জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি হচ্ছে, দাম বাড়ল কেন? কিন্তু আমাদের এখানে প্রশ্নটি করার আগেই উত্তর হাজির: আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে, তাই দেশের বাজারেও দাম বাড়াতে হয়েছে। ব্যস, হিসাব শেষ। অথচ জ্বালানি তেলের হিসাব এত সরল নয়। বরং এই সরলীকরণের মধ্যেই লুকিয়ে থাকতে পারে আসল শুভংকরের ফাঁকি।
একটি তথ্য দিয়ে শুরু করা যাক। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন, অর্থাৎ বিপিসি, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৪ হাজার ৫৮৬ কোটি, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩ হাজার ৯৪৩ কোটি এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ৪ হাজার ৩০০ কোটি টাকা নিট লাভ করেছে। অর্থাৎ টানা তিন বছরেই রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠান লাভ করেছে। বিপিসির বার্ষিক প্রতিবেদনও সংশ্লিষ্ট বছরের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
এখন প্রশ্ন, এমন একটি প্রতিষ্ঠান হঠাৎ লোকসানের মুখে পড়লে সেই হিসাবটা জনগণের সামনে কতটা স্বচ্ছভাবে দেওয়া হচ্ছে?
এখানেই আসল গোলমাল। ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা, পেট্রল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা করা হয়েছে। সরকার বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে এবং বিপিসির ওপর বড় আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির ১.৯ বিলিয়ন ডলার ঘাটতির কথা সরকার জানিয়েছে।
এই তথ্যকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ঘাটতির পূর্ণ হিসাব কোথায়? কোন পণ্যে কত আমদানি ব্যয়, কত শুল্ক-কর, কত পরিবহন ব্যয়, কত রিফাইনিং ব্যয়, বিপিসির মার্জিন কত, এবং প্রতি লিটারে সরকারের রাজস্ব কত? জনগণের কাছে যদি এই হিসাব না দেওয়া হয়, তাহলে ‘আন্তর্জাতিক বাজার’ কথাটি তথ্যের চেয়ে বেশি হয়ে যায় একটি সুবিধাজনক ঢাল।
আরেকটি বিষয় আরও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ২০২৪ সাল থেকে স্বয়ংক্রিয় জ্বালানি মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা চালু করেছে। এই কাঠামোতে শুধু আন্তর্জাতিক তেলের দাম নয়, ডলারের বিনিময় হার, শুল্ক-কর, আমদানি ব্যয়, পরিবহন, বিপিসির মার্জিনসহ একাধিক বিষয় বিবেচনা করা হয়। অর্থাৎ ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বাড়ল মানেই বাংলাদেশের পাম্পে একই অনুপাতে দাম বাড়বে, এমন কোনো সরল অঙ্ক নেই।
বরং এখানেই দরকার পুরো হিসাবটি প্রকাশ করা। কারণ বিপিসি তিন বছর ধরে হাজার হাজার কোটি টাকা লাভ করেছে। ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক অপরিশোধিত তেলের গড় দামও আগের বছরের তুলনায় কম ছিল, আর সেই সময়ে বিপিসির লাভ হয়েছে ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি। তাহলে ২০২৬ সালের সংকটে সেই সঞ্চিত মুনাফা, কর-রাজস্ব এবং মূল্য কাঠামোর প্রভাব কীভাবে বিবেচনা করা হলো, সেটিই জনগণের জানার বিষয়।
তবে আরেকটি সত্যও অস্বীকার করা যাবে না। আগের বছরের লাভ দিয়ে চলতি বছরের লোকসানকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিথ্যা বলা যায় না। ২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক তেল ও শিপিং ব্যয় সত্যিই বেড়েছে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি ব্রেন্ট ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছিল। অতএব সমস্যা আছে। প্রশ্ন হলো, সমস্যার পুরো বোঝা কি ভোক্তার ঘাড়েই চাপাতে হবে?
