ফরেন পলিসির মন্তব্য
মাইকেল হার্শ

মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধকে ঘিরে বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। যুদ্ধ শেষ হলেও এর প্রভাব এখনো বহুমাত্রিকভাবে অনুভূত হচ্ছে। সামরিক সংঘাতের তাৎক্ষণিক ফলাফলের চেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে এর দীর্ঘমেয়াদি ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য বদলে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের কৌশলগত অবস্থানকেও নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
কয়েক মাস আগেও ওয়াশিংটন ও তেল আবিব নিজেদেরকে অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে দেখতে অভ্যস্ত ছিল। ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজা সংকট এবং ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষাপটে মনে হচ্ছিল, পশ্চিমা জোট এখনো আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রধান নিয়ন্ত্রক শক্তি। কিন্তু ইরানকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া সাম্প্রতিক সংঘাতের পর সেই চিত্রে ফাটল দেখা দিয়েছে।
সমালোচকদের দাবি, যুদ্ধের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল ইরানের ওপর চাপ বাড়ানো এবং তাকে কৌশলগতভাবে দুর্বল করা। কিন্তু বাস্তবে ফল হয়েছে উল্টো। যুদ্ধের শেষে যে সমঝোতার পথে এগোতে হয়েছে, তাতে ইরান এমন কিছু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা পেয়েছে যা আগে কল্পনা করা কঠিন ছিল। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, এই যুদ্ধের প্রকৃত বিজয়ী কে?

যুদ্ধ-পরবর্তী আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে নতুন সমঝোতা কাঠামো। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, ইরানের ওপর আরোপিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বাধা শিথিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তেল রপ্তানির সুযোগ বাড়তে পারে। আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ও আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রেও নতুন পথ খুলে যেতে পারে। যদি এসব বাস্তবায়িত হয়, তাহলে দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক চাপে থাকা ইরান নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে।
এই বাস্তবতা অনেক পর্যবেক্ষকের কাছে বিস্ময়কর। কারণ কয়েক মাস আগেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানকে তুলনামূলকভাবে বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র হিসেবে দেখা হচ্ছিল। দেশটির অর্থনীতি চাপের মধ্যে ছিল। বৈদেশিক বিনিয়োগ সীমিত ছিল। নিষেধাজ্ঞার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তার প্রবেশাধিকারও সংকুচিত ছিল। অথচ যুদ্ধের পর পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে তেহরান নতুন আঞ্চলিক বাস্তবতার অন্যতম সুবিধাভোগী হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।
যুদ্ধের অর্থনৈতিক মূল্যও কম নয়। বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে। সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহার হয়েছে ব্যাপক হারে। যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণহানিও ঘটেছে। সমালোচকদের মতে, এই বিপুল ব্যয়ের বিনিময়ে ওয়াশিংটন স্পষ্ট কোনো কৌশলগত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। বরং মার্কিন সামরিক সম্পদের ওপর নতুন চাপ তৈরি হয়েছে।
তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি সম্ভবত মনস্তাত্ত্বিক। ইরানের শাসকগোষ্ঠী বহু বছর ধরে নিজেদের জনগণকে এই বার্তা দিয়ে এসেছে যে দেশটি বহিরাগত শক্তির অবরোধ ও চাপের মুখে রয়েছে। সাম্প্রতিক সংঘাতের পর তারা এখন দাবি করতে পারছে যে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক জোটের চাপও তারা মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছে। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এই বার্তাটি তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শক্তির উৎস হয়ে উঠতে পারে।
এই পুরো আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ এটি। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস এই প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়। ফলে হরমুজে যেকোনো অস্থিরতা সরাসরি বৈশ্বিক অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে।
ইরান বহু বছর ধরেই এই ভৌগোলিক অবস্থানকে কৌশলগত সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। সাম্প্রতিক ঘটনাবলি আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, হরমুজ প্রশ্নে তেহরানকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। বিশ্বের জ্বালানি বাজারের ওপর প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে এটি তাদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, যুদ্ধের পর ইরান উপলব্ধি করেছে যে সামরিক শক্তির পাশাপাশি ভূ-অর্থনৈতিক চাপও একটি কার্যকর অস্ত্র। ফলে ভবিষ্যতে তেহরান আরও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এই কৌশল ব্যবহার করতে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা নীতিও নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
