ads

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন: ছোট বিক্ষোভে বড় বার্তা দেখছে বিএনপি

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন: ছোট বিক্ষোভে বড় বার্তা দেখছে বিএনপি
শাহবাগে অবস্থান নিয়েছে শিক্ষার্থীরা। ছবি: চরচা

দীর্ঘ ১৭ বছর পর ক্ষমতায় আসার পাঁচ মাসের মাথাতেই আন্দোলনের মুখোমুখি হয়েছে বিএনপি সরকার। দীর্ঘসময় পর দলটির ক্ষমতায় ফেরার পথ সাধারণ সরকার বদল ছিল না। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন, এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে দেড় বছরের রাজনৈতিক রূপান্তর এবং সংসদ নির্বাচন–এই ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়েই সরকার গঠন করে বিএনপি। ফলে নতুন সরকারের সঙ্গে গণঅভ্যুত্থানের একটি সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

এ কারণে জুলাই মাসেই এইচএসসি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে কেবল একটি শিক্ষা-সংক্রান্ত বিক্ষোভ হিসেবে দেখছে না রাজনৈতিক মহল।

Advertisement

দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে পরীক্ষা নেওয়া, প্রশ্নপত্রে ভুল এবং তা নিয়ে পরীক্ষার্থীদের ক্ষোভ–এসব ছিল আন্দোলনের তাৎক্ষণিক কারণ। কিন্তু আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে সরকারবিরোধী স্লোগান, ‘সরকার পতনের’ প্রসঙ্গ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন বক্তব্য এবং বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর প্রকাশ্য সমর্থন পুরো ঘটনাকে নতুন রাজনৈতিক মাত্রা দেয়।

যদিও আন্দোলনটি বড় আকার ধারণ করেনি। মাত্র দুই দিনের মধ্যেই সরকার একাধিক দাবি মেনে নেয়। শিক্ষামন্ত্রী প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ করেন, ভুল প্রশ্নের পূর্ণ নম্বর দেওয়ার ঘোষণা আসে। পুনঃপরীক্ষার সিদ্ধান্ত জানানো হয় এবং আন্দোলনও ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যায়। কিন্তু আন্দোলনের সমাপ্তি রাজনৈতিক আলোচনা থামাতে পারেনি। বরং প্রশ্ন উঠেছে, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় যেকোনো ছাত্র আন্দোলন কি এখন খুব দ্রুত সরকার পরিবর্তনের আলোচনায় রূপ নিতে পারে? ২০২৪ সালের অভিজ্ঞতার পর ‘সরকার পতন’ শব্দবন্ধ কি এখন আরও সহজে রাজনৈতিক আলোচনায় জায়গা করে নিচ্ছে?

ক্ষমতাসীন বিএনপির ভেতরেও এই প্রশ্ন নিয়ে শুরু হয়েছে আত্মসমালোচনা ও মূল্যায়ন। দলটির একাধিক নীতিনির্ধারক ও তৃণমূল পর্যায়ের নেতারা বলছেন, আন্দোলনের মূল দাবি নয়, বরং আন্দোলনের ফাঁকে উঠে আসা সরকার পতনের বার্তা এবং রাজনৈতিক ভাষ্যই তাদের বেশি ভাবাচ্ছে। তাদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে যেকোনো জনঅসন্তোষ বা ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন যদি দ্রুত রাজনৈতিক রূপ নেয়, তাহলে সরকারকে আরও জটিল পরিস্থিতির মুখে পড়তে হতে পারে। আবার সরকারের একটি অংশের যুক্তি, জুলাই-পরবর্তী বাস্তবতায় শক্তি প্রয়োগের বদলে সংলাপ, দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার মাধ্যমেই সংকট মোকাবিলা করতে হবে।

