মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ব বাজারের জ্বালানি সংকটের কারণে দূরপাল্লার বাস চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পেট্রোল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ তেল পাচ্ছে না পরিবহনগুলো। দূরপাল্লার বাসগুলো চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেল না পাওয়ায় চলাচলও বাধার মুখে পড়ছে।
পরিবহন মালিক ও চালকদের অভিযোগ, সরকার জ্বালানি সরবরাহ সীমিত করে দেওয়ার পর তেলের পাম্পগুলোতে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে গেছে। দূরপাল্লার বাসে ৫০ থেকে ৭০ লিটার ডিজেল দেওয়ার নির্দেশনা থাকলেও ২০ থেকে ৩০ লিটারের বেশি মিলছে না। ফলে একটি বাসের জন্য ৮-১০টি পাম্প ঘুরে প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এতে সময় ও শ্রম দুটোই বাড়ছে।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ ছড়ানোর পর গত কয়েকদিন ধরে রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরের পেট্রোল পাম্পে মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। অনেক জায়গায় তেল নিতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে চালকদের।
এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে গাড়ির ধরন অনুযায়ী দৈনিক ট্রিপপ্রতি সরবরাহের পরিমাণ ঠিক করে দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
নির্দেশনা অনুযায়ী, মোটরসাইকেলে সর্বোচ্চ ২ লিটার, প্রাইভেট কারে ১০ লিটার এবং এসইউভি, জিপ ও মাইক্রোবাসে ২০ থেকে ২৫ লিটার অকটেন বা পেট্রোল দেওয়া যাবে।
ডিজেলচালিত পিকআপ ও লোকাল বাসে ৭০ থেকে ৮০ লিটার এবং দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও কনটেইনার ট্রাকে ২০০ থেকে ২২০ লিটার পর্যন্ত ডিজেল দেওয়া যাবে। এক দিন আগে রাইড শেয়ারিংয়ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের জন্য সেই সীমা বাড়িয়ে দিনে পাঁচ লিটার করা হয়েছে।
চলছে না বাস, গাবতলীর কাউন্টারগুলোতে নেই যাত্রী। ছবি: চরচা
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনাল গতকাল মঙ্গলবার ঘুরে দেখা যায়, অনেক বাস পার্কিংয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিছু পরিবহন কোম্পানির নিজস্ব তেলের পাম্প থাকলেও অধিকাংশ কোম্পানিকে নির্ভর করতে হচ্ছে অন্য পাম্পগুলোর ওপর। সরবরাহ সংকটে এসব পাম্পেও তেল মিলছে না নিয়মিত। ফলে অনেক বাসই নির্ধারিত সময়ে ছেড়ে যেতে পারছে না। কিছু বাস সাময়িকভাবে চলাচল বন্ধ রেখেছে সংশ্লিষ্টরা।
পরিবহন সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এরকম চলতে থাকলে ঈদযাত্রায় ব্যাঘাত ঘটতে পারে।
যমুনা লাইন পরিবহনের চালক এলাহান চরচাকে জানান, তিনি দিনাজপুর রুটে গাড়ি চালান। এ রুটে একবার যাতায়াতে প্রায় ১২০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। কিন্তু কোনো পাম্পেই ২০ লিটারের বেশি দেওয়া হচ্ছে না। তিনি বলেন, “গতকাল সাতটা পাম্প ঘুরে ১২০ লিটার তেল সংগ্রহ করেছি। আজ আবার তেলের অভাবে গাড়ি বন্ধ রাখতে হচ্ছে “
এসআই ট্রাভেলস পরিবহনের মালিক অমিত কুমার দণ্ড বলেন, তাদের প্রায় ৩০টি বাস উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় চলাচল করে। কিন্তু জ্বালানি সংকটে বর্তমানে মাত্র পাঁচটি বাস চালাতে পারছেন। অমিত কুমার বলেন, “একটি বাস চালু রাখতে পাঁচ থেকে ১০টি পাম্প ঘুরতে হচ্ছে। অধিকাংশ পাম্পেই বলছে তেল নেই। এভাবে চললে বড় ক্ষতির মুখে পড়ব।”
ইতোমধ্যে ঈদ উপলক্ষে সিংহভাগ কাউন্টারগুলো অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু করেছে। কিন্তু বাস ছাড়তে না পারলে যাত্রীদের কাছে জবাবদিহি কঠিন হয়ে পড়বে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করছেন তারা।
