড–অর্থাৎ, পার্লামেন্টে আসনও ভাগ হলো আলাদা সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে। এই উভয় দাবি তো হিন্দুদের না, মুসলমানদের দাবি। স্বদেশী আন্দোলনকালে মুসলমানরা বলল ব্রিটিশরাজের কাছে যে, “আমাদের ভোটব্যবস্থা আলাদা করে দাও।” তারপর বলল, “আমাদের আসনব্যবস্থাও আলাদা করে দাও।”
ব্রিটিশরা মুসলমানদের কাছে রাখা, মুসলিম লীগকে পাশে রাখার জন্য এটা করে দিল। তারই ধারাবাহিকতায় অ্যাসেম্বলিতে আসনের সংখ্যা হলো ২৫০। মুসলমানদের জন্য ১২১টা, হিন্দুদের জন্য ৯০টা, ৯০টার ভেতর ৩০টা শিডিউলড কাস্টের জন্য, বাকিটা ইউরোপিয়ান, ইউনিয়ন ও অন্যান্য।
এই ব্যবস্থাটা তারা করে দিলেও এমন একটা কৌশলে করল, যাতে কিনা মুসলমানদের জন্য বেশি আসন রাখা হলেও এককভাবে যাতে তারা কখনো ক্ষমতায় যেতে না পারে, সেই কায়দাটাও করল। ১২১টা, ২৫০-এর ভিতর ১২১-এর সবাই চাইলেও তো সরকার গঠন করতে পারবে না।
এই সংকটের ভেতরও প্রতিবারই ফজলুল হককে, সোহরাওয়ার্দীকে, নাজিমুদ্দিনকে তারা সমর্থন দিয়ে গেছে। কিন্তু তার কোনো উল্লেখ আমরা পাব না। এবং শুধু উল্লেখই পাব না–তা না, ওই পোড়ামাটি নীতির কারণে আমরা ৩৭ থেকে এবার শূন্যতে নিয়ে আসলাম।
যাই হোক, এই হলো অবস্থা। শুধু আসনই কমানো হয়নি, তাদের সংখ্যাও কমেছে। ১৯৭০-এর সময় এই অঞ্চলে অমুসলমানদের সংখ্যা ছিল ৩০ শতাংশ। আজকে ১০ শতাংশে নেমে এসেছে। আমি জানি না, আরও ৩০ বছর পরে সংখ্যা কত হবে।
অনেকে বলতে পারেন যে, জিন্নাহ সাহেব তো যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলকে মন্ত্রিসভায় নিয়েছিলেন এবং গণপরিষদের সভাপতিও করতে দিয়েছিলেন। আপনারা জানেন, পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম দিনের প্রথম অধিবেশনের সভাপতি ছিলেন যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল। জিন্নাহ এটা কেন করেছিলেন? বা যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলই কেন হলেন? এখানে অনেকে বলেছেন যে, নিশ্চয়ই ওনার কোনো ভুল হয়েছে পাকিস্তানকে সমর্থন করে। কিন্তু আমি বলব–না, ভুল হয়নি।
দেখুন, এই চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান করা কি ভুল হয়েছে আমাদের? একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ করা কি ভুল হয়েছে? মুক্তিযুদ্ধের পর আমরা মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নের বাংলাদেশ পাইনি। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর বৈষম্য কমেনি। কিন্তু শহীদেরা কি ভুল করেছিল? আমার তো মনে হয় না।
যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলও ওই সময় জিন্নাহর মন্ত্রিসভায় বা গণপরিষদের যে সভাপতি হয়েছিলেন, কেন হয়েছিলেন–তার উত্তর প্রথমদিনই জিন্নাহ দিয়েছেন। গণপরিষদে জিন্নাহর প্রথম ভাষণ পড়েছেন সবাই হয়তো। সেখানে তিনি বলেছেন, “আজ থেকে পাকিস্তান রাষ্ট্র পরিচালিত হবে নাগরিকতার ভিত্তিতে, ধর্মের ভিত্তিতে নয়। এখানে মন্দিরে, গির্জায়, মসজিদে ধর্মের স্বাধীনতা, ধর্মচর্চার স্বাধীনতা থাকবে। আর আমাদের রাষ্ট্রটা পরিচালিত হবে নাগরিকতার ওপর দাঁড়িয়ে, সিটিজেনশিপের ওপর দাঁড়িয়ে। সবাই পাকিস্তানের নাগরিক।”
এই অঙ্গীকারের ওপর দাঁড়িয়ে মুসলিম লীগ বলেছিল, “আমরা জমিদারি ব্যবস্থা বাতিল করব।” তো জমিদারি ব্যবস্থা বাতিল হবে, নাগরিকতার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে, তাহলে এখানে তো শিডিউলড কাস্টের সমর্থন দিতে সমস্যা নাই।
যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল তাই তার পুরো রাজনৈতিক ক্যারিয়ারই বাজি রেখেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে জিন্নাহ মরে গেলেন শীঘ্রই। তারপর লিয়াকত আলী খানরা কী করলেন? সংবিধান তো তৈরি করতে পারলেন না; কিন্তু সংবিধান প্রণয়নের একটা নির্দেশিকা হিসেবে অবজেকটিভ রেজ্যুলেশন করলেন। কিন্তু সেটা করলেন ধর্মের ভিত্তিতে। পাকিস্তানের অমুসলিমরা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত হয়ে গেল। সেই শুরু। পেছনে হটার শুরু।
শিডিউলড কাস্টের সব প্রতিনিধি পার্লামেন্টে, গণপরিষদে প্রতিবাদ করলেন। কিন্তু যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল প্রতিবাদ করলেন না। প্রতিবাদ করার উপায় নাই, উনি তো মন্ত্রী। প্রতিবাদ করলে তো পদত্যাগ করতে হয়। সবাই তাই করলেন। উনি করলেন না। কারণ তখনও উনি বাজি ধরে আছেন যে, এখনো আরেকটু দেখি।
কিন্তু ততদিনে ওই ‘ডিনায়াল পলিসি’ শুরু হয়ে গেছে। পূর্ব পাকিস্তানে কমিউনিস্টদেরকে নিষিদ্ধ করা হয়ে গেছে। কমিউনিস্ট খোঁজার নামে নমশূদ্রদের পাড়ায়-পাড়ায় হামলা শুরু হয়ে গেছে। তাদের দেশান্তর শুরু হয়ে গেল। আসলে সবাইকে বের করে দেওয়া হলো। প্রশাসনিক ইন্ধনে এগুলো শুরু হয়ে গেল। আর ওইদিকে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল তখন মন্ত্রী; লেবার মিনিস্টার, পরে আইনমন্ত্রী। কিন্তু ওনার কাছে কোনো ফাইল যায় না, ফাইল যায় সচিবের কাছে। মন্ত্রীকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। অর্থাৎ, একদিকে প্রশাসনিক অপমান, আর মাঠপর্যায়ে মানে সমাজ থেকে তাদের বের করে দেওয়া–এইভাবে ওই যে ৩৭ থেকে, বা তারও আগে থেকে, মুসলমান চাষী সমাজের সাথে নমশূদ্র চাষী সমাজের যে রাজনৈতিক ঐক্যটা গড়ে উঠেছিল, সেটা ভেঙে গেল। ’৪৭-এর পর ভেঙে দেওয়া হলো। এই হলো আমাদের অবক্ষয়ের চিত্র।
কিন্তু এর মাঝে দেখুন এই যে বারবার আমরা গত দুবছর ধরে তো বেশ শুনছি, ‘মুসলমানের রাষ্ট্র সাধনা’। দেখুন ৩৭-এর নির্বাচনে ২৫০ আসনের অ্যাসেম্বলি, কৃষক প্রজা পার্টি পেয়েছে ৪০টির মতো আসন, মুসলিম লীগ পেয়েছে ৪০-৪২টার মতো, অন্যরা স্বতন্ত্র আসন। ফজলুল হকের পক্ষে তো মন্ত্রিসভা গঠন করাই সম্ভব হতো না ৪০ আসন নিয়ে, এমনকি মুসলিম লীগের সমর্থন নিয়েও সম্ভব না–৮০-৯০ আসন। সেটা সম্ভব হলো ওই যে হিন্দুদের ৯০ আসনের ভেতর তো শিডিউলড কাস্টের ৩০ আসন; তারা ওইখান থেকে বেরিয়ে এসে ফজলুল হককে সমর্থন করলেন।
ফজলুল হকের মন্ত্রিসভায় মুকুন্দ বিহারী মল্লিক মন্ত্রী হলেন, প্রশান্ত রায় মন্ত্রী হলেন। ছোট মন্ত্রিসভায় দুজন শিডিউলড কাস্টের মন্ত্রী। ফজলুল হক দ্বিতীয় মন্ত্রিসভা গঠন করলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীকে নিয়ে, সেখানেও কিন্তু উপেন্দ্রনাথ বর্মন মন্ত্রী। নাজিমুদ্দিন মন্ত্রিসভা গঠন করলেন; সেখানে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল, প্রেম হরি বর্মন, পুলিন বিহারী মল্লিকেরা ছিলেন ক্যাবিনেটে। সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভা গঠন করলেন; যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল, দ্বারিকানাথ বারুরী মন্ত্রী। ৪৭-এর আগেই মুসলমান সমাজ যতগুলো মন্ত্রিসভা গঠন করল, সবগুলোয় কিন্তু শিডিউলড কাস্ট যৌথভাবে ছিল তাদের সঙ্গে। আবার ৪৭-এর আগের কথা যদি বলি, পূর্ব বাংলার প্রধান প্রধান দ্বন্দ্বটা, প্রিন্সিপাল কনট্রাডিকশন কী ছিল সমাজে?