এই আলোচনা শুধু বিএনপির ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই। গত ২০ জুলাই সরকার ও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক ও সমমনা দলগুলোর বৈঠকেও সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয়েছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। শরিক দলগুলোর কয়েকজন নেতা ছোট একটি আন্দোলনের মধ্যেই সরকার পতনের প্রসঙ্গ সামনে আসা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের রাজনৈতিক কৌশল কী হবে–সে বিষয়ে উদ্বেগ ও প্রশ্ন তুলে ধরেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শরিক দলের একজন নেতা চরচাকে বলেন, “প্রাইম মিনিস্টার অনেক কিছুই বেশ লাইটলি অ্যান্ড সফটলি নিচ্ছেন। এটা হয়তো ভুল পদক্ষেপ হতে পারে। একটি অভ্যুথানের পর আরও বেশি সূক্ষ্মভাবে সবকিছু পর্যালোচনা করতে হবে, সিদ্ধান্ত নিতে হবে। নয়তো, পস্তাতে হবে।”

ওই নেতা আরও বলেন, “একটি ছোট ঘটনাকে কেন্দ্র করে সবাই কমফোর্টলি সরকার বিদায় করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেবে, এটা আপাত দৃষ্টিতে সিলি ম্যাটার মনে হলেও, এর মিনিং ভেরি স্ট্রং অ্যান্ড ক্লিয়ার। আরও অনেক কশাসলি হ্যান্ডেল করতে হবে।”

ছোট আন্দোলনে বড় রাজনৈতিক বার্তা

ঘটনার শুরু ১৩ জুলাই। দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা শুরু হয়। পরীক্ষা শেষে প্রশ্নপত্রে দুটি ভুলের অভিযোগ এবং শিক্ষামন্ত্রীর একটি কথিত অডিও ভাইরাল হওয়ার পর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ শুরু করেন পরীক্ষার্থীরা। ঢাকায় প্রথম দিনের আন্দোলন সায়েন্স ল্যাব থেকে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে গিয়ে শেষ হয়।

শুরুতে ভুল প্রশ্নের পূর্ণ নম্বর, দুর্যোগকবলিত এলাকার পরীক্ষার্থীদের জন্য পরীক্ষা পুনঃনির্ধারণ এবং দায়ীদের শাস্তির দাবি থাকলেও অল্প সময়ের মধ্যেই শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি সামনে আসে। ১৪ জুলাই শিক্ষার্থীরা শিক্ষা মন্ত্রণালয় ঘেরাওয়ের কর্মসূচি দিয়ে পরে শাহবাগে অবস্থান নেন। সেখান থেকে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের আল্টিমেটাম দিয়ে পরদিন ‘লং মার্চ টু শিক্ষা মন্ত্রণালয়’ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

তবে আন্দোলন বড় আকার নেওয়ার আগেই সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। শিক্ষামন্ত্রী সংসদে নিজের বক্তব্যের জন্য প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে ভুল থাকা দুটি প্রশ্নের পূর্ণ নম্বর, পুনঃপরীক্ষা এবং তদন্তের ঘোষণা দেওয়া হয়। এরপরই আন্দোলনের গতি কমে আসে। তৃতীয় দিনের কর্মসূচি থাকলেও কোথাও উল্লেখযোগ্য বিক্ষোভ দেখা যায়নি।

ঘটনার শুরুতে সরকারের সমালোচনা হলেও পরে দ্রুত অবস্থান পরিবর্তন, শিক্ষামন্ত্রীর প্রকাশ্য দুঃখ প্রকাশ এবং শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তকে ইতিবাচকভাবে দেখেছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনেক ব্যবহারকারী ও সাধারণ মানুষ। তাদের অনেকে মনে করেন, ভুল স্বীকার করে দ্রুত সমাধানের পথে যাওয়ার কারণেই পরিস্থিতি বড় ধরনের সংকটে রূপ নেয়নি। সরকারের এই সংকট ব্যবস্থাপনা সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভিন্নধর্মী বলেও মন্তব্য করেন অনেকে।

তবে আন্দোলনের রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা থামেনি। কারণ, দুই দিনের এই আন্দোলন বড় আকার ধারণ না করলেও এর বিভিন্ন পর্যায়ে এমন কিছু বক্তব্য সামনে আসে, যা রাজনৈতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। আন্দোলনের সময় ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিওতে কয়েকজন আন্দোলনকারীকে বলতে শোনা যায়, “এই সরকার আমরা বসিয়েছি, চাইলে সরাতেও পারব।”

