ফারাহ এন. জান

২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধে মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের নির্ধারিত প্রতিটি লক্ষ্যই অর্জন করেছিল। আকাশে নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাসহ ইরাকে সাদ্দাম–সরকারের পতন ঘটানো গিয়েছিল। ইরাকের শীর্ষ নেতা সাদ্দাম হোসেনকে আটক, বিচার–এমনকি ফাঁসিও দিতে পেরেছিল যুক্তরাষ্ট্র। হামলা শুরুর মাত্র ২১ দিনের মাথায় সফলতার মুখ দেখেছিল মার্কিন সামরিক বাহিনী।
দুই দশক পর ইরাকের এখনকার পরিস্থিতির দিকে চোখ ফেরানো যাক। ইরাক আজ এমন এক কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র, যা তেহরানের সঙ্গে গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কযুক্ত রাজনৈতিক দলগুলো দ্বারা শাসিত। ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো ইরাকের মাটিতে প্রকাশ্যেই তৎপরতা চালাচ্ছে, এমনকি তাদের কেউ কেউ ইরাক রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে সরকারি পদেও অধিষ্ঠিত।
এর মানে দাঁড়ায় যে, দেশটিকে নতুন করে গড়তে যুক্তরাষ্ট্র ২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করেছেন এবং ৪ হাজার ৪৮৮ জন আমেরিকানের প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে। সেই ইরাকই আজ আমেরিকার বদলে অনেকটাই ইরানের প্রভাব বলয়ে রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের পারমাণবিক নিরাপত্তা ও জোট রাজনীতি বিশেষজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক হিসেবে আমি একাধিক ক্ষেত্রে মার্কিন সামরিক সাফল্যের ধরন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি।
তবে সামরিক ও রাজনৈতিক ফলাফল প্রায় কখনোই এক বিষয় নয়, আর এই দুইয়ের মধ্যকার ব্যবধানের কারণেই যুদ্ধগুলো ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
আড়াই হাজার বছর আগে থুকিডিডেস তার ‘হিস্ট্রি অব দ্য পেলোপোনেশিয়ান ওয়ার’ গ্রন্থে গ্রিক সাম্রাজ্যের (Athenian empire) চরম আত্মবিশ্বাসের রূপ লিপিবদ্ধ করে গেছেন। তিনি বলেছেন, “শক্তিশালীরা তা-ই করে যা তারা করতে পারে, আর দুর্বলদের নিয়তিতে সেটিই থাকে তা তাদের মেনে নিতেই হয়।” এরপর এথেন্স মেলোসকে ধ্বংস করে এবং পরবর্তী শাসনব্যবস্থা কী হবে তার কোনো সুসংহত রূপরেখা ছাড়াই বিপুল শক্তিমত্তা নিয়ে সিসিলি অভিযান শুরু করে।
সাম্রাজ্যগুলো ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে অক্ষম, এটাই অতীত ও বর্তমানের শিক্ষা নয়। বরং আসল শিক্ষাটি হলো-ধ্বংসলীলা আর শাসনব্যবস্থা পরিচালনা সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বিষয়। আর এই দুইয়ের মধ্যে গুলিয়ে ফেলার কারণেই সাম্রাজ্যগুলো নিজেদের নিঃশেষ করে ফেলে।
মার্কিন সামরিক বাহিনী চাইলে ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে গুঁড়িয়ে দিতে সক্ষম। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এমনটা ঘটলে যে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হবে, তা পূরণ করবে কে? ইরাকের নজির এই প্রশ্নেরই এক নির্মম ও স্পষ্ট উত্তর দেয়।
সামরিক ও রাজনৈতিক খতিয়ান
২০০৩ সালের এপ্রিলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী কোয়ালিশন প্রভিশনাল অথরিটির প্রধান হিসেবে বাগদাদে পৌঁছান মার্কিন নাগরিক এল. পল ব্রেমার। দায়িত্ব নিয়েই তিনি এমন দুটি আদেশ জারি করেছিলেন, যা পরবর্তী দুই দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়।
এক নম্বর আদেশে ক্ষমতাসীন বাথ পার্টিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয় এবং দলের সব শীর্ষ নেতাকে সরকারি পদ থেকে অপসারণ করা হয়। এর মাধ্যমে মূলত মন্ত্রণালয়, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনাকারী প্রশাসনিক কাঠামোকে পুরোপুরি ঢেলে সাজানো হয়। দুই নম্বর আদেশে ইরাকি সেনাবাহিনীকে ভেঙে দেওয়া হলেও তাদের নিরস্ত্রীকরণ করা হয়নি। নিজেদের অস্ত্র নিয়ে, কোনো বেতন ছাড়াই বাড়ি ফিরে যান প্রায় চার লাখ সেনা।