মাও সেতুং বলতেন যে, একটা সমাজে অনেক ধরনের দ্বন্দ্ব থাকে। তার মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব হলো প্রধান দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্ব অন্য দ্বন্দ্বগুলোকে তৈরি করে। এটা হলো প্রিন্সিপাল কনট্রাডিকশন। ৪৭-এর আগে আমাদের সমাজের প্রিন্সিপাল কনট্রাডিকশন হলো চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, জমিদারি ব্যবস্থা, জমিদারি শোষণ। ব্রিটিশ কর্নওয়ালিস করে গেছেন এই সমস্যার শুরু। তার বাইপ্রোডাক্ট হিসেবে আরেকটা সমস্যা তৈরি হলো–মহাজনী ঋণের সমস্যা। সেই মহাজনী ঋণের সমস্যা এবং জমিদারি শোষণের সমস্যায় প্রধান ভুক্তভোগী কারা?
যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল বলেছেন, দেবেশ রায়ের বইয়ে পেয়েছেন আপনারা নিশ্চয়ই–
“এই যে আইল, জমির আইল, আইলের এই দিকে আমরা চাষ করি শূদ্ররা, আইলের ঐ দিকে মুসলমান চাষীরা চাষ করে। আমরা উভয়েই জমিদারী শোষণের শিকার। আবার আমরা উভয়েই ব্রাহ্মণ্যবাদী অবহেলারও শিকার। অর্থাৎ, একটা বর্ণ শাসন, আরেকটা জমিদারী শোষণ। এই আমরা নমশূদ্র, রাজবংশী কৃষক সমাজ আর মুসলমান চাষী সমাজ–আমরা তো আত্মীয়। উভয়েই শোষিত এবং আত্মীয়। তাহলে আমাদের–এই ছোটলোকেদের রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তুলতে হবে, ছোট জাতের রাজনীতি গড়ে তুলতে হবে।” একদম এই ভাষাতেই উনি বলছেন।
তো সেই রাজনীতি শুরু হলো কৃষক প্রজা পার্টিতে। প্রথমে প্রজা সমিতি, তারপর কৃষক প্রজা পার্টি। ফজলুল হক সাহেব নেতৃত্ব দিচ্ছেন, আকরাম খাঁ নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এগুলো কিন্তু ’৩৭-এর আগের কথা বলছি। তো সেই সংগ্রামে যতগুলো কৃষক প্রজা সম্মেলন হচ্ছে, যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল যাচ্ছেন, অন্যরাও যাচ্ছেন, নমশূদ্র সব নেতারা যাচ্ছেন; একসাথে।
চাষী, মুসলমান চাষী সমাজের আন্দোলন এবং শিডিউলড কাস্টের আন্দোলন একসাথে হচ্ছে জমিদারি শোষণের বিরুদ্ধে। মুসলিম লীগ এর মাঝে দাবি করল যে, পৃথক ভোটব্যবস্থা লাগবে, পৃথক আসনব্যবস্থা লাগবে। তো আসন এবং ভোট যখন আলাদা হয়ে গেল, তখন মুসলমানেরও সমস্যা হলো না; বর্ণ হিন্দুদেরও না, মুশকিলে পড়ল নমশূদ্ররা।
তাদের ভোট তো আলাদা করে দেওয়া হলো। তারা শিডিউলড কাস্ট ফেডারেশন গঠন করল–একটা আলাদা দল। কিন্তু দেখুন, এই যে শিডিউলড কাস্ট ফেডারেশন গঠন করছে তারা, তাদের উপনিবেশবিরোধী সংগ্রাম তো অব্যাহত আছে।
মুসলিম লীগ বা বর্ণ হিন্দুরা সংগ্রাম বেশি করছে না, শিডিউলড কাস্ট করছে। আমি যেটা বলতে চাইছি, এই যে আমাদের এখানে ৫০টা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, ১০০টা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, অনেক সংবাদপত্র, প্রচুর কলাম লেখা হয়, কখনো কি সেসবে দেখা যায় যে রাজবংশীরা, নমশূদ্ররা কীভাবে উপনিবেশবিরোধী সংগ্রাম করল? কোথাও আছে এই আলাপ? কেন নেই? পুরো উপনিবেশবিরোধী সংগ্রামে কি নমোরা নাই? রাজবংশীরা নাই?