ইউরোপীয় দেশগুলোর অবস্থানও এই সংকটে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শুরু থেকেই তারা যুদ্ধের বিস্তার নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল। কারণ মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের অস্থিরতা ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও অর্থনীতিকে সরাসরি প্রভাবিত করে। ফলে তারা যুদ্ধের পরিবর্তে কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নেয়।

যুদ্ধ-পরবর্তী সমঝোতা নিয়ে ইউরোপের ভেতরে ভিন্নমত থাকলেও অধিকাংশ দেশ শেষ পর্যন্ত সেটিকে সমর্থন করেছে। কারণ তাদের কাছে যুদ্ধ বন্ধ করাই ছিল প্রধান লক্ষ্য। অনেক ইউরোপীয় কূটনীতিকের মতে, নিখুঁত সমাধান না হলেও এটি চলমান সংঘাতের চেয়ে ভালো বিকল্প।
জি-৭ সম্মেলনেও এই পরিবর্তিত বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রকে আগের তুলনায় অনেক বেশি সমঝোতা-প্রবণ দেখা গেছে। ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ওয়াশিংটনকে তুলনামূলক নমনীয় অবস্থান নিতে হয়েছে। এটি দেখায় যে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একক আধিপত্যের যুগ আগের মতো শক্তিশালী নেই।
এই প্রেক্ষাপটে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তার সমালোচকেরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, তিনি আন্তর্জাতিক কৌশলগত বিবেচনার চেয়ে অর্থনৈতিক সূচকের ওপর বেশি গুরুত্ব দেন। বিশেষ করে শেয়ারবাজার, মুদ্রাস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তার সিদ্ধান্ত গ্রহণে বড় প্রভাব ফেলে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই ধারণাকে আরও জোরালো করেছে। কারণ যুদ্ধ যত দীর্ঘ হয়েছে, অর্থনৈতিক ঝুঁকিও তত বেড়েছে। জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ মার্কিন অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। ফলে শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক সমাধানের দিকে এগোনোর প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়ে যায়।
এই বিষয়টি শুধু ইরান নয়, বিশ্বের অন্যান্য শক্তিও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বিশেষ করে চীন। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বেইজিং দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটনের আচরণ বিশ্লেষণ করে আসছে। তাইওয়ান প্রশ্নে ভবিষ্যতে কোনো সংকট দেখা দিলে যুক্তরাষ্ট্র কতদূর যেতে প্রস্তুত-চীনের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, ইরান সংকট থেকে চীন একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পেয়েছে। সেটি হলো, অর্থনৈতিক চাপ ও বাজারের অনিশ্চয়তা যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে ভবিষ্যতের সংঘাতে বেইজিং এই বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে।
যুদ্ধ-পরবর্তী সমঝোতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পারমাণবিক ইস্যু। অতীতে ইরানের সঙ্গে হওয়া আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলোতে কঠোর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ব্যবস্থা ছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই কাঠামো কতটা কার্যকর থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
সমালোচকদের আশঙ্কা, নতুন সমঝোতায় ইরান আগের তুলনায় বেশি স্বাধীনতা পেতে পারে। আবার সমর্থকদের যুক্তি, যুদ্ধের পথ পরিত্যাগ করে কূটনৈতিক কাঠামোয় ফিরে আসাই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সমাধান।
ইসরায়েলের জন্য এই যুদ্ধ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। গত কয়েক বছরে দেশটি নিজেকে মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান সামরিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে। হামাস, হিজবুল্লাহ এবং ইরানপন্থী বিভিন্ন গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযানও সেই কৌশলের অংশ ছিল।
নেতানিয়াহু সরকার বিশ্বাস করত যে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য স্থায়ীভাবে নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসা সম্ভব। কিন্তু সাম্প্রতিক যুদ্ধের পর সেই ধারণা নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। কারণ অনেকের মতে, ইরানকে দুর্বল করার পরিবর্তে সংঘাতটি তাকে নতুন রাজনৈতিক সুযোগ এনে দিয়েছে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে কৌশলগত দূরত্বের লক্ষণ ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। দুই দেশের সম্পর্ক এখনো ঘনিষ্ঠ। তবে সব বিষয়ে তাদের অবস্থান এক নয়। বিশেষ করে যুদ্ধের পরিধি, কূটনৈতিক সমঝোতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে মতপার্থক্য সামনে এসেছে।
মার্কিন রাজনীতির ভেতরেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ডেমোক্রেটিক পার্টির একটি বড় অংশ অনেক দিন ধরেই ইসরায়েলের কিছু নীতির সমালোচনা করে আসছে। এখন রিপাবলিকান শিবিরের মধ্যেও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে–মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততার সীমা কোথায় হওয়া উচিত?
