কাজী সাজিদুল হক

ব্রাজিল সমর্থকদের আজ মন খারাপ হওয়ারই কথা। নরওয়ের ওপর রাগও হতে পারে। তবে সেই রাগটা কতটা আর্লিং হালান্ডের ওপর, তা এই মুহূর্তে পরিমাপের কোনো উপায় হয়তো নেই। কিন্তু প্রশ্ন উঠতেই পারে যে, কী খেয়ে মাঠে নেমে জোড়া গোল করলেন এই নরওয়েজিয়ান স্ট্রাইকার?
হালান্ডের খাবার নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে বেশ আলোচনা চলছে। হালান্ডের প্রিয় খাবারের মধ্যে বাঙালির প্রিয় কিছু খাবারও আছে। যেমন: গরুর কলিজা ও হৃৎপিণ্ড। ক’দিন আগেই তো কোরবানির ঈদ গেল। অনেকেই হয়তো বাঙালি স্টাইলে এসব খাবার খেয়েছেনও।
হালান্ডের ডিনারটাকে রাজকীয় ভোজ বললেও কম হয় না। টেবিলে থাকে স্টেকের সাথে পুষ্টিতে ভরপুর বোন ব্রথ বা হাড়ের স্যুপ। গরুর হাড় দিয়েই এই স্যুপ বানানো হয়। মজার ব্যাপার হলো, এই হাড়ের স্যুপের সাথে কিন্তু আমাদের পরিচিত খাবার গরুর পায়ার মিল পাওয়া যায়।
ইতিহাসবিদ ও নৃবিজ্ঞানীদের মতে, বোন ব্রথের সূচনা হয়েছিল প্রায় ২০ হাজার বছর আগে, প্রস্তর যুগে। খাদ্য ইতিহাসবিদ স্যালি ফ্যালন মোরেল তার বই ‘Nourishing Broth: An Old-Fashioned Remedy for the Modern World’-এ প্রাগৈতিহাসিক মানুষের হাড় ফোটানোর আদিম কৌশলের বিশদ বিবরণ দিয়েছেন।
প্রাচীন চীনা চিকিৎসার বইগুলোয় হাড়ের স্যুপ বা বোন ব্রথ শুধু খাদ্য হিসেবে নয়, বরং ওষুধ হিসেবে ব্যবহারের কথা উল্লেখ আছে। ঐতিহ্যবাহী চীনা চিকিৎসায় হাড়ের নির্যাসকে ‘কিডনি টনিক’ এবং শরীরের ‘চি’ বা জীবনী ও হজমশক্তি বৃদ্ধিকারী প্রধান পথ্য হিসেবে ব্যবহার করা হতো।
আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক গ্রিক চিকিৎসক হিপোক্রেটিস খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ অব্দে পাকস্থলীর প্রদাহ এবং হজমের নানা জটিলতা নিরাময়ে রোগীদের হাড়ের নির্যাস পানের পরামর্শ দিতেন।
নরওয়ে, ডেনমার্ক ও সুইডেনের মতো নরডিক দেশগুলোয় এই স্যুপের ইতিহাস বেশ পুরনো। নরওয়েজিয়ান ভাষায় এই স্যুপের নাম Oksekraft। নরওয়েজিয়ান শব্দ ‘Kraft’-এর আক্ষরিক অর্থ হলো ‘শক্তি’ বা ‘ক্ষমতা’ এবং ‘Okse’ মানে ‘গরু’। স্ক্যান্ডিনেভিয়ার তীব্র শীতপ্রধান আবহাওয়ায় ভাইকিংরা শরীর গরম রাখতে এবং দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় পুষ্টির অভাব মেটাতে গরুর হাড় ও স্থানীয় মূলজাতীয় সবজি (রুট ভেজিটেবল) ঘন ঝোল বা স্যুপ তৈরি করত।
প্রাচীন নরওয়েজিয়ান গ্রামীণ পরিবারগুলোতে খাবারের অপচয়কে অপরাধ মনে করা হতো। মাংস কাটার পর যে হাড় অবশিষ্ট থাকত, তা বিশাল পাত্রে সারাদিন বা রাতভর ফুটিয়ে এই ‘Oksekraft’ তৈরি করা হতো, যা ছিল সপ্তাহের বাকি দিনগুলোর রান্নার বেস।