কোথাও কোথাও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনার দাবিও উচ্চারিত হতে দেখা যায়। আন্দোলন চলাকালে সায়েন্স ল্যাবে এক শিক্ষার্থী সংসদমাধ্যমকে বলেন, “এই শিক্ষামন্ত্রীরে মন্ত্রী বানাইছে কে? আমরা বানাইছি। বিএনপিরে সরকারেও আমরা বসাইছি। শিক্ষার্থীদের সঙ্গ লাগতে আসলে আমরা আবারো একটা জুলাই অভ্যুত্থান করে বিএনপিকে দেশছাড়া করব।”

এসব বক্তব্য আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক অবস্থানকে প্রতিনিধিত্ব করে কি না, তা স্পষ্ট নয়। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের স্লোগান ও বক্তব্য দেখিয়ে দিয়েছে যে, জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ছাত্রদের যেকোনো আন্দোলন খুব দ্রুত বৃহত্তর রাজনৈতিক আলোচনায় রূপ নিতে পারে।

ফলে মাত্র দুই দিনের একটি আন্দোলন শেষ হয়ে গেলেও সেটিকে ঘিরে রাজনৈতিক আলোচনা এখনো অব্যাহত রয়েছে। অনেকের মতে, এটি নতুন বিএনপি সরকারের জন্য এক ধরনের রাজনৈতিক বার্তা। ছোট একটি ইস্যু কীভাবে অল্প সময়ের মধ্যে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক আলোচনার জন্ম দিতে পারে, সেটিই এই আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।

ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন নয়। তবে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর ছাত্র আন্দোলনের রাজনৈতিক গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে। ফলে ভবিষ্যতে যেকোনো ছাত্র আন্দোলনকে শুধু প্রশাসনিক বা আইনশৃঙ্খলার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ কমে এসেছে। একই সঙ্গে নতুন সরকারের জন্যও এটি একটি পরীক্ষা–কখন সংলাপ, কখন সমঝোতা এবং কখন রাজনৈতিক দৃঢ়তা দেখাতে হবে, সেই ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বিরোধী রাজনীতির অবস্থান

পরীক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরুর পর বিষয়টি দ্রুত রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্রশিবির এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা পৃথকভাবে শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সমর্থন জানান এবং সরকারের সমালোচনা করে বক্তব্য দেন।

এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতাদের কয়েকজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ বিষয়ে সরব ছিলেন। তারা সরকারের প্রতি শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে আরও সংবেদনশীল হওয়ার আহ্বান জানান। তবে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে কেবল সমর্থনেই সীমাবদ্ধ থাকেননি দলটির কয়েকজন নেতা; তাদের বক্তব্যে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক বার্তাও উঠে আসে।

গত ১৪ জুলাই বগুড়া শহরের সাতমাথায় এক পথসভায় এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, “এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের বলব, তোমরা ভয় পাবা না…এই শিক্ষার্থীদের সঙ্গে টাল্টিবাল্টি করবেন না। একেবারে প্যাকেট করে লন্ডনে পাঠিয়ে দেবে।” তার এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দেয়। বিশেষ করে বিএনপি নেতা-কর্মীরা এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

একই সময় এনসিপির মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহও এক সমাবেশে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করে বলেন, “শিক্ষামন্ত্রী তার পদে বসে আছেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শিক্ষার্থীদের কারণে। সেই শিক্ষার্থীদের সঙ্গে উপহাসমূলক আচরণ করে তিনি আর এই পদে থাকার নৈতিক অধিকার রাখেন না।”

বিএনপির ভেতরে অস্বস্তি ও উদ্বেগ

ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি নেতা অলি উল্লাহ নিজের ফেসবুক পোস্টে লেখেন, “আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অনেক বেশি সফটলি সবকিছু হ্যান্ডেল করছেন। এত মানবিক হয়ে বাংলাদেশে রাজনীতি করা সম্ভব না। এত সফট হলে গুপ্তরা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। যেকোনো সময় কামড় দিয়ে দিতে পারে।”

এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ‘একেবারে প্যাকেট করে লন্ডনে পাঠিয়ে দেবে’ মন্তব্যের ভিডিও শেয়ার করে বিএনপির আরেক নেতা লেখেন, “গুপ্তদের শায়েস্তা করতে কঠোর হতে হবে। একদমই ছাড় দেওয়া যাবে না। নয়তো পরের নির্বাচন পর্যন্তও টেকা যাবে না।”

