ভারতের নির্বাচনব্যবস্থা ও ভোটারদের পরিচয় যাচাইয়ের নিয়মের উদাহরণ টেনে যুক্তরাষ্ট্রে ‘সেভ আমেরিকা অ্যাক্ট’ পাসের আহ্বান জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক বিরোধিতা রয়েছে।
ট্রাম্প নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্যের কথা তুলে ধরেন। তার দাবি, ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার তার প্রশাসনের কাছে জানতে চেয়েছেন, বৈধ ছবিযুক্ত পরিচয়পত্র ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে কীভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
ট্রাম্প বলেন, ভারতের সর্বশেষ নির্বাচনে ৬৪ কোটি ৬০ লাখ মানুষ ভোট দিয়েছেন। ১ শতাংশেরও কম মানুষ ডাকযোগে ভোট দিয়েছেন। আর প্রত্যেক ভোটারের বৈধ ছবিযুক্ত পরিচয়পত্র ছিল।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, সেভ আমেরিকা অ্যাক্টেও ফেডারেল নির্বাচনে ভোটার হিসেবে নিবন্ধনের সময় মার্কিন নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হবে। ভোট দেওয়ার সময়ও আরও কঠোর পরিচয়পত্রের নিয়ম চালু হবে।
ভারতের নির্বাচন বিশ্বের সবচেয়ে বড় নির্বাচন। এর বিশাল আয়োজন, জটিলতা ও দক্ষতার জন্য দেশটির নির্বাচনব্যবস্থা প্রশংসিত। তবে ভোটার তালিকা, নির্বাচনী অনিয়ম এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমলে নির্বাচন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে।
তাহলে ভারতের নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু? ভারতের অভিজ্ঞতা থেকে আসলে কী শেখার আছে? আর ভোটার আইডি থাকলেই কি নির্বাচনী অনিয়ম বন্ধ করা সম্ভব? এক বিশ্লেষণে বিষয়গুলো তুলে ধরেছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন (ডান থেকে দ্বিতীয়) রিপাবলিকান নেতৃত্ব ও কর্মীদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্বের প্রমাণ ছাড়া ভোটার হিসেবে নিবন্ধন ও ভোট দেওয়া নিষিদ্ধ করার বিল পাসের পর সংবাদ সম্মেলনে কথা বলছেন। ছবি: রয়টার্স
সেভ আমেরিকা অ্যাক্ট কী এবং কেন বিতর্ক?
সেভ আমেরিকা অ্যাক্ট হলো ট্রাম্প সমর্থিত একটি নির্বাচনী আইন। ফেব্রুয়ারিতে রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত প্রতিনিধি পরিষদে পাস হওয়া প্রস্তাব অনুযায়ী, ফেডারেল নির্বাচনে ভোটার হিসেবে নিবন্ধনের সময় জন্মসনদ বা পাসপোর্টের মতো নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হবে। এছাড়া সরাসরি ভোট দেওয়া বা ডাকযোগে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রেও আরও কঠোর পরিচয়পত্রের নিয়ম করা হবে। আইনটির সমর্থকদের দাবি, এসব কাগজপত্র ও পরিচয়পত্রের নিয়ম নির্বাচনকে আরও নিরাপদ করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ও অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনে দেশটির নাগরিক ভিন্ন অন্যদের ভোট দেওয়া এমনিতেই বেআইনি। আর ব্যাপক ভোট জালিয়াতি হচ্ছে বলে ট্রাম্পের দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো প্রমাণও পাওয়া যায়নি।
নিউইয়র্কভিত্তিক ব্রেনান সেন্টার ফর জাস্টিসের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ভোট জালিয়াতির যেসব ঘটনা সামনে এসেছে, তার বেশিরভাগই আসলে দাপ্তরিক ভুল বা ভোটারদের তথ্য মেলানোর ক্ষেত্রে ভুলের কারণে হয়েছে।
সমালোচকদের দাবি, সেভ আমেরিকা অ্যাক্ট কার্যকর হলে অনেক বৈধ ভোটারই ভোট দেওয়ার সুযোগ হারাতে পারেন। এতে ভোটার উপস্থিতিও কমে যেতে পারে।
অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাট নেতাদের অভিযোগ, ট্রাম্প প্রশাসন আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল নিজেদের পক্ষে প্রভাবিত করতে এই আইনকে ব্যবহার করছে।
ভারতের নির্বাচন ও ভোটার আইডি কীভাবে কাজ করে?
