তরুণদের ক্ষেপিয়ে কোনো দেশের শাসকেরা যে টিকতে পারেন না, সেটা নিকট অতীতে বাংলাদেশ ও নেপাল প্রমাণ করেছে।
এক মাসেরও কম সময়ের আন্দোলনে কুরসি চিরস্থায়ী ধরে নেওয়া শাসকেরা বিদায় নিয়েছেন, কেউ কেউ দেশত্যাগেও বাধ্য হয়েছেন। শ্রীলঙ্কার আন্দোনে অবশ্য জেনজি’রা নেতৃত্বের আসনে ছিল না, তবে সেখানেও তরুণেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। পাকিস্তানে বর্তমানে ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে যে আন্দোলন হচ্ছে, তারও পুরোভাগে তরুণেরা।
এই প্রেক্ষাপটে আমরা দিল্লিতে চলমান ককরোচ জনতা পার্টির বা জেনজি তরুণদের আন্দোলনকে কীভাবে ব্যাখ্যা করব? জুলাইয়ে তারা আন্দোলন শুরু করেছিল একটি অরাজনৈতিক ইস্যুকে সামনে রেখে, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার অভিযোগ এনে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করেছিলেন। সেই দাবিতে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে তরুণেরা যোগ দিলেও দিল্লির সমাবেশ শক্তিধর নরেন্দ্র মোদি সরকারেরও ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত মোদি সরকার জেনজি আন্দোলনকারীদের দাবি মেনে নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করে। জুলাইয়ের আন্দোলন সেখানেই সমাপ্ত হয়। ওদিকে বাংলাদেশে দু্ই বছর আগের জুলাইয়ে কোটাবিরোধী আন্দোলন এক দফার আন্দোলনে রূপ নেয় ক্ষমতাসীনদের আহম্মকির কারণে।
অক্টোবরে যেই দাবি নিয়ে ককরোচ জনতা পার্টি আন্দোলন করছে, সেটা পুরোপুরি রাজনৈতিক। দিল্লির কেন্দ্রস্থল যন্তর মন্তরে তারা যে সমাবেশ ডেকেছিল তাতেই মোদি সরকারের গদিতে কম্পন শুরু হয়েছে।
সিজেপির আন্দোলনকে কেন্দ্র করে এ পর্যন্ত আটক হয়েছে প্রায় ৬ হাজার মানুষ। ছবি: সংগৃহীত
ককরোচ পার্টির দাবি, ভোটার যাচাই বাছাইয়ের নামে তের কোটি মানুষের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছে। অতএব, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে পদত্যাগ করতে হবে। তাদের স্লোগান হলো: ‘জ্ঞানেশ, ইটস ডান ব্রো’, ‘জ্ঞানেশ তুমি চলে যাও’ ইত্যাদি ইত্যাদি। এখানে উল্লেখ করা দরকার, যে কায়দায় ভোটার তালিকায় নাম ঝাড়া–মোছা করা হয়েছে, তার সঙ্গে অপর দুই কমিশনার সুখবীর সিং ও বিবেকী যোশী একমত ছিলেন না। সিইসি এককভাবে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়েছেন।
ভারতের ডান, বাম সব বিরোধী দল ককরোচ পার্টির আন্দোলনের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছে। বিরোধী দলের নেতা রাহুল গান্ধী নির্বাচন কমিশনে ধরনা দিতে গিয়ে পুলিশের হেনস্তারও শিকার হয়েছেন। এর আগে বিরোধী দলের এমপিরা রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে স্মারকলিপি দেন, যাতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের যুক্তি তুলে ধরা হয়। এই বৈঠক নিয়েও কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে কথার লড়াই চলছে।
১০ অক্টোবরের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে মোদি সরকার পুরো দিল্লি শহরকেই অবরুদ্ধ করে দেয়। দিল্লির মেট্রোর সব স্টেশন বন্ধ রাখার পাশাপাশি দিল্লিগামী বাস, ট্রেনও বন্ধ করে দেয় তারা। উড়োজাহাজ থেকে নামিয়ে দেয় ককরোচ পার্টির নেতা অভিজিৎ দীপকেসহ কয়েকজনকে। আটক করে বামপন্থী ছাত্রনেতা নেহা বোরাকে। আন্দোলনে যোগ দিতে এসে বিরোধী দলের কয়েক হাজার নেতা–কর্মী আটক হয়েছেন, যাদের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি ও ত্রিপুরার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারও আছেন। অবশ্য কয়েক ঘন্টা পর তাদের ছেড়েও দেওয়া হয়েছে। আটকাবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে অভিজিৎ দীপকে সরকারের কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, মোদির ক্ষমতায় থাকা ভারতের জনগণের জন্য অস্বস্তিকর। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে ‘কাপুরুষ’ ও ‘জুলুমবাজ’ বলেও অভিহিত করেন এবং আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।
অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, বাংলাদেশ ও নেপালে জেনজি আন্দোলন যেভাবে সরকারের পতন ঘটিয়েছে ভারতে তার পুনরাবৃত্তি ঘটবে কি না। প্রথমত, ভারতের জেনজিরা এখনো প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের পদত্যাগ দাবি করেনি। তারা কেবল প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ চেয়েছে।
ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-এর আন্দোলন। ছবি: সিএনএন
দ্বিতীয়ত, ৭৯ বছর বয়সের ভারতে এ পর্যন্ত নির্বাচন ছাড়া সরকার পরিবর্তন ঘটেনি। বিরোধী দল বা জেনজিদের আন্দোলন বড়জোর সরকারকে আগাম নির্বাচন দিতে বাধ্য করতে পারে। কিন্তু সেখানেও সমস্যা আছে। ভারতের ২৯টি রাজ্যের মধ্যে বেশির ভাগ রাজ্য বিজেপি ও তাদের মিত্রদের শাসনাধীন। কংগ্রেস ও তাদের মিত্রদের হাতে গুটিকয়েক রাজ্য। এই দুর্বল অবস্থানে থেকে বিরোধী দলগুলো মোদি সরকারের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী আন্দোলন গড়ে তুলতে পারবে কি না, সে বিষয়েও সন্দেহ আছে। তবে আগামী বছর যে কয়েকটি রাজ্যে বিধানসভার ভোট হবে, সেখানে বিরোধী দল ভালো ফল করতে পারলে পরবর্তী লোকসভা নির্বাচনে তারা সমানে সমান লড়াই করতে পারবে।
গত লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি জোট জয়ী হলেও দুই–তৃতীয়াংশ আসন পায়নি। ফলে সংসদে যা খুশি করার অধিকার এখন নেই। তৃতীয়ত, বিরোধী দল তাদের ঐক্য ধরে রেখে নিজেদের শক্তি–সামর্থ্য বাড়াতে পারে কি না, তার ওপর রাজনীতির গতিপথ নির্ধারিত হবে।
এই আন্দোলন মোকাবিলায় বিজেপি সরকার কয়েকটি কৌশলগত ভুল করেছে। তারা মনে করেছে, অভিজিৎ দীপকেকে আটক করলে বা সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করলে আন্দোলন ঠেকিয়ে দেওয়া যাবে। কিন্তু অভিজিৎরা আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন যে, শীর্ষ নেতৃত্ব গ্রেপ্তার বা আটক হলে, কে কোথায় দায়িত্ব পালন করবেন।
এখানে একটি কথা বলা প্রয়োজন যে, ককরোচ পার্টি বা ভারতের জেনজিরা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য এই আন্দোলন করছে না। তারা আন্দোলন করছে দেশবাসীর একাংশের ভোটাধিকার হরণের প্রতিকার পেতে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নাহক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে। ফলে সাধারণ মানুষের সমর্থনও পাচ্ছে তারা।
চলতি বছর পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনেও ভোটার তালিকার কারসাজির বিষয়টি আলোচনায় আসে। যেখানে আগের নির্বাচনে বিজেপি গো–হারা হেরেছিল, সেখানে এবারের নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হওয়া অনেকের মনে প্রশ্ন জাগিয়েছে। কিন্তু তথ্যপ্রমাণের অভাবে তাৎক্ষণিকভাবে নির্বাচন কমিশনকে দায়ী করা যায়নি। পরে এ নিয়ে ভারতের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত অনুসন্ধানী সংবাদে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এখন জেনজিরা জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে যেই আন্দোলন করছে, সেটি সফল হলে হয়তো রহস্য পুরোপুরি খোলাসা হবে। জেনজি আন্দোলনের ফল যাই হোক না কেন, পুরনো পদ্ধতিতে আর রাজনীতি চলবে না। ধর্মের আফিম খাইয়েও মানুষকে বেশি দিন বুঁদ করে রাখা যাবে না। এখন সরকারি ও বিরোধী দল সবাইকে জনজীবনের সমস্যা সমাধানের দিকেই নজর দিতে হবে।
লেখক: সম্পাদক, চরচা