চলুন, এই হাড়ের স্যুপের রেসিপিটা জেনে নেওয়া যাক।
এটি তৈরি করতে অবশ্যই লাগবে ১ কেজি গরুর হাড়। এক্ষেত্রে নল্লি নিলে সবচেয়ে ভালো। সাথে নিতে হবে ৫০০ গ্রাম মাংস (হাড়সহ)।
সবজি: গাজর ৪টি (টুকরো করা), আলু ৪টি (মাঝারি কিউব করে কাটা), শালগম বা বাঁধাকপি ১টি (মাঝারি টুকরো), সেলেরি রুট বা লীক ১টি (কুচি করা; লীক না পেলে পেঁয়াজ কলি বা রসুন পাতা)।
মিহি কুচি করা পেঁয়াজ ২টি। ৪ কোয়া রসুন কুচি। মাখন বা তেল লাগবে ২ টেবিল চামচ।
এর বাইরে গোলমরিচ গুঁড়া লাগবে ১ চা চামচ। লবণ স্বাদমতো দিলেই হবে।
তেজপাতা লাগবে ১/২টি। আর আপেল সাইডার ভিনেগার লাগবে ২ টেবিল চামচ।
এবার রান্নার পালা
হাড়গুলো একটি বড় পাত্রে ঠান্ডা পানি দিয়ে চুলায় বসিয়ে দিন। ফুটতে শুরু করার পর ৫-১০ মিনিট ফুটিয়ে নিন। ওপরের ময়লা ফেনা ফেলে দিন। এরপর হাড়গুলো ধুয়ে নিতে হবে। এই পদ্ধতি ব্রথ একদম পরিষ্কার ও গন্ধহীন করার ক্ষেত্রে খুব কার্যকর।
এবার হাড়গুলো ওভেন ট্রে’তে নিয়ে ২০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ৩০ মিনিট রোস্ট করুন। ওভেন না থাকলে শুকনো কড়াইতে হালকা লালচে করে ভেজে নিতে হবে। হাড়ের এই বাদামী রঙ ব্রথকে চমৎকার ফ্লেভার দেবে। রঙটাও হবে সুন্দর।
এবার একটি বড় পাত্রে বা স্লো-কুকারে রোস্ট করা হাড়, ৪-৫ লিটার ঠান্ডা পানি এবং ২ টেবিল চামচ আপেল সাইডার ভিনেগার দিন। চুলা না জ্বালিয়ে ৩০ মিনিট রেখে দিতে হবে। ভিনেগার হাড়ের ভেতরের পুষ্টি উপাদান সহজে গলতে সাহায্য করবে। এবার চুলা জ্বালিয়ে পানি ফুটে ওঠা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। ফুটতে শুরু করলে চুলার আঁচ একদম কমিয়ে দিন (যাতে পানি ফুটবে না, শুধু হালকা বুদবুদ উঠবে)।
এরপর পাত্রের ঢাকনা ভালোমতো আটকে ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টা মৃদু আঁচে রান্না হতে দিন। মাঝে মাঝে ওপরের তেলের স্তর চামচ দিয়ে ফেলে দিতে পারেন। আপনি চাইলে এক্ষেত্রে সময় কমিয়ে নিতে পারেন। সেক্ষেত্রে ৪ ঘণ্টার কম যেন না হয়। শুধু ভাবুন, একটু ভালো নেহারি/পায়া রান্নার ক্ষেত্রে আপনি কতটা সময় নেন। প্রেশার কুকার এই রান্নায় ব্যবহার না করলে ভালো হবে।
রান্না শেষ হওয়ার ৪ ঘণ্টা আগে পেঁয়াজ, গাজর, আলু, রসুন, তেজপাতা, লীক, বাঁধাকপি বা শালগম এবং গোলমরিচ পাত্রে দিয়ে দিন। সঙ্গে মাখনটাও দিয়ে দিতে হবে। যদি শুধু ব্রথ হিসেবে ব্যবহার করতে চান, তবে রান্না শেষে একটি সূক্ষ্ম ছাঁকনি দিয়ে হাড় ও সবজি আলাদা করে শুধু তরল ব্রথটি সংগ্রহ করুন। এবার স্বাদমতো লবণ মেশান।
এই ব্রথ আপনি নুডলসে দিয়ে খেতে পারেন। কিংবা না ছেঁকে শুধু স্যুপ হিসেবেও খেতে পারেন। বানিয়ে খেয়েই দেখুন না হয়। হালান্ডের মতো এনার্জি পেলেও পেতে পারেন!