ভারতের নির্বাচন কমিশন (ইসিআই) দেশটির নির্বাচন পরিচালনার সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে ভারতে প্রায় ৯৭ কোটি মানুষ ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধিত ছিলেন। তাদের মধ্যে ৬৪ কোটির বেশি মানুষ ভোট দিয়েছেন। এটি ছিল বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় নির্বাচন।
বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ হওয়ায় ভারতে নির্বাচন কয়েক সপ্তাহ ধরে অনুষ্ঠিত হয়। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচন সাত ধাপে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এই নির্বাচনে ভোটাররা ভারতের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ লোকসভার সদস্য নির্বাচন করেন।
১৯৯৩ সালে ভোটারদের ছবিযুক্ত পরিচয়পত্র চালু করে দেশটির নির্বাচন কমিশন। এর উদ্দেশ্য ছিল একজনের নামে অন্য কেউ যাতে ভোট দিতে না পারে, তা ঠেকানো এবং নির্বাচন পরিচালনা আরও শক্তিশালী করা।
ভারতে ভোটারদের বিস্তারিত তালিকাও রাখা হয়। এই তালিকার মাধ্যমে কোন এলাকার কোন ব্যক্তি ভোট দিতে পারবেন, তা নির্ধারণ করা হয়। ভোটের আগে নির্বাচন কমিশন ভোটারদের নিজেদের নাম ভোটার তালিকায় আছে কি না, তা যাচাই করতে বলে।
ভারতে কি ডাকযোগে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা আছে?
ভারতে ডাকযোগে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও সবাই এই সুযোগ পান না। নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, কিছু ভোটার নিজেদের নির্বাচনী এলাকার বাইরে থেকেও ডাকযোগে ভোট দিতে পারেন। তারা নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় ব্যালট পান, তাতে ভোট দেন এবং ডাকের মাধ্যমে সেটি ফেরত পাঠান।
এই সুবিধা পান মূলত পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের মতো দায়িত্বে থাকা কর্মীরা, নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা এবং বিচারাধীন কিছু ব্যক্তি যারা এখনো দোষী সাব্যস্ত হননি।
ভোটার আইডি কি ভারতে নির্বাচনী জালিয়াতি বন্ধ করতে পেরেছে?
ভারতের বিরোধী দলগুলো দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় ও রাজ্য–দুই নির্বাচনেই নানা অনিয়মের অভিযোগ করে আসছে। গত বছরের আগস্টে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে জালিয়াতির অভিযোগ তোলেন। তিনি অভিযোগ করেন, কর্ণাটকের মহাদেবপুরা আসনের ভোটার তালিকায় ভুয়া ভোটারের নাম যোগ করা হয়েছিল।
সংবাদ সম্মেলন করে রাহুল গান্ধী এমন কয়েকটি ঘটনা দেখান, যেখানে একই ব্যক্তির নামে একাধিক ভোটার আইডি দেখা গেছে।
রাহুল বলেন, ছয় মাস ধরে গবেষণা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযোগ ভুল প্রমাণ করতে নির্বাচন কমিশনকে ইলেকট্রনিক ভোটার তালিকা ও সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ করার চ্যালেঞ্জও দেন তিনি।
ভারত সরকার এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে। তবে অভিযোগ সত্য না মিথ্যা, তা প্রমাণের জন্য রাহুল যে তথ্য প্রকাশের দাবি করেছিলেন, সরকার তা মেনে নেয়নি।
ওই বছরের নভেম্বর মাসে কংগ্রেস অভিযোগ করে, ২০২৪ সালের হরিয়ানা বিধানসভা নির্বাচনে ২৫ লাখের বেশি ভোট ‘চুরি’ করা হয়েছে। ভারতের প্রধান বিরোধী দলটির দাবি, ভোটারদের তথ্যেও অনিয়ম পাওয়া গেছে। একই ছবি একাধিক ভোটার আইডিতে ব্যবহারের ঘটনাও তারা দেখতে পেয়েছে।
মোদির নীতিতে কি বিরোধী ভোটাররা ভোট দেওয়ার অধিকার হারিয়েছেন?
