জুলাই সনদে ডেডলক, বিদেশ যাত্রায় মতৈক্য

জুলাই সনদে ডেডলক, বিদেশ যাত্রায় মতৈক্য
জুলাই সনদ নিয়ে এখনো ঐক্য হয়নি রাজনৈতিক দলগুলোর

সকালে হোয়াটসঅ্যাপ খুলতেই একটি বার্তা পেলাম বন্ধু মফিজুর রহমান লাল্টুর কাছ থেকে। এর আগে বলা হয়েছিল বৃহস্পতিবার বিকেল চারটায় বিবর্তনের পরিবেশনায় ক্রীতদাস কথা নাটকটি মঞ্চস্থ হবে চীন–বাংলাদেশ নাট্য উৎসবের অংশ হিসেবে। কিন্তু শিল্পকলা একাডেমির আশপাশে বড় ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি থাকার কারণে চীনা দূতাবাস ওই কর্মসূচি স্থগিত করার কথা জানিয়েছে। এ রকম একটি নাটক মঞ্চায়ন করতে অনেক মানুষকে শ্রম দিতে হয়, প্রস্তুতি নিতে হয়। আমন্ত্রিত অতিথিরাও অন্য কাজ বাদ দিয়ে নাটক দেখার সময় বের করেন। এ অবস্থায় নাটক স্থগিত হলে অয়োজক প্রতিষ্ঠানকে বড় ধরনের খেসারত দিতে হয়।

ঘটনাটি দৈবদুর্বিপাকের কারণে হয়নি। হয়েছে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের কর্মসূচির কারণে। জামায়াতে ইসলামী বিকেল সাড়ে চারটায় বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে সমাবেশ ও শাহবাগ পর্যন্ত বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি নিয়েছে। ইসলামী আন্দোলন জোহর নামাজের পর বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে মিছিল করবে বলে জানিয়েছে। একই ধরনের কর্মসূচি আছে খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টিরও (জাগপা)।

আগের দিন পলিটেকনিক শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ও অবরোধের কারণে ঢাকা শহরে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। ৩৫ প্রত্যাশী চাকরিপ্রার্থীরা যমুনা অভিমুখে মিছিল করতে গেলে পুলিশ তাদের বেধরক লাঠিপেটা করে।

আমরা ভেবেছিলাম, চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের পর দাবি দাওয়া আদায়ে কাউকে রাস্তায় নেমে আন্দোলন করতে হবে না। সরকার আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করবে।

পেশাজীবীরা অনেক সময় নিরুপায় হয়ে রাস্তায় নামেন। রাজনৈতিক সরকারের আমলে বিরোধী দল নানা দাবি দাওয়া নিয়ে মাঠে নামে। কিন্তু যেই রাজনৈতিক দলগুলো আন্দোলন করে অন্তর্বর্তী সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়েছে, তারাই এখন নানা দাবি নিয়ে মাঠ গরম করছে। বৃহস্পতিবার রাজনৈতিক দলগুলো যেসব দাবিতে আন্দোলনের কর্মসূচি দিয়েছে, সেসব দাবি নিয়ে তারা সরকারের সঙ্গে আলোচনাও অব্যাহত রেখেছে। অনেকে বলেন, সরকারকে চাপে রাখতে এটি করা হয়েছে। এখন বিএনপিসহ অন্যান্য দলও যদি তাদের দাবি নিয়ে একইভাবে রাস্তায় নামে তাহলে পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে? আবার আমরা হরতাল–অবরোধের যুগে ফিরে গেলাম?

এই যে দিনের পর দিন রাস্তা বন্ধ করে ঢাকা শহরে কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে, তাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। খেটে খাওয়া মানুষ, জুলাই অভ্যুত্থানে কোনো রাজনৈতিক দলের চেয়ে তাদের ভূমিকা মোটেই কম ছিল না। তাদের কেউ ক্ষমতার হিস্যা নিয়ে মারামারি কাটাকাটি করছেন না।

রাজনৈতিক দলগুলোই দেশ চালাবে। কিন্তু তাদের মধ্যে ন্যূনতম মতৈক্যও তো থাকতে হবে। ঢাকায় যখন জুলাই সনদ নিয়ে কয়েকটি দল রাজপথ গরম করছে, তখনই খবর দেখলাম, প্রধান উপদেষ্টার সফরসঙ্গী হিসেবে তিনটি দলের চারজন নেতা আমেরিকা যাচ্ছেন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে। এরা হলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা হুমায়ুন কবীর, জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা আখতার হোসাইন। এটাকে আমরা সম্প্রীতি–যাত্রা বলেও আখ্যায়িত করতে পারি।

ঐকমত্য কমিশনের বৈঠক

প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস সরকারি প্রতিনিধি দলের বাইরে যাদের সফরসঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছেন, জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে তাদের মধ্যে প্রবল মতভেদ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিএনপি চাইছে, জুলাই সনদের বিষয়টি সাংবিধানিক আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে । নির্বাচনের পর গঠিত জাতীয় সংসদে সেটি আইনে রূপান্তরিত হবে। জামায়াতে ইসলামী বলছে, সাংবিধানিক আদেশ বা গণভোটের মাধ্যমে এটি হতে পারে। অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টি মনে করে, নতুন গণপরিষদ গঠন করে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে। গণপরিষদ ছাড়া এটি করলে ভবিষ্যতে কেউ বাতিল করে দিতে পারে।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সর্বশেষ বৈঠকে তারা বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে যেই মতামত উপস্থাপন করেছে তা নিয়েও রাজনৈতিক দলগুলো একমত হতে পারেনি। বিশেষজ্ঞরা সাংবিধানিক আদেশের পাশাপাশি সংসদ নির্বাচনের দিন জুলাই সনদের প্রশ্নে গণভোটের প্রস্তাব দিয়েছেন। জামায়াত এই প্রস্তাব গ্রহণ করলেও বিএনপি কোনোভাবে নির্বাচনের দিন গণভোটে রাজি নয়। তারা বলেছে, গণভোট হতে পারে, তবে নির্বাচনের আগে নয়। এনসিপি আনুষ্ঠানিকভাবে মতামত না দিলেও তারা গণপরিষদ ও সংসদ নির্বাচন একসঙ্গে করার কথা বলেছে।

WhatsApp Image 2025-09-18 at 13.14.18

এ অবস্থায় জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠক অক্টোবর পর্যন্ত স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। তবে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা চলবে । জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে ডেডলক দেখা দিলেও প্রধান উপদেষ্টার সফরসঙ্গী হতে তিন দল সানন্দে সম্মতি দিয়েছে। এটাও অনানুষ্ঠানিক আলোচনার অংশ কি না,সেটা ভবিষ্যতে জানা যাবে। আমরা তিন দলের চার প্রতিনিধির জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগদানকে স্বাগত জানাই। কিন্তু জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে রাজনৈতিক দলগুলোর রাজপথের কর্মসূচিকে সমর্থন জানাতে পারছি না। যেই সমস্যা আলোচনার মাধথ্যমে সমাধান করা সম্ভব, সেটি নিয়ে কেন জনজীবন অচল করা হবে? কেন সাধারণ মানুষকে দিনের পর দিন কষ্ট দেওয়া হবে? আর নির্বাচন ও জুলাই সনদ নিয়ে যদি তারা শেষপর্যন্ত একমত না হতে পারেন, তাহলে নির্বাচনও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।

সম্পর্কিত