ওয়াশিংটন তখন যেন বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর হাতে তাদের প্রয়োজনীয় জনবল সংগ্রহের এক বিশাল সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিল। সুন্নি নেতৃত্বাধীন এই সশস্ত্র প্রতিরোধই পরবর্তীতে এক দশক দীর্ঘ এক যুদ্ধে রূপ নেয়। ব্রেমারের ‘ডি-বাথিফিকেশন’ বা বাথ পার্টি নির্মূল প্রক্রিয়ার পেছনের যুক্তিটি ছিল খুবই সরল, তা হলো—যারা পুরোনো ইরাক গড়েছিল, তাদের দিয়ে নতুন ইরাক বিনির্মাণ সম্ভব নয়। তবে এই যুক্তিটি ছিল চরম বিপর্যয়কর।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, কোনো রাষ্ট্র কেবল আদর্শের ভিত্তিতে নয়, বরং সংঘবদ্ধ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমেই টিকে থাকে। অর্থাৎ, আমলাতান্ত্রিক কাঠামো, প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা এবং শিক্ষিত ও দক্ষ পেশাজীবীদের মাধ্যমেই রাষ্ট্রের বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহের মতো মৌলিক সেবাগুলো সচল থাকে। সেই রাষ্ট্রযন্ত্র ভেঙে ফেলার অর্থ এই নয় যে সবকিছু নতুন করে শুরুর সুযোগ তৈরি হলো বরং এর ফলে রাষ্ট্র ব্যবস্থাই ধসে পড়ে। আর কোনো ধসে পড়া রাষ্ট্রে কখনোই নেতৃত্বের শূন্যতা দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
এই শূন্যস্থান পূরণ হয়, আর মাঠে যাদের সাংগঠনিক সক্ষমতা সবচেয়ে বেশি, তারাই এর নিয়ন্ত্রণ নেয়। ১৯৮০ এর দশক থেকেই ইরাকে এই সক্ষমতা গড়ে তুলছিল ইরান। ইরান-ইরাক যুদ্ধ এবং তৎপরবর্তী সময়ে শিয়া রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক, নির্বাসিত রাজনৈতিক দল ও মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোকে তারা মদদ জুগিয়েছিল। তাদের সুস্পষ্ট লক্ষ্য ছিল, সাদ্দাম-পরবর্তী ইরাক যেন আর কখনোই ইরানের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে না পারে তা নিশ্চিত করা।

মার্কিন আগ্রাসনের পর ইরাকে নতুন করে কোনো অবকাঠামো গড়ার প্রয়োজন তেহরানের ছিল না, কারণ আগের দুই দশক ধরেই তারা এ কাজে বিনিয়োগ করেছিল। ফলে পুরনো শাসনব্যবস্থা যখন ভেঙে পড়ে, তখন ইরানের নেটওয়ার্কগুলো পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে যে বিরোধী শক্তিকে লালন-পালন করেছিল (আহমেদ চালাবি ও ইরাকি ন্যাশনাল কংগ্রেস) ওয়াশিংটনে তাদের কদর থাকলেও ইরাকের মাটিতে তাদের কোনো জনভিত্তি ছিল না। তারা কখনোই দেশটি শাসন করেনি, কিংবা এর অভ্যন্তরে কোনো নেটওয়ার্কও গড়ে তোলেনি।
এখান থেকে শিক্ষণীয় বিষয়টি হলো, সামরিক সাফল্যই চরম রাজনৈতিক বিপর্যয়ের নিখুঁত প্রেক্ষাপট তৈরি করে দেয়। আর এই দুইয়ের মধ্যকার ব্যবধানেই মুখ থুবড়ে পড়েছে মার্কিন কৌশল—তা সে ইরাক হোক বা লিবিয়া। ওবামা প্রশাসন ২০১১ সালে লিবিয়ায় সরকার পতনে সহায়তা করেছিল, কিন্তু এরপর থেকে সেখানে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা লেগেই আছে। আর সম্ভবত এবার ইরানের ক্ষেত্রেও এমনটাই ঘটতে যাচ্ছে।
ক্ষমতার শূন্যতা নিরপেক্ষ নয়
আমেরিকার সরকার পরিবর্তন কৌশলের মূলে যে মৌলিক ভুল ধারণাটি রয়েছে, তা হলো- বিদ্যমান ব্যবস্থাকে ধ্বংস করলেই আরও ভালো কিছুর জন্য জায়গা তৈরি হয় বলে ধরে নেওয়া।
কিন্তু বাস্তবে তা হয় না।
বরং এটি এমন কারও জন্য জায়গা তৈরি করে দেয়, যারা সবচেয়ে সুসংগঠিত, সবচেয়ে বেশি অস্ত্রে সজ্জিত এবং সেই শূন্যস্থান পূরণে সবচেয়ে বেশি ইচ্ছুক। ইরাকের ক্ষেত্রে সেই জায়গাটি নিয়েছিল ইরান।
এখন প্রশ্ন হলো, স্বয়ং ইরানের ক্ষেত্রে এই শূন্যস্থান কে পূরণ করবে?