ভারতে বড় ধরনের ভোট জালিয়াতির প্রমাণ খুব বেশি পাওয়া যায়নি। তবে বিশ্লেষক ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, শুধু ভোটার আইডি নিয়ে আলোচনা করলে আসল সমস্যাটি আড়ালে থেকে যায়। আসল প্রশ্ন হলো–কারা ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন এবং কারা পাচ্ছেন না।
পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় কর্মকর্তারা নিবন্ধন ফরম বিতরণ করছেন। ছবি: এএফপি
অক্টোবরে ভারতের নির্বাচন কমিশন বিতর্কিত ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বা এসআইআর কার্যক্রম শুরু করে। নরেন্দ্র মোদি সরকার এটিকে সমর্থন করেছে। তবে প্রায় সব বিরোধী দল এর বিরোধিতা করেছে।
এই কার্যক্রমের লক্ষ্য হলো ভোটার তালিকা থেকে মৃত ব্যক্তি, একই ব্যক্তির একাধিক নাম এবং ভোট দেওয়ার অযোগ্য ব্যক্তিদের শনাক্ত করে বাদ দেওয়া।
গত বছর বিহারে প্রায় ৮ কোটি নিবন্ধিত ভোটারকে নিজেদের ভোট দেওয়ার যোগ্যতা যাচাই করতে বলা হয়। তাদের হাতে ছিল মাত্র কয়েক সপ্তাহ সময়। অনেককে জন্মসনদ, পাসপোর্ট বা স্কুলের নথির মতো কাগজপত্র জমা দিতে বলা হয়।
সেপ্টেম্বরে নির্বাচন কমিশন ৭ কোটি ৪২ লাখ ভোটারের একটি তালিকা প্রকাশ করে। এর আগে ৪৭ লাখ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়।
রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ ও লেখক পারকলা প্রভাকর আল জাজিরাকে বলেন, সরকার ও নির্বাচন কমিশন ঠিক করছে, জনগণের মধ্যে কারা ভোটার হিসেবে থাকবে। অর্থাৎ জনগণ সরকার নির্বাচন করার বদলে সরকারই ভোটার বেছে নিচ্ছে।
চলতি বছরের এপ্রিলে পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর প্রায় ৯০ লাখ মানুষ ভোট দেওয়ার অধিকার হারান। রাজ্যটিতে নিবন্ধিত ভোটার ছিলেন প্রায় ৭ কোটি ৬০ লাখ। অর্থাৎ প্রায় ১২ শতাংশ ভোটার ভোট দেওয়ার সুযোগ হারান।
এর মধ্যে প্রায় ৬০ লাখ মানুষকে অনুপস্থিত বা মৃত হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। আর ৩০ লাখ মানুষ ভোট দিতে পারেননি, কারণ নির্বাচনের আগে বিশেষ ট্রাইব্যুনালগুলো তাদের অভিযোগ শোনার জন্য যথেষ্ট সময় পায়নি।
মানবাধিকারকর্মী ও নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের দাবি, এই কার্যক্রমে সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষই বেশি ভোটাধিকার হারাচ্ছেন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুর তথ্য অনুযায়ী, বাদ দেওয়া ভোটারদের ৩৪ শতাংশ ছিলেন মুসলিম। অথচ পশ্চিমবঙ্গের মোট জনসংখ্যার মধ্যে মুসলিমের সংখ্যা প্রায় ২৭ শতাংশ। অন্যদিকে, বাদ পড়া ভোটারদের ৬৩ শতাংশ ছিলেন হিন্দু। তাদের মধ্যে অনেকেই মতুয়া সম্প্রদায়ের সদস্য। মতুয়া সম্প্রদায় মূলত প্রান্তিক দলিত জনগোষ্ঠীর একটি অংশ এবং বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকায় তাদের বসবাস বেশি।
অর্থনীতিবিদ প্রভাকর বলেন, ভারতে এসআইআরের মাধ্যমে এমন জনগোষ্ঠীকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা চলছে, যারা হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতার রাজনৈতিক চিন্তার বিরোধী। তিনি আরও বলেন, এই প্রক্রিয়া শেষে ভারতে দুই ধরনের নাগরিক থাকবে–একদল ভোট দেওয়ার অধিকার রাখবে, আরেকদল সেই অধিকার হারাবে।
তার মতে, কিছু দেশে রাজনৈতিক ব্যবস্থা থেকে বিরোধীদের সরাতে রক্তপাত হয়েছে। কিন্তু মোদির আমলে ভারত রক্তপাত ছাড়াই অন্যদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার একটি পদ্ধতি নিয়ে পরীক্ষা চালাচ্ছে।