Advertisement Banner

ইরানকে অস্ত্রের চেয়ে বেশি কিছু দিয়েছে রাশিয়া

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ইরানকে অস্ত্রের চেয়ে বেশি কিছু দিয়েছে রাশিয়া
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাতে রাশিয়ার ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে এই আলোচনা শুরু হয়েছে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগাচির মস্কো সফরের পর। আলজাজিরায় প্রকাশিত এক উপসম্পাদকীয়তে রাশিয়ান ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার কাউন্সিলের পরিচালক ইভান ত্রিমোফিভ লিখেছেন, এই সংঘাতে রাশিয়া ইরানকে অস্ত্রের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিয়েছে– তা হলো শক্তিশালী রাজনৈতিক সমর্থন এবং কূটনৈতিক অবস্থান। এই দৃষ্টিভঙ্গি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটকে বোঝার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণাত্মক কাঠামো তৈরি করে।

রাশিয়া একটি বৈশ্বিক শক্তি এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য। এ কারণে তার প্রতিটি অবস্থান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ২০২৫ সালে স্বাক্ষরিত রাশিয়া-ইরান চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে মস্কোর জন্য সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হলো সংঘাতকে প্রশমিত করা এবং শান্তির পক্ষে অবস্থান নেওয়া। যদিও স্বল্পমেয়াদে তেলের দাম বৃদ্ধি বা ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে আন্তর্জাতিক মনোযোগ সরে যাওয়ার মতো কিছু সুবিধা রাশিয়া পেতে পারে, তবুও মস্কো দীর্ঘমেয়াদে এসবকে যথেষ্ট মনে করছে না।

রাশিয়া বুঝতে পারছে, শুধু তেলের বাজারে সাময়িক লাভ তার অর্থনৈতিক কাঠামোর মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারবে না, বিশেষ করে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষাপটে। একইভাবে ইউক্রেন সংঘাতেও শুধুমাত্র বাহ্যিক পরিস্থিতির পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। ফলে রাশিয়া স্বল্পমেয়াদি লাভের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও ঝুঁকি কমানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

এই ঝুঁকিগুলোর মধ্যে রয়েছে ইরানে সম্ভাব্য মানবিক সংকট, অতিরিক্ত জ্বালানি দামের কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মন্দা, আঞ্চলিক আর্থিক কেন্দ্রগুলোর অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যে সম্প্রসারিত রুশ কোম্পানিগুলোর ওপর প্রভাব। এই বাস্তবতা রাশিয়াকে সংঘাতের বিস্তার রোধে আরও সক্রিয় কূটনৈতিক ভূমিকা নিতে উদ্বুদ্ধ করছে।

ইরানের দৃষ্টিকোণ থেকেও রাশিয়ার এই অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামরিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শক্তিশালী আক্রমণ প্রতিহত করে ইরান একটি কৌশলগত সাফল্য অর্জন করেছে বলে মনে করা হয়। তবে আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রত্যাশিত আন্তর্জাতিক সমর্থন পায়নি। ইউরোপীয় ন্যাটো মিত্ররা সরাসরি অংশগ্রহণে অনীহা দেখিয়েছে, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে মাইন অপসারণের মতো কার্যক্রমে।

একইভাবে, আঞ্চলিক মিত্র দেশগুলোও এই সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং তাদের নিরাপত্তা আরও দুর্বল হয়েছে। চীন স্পষ্টভাবে সামরিক পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছে এবং উত্তেজনা বৃদ্ধির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। ভারতের মতো দেশও এই যুদ্ধে আগ্রহ দেখায়নি, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল সংখ্যক ভারতীয় শ্রমিকের উপস্থিতির কারণে।

এই প্রেক্ষাপটে ইরান শুরুতে কূটনৈতিকভাবে কিছুটা বিচ্ছিন্ন থাকলেও, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলও কার্যত একই ধরনের বিচ্ছিন্নতার মুখে পড়েছে। রাশিয়ার অবস্থান এই বিচ্ছিন্নতা ভাঙতে সাহায্য করছে। তবে পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত নাজুক এবং অনিশ্চিত, বিশেষ করে ইরানের জন্য।