ব্রাজিল সমর্থকদের আজ মন খারাপ হওয়ারই কথা। নরওয়ের ওপর রাগও হতে পারে। তবে সেই রাগটা কতটা আর্লিং হালান্ডের ওপর, তা এই মুহূর্তে পরিমাপের কোনো উপায় হয়তো নেই। কিন্তু প্রশ্ন উঠতেই পারে যে, কী খেয়ে মাঠে নেমে জোড়া গোল করলেন এই নরওয়েজিয়ান স্ট্রাইকার?
হালান্ডের খাবার নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে বেশ আলোচনা চলছে। হালান্ডের প্রিয় খাবারের মধ্যে বাঙালির প্রিয় কিছু খাবারও আছে। যেমন: গরুর কলিজা ও হৃৎপিণ্ড। ক’দিন আগেই তো কোরবানির ঈদ গেল। অনেকেই হয়তো বাঙালি স্টাইলে এসব খাবার খেয়েছেনও।
হালান্ডের ডিনারটাকে রাজকীয় ভোজ বললেও কম হয় না। টেবিলে থাকে স্টেকের সাথে পুষ্টিতে ভরপুর বোন ব্রথ বা হাড়ের স্যুপ। গরুর হাড় দিয়েই এই স্যুপ বানানো হয়। মজার ব্যাপার হলো, এই হাড়ের স্যুপের সাথে কিন্তু আমাদের পরিচিত খাবার গরুর পায়ার মিল পাওয়া যায়।
ইতিহাসবিদ ও নৃবিজ্ঞানীদের মতে, বোন ব্রথের সূচনা হয়েছিল প্রায় ২০ হাজার বছর আগে, প্রস্তর যুগে। খাদ্য ইতিহাসবিদ স্যালি ফ্যালন মোরেল তার বই ‘Nourishing Broth: An Old-Fashioned Remedy for the Modern World’-এ প্রাগৈতিহাসিক মানুষের হাড় ফোটানোর আদিম কৌশলের বিশদ বিবরণ দিয়েছেন।
প্রাচীন চীনা চিকিৎসার বইগুলোয় হাড়ের স্যুপ বা বোন ব্রথ শুধু খাদ্য হিসেবে নয়, বরং ওষুধ হিসেবে ব্যবহারের কথা উল্লেখ আছে। ঐতিহ্যবাহী চীনা চিকিৎসায় হাড়ের নির্যাসকে ‘কিডনি টনিক’ এবং শরীরের ‘চি’ বা জীবনী ও হজমশক্তি বৃদ্ধিকারী প্রধান পথ্য হিসেবে ব্যবহার করা হতো।
আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক গ্রিক চিকিৎসক হিপোক্রেটিস খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ অব্দে পাকস্থলীর প্রদাহ এবং হজমের নানা জটিলতা নিরাময়ে রোগীদের হাড়ের নির্যাস পানের পরামর্শ দিতেন।
নরওয়ে, ডেনমার্ক ও সুইডেনের মতো নরডিক দেশগুলোয় এই স্যুপের ইতিহাস বেশ পুরনো। নরওয়েজিয়ান ভাষায় এই স্যুপের নাম Oksekraft। নরওয়েজিয়ান শব্দ ‘Kraft’-এর আক্ষরিক অর্থ হলো ‘শক্তি’ বা ‘ক্ষমতা’ এবং ‘Okse’ মানে ‘গরু’। স্ক্যান্ডিনেভিয়ার তীব্র শীতপ্রধান আবহাওয়ায় ভাইকিংরা শরীর গরম রাখতে এবং দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় পুষ্টির অভাব মেটাতে গরুর হাড় ও স্থানীয় মূলজাতীয় সবজি (রুট ভেজিটেবল) ঘন ঝোল বা স্যুপ তৈরি করত।
প্রাচীন নরওয়েজিয়ান গ্রামীণ পরিবারগুলোতে খাবারের অপচয়কে অপরাধ মনে করা হতো। মাংস কাটার পর যে হাড় অবশিষ্ট থাকত, তা বিশাল পাত্রে সারাদিন বা রাতভর ফুটিয়ে এই ‘Oksekraft’ তৈরি করা হতো, যা ছিল সপ্তাহের বাকি দিনগুলোর রান্নার বেস।
চলুন, এই হাড়ের স্যুপের রেসিপিটা জেনে নেওয়া যাক।