বিশেষ করে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ ধারার সমর্থকদের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে বিদেশি সংঘাতে অতিরিক্ত জড়িয়ে পড়া যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সবসময় সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই মনোভাব ভবিষ্যতে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
ফলে ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হতে পারে তার ঐতিহ্যগত রাজনৈতিক সমর্থনের ভিত্তি দুর্বল হয়ে যাওয়া। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলই ইসরায়েলকে সমর্থন করেছে। কিন্তু সেই ঐকমত্য এখন আর আগের মতো অটুট নয়।
সব মিলিয়ে ইরান যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করছে। যুদ্ধক্ষেত্রের ফলাফলের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এর কৌশলগত ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, ইরান, ইউরোপ এবং চীন–সব পক্ষই নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে।
এই পরিবর্তন স্থায়ী হবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট–মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির সমীকরণ আর আগের জায়গায় নেই। পুরনো ধারণা ও কৌশল দিয়ে নতুন বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করা কঠিন। ফলে আগামী বছরগুলোতে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ গড়ে ওঠার সম্ভাবনা প্রবল।
ইরান যুদ্ধ হয়তো শেষ হয়েছে, কিন্তু এর রাজনৈতিক অভিঘাত মাত্র শুরু হয়েছে।
লেখক: ফরেন পলিসির কলাম লেখক।
(এই লেখাটি ওয়াশিংটন-ভিত্তিক প্রভাবশালী মার্কিন ম্যাগাজিন ফরেন পলিসির সৌজন্যে সংক্ষিপ্তাকারে প্রকাশিত হলো।)

মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধকে ঘিরে বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। যুদ্ধ শেষ হলেও এর প্রভাব এখনো বহুমাত্রিকভাবে অনুভূত হচ্ছে। সামরিক সংঘাতের তাৎক্ষণিক ফলাফলের চেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে এর দীর্ঘমেয়াদি ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য বদলে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের কৌশলগত অবস্থানকেও নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
কয়েক মাস আগেও ওয়াশিংটন ও তেল আবিব নিজেদেরকে অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে দেখতে অভ্যস্ত ছিল। ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজা সংকট এবং ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষাপটে মনে হচ্ছিল, পশ্চিমা জোট এখনো আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রধান নিয়ন্ত্রক শক্তি। কিন্তু ইরানকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া সাম্প্রতিক সংঘাতের পর সেই চিত্রে ফাটল দেখা দিয়েছে।
সমালোচকদের দাবি, যুদ্ধের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল ইরানের ওপর চাপ বাড়ানো এবং তাকে কৌশলগতভাবে দুর্বল করা। কিন্তু বাস্তবে ফল হয়েছে উল্টো। যুদ্ধের শেষে যে সমঝোতার পথে এগোতে হয়েছে, তাতে ইরান এমন কিছু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা পেয়েছে যা আগে কল্পনা করা কঠিন ছিল। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, এই যুদ্ধের প্রকৃত বিজয়ী কে?

