বিশ্বখ্যাত কান চলচ্চিত্র উৎসবের ইতিহাসে খুব বেশি ভারতীয় সিনেমা তাদের প্রতিযোগতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়নি। প্রথম কানের প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে পাম দ’র পুরস্কার পায় ১৯৪৬ সালে মুক্তি পাওয়া চেতন আনন্দ পরিচালিত সিনেমা ‘নিচা নগর’। পাম দ’র হলো কানের সর্বোচ্চ পুরস্কার। এই পুরস্কার আজ পর্যন্ত আর কোনো ভারতীয় নির্মাতা পাননি। কান উৎসবে অন্যান্য পুরস্কার পেয়েছেন সত্যজিৎ রায়, বিমল রায়, মৃণাল সেন, মিরা নাইর, মুরালি নাইরসহ আরো কয়েকজন। মৃণাল সেনের ‘খারিজ’ সিনেমা ১৯৮৩ সালের পেয়েছিল জুরি পুরস্কার।
মৃণাল সেনের ‘খারিজ’ মুক্তি পায় ১৯৮২ সালে। এটিকে বাংলা চলচ্চিত্রের এক অনবদ্য সৃষ্টি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সিনেমায় দেখা যায়, একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের ‘পালান’ নামের গৃহকর্মী ছেলেটির রহস্যজনক মৃত্যু হয়। একটি বদ্ধ রান্নাঘরে ছেলেটির কীভাবে মৃত্যু হলো, তা নিয়ে শুরু হয় জল্পনা-কল্পনা। মৃত্যুরহস্য সমাধানের আগেই বেরিয়ে আসতে থাকে সমাজের বীভৎস রূপ, প্রান্তিক মানুষের প্রতি আমাদের চরম উন্নাসিকতা এবং ক্ষমতার অট্টহাসি।
আসলে এই সিনেমা কোনো রহস্যের সমাধান খোঁজ করে না। বরং দর্শকদের নিজেদের বিবেকের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। চলচ্চিত্রের প্রধান প্রশ্নটি হলো—এই মৃত্যুর জন্য দায়ী কে? পরিচালক মৃণাল সেন তার সিনেমার মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট অপরাধীর সন্ধান করেননি। তিনি আসলে দেখিয়েছেন, অবহেলা, শ্রেণিবৈষম্য, সামাজিক উদাসীনতা, আত্মপ্রবঞ্চনা ও দায়মুক্তির জালে বন্দী হয়েই ‘পালান’ নামের কিশোরটি নিহত হয়েছে। খুব অল্প সময়ের মধ্যে পুলিশের তদন্ত শেষ হয়ে যায়, পালানের এই অস্বাভাবিক মৃত্যুটি একটি দুর্ঘটনায় রূপ নেয়, কাউকে কোনো দায় নিতে হয় না, মিটে যায় সব আইনি জটিলতা। যদিও সেই নৈতিক প্রশ্নের কোনো নিষ্পত্তি হয় না, ‘আমরা সবাই কি দায়ী নই?’ ‘ভদ্র সমাজে’র কোলাহলে নীরবে তছনছ হয়ে যায় প্রান্তিক মানুষের জীবন। তবে এই নীরবতার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে মানুষের সবচেয়ে বড় নৈতিক ব্যর্থতা।
‘খারিজ’-এর নির্মাণশৈলী অনন্য। সিনেমাটির শক্তি তার গল্প, চিত্রনাট্য ও চিত্রধারণে। এই সিনেমা কোনো আনন্দ দেয় না, খুব যে বেদনা দেয়, তাও নয়। এই সিনেমা দেয় ভরপুর অস্বস্তি। এই সিনেমা বারবার আমাদের দায়বদ্ধতা, ভদ্রতা, মানবিকতা, মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। দর্শক তখন পালাতে চায়, ভাবে, ‘এই সিনেমা দেখতে না বসলেই ভালো হতো’। তারপরও সিনেমাটি শেষতক দেখতে হয়, শেষে কী আছে তা দেখার আগ্রহও শেষপর্যন্ত দেখতে কম উদ্বুদ্ধ করে না। সব মিলিয়ে সিনেমাটি এক গভীর মানসিক আবহ তৈরি করে। ‘খারিজ’ দর্শককে আবেগে না ভাসিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়, মৃণাল সেন বরাবরই তাই করে থাকেন।
সিনেমাটি তৈরি করা হয়েছে প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক রমাপদ চৌধুরীর ‘খারিজ’ উপন্যাস অবলম্বনে। চিত্রনাট্য পরিচালক নিজেই করেছেন। অভিনয় করেছেন, মমতা শংকর, অঞ্জন দত্ত, শ্রীলা মজুমদার প্রমুখ। মজার ব্যাপার হলো–সিনেমাতে এই তিনজনের চরিত্রের নামও একই। কান-এ জুরি পুরস্কার ছাড়াও ১৯৮৩ সালে এটি পায় তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং স্পেনে ভায়াদোলিদ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের গোল্ডেন স্পাইক পুরস্কার।