সোহরাব হাসান

গত এক সপ্তাহে সিডনিতে যেসব প্রবাসী বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়েছে, সবারই জিজ্ঞাসা দেশের অবস্থা কী? আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে তো? নির্বাচন হলেও তার চেহারা কেমন হবে? নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেশ কিছু নাটকীয় ঘটনা ঘটেছে, যা কারও কারও কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়েছে।
দেশে থাকতে যাকে আমরা স্বাভাবিক মনে করি, প্রবাসীদের কাছে তা অস্বাভাবিক মনে হয়। কেননা এখানে ভোটের রাজনীতির চেহারা পুরোপুরি ভিন্ন। কোনো উত্তেজনা নেই, দল ও জোট ভাঙার খেলা নেই।
কিন্তু বাংলাদেশে নির্বাচন মানে ‘যুদ্ধ’, যা ন্যায়-অন্যায় মানে না। এলডিপির সাধারণ সম্পাদক রেদোয়ান আহমদ ও গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান আসন ভাগাভাগিতে আশ্বস্ত হতে না পেরে সরাসরি বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ প্রতীক নিশ্চিত করেছেন। এর আগে, এলডিপির একাংশের নেতা শাহাদত হোসেন সেলিমও নিজের দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দিয়ে তার হক আদায় করেছেন।
এলডিপির প্রধান অলি আহমদ ও গণঅধিকার পরিষদ সভাপতি নুরুল হক নুর দুই ভিন্ন জোটের শরিক হয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার চেষ্টা করছেন। নুরুল হক নুর দলীয় প্রতীক রেখেই বিএনপির সঙ্গে সমঝোতায় আসছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর অলি আহমেদ ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে জামায়াত জোটে নিজের নাম লিখিয়েছেন। এরা মুখে নীতি আদর্শের কথা বললেও বাস্তবে ভোটে জেতাই একমাত্র আরাধনা হয়ে উঠেছে।
অলি আহমদ জামায়াত জোটে যোগ দেওয়ার খবরের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আরেকটি খবরও ভাসছে। বিএনপি জামায়াতকে জোটে রাখার কারণে তিনি অতীতে ১৮ দলীয় জোট ত্যাগ করেছিলেন।
এদিকে কিছু আসনে মনোনয়ন বঞ্চিত বিএনপির নেতা/ নেত্রী স্বতন্ত্র প্রার্থী হচ্ছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত প্রার্থী রুমিন ফারহানা, যিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার এই নির্বাচনী লড়াই। বিএনপি এই আসনটি অন্যদের ছেড়ে দিয়েছে।
তবে নির্বাচনী মঞ্চে সবচেয়ে বড় চমক দেখালো চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদের নিয়ে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি জামায়াতের সঙ্গে ব্রাকেটবন্দী হয়ে।
চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে দল গঠনের পর এনসিপি নেতারা বিএনপি ও জামায়াতের বাইরে রাজনীতিতে নতুন ধারা চালু ও নতুন বন্দোবস্তের কথা বলে আসছিলেন। আবার তারা দুই বড় দলের সঙ্গে তলে তলে আলোচনাও চালিয়ে আসছিলেন। এখানে নীতি ও আদর্শের চেয়ে আসন নিয়ে দরকষাকষিই প্রাধান্য পেয়েছে।
মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা পার হওয়ার আগের দিন নাটকীয়ভাবে দলটি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ভেতর থেকে বিরোধিতার মুখে পড়ে। শুরু থেকে এনসিপিতে তিনটি ধারা বহমান ছিল। প্রথম ধারাটি স্বতন্ত্র অবস্থানের পক্ষে ছিল। দ্বিতীয় ধারাটি বিএনপির সঙ্গে জোট বেধে ক্ষমতায় যাওয়ার খোয়াব দেখেছিল। আর তৃতীয় ধারার অনুসারীরা জামায়াতেই বেশি আস্থা রেখে আসছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন হিসেবে তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন রাজনীতির অনেক হিসেব নিকেষ বদলে দেয়। বিএনপির পক্ষে এক ধরনের গণজাগরণ সৃষ্টি হলে এনসিপি নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়ে। তারা মনে করে, স্বতন্ত্র অবস্থান নিয়ে ভোটের মাঠে টিকে থাকা যাবে না। যে কোনো একটি বড় দলের সঙ্গে জোটবদ্ধ হতে হবে। এই প্রেক্ষাপটে এনসিপি ৩০টির মতো আসন নিয়ে জামায়াতের জোটে যোগ দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়।