এটি তৈরি করতে অবশ্যই লাগবে ১ কেজি গরুর হাড়। এক্ষেত্রে নল্লি নিলে সবচেয়ে ভালো। সাথে নিতে হবে ৫০০ গ্রাম মাংস (হাড়সহ)।
সবজি: গাজর ৪টি (টুকরো করা), আলু ৪টি (মাঝারি কিউব করে কাটা), শালগম বা বাঁধাকপি ১টি (মাঝারি টুকরো), সেলেরি রুট বা লীক ১টি (কুচি করা; লীক না পেলে পেঁয়াজ কলি বা রসুন পাতা)।
মিহি কুচি করা পেঁয়াজ ২টি। ৪ কোয়া রসুন কুচি। মাখন বা তেল লাগবে ২ টেবিল চামচ।
এর বাইরে গোলমরিচ গুঁড়া লাগবে ১ চা চামচ। লবণ স্বাদমতো দিলেই হবে।
তেজপাতা লাগবে ১/২টি। আর আপেল সাইডার ভিনেগার লাগবে ২ টেবিল চামচ।
এবার রান্নার পালা
হাড়গুলো একটি বড় পাত্রে ঠান্ডা পানি দিয়ে চুলায় বসিয়ে দিন। ফুটতে শুরু করার পর ৫-১০ মিনিট ফুটিয়ে নিন। ওপরের ময়লা ফেনা ফেলে দিন। এরপর হাড়গুলো ধুয়ে নিতে হবে। এই পদ্ধতি ব্রথ একদম পরিষ্কার ও গন্ধহীন করার ক্ষেত্রে খুব কার্যকর।
এবার হাড়গুলো ওভেন ট্রে’তে নিয়ে ২০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ৩০ মিনিট রোস্ট করুন। ওভেন না থাকলে শুকনো কড়াইতে হালকা লালচে করে ভেজে নিতে হবে। হাড়ের এই বাদামী রঙ ব্রথকে চমৎকার ফ্লেভার দেবে। রঙটাও হবে সুন্দর।
এবার একটি বড় পাত্রে বা স্লো-কুকারে রোস্ট করা হাড়, ৪-৫ লিটার ঠান্ডা পানি এবং ২ টেবিল চামচ আপেল সাইডার ভিনেগার দিন। চুলা না জ্বালিয়ে ৩০ মিনিট রেখে দিতে হবে। ভিনেগার হাড়ের ভেতরের পুষ্টি উপাদান সহজে গলতে সাহায্য করবে। এবার চুলা জ্বালিয়ে পানি ফুটে ওঠা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। ফুটতে শুরু করলে চুলার আঁচ একদম কমিয়ে দিন (যাতে পানি ফুটবে না, শুধু হালকা বুদবুদ উঠবে)।
এরপর পাত্রের ঢাকনা ভালোমতো আটকে ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টা মৃদু আঁচে রান্না হতে দিন। মাঝে মাঝে ওপরের তেলের স্তর চামচ দিয়ে ফেলে দিতে পারেন। আপনি চাইলে এক্ষেত্রে সময় কমিয়ে নিতে পারেন। সেক্ষেত্রে ৪ ঘণ্টার কম যেন না হয়। শুধু ভাবুন, একটু ভালো নেহারি/পায়া রান্নার ক্ষেত্রে আপনি কতটা সময় নেন। প্রেশার কুকার এই রান্নায় ব্যবহার না করলে ভালো হবে।
রান্না শেষ হওয়ার ৪ ঘণ্টা আগে পেঁয়াজ, গাজর, আলু, রসুন, তেজপাতা, লীক, বাঁধাকপি বা শালগম এবং গোলমরিচ পাত্রে দিয়ে দিন। সঙ্গে মাখনটাও দিয়ে দিতে হবে। যদি শুধু ব্রথ হিসেবে ব্যবহার করতে চান, তবে রান্না শেষে একটি সূক্ষ্ম ছাঁকনি দিয়ে হাড় ও সবজি আলাদা করে শুধু তরল ব্রথটি সংগ্রহ করুন। এবার স্বাদমতো লবণ মেশান।
এই ব্রথ আপনি নুডলসে দিয়ে খেতে পারেন। কিংবা না ছেঁকে শুধু স্যুপ হিসেবেও খেতে পারেন। বানিয়ে খেয়েই দেখুন না হয়। হালান্ডের মতো এনার্জি পেলেও পেতে পারেন!