ইরানে সুসংগঠিত, সশস্ত্র এবং ইচ্ছুক এই তিনটি মানদণ্ড পূরণকারী গোষ্ঠীটি হলো ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। রেভল্যুশনারি গার্ড নিছক কোনো সামরিক প্রতিষ্ঠান নয়। ধারণা করা হয়, ইরানের অর্থনীতির ৩০ থেকে ৪০ শতাংশই তাদের নিয়ন্ত্রণে এবং তারা বিভিন্ন বৃহৎ নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, টেলিযোগাযোগ কোম্পানি ও পেট্রোকেমিক্যাল ফার্ম পরিচালনা করে। আর কয়েক দশক ধরে তারা রাষ্ট্রের অভ্যন্তরেই এক সমান্তরাল রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো গড়ে তুলেছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের বোমা হামলার শুরুতে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে রেভল্যুশনারি গার্ড। এনবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরান বিষয়ক এক বিশেষজ্ঞ সেটাই বলেছেন, “তারা যদি সর্বোচ্চ নেতাকে পরিবর্তনও করে, তবু এই শাসনব্যবস্থার যা কিছু অবশিষ্ট থাকবে, তা হলো আইআরজিসি।”
উত্তরাধিকার নির্বাচন প্রমাণ করেছে, রেভল্যুশনারি গার্ডের সঙ্গে গভীর সম্পর্কযুক্ত মোজতবা খামেনিকে ২০২৬ সালের ৮ মার্চ সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এটি রেভল্যুশনারি গার্ড-সমর্থিত এমন এক বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকার, যা মূলত পুরনো শাসনব্যবস্থারই সর্বোচ্চ ধারাবাহিকতাকে প্রতিনিধিত্ব করে, কোনো সরকার পরিবর্তন নয়।
অর্থনীতিকে ধ্বংস না করে রেভল্যুশনারি গার্ডকে ভেঙে ফেলা সম্ভব নয়। আর ভেঙে পড়া অর্থনীতি কোনো অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তৈরি করে না, বরং এটি একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রের জন্ম দেয়। ওয়াশিংটন লিবিয়ায় ইতোমধ্যেই এই পরীক্ষা চালিয়ে দেখেছে।
রেভল্যুশনারি গার্ডকে বহাল রাখার অর্থ হলো বর্তমান শাসনব্যবস্থার নিপীড়নমূলক মূল শক্তিকেই অক্ষত রাখা। কেবল বোমা ফেলে বা নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিকে হত্যা করে ইরানে রাতারাতি নতুন ভোরের সূচনা ঘোষণার মতো কোনো পরিচ্ছন্ন বিকল্প আসলে নেই।
নির্বাসিত ইরানি বিরোধী গোষ্ঠী মুজাহিদিন-ই-খালক (এমইকে), প্রয়াত শাহের পুত্রের নেতৃত্বে দেশ পরিচালনার সমর্থক রাজতন্ত্রবাদী গোষ্ঠী এবং বিভিন্ন গণতান্ত্রিক উপদল এদের সবার ক্ষেত্রেই ২০০৩ সালের চালাবির মতো একই সংকট বিদ্যমান, ওয়াশিংটনে তাদের অবাধ যাতায়াত থাকলেও দেশের অভ্যন্তরে কোনো জনসমর্থন বা বৈধতা নেই।
মুজাহিদিন-ই-খালককে ইরান একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে এবং দেশের অভ্যন্তরে তারা ব্যাপকভাবে ঘৃণিত। ১৯৭৯ সালের পর থেকে রাজতন্ত্রবাদীরা আর ইরান শাসন করেনি এবং সে সময়ের বিপ্লবের মধ্য দিয়ে তাদের দুর্নীতিগ্রস্ত ও স্বৈরাচারী নেতাকে উৎখাত করা হয়েছিল। অন্যদিকে ইরানের অভ্যন্তরে যে গণতান্ত্রিক সংস্কারপন্থী নেটওয়ার্কগুলো ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠছিল, মার্কিন হামলা তাদেরও রক্ষা করতে পারেনি। গত জানুয়ারিতেই হাজার হাজার মানুষকে আটক ও হত্যার মাধ্যমে সরকার এই আন্দোলন কঠোর হাতে দমন করেছিল।