যুক্তরাষ্ট্র এখনো সামরিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী। তারা প্রয়োজনে আঘাত হানার সক্ষমতা রাখে। যদিও এই যুদ্ধ তার সামরিক কাঠামোর কিছু দুর্বলতা প্রকাশ করেছে— বিশেষ করে নৌবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা। তবুও ওয়াশিংটন এখনো প্রতিশোধমূলক আঘাত থেকে অনেকটাই নিরাপদ অবস্থানে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বৃহত্তম তেল উৎপাদক হওয়ায় হরমুজ প্রণালির অবরোধ থেকেও তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত।

এই বাস্তবতা দেখায় যে, রাশিয়া সরাসরি সামরিকভাবে সংঘাতের ফল নির্ধারণ করতে না পারলেও তার রাজনৈতিক অবস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে। মস্কো স্পষ্টভাবে বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসন চালিয়েছে এবং এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।

রাশিয়া আরও সতর্ক করেছে যে, এই সংঘাত মানবিক বিপর্যয় এবং এমনকি পারমাণবিক দূষণের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, যদি পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই তাদের মতে, এই সংকটের কোনো সামরিক সমাধান নেই; এটি শুধুমাত্র ধারাবাহিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব।

এছাড়া রাশিয়া ইরানের ওপর কোনো একতরফা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করছে, বিশেষ করে যেগুলো জাতিসংঘের অনুমোদন ছাড়া আরোপ করা হয়। একইভাবে, নৌ অবরোধসহ অন্যান্য শত্রুতামূলক পদক্ষেপের বিরুদ্ধেও তারা অবস্থান নিয়েছে। তবে এর পাশাপাশি তারা একটি রাজনৈতিক সমঝোতার প্রয়োজনীয়তাও জোর দিয়ে উল্লেখ করছে।

রাশিয়ার সামরিক সহায়তা সীমিত থাকার পেছনে বাস্তব কারণ রয়েছে। ২০২৫ সালের চুক্তিটি একটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোট নয়, বরং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কাঠামো। এছাড়া রাশিয়া উপসাগরীয় অন্যান্য দেশগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, ফলে তারা এমন কোনো পদক্ষেপ নিতে চায় না যা আঞ্চলিক সংঘাতকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের জটিল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি সংঘাতের ফলাফল পূর্বানুমান করা অত্যন্ত কঠিন। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন পরিবর্তন হলেও এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান আসবে না। ১৯৭৯ সালের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক মূলত বৈরিতাপূর্ণই রয়ে গেছে।

এই যুদ্ধ আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এনেছে। আর তা হলো, মার্কিন সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতা। অতীতে যেখানে শক্তি প্রদর্শনই যথেষ্ট ছিল, এখন তা কার্যকারিতা হারাতে শুরু করেছে। ফলে ভবিষ্যতে ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’– যেখানে সাইবার, অর্থনীতি ও তথ্যযুদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে– আরও বেশি গুরুত্ব পেতে পারে।

অন্যদিকে, ইরানের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো একটি টেকসই অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন মডেল তৈরি করা। যুদ্ধের চাপ সহ্য করার সক্ষমতা তারা দেখিয়েছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে শুধুমাত্র সংকট ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই তেহরান একটি বিরতির সময় খুঁজবে, যাতে তারা তাদের অর্থনীতি পুনর্গঠন করতে পারে।

সব মিলিয়ে এই বিশ্লেষণ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট– বর্তমান সংঘাতে সামরিক শক্তির পাশাপাশি কূটনৈতিক অবস্থান ও আন্তর্জাতিক সমর্থনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রাশিয়া সেই ক্ষেত্রেই ইরানকে সবচেয়ে বড় সহায়তা দিচ্ছে। এটি শুধু একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয়, বরং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির নতুন বাস্তবতার প্রতিফলন।

সম্পর্কিত