রোজিনা এন্টারপ্রাইজের কাউন্টার মাস্টার মো. সোহেল জানান, তাদের ৩০ থেকে ৩৫টি বাস দেশের প্রায় ১৫টি জেলায় চলাচল করে। প্রতিটি বাসের জন্য গড়ে ২০০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন। কিন্তু পাম্পগুলোতে গেলে ২০ থেকে ৩০ লিটারের বেশি পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি বলেন, “বাকি তেল কোথা থেকে আনব? খোলা বাজারেও এত পরিমাণ ডিজেল পাওয়া যায় না।”
আলহামরা পরিবহনের সুপারভাইজার মো. আরিফ বলেন, “পাবনা থেকে ঢাকায় আসার পথে ১০টি পাম্প ঘুরে পরদিনের জন্য তেল সংগ্রহ করতে হয়েছে। এতে সারা রাত কেটে যায়। এভাবে চলতে থাকলে পরিবহন খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
আয়াত এন্টারপ্রাইজের চালক জালাল উদ্দিন জানান, আগে যেসব পাম্প থেকে নিয়মিত তেল নিতেন, সেখানেও এখন সরবরাহ নেই। তিনি বলেন, “দুইদিন তেল জোগাড় করে একদিন বাস চালাতে হচ্ছে। আয় না থাকলে পরিবার চালানো কঠিন হয়ে যাবে। সামনের দিনগুলোতে আমরা কী করব বুঝতে পারছি না।”
তেল না থাকায় সাময়িক বন্ধ পাম্প। ছবি: চরচাবাংলাদেশে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৪৮৬টি বাস কোম্পানি দূরপাল্লার সেবা দেয়। নিবন্ধিত বাসের সংখ্যা ৫৩ হাজারের বেশি। জ্বালানি সংকট দীর্ঘায়িত হলে ঈদযাত্রা বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি পরিবহন খাতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন। না হলে আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে জনভোগান্তি চরমে পৌঁছাতে পারে আশঙ্কা তাদের।
গ্রামীন ট্রাভেলসের চালক মো. আলাল মিয়া বলেন, এখন যাত্রী চাপ কিছুটা কম থাকলেও দুই-এক দিনের মধ্যে ঈদযাত্রা শুরু হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। গতকাল রাত থেকে আজ সকাল পর্যন্ত আটটি পাম্প ঘুরে দেড়শ লিটার তেল নিয়েছি। সামনে যখন যাত্রী বাড়বে, তখন কীভাবে এত বাসের জ্বালানি জোগাড় হবে?”
তবে জ্বালানি সংকটের এই চিত্রের ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে বড় বড় পরিবহন কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে। গাবতলী বাস টার্মিনালের বিভিন্ন কাউন্টরর ঘুরে দেখা গেছে, দেশের বিভিন্ন জেলায় নিজস্ব তেলের পাম্প বা নির্ধারিত সরবরাহব্যবস্থা থাকায় তারা তুলনামূলকভাবে সংকট মোকাবিলা করতে পারছে। বিশেষ করে শ্যামলী, হানিফ, স্টারলাইন, রয়েল কোচের মতো বড় ও একক মালিকানাধীন দূরপাল্লার পরিবহনগুলোতে বাস চলাচল স্বাভাবিকই রয়েছে।
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বড় কোম্পানিগুলো কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থায় থাকলেও ছোট ও মাঝারি মালিকানাধীন বাসগুলোই বেশি বিপাকে পড়েছে। ফলে সামগ্রিকভাবে দূরপাল্লার পরিবহন খাতে এক ধরনের বৈষম্যপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সংকট দীর্ঘায়িত হলে বড় কোম্পানিগুলোকেও শেষ পর্যন্ত একই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হতে পারে বলে।
শ্যামলী পরিবহনের এনআর ট্রাভেলসের গাবতলী কাউন্টার ম্যানেজার মকবুল জানান, তাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় জ্বালানি সংগ্রহ করা হয়। ফলে অন্যদের মতো ৮–১০টি পাম্প ঘুরতে হচ্ছে না। তিনি বলেন “সংকট যে নেই, তা নয়। তবে আমাদের নিজস্ব পাম্প থাকায় বাস চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। ঈদ সামনে রেখে আমরা শিডিউল ঠিক রাখার চেষ্টা করছি।”
একইভাবে হানিফ পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার মো. জাবেদ বলেন, তাদের কোম্পানির বেশ কয়েকটি জেলায় নিজস্ব পাম্প রয়েছে। বিশেষ করে গাবতলী থেকে আমিন বাজার পর্যন্ত তাদের পাঁচটি পাম্প রয়েছে। এসব পাম্প থেকেই তারা বাসের জন্য জ্বালনি সংগ্রহ করে থাকেন। তিনি বলেন, “সাধারণ পাম্পে তেল সংকট থাকলেও আমরা কেন্দ্রীয়ভাবে সমন্বয় করে বাস চালাচ্ছি। তবে অতিরিক্ত চাপ এলে পরিস্থিতি কঠিন হতে পারে।”