জাতীয় সংকটে পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার (র্যালি-অ্যারাউন্ড দ্য ফ্ল্যাগ) প্রভাব নিয়ে কয়েক দশকের গবেষণা ইরানের মানুষের কান্ডজ্ঞানেরই পরিচয় দেয়। কারণ নাগরিকেরা তাদের নেতাদের চরম ঘৃণা করলেও বাহ্যিক আক্রমণ রাষ্ট্রযন্ত্র ও জনগণকে এক সুতোয় গেঁথে ফেলে। যেসব ইরানি নাগরিক সর্বোচ্চ নেতার বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছিলো তারাই এখন নিজেদের শহরের বুকে বিদেশি বোমা আছড়ে পড়তে দেখছেন।
২০০৩ সালে ইরাকের জনসংখ্যা ছিল আড়াই কোটি, ১২ বছরের নিষেধাজ্ঞায় তাদের সামরিক বাহিনী ছিল বিপর্যস্ত এবং দেশটিতে কোনো সক্রিয় পারমাণবিক কর্মসূচিও ছিল না।
অন্যদিকে, ইরানের বর্তমান জনসংখ্যা ৯ কোটি ২০ লাখ। তাদের এমন সব প্রক্সি নেটওয়ার্ক রয়েছে, যা তেহরানের পতন ঘটলেও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে না বরং উল্টো আরও বেশি সক্রিয় হয়ে উঠবে। এর পাশাপাশি তাদের কাছে ৮৮০ পাউন্ডেরও বেশি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত রয়েছে, ২০২৫ সালের যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলার পর থেকে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থাও (আইএইএ) যার পূর্ণাঙ্গ হিসাব দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

ওয়াশিংটন যে প্রশ্নের উত্তর দেয়নি
৯ কোটি ২০ লাখ ইরানির শাসনভার কার হাতে?
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যিনিই ইরানের শাসন ক্ষমতায় বসুন না কেন, তাকে অবশ্যই ওয়াশিংটনের অনুমোদন নিতে হবে। কিন্তু কেবল ‘ভেটো’ দেওয়ার ক্ষমতাই কোনো রূপরেখা হতে পারে না।
ওয়াশিংটনে বসে প্রার্থীদের অনুমোদন বা বাতিলের জন্য একটি কার্যকর রাজনৈতিক প্রক্রিয়া, বৈধ অন্তর্বর্তীকালীন কর্তৃপক্ষ এবং এমন এক জনসমষ্টির প্রয়োজন, যারা নিজেদের নেতৃত্বের ওপর মার্কিন সিলমোহর মেনে নিতে প্রস্তুত। কিন্তু বাস্তবে এর কোনোটিরই অস্তিত্ব নেই।
ওয়াশিংটনের কেবল পছন্দ-অপছন্দই রয়েছে; তাদের কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নেই। পারমাণবিক কর্মসূচি নির্মূল করাই যদি মূল লক্ষ্য হয়ে থাকে, তবে ২০২৫ সালের হামলার আট মাস পরও কেন ইরানের কাছে অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহারযোগ্য ইউরেনিয়ামের হিসাব-বহির্ভূত মজুত রয়ে গেছে? এই হামলাগুলো পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের ঝুঁকির কোনো সমাধান তো করেইনি, উল্টো পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে গেছে।
লক্ষ্য যদি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষা হয়, তবে কেন প্রতি দফার হামলা একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধের জন্ম দিয়েছে?