এই যে পোড়ামাটি নীতি আমরা করলাম, আমরা পার্লামেন্টে করলাম, রাজনৈতিক ইতিহাসেও করলাম, ইতিহাস চর্চাতেও করলাম। উপনিবেশবিরোধী সংগ্রামের ইতিহাসে আমাদের কাছে সংগ্রামী হলেন গান্ধী, নেহেরু, জিন্নাহ। না আছেন যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল, না আছে অন্য কোনো নেতা।
অর্থাৎ, নিম্নবর্গের ইতিহাসে আমরা তাদের ‘নাই’ করে দিলাম। আমার সহ-আলোচক বললেন যে, ‘ক্যান দ্য সাবঅল্টার্ন স্পিক?’ কোথায় স্পিক করবে? পার্লামেন্টেও সে নেই, আলোচনার সভায়ও তাকে রাখেন না, পত্রিকাও রাখে না–কথাটা বলবে কোথায়? তাকে তো আমি ডিনায়াল পলিসিতে নাই করে দিয়েছি।
যা হোক, আমি যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের জীবনের ওপর বেশি আলাপ করতে চাই না, আমার আগের দুই আলোচক বলেছেন। কিন্তু দেখুন, ১৯০৪-এ ওনার জন্ম, ১৯৬৮ সালে মারা গেলেন, মাত্র ৬৪ বছরের জীবন। এই ৬৪ বছরে ওনার ব্যক্তিগত অর্জনটা দেখেছেন?
সেই ’৪৬ সালে কেন্দ্রীয় ভারতে, মানে অখণ্ড ভারতে যে অস্থায়ী মন্ত্রিসভা হচ্ছে, নেহেরু আছেন, সেখানে মুসলিম লীগের প্রতিনিধি হিসেবে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল আছেন–কেন্দ্রীয় অখণ্ড ভারতের মন্ত্রী। অখণ্ড পাকিস্তানের মন্ত্রিসভায় মন্ত্রী, অখণ্ড বাংলার সোহরাওয়ার্দীর মন্ত্রিসভায় মন্ত্রী, অখণ্ড বাংলায় নাজিমুদ্দিনের মন্ত্রিসভায় মন্ত্রী। এ রকম আরেকটা ক্যারেক্টার পাওয়া যায় আমাদের ইতিহাসে? এই হলো ওনার অর্জন। কিন্তু এরচেয়েও বড় অর্জন আমি বলব–আম্বেদকরকে সংবিধান সভায় পাঠাতে পেরেছিলেন।
১৯৪৬ সালে, তখন আম্বেদকর তো বোম্বেতে প্রাদেশিক নির্বাচনে হেরে গিয়েছিলেন, কংগ্রেস ওনাকে হারিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল যখন দেখলেন যে, ভারতের সংবিধান রচনা হবে, সেখানে যদি নিম্নবর্গের একজন প্রতিনিধিও না থাকে, তাহলে তো আমাদের সব অর্জন বর্ণ হিন্দুরা শেষ করে দেবে। বেঙ্গলে তখন শিডিউলড কাস্টের ৩০ জনের ভেতর ২৬ জনই কংগ্রেসের প্রতিনিধি, পাঁচজন অন্তত এমএলএ না হলে কাউকে ওই মন্ত্রিসভায় পাঠানো যাবে না। কংগ্রেস থেকে একজনকে ছুটিয়ে এনে নিজেরা চারজনসহ পাঁচজন হয়ে বেঙ্গল থেকে আম্বেদকরকে পাঠানো হলো। আজকে ভারত তার যে সংবিধানের জন্য গর্ব করে, যে সংবিধানকে ওরা শেষ রক্ষাকবচ ভাবছে, সেই সংবিধানের জন্য তো আসলে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলকেও কৃতিত্ব দিতে হয়। যদিও সেই সংবিধান কতদিন থাকবে জানি না। তবে পশ্চিমবঙ্গে ওনাকে আমাদের মতোই কিছুটা পোড়ামাটি নীতিতেই রাখা হয়েছে।
এই যে যোগেন মণ্ডলের দূরদর্শিতা, যে আমাদের একজনকে রাখতে হবে–এইটা ওনার একটা বড় কৃতিত্ব। হয়তো এসব কারণে দেবেশ রায় লিখেছিলেন ১০৫৬ পৃষ্ঠার বই- ‘বরিশালের যোগেন মণ্ডল’।
আলতাফ পারভেজ: দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি বিষয়ক গবেষক ও বিশ্লেষক
রাজধানীর ডেইলি স্টার সেন্টারে ৩ অক্টোবর ‘ইতিহাস আড্ডা’ আয়োজিত ‘ফের দেখা যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল’ শীর্ষক বক্তৃতার অনুলিখন