ডিজেলের ক্ষেত্রেই বিষয়টি সবচেয়ে ভয়াবহ। ডিজেল শুধু গাড়ির জ্বালানি নয়; কৃষি, সেচ, পরিবহন, নির্মাণ, শিল্প, পণ্য সরবরাহ, প্রায় পুরো অর্থনীতির সঙ্গে এটি যুক্ত। ফলে পাম্পে ২০ টাকা বাড়ানো শেষ পর্যন্ত ২০ টাকার গল্প থাকে না। ট্রাকভাড়া বাড়ে, কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়ে, পাইকারি বাজারে দাম বাড়ে, খুচরা বাজারে তার ওপর আবার মার্জিন যোগ হয়। অর্থাৎ জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি অর্থনীতিতে একটি গুণিতক প্রভাব তৈরি করে। সরকার নিজেও জানে, জ্বালানির দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতি ও পরিবহন ব্যয়ের ওপর চাপ পড়ে। সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে ব্যবসায়ী মহলও উৎপাদন ব্যয় ও কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে।
এখন আসে আইএমএফ প্রসঙ্গ। বাংলাদেশ ২০২৩ সালে আইএমএফ-এর কাছ থেকে ৩.৩ বিলিয়ন ডলারের ইসিএফ/ইএফএফ এবং ১.৪ বিলিয়ন ডলারের আরএসএফ অনুমোদন পায়। আইএমএফ সেই কর্মসূচির অংশ হিসেবেই জ্বালানি পণ্যের জন্য নিয়মিত ফর্মুলা বেইজড প্রাইসিং চালুর বিষয়টি ছিল স্পষ্ট। আইএমএফ-এর নথিতেই বলা হয়েছিল, পেট্রোলিয়াম পণ্যে কাঠামোগত ভর্তুকি কমিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মূল্য নির্ধারণের ব্যবস্থা করা হবে।
সুতরাং এটিকে শুধু ‘আইএমএফের দাসত্ব’ বলে উড়িয়ে দেওয়াও যেমন তথ্যসম্মত নয়, তেমনি আইএমএফের শর্ত মানলেই রাষ্ট্রের সব সিদ্ধান্ত অর্থনৈতিকভাবে ন্যায়সঙ্গত হয়ে যায়, সেটিও সত্য নয়। ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান সংস্কার চাইবে। কিন্তু কোন সংস্কারের খরচ কে দেবে, সেটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখানেই: সরকারের কাছে যদি ভর্তুকি কমানোর যুক্তি থাকে, তাহলে ধনী ও নিম্নআয়ের মানুষের ওপর একইভাবে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির বোঝা চাপবে কেন? উন্নত দেশগুলোও ঘাটতি বাজেট করে, ঋণ নেয়, ভর্তুকি দেয়, কর কাঠামো বদলায়। তাদের অর্থনীতি যে প্রতিবার আয়-ব্যয়ের খাতা মিলিয়েই চলে, এমন নয়। রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি নিছক পারিবারিক বাজারের খাতা নয়।
তাই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর বিতর্কে আমাদের দরকার না স্লোগান, না ভয় দেখানো। দরকার পূর্ণ হিসাব। বিপিসি কত দামে তেল কিনেছে, কতদিনের মজুত ছিল, কত দামে বিক্রি করেছে, কত কর দিয়েছে, কত লাভ বা লোকসান হয়েছে, এবং নতুন ২০ টাকা বৃদ্ধির প্রতি লিটারে সরকারের প্রকৃত রাজস্ব ও বিপিসির প্রকৃত মার্জিন কত, সব প্রকাশ করা হোক।
কারণ জনগণকে শুধু বলা হবে, “বিশ্ববাজারে দাম বেড়েছে”, আর জনগণ প্রশ্ন করলে বলা হবে, “হিসাব আছে, কিন্তু দেখানো যাবে না”। সেটাই যদি হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারের দোষ যতটা, তার চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায় হিসাবের অস্বচ্ছতা।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়তেই পারে। কিন্তু প্রশ্নটা থেকেই যায়: ৪ হাজার কোটি টাকা লাভ করা বিপিসির দেশে, জ্বালানির দাম বাড়ানোর আগে জনগণের কাছ থেকে আসলে কোন হিসাবটি গোপন রাখা হচ্ছে?
সত্য ও মিথ্যার মাঝখানে পার্থক্যটা খুব বড় নয়। পার্থক্যটা হলো হিসাব দেখানোর সাহস।
চিররঞ্জন সরকার: কলাম লেখক ও গবেষক