কেন্দ্রীয় কমিটির ৩০ জন নেতা আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে লেখা চিঠিতে এর আপত্তি জানান। অন্যদিকে দলের তাসনিম জারাসহ দুই কেন্দ্রীয় নেত্রী পদত্যাগ করেছেন। দলের আরও কয়েকজন নেতা পদত্যাগ না করলেও রাজনীতি থেকে নিজেদের সরিয়ে নিতে পারেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। বিশেষ করে যেসব নারী চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন, তাদের বেশির ভাগই জামায়াতের সঙ্গে এই রাজনৈতিক সমঝোতা সহজভাবে মানতে পারেননি। তারা মনে করেন, জামায়াতের একাত্তরের দায় ও নারী অধিকার বিরোধী মনোভাব হজম করা কঠিন।
জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশনের সঙ্গে আলোচনায় প্রতিটি রাজনৈতিক দল শতকরা ৫ ভাগ আসনে নারী প্রার্থী দেওয়ার বিষয়ে একমত হলেও জামায়াত কোনো আসনে নারী প্রতিনিধি রাখেনি। নারীদের কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনাবিষয়ক জামায়াত আমিরের মন্তব্যও তাদের ক্ষুব্ধ করেছে।
এদিকে এনসিপির তাত্ত্বিক নেতা হিসেবে পরিচিত সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম এক ফেসবুক বার্তায় লিখেছেন, ‘তিনি এই এনসিপির অংশ হচ্ছেন না।’ জুলাই অভ্যুত্থানের সম্মুখসারির নেতা হিসেবে যে তিন ছাত্রনেতা অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে ছিলেন, তাদের একজন মাহফুজ আলম। অভ্যুত্থানের নেতৃত্বে থাকা তরুণদের দল ও সংগঠন এনসিপি ও নাগরিক কমিটিতে তার প্রভাব ছিল। অপর দুই ছাত্রনেতা হলেন নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া। নাহিদ এনসিপির নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং আসিফ এনসিপিতে যোগ দিয়ে দলের পক্ষে নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নিচ্ছেন। এর আগে তিনি ঢাকা–১০ এ স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েও সরে আসেন।
ফেসবুকে মাহফুজ আলম আরও লিখেছেন, “নাগরিক কমিটি ও এনসিপি জুলাইয়ের সম্মুখসারির নেতৃত্বে সংগঠিত হয়েছিল। এ দুটি সংগঠনে আমার জুলাই সহযোদ্ধারা থাকায় গত দেড় বছর আমি চাহিবামাত্র তাদের পরামর্শ, নির্দেশনা ও পলিসিগত (নীতিগত) জায়গায় সহযোগিতা করেছি।”
বিদ্যমান বাস্তবতায় এই সম্পর্ক আর থাকছে না জানিয়ে মাহফুজ আলম বলেন, “আমার জুলাই সহযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান, স্নেহ ও বন্ধুত্ব মুছে যাবে না। কিন্তু আমি এ এনসিপির অংশ হচ্ছি না। আমাকে জামায়াত-এনসিপি জোট থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয়নি, এটা সত্য নয়। কিন্তু ঢাকার কোনো একটা আসনে জামায়াত-এনসিপি জোটের প্রার্থী হওয়ার চাইতে আমার লং স্ট্যান্ডিং পজিশন (দীর্ঘদিনের অবস্থান) ধরে রাখা অধিক গুরুত্বপূর্ণ।”
এর আগে জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির সখ্যের খবর চাউর হলে উপদেষ্টা পদে থাকা মাহফুজ আলম মন্তব্য করেছিলেন, ‘আরেকটি ব্রাকেটবন্দী মওদুদীবাদী দলের প্রয়োজন নেই।’