ওয়াশিংটনের কাছে এসবের কোনো প্রশ্নেরই উত্তর নেই, রয়েছে কেবল ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর এক তত্ত্ব।
লেখক: শিক্ষক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়
লেখাটি দ্য কনভারসেশনে প্রকাশিত নিবন্ধ থেকে অনূদিত

২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধে মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের নির্ধারিত প্রতিটি লক্ষ্যই অর্জন করেছিল। আকাশে নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাসহ ইরাকে সাদ্দাম–সরকারের পতন ঘটানো গিয়েছিল। ইরাকের শীর্ষ নেতা সাদ্দাম হোসেনকে আটক, বিচার–এমনকি ফাঁসিও দিতে পেরেছিল যুক্তরাষ্ট্র। হামলা শুরুর মাত্র ২১ দিনের মাথায় সফলতার মুখ দেখেছিল মার্কিন সামরিক বাহিনী।
দুই দশক পর ইরাকের এখনকার পরিস্থিতির দিকে চোখ ফেরানো যাক। ইরাক আজ এমন এক কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র, যা তেহরানের সঙ্গে গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কযুক্ত রাজনৈতিক দলগুলো দ্বারা শাসিত। ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো ইরাকের মাটিতে প্রকাশ্যেই তৎপরতা চালাচ্ছে, এমনকি তাদের কেউ কেউ ইরাক রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে সরকারি পদেও অধিষ্ঠিত।
এর মানে দাঁড়ায় যে, দেশটিকে নতুন করে গড়তে যুক্তরাষ্ট্র ২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করেছেন এবং ৪ হাজার ৪৮৮ জন আমেরিকানের প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে। সেই ইরাকই আজ আমেরিকার বদলে অনেকটাই ইরানের প্রভাব বলয়ে রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের পারমাণবিক নিরাপত্তা ও জোট রাজনীতি বিশেষজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক হিসেবে আমি একাধিক ক্ষেত্রে মার্কিন সামরিক সাফল্যের ধরন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি।
তবে সামরিক ও রাজনৈতিক ফলাফল প্রায় কখনোই এক বিষয় নয়, আর এই দুইয়ের মধ্যকার ব্যবধানের কারণেই যুদ্ধগুলো ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
আড়াই হাজার বছর আগে থুকিডিডেস তার ‘হিস্ট্রি অব দ্য পেলোপোনেশিয়ান ওয়ার’ গ্রন্থে গ্রিক সাম্রাজ্যের (Athenian empire) চরম আত্মবিশ্বাসের রূপ লিপিবদ্ধ করে গেছেন। তিনি বলেছেন, “শক্তিশালীরা তা-ই করে যা তারা করতে পারে, আর দুর্বলদের নিয়তিতে সেটিই থাকে তা তাদের মেনে নিতেই হয়।” এরপর এথেন্স মেলোসকে ধ্বংস করে এবং পরবর্তী শাসনব্যবস্থা কী হবে তার কোনো সুসংহত রূপরেখা ছাড়াই বিপুল শক্তিমত্তা নিয়ে সিসিলি অভিযান শুরু করে।
সাম্রাজ্যগুলো ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে অক্ষম, এটাই অতীত ও বর্তমানের শিক্ষা নয়। বরং আসল শিক্ষাটি হলো-ধ্বংসলীলা আর শাসনব্যবস্থা পরিচালনা সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বিষয়। আর এই দুইয়ের মধ্যে গুলিয়ে ফেলার কারণেই সাম্রাজ্যগুলো নিজেদের নিঃশেষ করে ফেলে।
মার্কিন সামরিক বাহিনী চাইলে ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে গুঁড়িয়ে দিতে সক্ষম। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এমনটা ঘটলে যে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হবে, তা পূরণ করবে কে? ইরাকের নজির এই প্রশ্নেরই এক নির্মম ও স্পষ্ট উত্তর দেয়।
সামরিক ও রাজনৈতিক খতিয়ান
২০০৩ সালের এপ্রিলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী কোয়ালিশন প্রভিশনাল অথরিটির প্রধান হিসেবে বাগদাদে পৌঁছান মার্কিন নাগরিক এল. পল ব্রেমার। দায়িত্ব নিয়েই তিনি এমন দুটি আদেশ জারি করেছিলেন, যা পরবর্তী দুই দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়।