যুদ্ধ-পরবর্তী আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে নতুন সমঝোতা কাঠামো। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, ইরানের ওপর আরোপিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বাধা শিথিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তেল রপ্তানির সুযোগ বাড়তে পারে। আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ও আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রেও নতুন পথ খুলে যেতে পারে। যদি এসব বাস্তবায়িত হয়, তাহলে দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক চাপে থাকা ইরান নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে।
এই বাস্তবতা অনেক পর্যবেক্ষকের কাছে বিস্ময়কর। কারণ কয়েক মাস আগেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানকে তুলনামূলকভাবে বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র হিসেবে দেখা হচ্ছিল। দেশটির অর্থনীতি চাপের মধ্যে ছিল। বৈদেশিক বিনিয়োগ সীমিত ছিল। নিষেধাজ্ঞার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তার প্রবেশাধিকারও সংকুচিত ছিল। অথচ যুদ্ধের পর পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে তেহরান নতুন আঞ্চলিক বাস্তবতার অন্যতম সুবিধাভোগী হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।
যুদ্ধের অর্থনৈতিক মূল্যও কম নয়। বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে। সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহার হয়েছে ব্যাপক হারে। যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণহানিও ঘটেছে। সমালোচকদের মতে, এই বিপুল ব্যয়ের বিনিময়ে ওয়াশিংটন স্পষ্ট কোনো কৌশলগত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। বরং মার্কিন সামরিক সম্পদের ওপর নতুন চাপ তৈরি হয়েছে।
তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি সম্ভবত মনস্তাত্ত্বিক। ইরানের শাসকগোষ্ঠী বহু বছর ধরে নিজেদের জনগণকে এই বার্তা দিয়ে এসেছে যে দেশটি বহিরাগত শক্তির অবরোধ ও চাপের মুখে রয়েছে। সাম্প্রতিক সংঘাতের পর তারা এখন দাবি করতে পারছে যে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক জোটের চাপও তারা মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছে। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এই বার্তাটি তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শক্তির উৎস হয়ে উঠতে পারে।
এই পুরো আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ এটি। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস এই প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়। ফলে হরমুজে যেকোনো অস্থিরতা সরাসরি বৈশ্বিক অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে।
ইরান বহু বছর ধরেই এই ভৌগোলিক অবস্থানকে কৌশলগত সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। সাম্প্রতিক ঘটনাবলি আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, হরমুজ প্রশ্নে তেহরানকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। বিশ্বের জ্বালানি বাজারের ওপর প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে এটি তাদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, যুদ্ধের পর ইরান উপলব্ধি করেছে যে সামরিক শক্তির পাশাপাশি ভূ-অর্থনৈতিক চাপও একটি কার্যকর অস্ত্র। ফলে ভবিষ্যতে তেহরান আরও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এই কৌশল ব্যবহার করতে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা নীতিও নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
ইউরোপীয় দেশগুলোর অবস্থানও এই সংকটে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শুরু থেকেই তারা যুদ্ধের বিস্তার নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল। কারণ মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের অস্থিরতা ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও অর্থনীতিকে সরাসরি প্রভাবিত করে। ফলে তারা যুদ্ধের পরিবর্তে কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নেয়।

যুদ্ধ-পরবর্তী সমঝোতা নিয়ে ইউরোপের ভেতরে ভিন্নমত থাকলেও অধিকাংশ দেশ শেষ পর্যন্ত সেটিকে সমর্থন করেছে। কারণ তাদের কাছে যুদ্ধ বন্ধ করাই ছিল প্রধান লক্ষ্য। অনেক ইউরোপীয় কূটনীতিকের মতে, নিখুঁত সমাধান না হলেও এটি চলমান সংঘাতের চেয়ে ভালো বিকল্প।
জি-৭ সম্মেলনেও এই পরিবর্তিত বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রকে আগের তুলনায় অনেক বেশি সমঝোতা-প্রবণ দেখা গেছে। ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ওয়াশিংটনকে তুলনামূলক নমনীয় অবস্থান নিতে হয়েছে। এটি দেখায় যে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একক আধিপত্যের যুগ আগের মতো শক্তিশালী নেই।