মাহফুজ আলমের এই সতর্কবার্তা যে এনসিপি নেতাদের চৈতন্নোদয় ঘটাতে পারেনি, তা তাদের সর্বশেষ সিদ্ধান্তই প্রমাণ। তাদের দাবি, জামায়াতে জোটে যাওয়া না যাওয়া নিয়ে যে মতভেদ ছিল, গণতান্ত্রিক উপায়েই তা সমাধান করা হয়েছে। একই সঙ্গে তারা ভিন্নমতপোষণকারীদের সঙ্গেও আলোচনা করবেন বলে জানিয়েছেন। কিন্তু তাদের এই আশ্বাসবাণী শেষ পর্যন্দ দলের ভাঙন ঠেকাতে পারবে বলে মনে হয় না। এনসিপিতে আনুষ্ঠানিক ভাঙন দেখা না দিলেও অনেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবেন।
অতীতের কিছু হঠকারী সিদ্ধান্ত ও উগ্র কথাবার্তার জন্যই এনসিপি অনেকটা একঘরে হয়ে যায় বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। শুরুতে তারা জনমনে আশা জাগালেও সেটি ধরে রাখতে পারেনি। মুখে নিজেদের মধ্যপন্থী বলে দাবি করলেও শেষ পর্যন্ত কর্মকাণ্ড ডান পক্ষেই গিয়েছে। এ অবস্থায় জামায়াত জোটে না গিয়ে তাদের উপায় ছিল না। জোটের কাছে তারা কতটি আসন পেয়েছে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো বাকি আসনে নেতা-কর্মীদের সুরক্ষা দেওয়া এবং সাংগঠনিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা।
সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে নতুন উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছেন। সেই উদ্যোগে এনসিপির হতাশ ও ক্ষুব্ধ নেতা-কর্মীরা যুক্ত হবেন কিনা সেই প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যতেই জানা যাবে। আপাতত এনসিপি নেতৃত্ব বালুতে মুখ গুঁজে ঝড় থামানোর চেষ্টা করছেন।
লেখক: সম্পাদক, চরচা।

গত এক সপ্তাহে সিডনিতে যেসব প্রবাসী বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়েছে, সবারই জিজ্ঞাসা দেশের অবস্থা কী? আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে তো? নির্বাচন হলেও তার চেহারা কেমন হবে? নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেশ কিছু নাটকীয় ঘটনা ঘটেছে, যা কারও কারও কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়েছে।
দেশে থাকতে যাকে আমরা স্বাভাবিক মনে করি, প্রবাসীদের কাছে তা অস্বাভাবিক মনে হয়। কেননা এখানে ভোটের রাজনীতির চেহারা পুরোপুরি ভিন্ন। কোনো উত্তেজনা নেই, দল ও জোট ভাঙার খেলা নেই।
কিন্তু বাংলাদেশে নির্বাচন মানে ‘যুদ্ধ’, যা ন্যায়-অন্যায় মানে না। এলডিপির সাধারণ সম্পাদক রেদোয়ান আহমদ ও গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান আসন ভাগাভাগিতে আশ্বস্ত হতে না পেরে সরাসরি বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ প্রতীক নিশ্চিত করেছেন। এর আগে, এলডিপির একাংশের নেতা শাহাদত হোসেন সেলিমও নিজের দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দিয়ে তার হক আদায় করেছেন।
এলডিপির প্রধান অলি আহমদ ও গণঅধিকার পরিষদ সভাপতি নুরুল হক নুর দুই ভিন্ন জোটের শরিক হয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার চেষ্টা করছেন। নুরুল হক নুর দলীয় প্রতীক রেখেই বিএনপির সঙ্গে সমঝোতায় আসছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর অলি আহমেদ ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে জামায়াত জোটে নিজের নাম লিখিয়েছেন। এরা মুখে নীতি আদর্শের কথা বললেও বাস্তবে ভোটে জেতাই একমাত্র আরাধনা হয়ে উঠেছে।
অলি আহমদ জামায়াত জোটে যোগ দেওয়ার খবরের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আরেকটি খবরও ভাসছে। বিএনপি জামায়াতকে জোটে রাখার কারণে তিনি অতীতে ১৮ দলীয় জোট ত্যাগ করেছিলেন।