এক নম্বর আদেশে ক্ষমতাসীন বাথ পার্টিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয় এবং দলের সব শীর্ষ নেতাকে সরকারি পদ থেকে অপসারণ করা হয়। এর মাধ্যমে মূলত মন্ত্রণালয়, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনাকারী প্রশাসনিক কাঠামোকে পুরোপুরি ঢেলে সাজানো হয়। দুই নম্বর আদেশে ইরাকি সেনাবাহিনীকে ভেঙে দেওয়া হলেও তাদের নিরস্ত্রীকরণ করা হয়নি। নিজেদের অস্ত্র নিয়ে, কোনো বেতন ছাড়াই বাড়ি ফিরে যান প্রায় চার লাখ সেনা।
ওয়াশিংটন তখন যেন বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর হাতে তাদের প্রয়োজনীয় জনবল সংগ্রহের এক বিশাল সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিল। সুন্নি নেতৃত্বাধীন এই সশস্ত্র প্রতিরোধই পরবর্তীতে এক দশক দীর্ঘ এক যুদ্ধে রূপ নেয়। ব্রেমারের ‘ডি-বাথিফিকেশন’ বা বাথ পার্টি নির্মূল প্রক্রিয়ার পেছনের যুক্তিটি ছিল খুবই সরল, তা হলো—যারা পুরোনো ইরাক গড়েছিল, তাদের দিয়ে নতুন ইরাক বিনির্মাণ সম্ভব নয়। তবে এই যুক্তিটি ছিল চরম বিপর্যয়কর।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, কোনো রাষ্ট্র কেবল আদর্শের ভিত্তিতে নয়, বরং সংঘবদ্ধ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমেই টিকে থাকে। অর্থাৎ, আমলাতান্ত্রিক কাঠামো, প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা এবং শিক্ষিত ও দক্ষ পেশাজীবীদের মাধ্যমেই রাষ্ট্রের বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহের মতো মৌলিক সেবাগুলো সচল থাকে। সেই রাষ্ট্রযন্ত্র ভেঙে ফেলার অর্থ এই নয় যে সবকিছু নতুন করে শুরুর সুযোগ তৈরি হলো বরং এর ফলে রাষ্ট্র ব্যবস্থাই ধসে পড়ে। আর কোনো ধসে পড়া রাষ্ট্রে কখনোই নেতৃত্বের শূন্যতা দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
এই শূন্যস্থান পূরণ হয়, আর মাঠে যাদের সাংগঠনিক সক্ষমতা সবচেয়ে বেশি, তারাই এর নিয়ন্ত্রণ নেয়। ১৯৮০ এর দশক থেকেই ইরাকে এই সক্ষমতা গড়ে তুলছিল ইরান। ইরান-ইরাক যুদ্ধ এবং তৎপরবর্তী সময়ে শিয়া রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক, নির্বাসিত রাজনৈতিক দল ও মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোকে তারা মদদ জুগিয়েছিল। তাদের সুস্পষ্ট লক্ষ্য ছিল, সাদ্দাম-পরবর্তী ইরাক যেন আর কখনোই ইরানের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে না পারে তা নিশ্চিত করা।

মার্কিন আগ্রাসনের পর ইরাকে নতুন করে কোনো অবকাঠামো গড়ার প্রয়োজন তেহরানের ছিল না, কারণ আগের দুই দশক ধরেই তারা এ কাজে বিনিয়োগ করেছিল। ফলে পুরনো শাসনব্যবস্থা যখন ভেঙে পড়ে, তখন ইরানের নেটওয়ার্কগুলো পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে যে বিরোধী শক্তিকে লালন-পালন করেছিল (আহমেদ চালাবি ও ইরাকি ন্যাশনাল কংগ্রেস) ওয়াশিংটনে তাদের কদর থাকলেও ইরাকের মাটিতে তাদের কোনো জনভিত্তি ছিল না। তারা কখনোই দেশটি শাসন করেনি, কিংবা এর অভ্যন্তরে কোনো নেটওয়ার্কও গড়ে তোলেনি।
এখান থেকে শিক্ষণীয় বিষয়টি হলো, সামরিক সাফল্যই চরম রাজনৈতিক বিপর্যয়ের নিখুঁত প্রেক্ষাপট তৈরি করে দেয়। আর এই দুইয়ের মধ্যকার ব্যবধানেই মুখ থুবড়ে পড়েছে মার্কিন কৌশল—তা সে ইরাক হোক বা লিবিয়া। ওবামা প্রশাসন ২০১১ সালে লিবিয়ায় সরকার পতনে সহায়তা করেছিল, কিন্তু এরপর থেকে সেখানে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা লেগেই আছে। আর সম্ভবত এবার ইরানের ক্ষেত্রেও এমনটাই ঘটতে যাচ্ছে।
ক্ষমতার শূন্যতা নিরপেক্ষ নয়
আমেরিকার সরকার পরিবর্তন কৌশলের মূলে যে মৌলিক ভুল ধারণাটি রয়েছে, তা হলো- বিদ্যমান ব্যবস্থাকে ধ্বংস করলেই আরও ভালো কিছুর জন্য জায়গা তৈরি হয় বলে ধরে নেওয়া।
কিন্তু বাস্তবে তা হয় না।
বরং এটি এমন কারও জন্য জায়গা তৈরি করে দেয়, যারা সবচেয়ে সুসংগঠিত, সবচেয়ে বেশি অস্ত্রে সজ্জিত এবং সেই শূন্যস্থান পূরণে সবচেয়ে বেশি ইচ্ছুক। ইরাকের ক্ষেত্রে সেই জায়গাটি নিয়েছিল ইরান।
এখন প্রশ্ন হলো, স্বয়ং ইরানের ক্ষেত্রে এই শূন্যস্থান কে পূরণ করবে?