এই প্রেক্ষাপটে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তার সমালোচকেরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, তিনি আন্তর্জাতিক কৌশলগত বিবেচনার চেয়ে অর্থনৈতিক সূচকের ওপর বেশি গুরুত্ব দেন। বিশেষ করে শেয়ারবাজার, মুদ্রাস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তার সিদ্ধান্ত গ্রহণে বড় প্রভাব ফেলে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই ধারণাকে আরও জোরালো করেছে। কারণ যুদ্ধ যত দীর্ঘ হয়েছে, অর্থনৈতিক ঝুঁকিও তত বেড়েছে। জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ মার্কিন অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। ফলে শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক সমাধানের দিকে এগোনোর প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়ে যায়।
এই বিষয়টি শুধু ইরান নয়, বিশ্বের অন্যান্য শক্তিও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বিশেষ করে চীন। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বেইজিং দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটনের আচরণ বিশ্লেষণ করে আসছে। তাইওয়ান প্রশ্নে ভবিষ্যতে কোনো সংকট দেখা দিলে যুক্তরাষ্ট্র কতদূর যেতে প্রস্তুত-চীনের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, ইরান সংকট থেকে চীন একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পেয়েছে। সেটি হলো, অর্থনৈতিক চাপ ও বাজারের অনিশ্চয়তা যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে ভবিষ্যতের সংঘাতে বেইজিং এই বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে।
যুদ্ধ-পরবর্তী সমঝোতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পারমাণবিক ইস্যু। অতীতে ইরানের সঙ্গে হওয়া আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলোতে কঠোর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ব্যবস্থা ছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই কাঠামো কতটা কার্যকর থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
সমালোচকদের আশঙ্কা, নতুন সমঝোতায় ইরান আগের তুলনায় বেশি স্বাধীনতা পেতে পারে। আবার সমর্থকদের যুক্তি, যুদ্ধের পথ পরিত্যাগ করে কূটনৈতিক কাঠামোয় ফিরে আসাই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সমাধান।
ইসরায়েলের জন্য এই যুদ্ধ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। গত কয়েক বছরে দেশটি নিজেকে মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান সামরিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে। হামাস, হিজবুল্লাহ এবং ইরানপন্থী বিভিন্ন গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযানও সেই কৌশলের অংশ ছিল।
নেতানিয়াহু সরকার বিশ্বাস করত যে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য স্থায়ীভাবে নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসা সম্ভব। কিন্তু সাম্প্রতিক যুদ্ধের পর সেই ধারণা নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। কারণ অনেকের মতে, ইরানকে দুর্বল করার পরিবর্তে সংঘাতটি তাকে নতুন রাজনৈতিক সুযোগ এনে দিয়েছে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে কৌশলগত দূরত্বের লক্ষণ ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। দুই দেশের সম্পর্ক এখনো ঘনিষ্ঠ। তবে সব বিষয়ে তাদের অবস্থান এক নয়। বিশেষ করে যুদ্ধের পরিধি, কূটনৈতিক সমঝোতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে মতপার্থক্য সামনে এসেছে।
মার্কিন রাজনীতির ভেতরেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ডেমোক্রেটিক পার্টির একটি বড় অংশ অনেক দিন ধরেই ইসরায়েলের কিছু নীতির সমালোচনা করে আসছে। এখন রিপাবলিকান শিবিরের মধ্যেও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে–মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততার সীমা কোথায় হওয়া উচিত?
বিশেষ করে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ ধারার সমর্থকদের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে বিদেশি সংঘাতে অতিরিক্ত জড়িয়ে পড়া যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সবসময় সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই মনোভাব ভবিষ্যতে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
ফলে ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হতে পারে তার ঐতিহ্যগত রাজনৈতিক সমর্থনের ভিত্তি দুর্বল হয়ে যাওয়া। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলই ইসরায়েলকে সমর্থন করেছে। কিন্তু সেই ঐকমত্য এখন আর আগের মতো অটুট নয়।
সব মিলিয়ে ইরান যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করছে। যুদ্ধক্ষেত্রের ফলাফলের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এর কৌশলগত ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, ইরান, ইউরোপ এবং চীন–সব পক্ষই নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে।
এই পরিবর্তন স্থায়ী হবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট–মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির সমীকরণ আর আগের জায়গায় নেই। পুরনো ধারণা ও কৌশল দিয়ে নতুন বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করা কঠিন। ফলে আগামী বছরগুলোতে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ গড়ে ওঠার সম্ভাবনা প্রবল।
ইরান যুদ্ধ হয়তো শেষ হয়েছে, কিন্তু এর রাজনৈতিক অভিঘাত মাত্র শুরু হয়েছে।
লেখক: ফরেন পলিসির কলাম লেখক।
(এই লেখাটি ওয়াশিংটন-ভিত্তিক প্রভাবশালী মার্কিন ম্যাগাজিন ফরেন পলিসির সৌজন্যে সংক্ষিপ্তাকারে প্রকাশিত হলো।)