এদিকে কিছু আসনে মনোনয়ন বঞ্চিত বিএনপির নেতা/ নেত্রী স্বতন্ত্র প্রার্থী হচ্ছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত প্রার্থী রুমিন ফারহানা, যিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার এই নির্বাচনী লড়াই। বিএনপি এই আসনটি অন্যদের ছেড়ে দিয়েছে।
তবে নির্বাচনী মঞ্চে সবচেয়ে বড় চমক দেখালো চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদের নিয়ে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি জামায়াতের সঙ্গে ব্রাকেটবন্দী হয়ে।
চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে দল গঠনের পর এনসিপি নেতারা বিএনপি ও জামায়াতের বাইরে রাজনীতিতে নতুন ধারা চালু ও নতুন বন্দোবস্তের কথা বলে আসছিলেন। আবার তারা দুই বড় দলের সঙ্গে তলে তলে আলোচনাও চালিয়ে আসছিলেন। এখানে নীতি ও আদর্শের চেয়ে আসন নিয়ে দরকষাকষিই প্রাধান্য পেয়েছে।
মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা পার হওয়ার আগের দিন নাটকীয়ভাবে দলটি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ভেতর থেকে বিরোধিতার মুখে পড়ে। শুরু থেকে এনসিপিতে তিনটি ধারা বহমান ছিল। প্রথম ধারাটি স্বতন্ত্র অবস্থানের পক্ষে ছিল। দ্বিতীয় ধারাটি বিএনপির সঙ্গে জোট বেধে ক্ষমতায় যাওয়ার খোয়াব দেখেছিল। আর তৃতীয় ধারার অনুসারীরা জামায়াতেই বেশি আস্থা রেখে আসছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন হিসেবে তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন রাজনীতির অনেক হিসেব নিকেষ বদলে দেয়। বিএনপির পক্ষে এক ধরনের গণজাগরণ সৃষ্টি হলে এনসিপি নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়ে। তারা মনে করে, স্বতন্ত্র অবস্থান নিয়ে ভোটের মাঠে টিকে থাকা যাবে না। যে কোনো একটি বড় দলের সঙ্গে জোটবদ্ধ হতে হবে। এই প্রেক্ষাপটে এনসিপি ৩০টির মতো আসন নিয়ে জামায়াতের জোটে যোগ দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়।
কেন্দ্রীয় কমিটির ৩০ জন নেতা আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে লেখা চিঠিতে এর আপত্তি জানান। অন্যদিকে দলের তাসনিম জারাসহ দুই কেন্দ্রীয় নেত্রী পদত্যাগ করেছেন। দলের আরও কয়েকজন নেতা পদত্যাগ না করলেও রাজনীতি থেকে নিজেদের সরিয়ে নিতে পারেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। বিশেষ করে যেসব নারী চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন, তাদের বেশির ভাগই জামায়াতের সঙ্গে এই রাজনৈতিক সমঝোতা সহজভাবে মানতে পারেননি। তারা মনে করেন, জামায়াতের একাত্তরের দায় ও নারী অধিকার বিরোধী মনোভাব হজম করা কঠিন।
জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশনের সঙ্গে আলোচনায় প্রতিটি রাজনৈতিক দল শতকরা ৫ ভাগ আসনে নারী প্রার্থী দেওয়ার বিষয়ে একমত হলেও জামায়াত কোনো আসনে নারী প্রতিনিধি রাখেনি। নারীদের কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনাবিষয়ক জামায়াত আমিরের মন্তব্যও তাদের ক্ষুব্ধ করেছে।