ইরানে সুসংগঠিত, সশস্ত্র এবং ইচ্ছুক এই তিনটি মানদণ্ড পূরণকারী গোষ্ঠীটি হলো ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। রেভল্যুশনারি গার্ড নিছক কোনো সামরিক প্রতিষ্ঠান নয়। ধারণা করা হয়, ইরানের অর্থনীতির ৩০ থেকে ৪০ শতাংশই তাদের নিয়ন্ত্রণে এবং তারা বিভিন্ন বৃহৎ নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, টেলিযোগাযোগ কোম্পানি ও পেট্রোকেমিক্যাল ফার্ম পরিচালনা করে। আর কয়েক দশক ধরে তারা রাষ্ট্রের অভ্যন্তরেই এক সমান্তরাল রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো গড়ে তুলেছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের বোমা হামলার শুরুতে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে রেভল্যুশনারি গার্ড। এনবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরান বিষয়ক এক বিশেষজ্ঞ সেটাই বলেছেন, “তারা যদি সর্বোচ্চ নেতাকে পরিবর্তনও করে, তবু এই শাসনব্যবস্থার যা কিছু অবশিষ্ট থাকবে, তা হলো আইআরজিসি।”
উত্তরাধিকার নির্বাচন প্রমাণ করেছে, রেভল্যুশনারি গার্ডের সঙ্গে গভীর সম্পর্কযুক্ত মোজতবা খামেনিকে ২০২৬ সালের ৮ মার্চ সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এটি রেভল্যুশনারি গার্ড-সমর্থিত এমন এক বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকার, যা মূলত পুরনো শাসনব্যবস্থারই সর্বোচ্চ ধারাবাহিকতাকে প্রতিনিধিত্ব করে, কোনো সরকার পরিবর্তন নয়।
অর্থনীতিকে ধ্বংস না করে রেভল্যুশনারি গার্ডকে ভেঙে ফেলা সম্ভব নয়। আর ভেঙে পড়া অর্থনীতি কোনো অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তৈরি করে না, বরং এটি একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রের জন্ম দেয়। ওয়াশিংটন লিবিয়ায় ইতোমধ্যেই এই পরীক্ষা চালিয়ে দেখেছে।
রেভল্যুশনারি গার্ডকে বহাল রাখার অর্থ হলো বর্তমান শাসনব্যবস্থার নিপীড়নমূলক মূল শক্তিকেই অক্ষত রাখা। কেবল বোমা ফেলে বা নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিকে হত্যা করে ইরানে রাতারাতি নতুন ভোরের সূচনা ঘোষণার মতো কোনো পরিচ্ছন্ন বিকল্প আসলে নেই।
নির্বাসিত ইরানি বিরোধী গোষ্ঠী মুজাহিদিন-ই-খালক (এমইকে), প্রয়াত শাহের পুত্রের নেতৃত্বে দেশ পরিচালনার সমর্থক রাজতন্ত্রবাদী গোষ্ঠী এবং বিভিন্ন গণতান্ত্রিক উপদল এদের সবার ক্ষেত্রেই ২০০৩ সালের চালাবির মতো একই সংকট বিদ্যমান, ওয়াশিংটনে তাদের অবাধ যাতায়াত থাকলেও দেশের অভ্যন্তরে কোনো জনসমর্থন বা বৈধতা নেই।
মুজাহিদিন-ই-খালককে ইরান একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে এবং দেশের অভ্যন্তরে তারা ব্যাপকভাবে ঘৃণিত। ১৯৭৯ সালের পর থেকে রাজতন্ত্রবাদীরা আর ইরান শাসন করেনি এবং সে সময়ের বিপ্লবের মধ্য দিয়ে তাদের দুর্নীতিগ্রস্ত ও স্বৈরাচারী নেতাকে উৎখাত করা হয়েছিল। অন্যদিকে ইরানের অভ্যন্তরে যে গণতান্ত্রিক সংস্কারপন্থী নেটওয়ার্কগুলো ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠছিল, মার্কিন হামলা তাদেরও রক্ষা করতে পারেনি। গত জানুয়ারিতেই হাজার হাজার মানুষকে আটক ও হত্যার মাধ্যমে সরকার এই আন্দোলন কঠোর হাতে দমন করেছিল।
