দ্বৈত নাগরিকত্ব বিতর্ক: নির্বাচন কি বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটে?

দ্বৈত নাগরিকত্ব বিতর্ক: নির্বাচন কি বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটে?
ফাইল ছবি: চরচা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দ্বৈত নাগরিকত্ব ইস্যু নতুন করে বড় রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। নির্বাচনী আইন এবং সংবিধানের স্পষ্ট বিধান থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ‘অনুরোধের’ পর নির্বাচন কমিশন (ইসি) দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ ওঠা প্রায় সব প্রার্থীকেই বৈধ ঘোষণা করেছে। এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে ইসির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।

সংবিধানের ৬৬(২)(গ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দ্বৈত নাগরিকত্বধারীরা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন না। তবুও এই বিধান কার্যত প্রয়োগ না হওয়ায় প্রশ্ন উঠছে–দ্বৈত নাগরিকত্ব ইস্যুতে আসন্ন সংসদ নির্বাচন কি বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটে পড়ছে?

রাজনৈতিক চাপ ও ইসির অবস্থান

এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেছেন, ‘বিএনপির মবের মুখে’ দলটি এ বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেয়নি। অন্যদিকে, ১৮ জানুয়ারি মনোনয়নপত্র গ্রহণ ও দাখিলের বিরুদ্ধে আপিল শুনানির শেষ দিনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) পক্ষপাতের অভিযোগ নাকচ করে বলেন, “আমরা অনেক বিশ্লেষণ করে যেটা সঠিক মনে করেছি, তার আলোকে করেছি।”

ইসির এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে চরচাকে জানান, “সব রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরাই শেষ পর্যন্ত বৈধ হয়েছেন। যে প্রার্থী ২৯ ডিসেম্বরের আগে বিদেশি নাগরিকত্ব প্রত্যাহারের আবেদন এবং তার আপডেট দেখাতে পেরেছেন, কেবল তাদেরই প্রার্থিতা বৈধ হয়েছে।”

বিতর্কের সূত্রপাত যেভাবে

এই বিতর্কের সূচনা হয় ১৩ জানুয়ারি, যখন দ্বৈত নাগরিকত্ব ইস্যুতে নমনীয় হওয়ার অনুরোধ জানিয়ে বিএনপির একটি প্রতিনিধি দল সিইসির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। এর প্রতিফলন দেখা যায় ১৭ জানুয়ারির আপিল শুনানিতে। সেদিন ইসির কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দেন, দ্বৈত নাগরিকত্ব সংক্রান্ত অভিযোগে যাদের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে, তাদের প্রার্থিতা শর্তসাপেক্ষে বৈধ করা হতে পারে। এরপরই ইসি ও বিএনপির বিরুদ্ধে ‘আপসের রাজনীতি’র অভিযোগ তোলে জামায়াত ও এনসিপি।

১৭ জানুয়ারির শুনানিতে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, দ্বৈত নাগরিকত্ব বিষয়ে কমিশন একটি ‘স্ট্যান্ডিং পয়েন্টে’ পৌঁছেছে এবং রোববার একযোগে সব রায় ঘোষণা করা হবে। একই দিনে আরেক নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানান, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সবার জন্য একটি অভিন্ন সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে।

পরদিন ১৮ জানুয়ারি, দ্বৈত নাগরিকত্ব সংক্রান্ত অভিযোগে অভিযুক্ত প্রায় সব প্রার্থীই ‘বৈধ’ হিসেবে ঘোষণা পান। শুনানি শেষে ইসির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে জামায়াতে ইসলামী প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে অভিযোগ জানায়। দলটির অভিযোগ, ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্ব–এই দুই ক্ষেত্রেই ইসি পক্ষপাতমূলক আচরণ করছে। একই অভিযোগ এনসিপিরও। তাদের দাবি, একপক্ষীয় রায়ের মাধ্যমে দ্বৈত নাগরিক ও ঋণখেলাপিদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

আইন কি সত্যিই স্পষ্ট?

সংবিধানের ৬৬(২)(গ) অনুচ্ছেদে দ্বৈত নাগরিকত্বের অযোগ্যতার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। এই বিধানকে আরও জোরদার করা হয় ২০০৯ সালের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (সংশোধনী) আইন এবং ২০১১ সালের সংবিধান (পঞ্চদশ সংশোধনী) আইনের মাধ্যমে।

সংশোধিত আইনে বলা হয়েছে, কেউ অন্য রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করলে বা বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করলে তিনি সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা হারাবেন। এই বিধান কার্যকর রয়েছে ১৯ আগস্ট ২০০৮ থেকে।

তবে আইনে নাগরিকত্ব ‘ত্যাগ’ নিয়ে স্পষ্ট প্রক্রিয়াগত নির্দেশনা না থাকায় ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি হয়। ফলে কেবল নাগরিকত্ব ত্যাগের জন্য আবেদন করা হয়েছে–এমন প্রমাণ দেখিয়েই এবার অনেক প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

সাবেক সচিব এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার মনে করেন, আইনটিতে ফাঁকফোকর থাকায় এই বিতর্ক বারবার ফিরে আসবে। চরচাকে তিনি বলেন, “দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়ে নানা গ্রাউন্ড থেকে প্রশ্ন থাকবেই। কারণ, আইনটি পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। এখন নির্বাচনটি সুষ্ঠুভাবেই হতে হবে।”

আইনজীবীদের ভিন্ন ব্যাখ্যা

দ্বৈত নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত আপিল শুনানিতেও এই অস্পষ্টতা প্রকাশে আসে। ১৭ জানুয়ারির শুনানিতে ইসি উপস্থিত জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের কাছে ব্যাখ্যা জানতে চাইলে তারা ভিন্ন ভিন্ন মত দেন।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, “সংবিধানে বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের কথা বলা হলেও কোনো নির্দিষ্ট প্রত্যয়নপত্রের বাধ্যবাধকতা নেই। তাই কেউ আবেদন করে থাকলে এবং তার পক্ষে করণীয় আর কিছু না থাকলে তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন।”