এ ধরনের আরও অনেক পোস্টে সরকারের সংকট মোকাবিলার কৌশল নিয়ে প্রশ্ন তুলতে দেখা গেছে দলটির নেতা-কর্মীদের। তাদের মতে, সরকারের সংকট মোকাবিলার কৌশল প্রয়োজনের তুলনায় বেশি নমনীয় ছিল।

তবে দলের একাধিক নীতিনির্ধারকের ভাষ্য, বর্তমান বাস্তবতায় ছাত্রদের যেকোনো আন্দোলন খুব দ্রুত রাজনৈতিক রূপ নিতে পারে। সে কারণেই সরকার শুরুতেই সংঘাতের পথ এড়িয়ে সংলাপ, দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং প্রশাসনিক সমাধানের কৌশল বেছে নিয়েছে। একই সঙ্গে দলটির ভেতরে এই প্রশ্নও উঠেছে, ভবিষ্যতে প্রতিটি আন্দোলনেই কি সরকার একই ধরনের নমনীয় অবস্থান নেবে, নাকি কোনো পর্যায়ে আরও দৃঢ় রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করতে হবে?

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির একজন নীতিনির্ধারক চরচাকে বলেন, “জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের বাস্তবতায় ছাত্রদের যেকোনো আন্দোলন দ্রুত রাজনৈতিক রূপ নিতে পারে। তাই শুরুতেই সংলাপ, দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার কৌশলকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ছোট একটি ইস্যুকেও অবহেলা করার সুযোগ নেই।”

সরকারের মন্ত্রিসভার একজন প্রতিমন্ত্রীও একই ধরনের মূল্যায়ন দিয়ে চরচাকে বলেন, “সরকারের লক্ষ্য ছিল পরিস্থিতি দ্রুত শান্ত করা এবং শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক উদ্বেগ দূর করা। তবে এটাও নিশ্চিত করতে হবে, যেন কোনো ইস্যুকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির সুযোগ না হয়।”

প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, “ছাত্রদের ন্যায্য দাবির পাশে আমরা সবসময় ছিলাম, সামনেও থাকব। এটা গণতান্ত্রিক সরকার। এখনকার রাজনৈতিক চর্চা আগের তুলনায় ভিন্ন। এই ঘটনা নিয়েও আমি বলেছিলাম, দুর্যোগের মধ্যে পরীক্ষা না নিলেও পারত। তবে এটাও দেখতে হবে, যেন আন্দোলনকে কেউ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে না পারে।”

বিএনপির একজন ভাইস চেয়ারম্যানও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। চরচাকে তিনি বলেন, “ছাত্রদের আবেগ আমরা বুঝি। কিন্তু কথায় কথায় আন্দোলন আর সরকার পতনের মতো বিষয়কে স্বাভাবিক করে তোলার প্রবণতা তৈরি হয়েছে, যা উদ্বেগজনক। এই অপসংস্কৃতি রুখতে হবে। ন্যায্য আর অযৌক্তিক দাবির পার্থক্য বোঝাতে সরকার, শিক্ষক, পরিবার–সবারই ভূমিকা রাখতে হবে।”

দলটির স্থায়ী কমিটির বেশির ভাগ নেতার ভাষ্য–এইচএসসি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে হওয়া দুই দিনের আন্দোলন সরকারকে তাৎক্ষণিক সংকটে না ফেললেও ভবিষ্যতের জন্য একটি রাজনৈতিক সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাদের মতে, জুলাই-পরবর্তী বাস্তবতায় ছোট কোনো ইস্যুও খুব দ্রুত বড় রাজনৈতিক বিতর্কে রূপ নিতে পারে। তাই সামনে এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা এবং রাষ্ট্রীয় দৃঢ়তার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

যদিও এবারের আন্দোলন দ্রুত শেষ হয়েছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে, তবু এটি নতুন সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা রেখে গেছে–বাংলাদেশে ছাত্র আন্দোলন এখনো একটি শক্তিশালী সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা। আর সেই বাস্তবতাকে মোকাবিলায় শুধু প্রশাসনিক নয়, রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং জনমতের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি–সবকিছুরই সমন্বয় প্রয়োজন।

সম্পর্কিত