জাতীয় সংকটে পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার (র্যালি-অ্যারাউন্ড দ্য ফ্ল্যাগ) প্রভাব নিয়ে কয়েক দশকের গবেষণা ইরানের মানুষের কান্ডজ্ঞানেরই পরিচয় দেয়। কারণ নাগরিকেরা তাদের নেতাদের চরম ঘৃণা করলেও বাহ্যিক আক্রমণ রাষ্ট্রযন্ত্র ও জনগণকে এক সুতোয় গেঁথে ফেলে। যেসব ইরানি নাগরিক সর্বোচ্চ নেতার বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছিলো তারাই এখন নিজেদের শহরের বুকে বিদেশি বোমা আছড়ে পড়তে দেখছেন।
২০০৩ সালে ইরাকের জনসংখ্যা ছিল আড়াই কোটি, ১২ বছরের নিষেধাজ্ঞায় তাদের সামরিক বাহিনী ছিল বিপর্যস্ত এবং দেশটিতে কোনো সক্রিয় পারমাণবিক কর্মসূচিও ছিল না।
অন্যদিকে, ইরানের বর্তমান জনসংখ্যা ৯ কোটি ২০ লাখ। তাদের এমন সব প্রক্সি নেটওয়ার্ক রয়েছে, যা তেহরানের পতন ঘটলেও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে না বরং উল্টো আরও বেশি সক্রিয় হয়ে উঠবে। এর পাশাপাশি তাদের কাছে ৮৮০ পাউন্ডেরও বেশি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত রয়েছে, ২০২৫ সালের যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলার পর থেকে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থাও (আইএইএ) যার পূর্ণাঙ্গ হিসাব দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

ওয়াশিংটন যে প্রশ্নের উত্তর দেয়নি
৯ কোটি ২০ লাখ ইরানির শাসনভার কার হাতে?
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যিনিই ইরানের শাসন ক্ষমতায় বসুন না কেন, তাকে অবশ্যই ওয়াশিংটনের অনুমোদন নিতে হবে। কিন্তু কেবল ‘ভেটো’ দেওয়ার ক্ষমতাই কোনো রূপরেখা হতে পারে না।
ওয়াশিংটনে বসে প্রার্থীদের অনুমোদন বা বাতিলের জন্য একটি কার্যকর রাজনৈতিক প্রক্রিয়া, বৈধ অন্তর্বর্তীকালীন কর্তৃপক্ষ এবং এমন এক জনসমষ্টির প্রয়োজন, যারা নিজেদের নেতৃত্বের ওপর মার্কিন সিলমোহর মেনে নিতে প্রস্তুত। কিন্তু বাস্তবে এর কোনোটিরই অস্তিত্ব নেই।
ওয়াশিংটনের কেবল পছন্দ-অপছন্দই রয়েছে; তাদের কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নেই। পারমাণবিক কর্মসূচি নির্মূল করাই যদি মূল লক্ষ্য হয়ে থাকে, তবে ২০২৫ সালের হামলার আট মাস পরও কেন ইরানের কাছে অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহারযোগ্য ইউরেনিয়ামের হিসাব-বহির্ভূত মজুত রয়ে গেছে? এই হামলাগুলো পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের ঝুঁকির কোনো সমাধান তো করেইনি, উল্টো পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে গেছে।
লক্ষ্য যদি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষা হয়, তবে কেন প্রতি দফার হামলা একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধের জন্ম দিয়েছে?
ওয়াশিংটনের কাছে এসবের কোনো প্রশ্নেরই উত্তর নেই, রয়েছে কেবল ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর এক তত্ত্ব।
লেখক: শিক্ষক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়
লেখাটি দ্য কনভারসেশনে প্রকাশিত নিবন্ধ থেকে অনূদিত

কম খরচে উৎপাদন এবং বাস্তব পরিবেশে ব্যবহারের বিপুল অভিজ্ঞতার কারণে চীন এখন উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বেশ সস্তায় এসব স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি (অটোমেশন) রপ্তানি করার মতো সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উৎপাদন খাতে চীনের তৈরি রোবটগুলো ইতিমধ্যেই বেশ শক্ত অবস্থান তৈরি করে নিচ্ছে