অ্যাডভোকেট মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন একবার করলে তা আর প্রত্যাহারযোগ্য নয়। আজ হোক বা দুদিন পর–আবেদন কার্যকর হবেই। তিনি আরও বলেন, এবার আরপিওতে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পরও প্রার্থিতা বাতিলের বিধান থাকায় অভিযুক্ত প্রার্থীরা একটি সুযোগ পেতে পারেন।

ব্যারিস্টার এস এম শাহরিয়ার কবির জানান, যুক্তরাজ্যের আইনে আবেদন করলেই নাগরিকত্ব পরিত্যাগের প্রক্রিয়া শুরু হয়। যদিও দেশভেদে এই প্রক্রিয়া ভিন্ন। এসব পার্থক্য বিবেচনায় নিয়েই একটি সাধারণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।

তবে অ্যাডভোকেট শাহ বখতিয়ার ইলিয়াস মনে করেন, নাগরিকত্ব ত্যাগের বিষয়টি যেহেতু স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, তাই নাগরিকত্ব পরিত্যাগের সনদ জমা দেওয়া আবশ্যক। এনসিপি নেতা অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলাম মুছার মতে, বিষয়টি সংবিধানসংক্রান্ত হওয়ায় এর ব্যত্যয় ঘটানোর এখতিয়ার ইসির নেই। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে সুপ্রিম কোর্ট থেকে।

এদিকে নির্বাচন কমিশনার রহমানেল মাছউদ জানান, যাদের বিরুদ্ধে দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ রয়েছে বা যারা নিজেরাই এ কথা স্বীকার করেছেন, তাদের একটি এফিডেভিট দিতে হবে–যেখানে উল্লেখ থাকবে, ভবিষ্যতে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাদের প্রার্থিতা বাতিল হবে।

বিএনপি নেতা কায়কোবাদ। ছবি: বাসস
বিএনপি নেতা কায়কোবাদ। ছবি: বাসস

দ্বৈত নাগরিকত্বের বাধা পেরোলেন যারা

ছয়টি রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মিলিয়ে মোট ২৬ জনের বিরুদ্ধে দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ উঠেছিল। ১৯ জানুয়ারি প্রকাশিত মনোনয়নপত্র গ্রহণ ও দাখিলের বিরুদ্ধে আপিল শুনানির চূড়ান্ত তালিকা অনুযায়ী ২৪ জনই প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বিএনপি থেকে দ্বৈত নাগরিকত্ব ইস্যু রয়েছে–এমন মোট ১০ জন প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন–এ কে এম কামরুজ্জামান (দিনাজপুর-৫), শামা ওবায়েদ ইসলাম (ফরিদপুর-১), মো. মনিরুজ্জামান (সাতক্ষীরা-৪), কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ (কুমিল্লা-৩), তাহির রায়হান চৌধুরী (সুনামগঞ্জ-২), মো. শওকতুল ইসলাম (মৌলভীবাজার-২), মুশফিকুর রহমান (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪), আব্দুল আইয়াল মিন্টু (ফেনী-৩), আফরোজা খানম রিতা (মানিকগঞ্জ-৩) এবং মোহাম্মদ ফাহিম চৌধুরী (শেরপুর-২)। তবে শুনানিতে অনুপস্থিত থাকায় বিএনপির বৈধ প্রার্থী আবদুল গফুর ভুইয়া (কুমিল্লা-১০) তার প্রার্থিতা হারান।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ আছে–এমন পাঁচজন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন–মোহাম্মাদ নজরুল ইসলাম (ঢাকা-১), জোনায়েদ হোসাইন (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩), মো. মাহবুবুল আলম (কুড়িগ্রাম-৩), ডা. এ কে এম ফজলুল হক (চট্টগ্রাম-৯) এবং মোহাম্মদ মোসলেহউদ্দিন ফরিদ (যশোর-২)। আপিল শুনানির মাধ্যমে জামায়াতের তিনজন প্রার্থী প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে এমন দুজন প্রার্থী রয়েছেন–জহিরুল ইসলাম (আসন উল্লেখ নেই) এবং মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন (চট্টগ্রাম-৩)। এর মধ্যে মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন আপিলের মাধ্যমে প্রার্থিতা পুনরুদ্ধার করেছেন।

এ ছাড়া জাতীয় পার্টির দুই প্রার্থী–মঞ্জুম আলী (রংপুর-১) ও মো. খুরশিদ আলম (চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২), এনসিপির এক প্রার্থী–এহতেশামুল হক (সিলেট-১), খেলাফত মজলিসের এক প্রার্থী–মো. আজাবুল হক (নাটোর-১), এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আনোয়ার হোসেন (সুনামগঞ্জ-৩) ও শেখ সুজাত মিয়া (হবিগঞ্জ-১) নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় রয়েছেন।

নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে যাদের প্রার্থিতা প্রথমে বাতিল হলেও পরে পুনর্বহাল হয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন–ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমজাদ হোসেন; বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ মোসলেহউদ্দিন ফরিদ, ডা. এ কে এম ফজলুল হক ও মো. মাহবুবুল আলম; জাতীয় পার্টির মঞ্জুম আলী ও মো. খুরশিদ আলম; বিএনপির মোহাম্মদ ফাহিম চৌধুরী; খেলাফত মজলিসের মো. আজাবুল হক; এবং এনসিপির এহতেশামুল হক।

সম্পর্কিত