এদিকে এনসিপির তাত্ত্বিক নেতা হিসেবে পরিচিত সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম এক ফেসবুক বার্তায় লিখেছেন, ‘তিনি এই এনসিপির অংশ হচ্ছেন না।’ জুলাই অভ্যুত্থানের সম্মুখসারির নেতা হিসেবে যে তিন ছাত্রনেতা অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে ছিলেন, তাদের একজন মাহফুজ আলম। অভ্যুত্থানের নেতৃত্বে থাকা তরুণদের দল ও সংগঠন এনসিপি ও নাগরিক কমিটিতে তার প্রভাব ছিল। অপর দুই ছাত্রনেতা হলেন নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া। নাহিদ এনসিপির নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং আসিফ এনসিপিতে যোগ দিয়ে দলের পক্ষে নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নিচ্ছেন। এর আগে তিনি ঢাকা–১০ এ স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েও সরে আসেন।
ফেসবুকে মাহফুজ আলম আরও লিখেছেন, “নাগরিক কমিটি ও এনসিপি জুলাইয়ের সম্মুখসারির নেতৃত্বে সংগঠিত হয়েছিল। এ দুটি সংগঠনে আমার জুলাই সহযোদ্ধারা থাকায় গত দেড় বছর আমি চাহিবামাত্র তাদের পরামর্শ, নির্দেশনা ও পলিসিগত (নীতিগত) জায়গায় সহযোগিতা করেছি।”
বিদ্যমান বাস্তবতায় এই সম্পর্ক আর থাকছে না জানিয়ে মাহফুজ আলম বলেন, “আমার জুলাই সহযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান, স্নেহ ও বন্ধুত্ব মুছে যাবে না। কিন্তু আমি এ এনসিপির অংশ হচ্ছি না। আমাকে জামায়াত-এনসিপি জোট থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয়নি, এটা সত্য নয়। কিন্তু ঢাকার কোনো একটা আসনে জামায়াত-এনসিপি জোটের প্রার্থী হওয়ার চাইতে আমার লং স্ট্যান্ডিং পজিশন (দীর্ঘদিনের অবস্থান) ধরে রাখা অধিক গুরুত্বপূর্ণ।”
এর আগে জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির সখ্যের খবর চাউর হলে উপদেষ্টা পদে থাকা মাহফুজ আলম মন্তব্য করেছিলেন, ‘আরেকটি ব্রাকেটবন্দী মওদুদীবাদী দলের প্রয়োজন নেই।’
মাহফুজ আলমের এই সতর্কবার্তা যে এনসিপি নেতাদের চৈতন্নোদয় ঘটাতে পারেনি, তা তাদের সর্বশেষ সিদ্ধান্তই প্রমাণ। তাদের দাবি, জামায়াতে জোটে যাওয়া না যাওয়া নিয়ে যে মতভেদ ছিল, গণতান্ত্রিক উপায়েই তা সমাধান করা হয়েছে। একই সঙ্গে তারা ভিন্নমতপোষণকারীদের সঙ্গেও আলোচনা করবেন বলে জানিয়েছেন। কিন্তু তাদের এই আশ্বাসবাণী শেষ পর্যন্দ দলের ভাঙন ঠেকাতে পারবে বলে মনে হয় না। এনসিপিতে আনুষ্ঠানিক ভাঙন দেখা না দিলেও অনেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবেন।
অতীতের কিছু হঠকারী সিদ্ধান্ত ও উগ্র কথাবার্তার জন্যই এনসিপি অনেকটা একঘরে হয়ে যায় বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। শুরুতে তারা জনমনে আশা জাগালেও সেটি ধরে রাখতে পারেনি। মুখে নিজেদের মধ্যপন্থী বলে দাবি করলেও শেষ পর্যন্ত কর্মকাণ্ড ডান পক্ষেই গিয়েছে। এ অবস্থায় জামায়াত জোটে না গিয়ে তাদের উপায় ছিল না। জোটের কাছে তারা কতটি আসন পেয়েছে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো বাকি আসনে নেতা-কর্মীদের সুরক্ষা দেওয়া এবং সাংগঠনিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা।
সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে নতুন উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছেন। সেই উদ্যোগে এনসিপির হতাশ ও ক্ষুব্ধ নেতা-কর্মীরা যুক্ত হবেন কিনা সেই প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যতেই জানা যাবে। আপাতত এনসিপি নেতৃত্ব বালুতে মুখ গুঁজে ঝড় থামানোর চেষ্টা করছেন।
লেখক: সম্পাদক, চরচা।

৩২ বছর বয়সী ছাত্রনেতা শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। গত ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ঢাকায় মুখোশধারী দুর্বৃত্তদের গুলিতে আহত হওয়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।