ইয়াসিন আরাফাত

শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন বা রেজিম চেঞ্জকে প্রায়ই একটি অর্থনৈতিক মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা হিসেবে দেখা হয়। দীর্ঘদিনের দুঃশাসন, মূল্যনিয়ন্ত্রণ এবং রাষ্ট্রীয় অবক্ষয়ের পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই আশা জাগায়। তবে এতে কি খুব একটা পরিবর্তন ঘটে?
ভেনেজুয়েলায় বছরের পর বছর ধরে চলা বিশৃঙ্খলা ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পর আজ প্রতি ১০ জনের মধ্যে প্রায় সাতজন বিশ্বাস করেন যে, আগামী এক বছরে তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে কারণ নিকোলাস মাদুরোর অযোগ্য স্বৈরাচারী শাসনকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে। একই ধরনের আশা ইরানের বহু নাগরিকেরও। যারা ধর্মতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে জীবন বাজি রেখে প্রতিবাদ চালিয়ে যাচ্ছেন।
তবে ইতিহাস দেখায়, রাজনৈতিক পরিবর্তন হঠাৎ আসতে পারে, কিন্তু অর্থনৈতিক ফলাফল সাধারণত অনেক ধীরে এবং অসমভাবে সামনে আসে।
অর্থনীতিবিদরা বহু দশক ধরে বোঝার চেষ্টা করছেন-রাজনৈতিক অভ্যুত্থান বা আমূল পরিবর্তন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর কী প্রভাব ফেলে। ১৯৯০-এর দশকে, যখন দেশভিত্তিক প্রবৃদ্ধির তুলনামূলক বিশ্লেষণ জনপ্রিয় ছিল, তখন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আলবার্তো আলেসিনা ও তার সহ-গবেষকরা দেখান যে, ঘনঘন সরকার পরিবর্তন সাধারণত ধীরগতির প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত। একই সময় হার্ভার্ডের আরেক অধ্যাপক রবার্ট ব্যারো দেখান, বিপ্লব ও অভ্যুত্থান দুর্বল বিনিয়োগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। কারণ এসব ঘটনা প্রায়শই সম্পত্তির অধিকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

গড় হিসাবে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ব্যবসা ও বিনিয়োগের জন্য ক্ষতিকর বলেই বিবেচিত হয়েছে। তবে এই গড় হিসাবের আড়ালে রয়েছে বিস্ময়কর বৈচিত্র্য। ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে রাশিয়ার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উত্তরণ শেষ হয়েছিল গভীর পতনের মাধ্যমে। বিপরীতে, দক্ষিণ কোরিয়া (১৯৮৭-এর পর) এবং পোল্যান্ড (১৯৮৯-এর পর) চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা সত্ত্বেও শক্তিশালীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছিল। একই ধরনের রাজনৈতিক ধাক্কা ভিন্ন ভিন্ন দেশে সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থনৈতিক ফলাফল তৈরি করেছিল।
গণতন্ত্রই কি যথেষ্ট? এই বৈচিত্র্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অর্থনীতিবিদরা দেখেছেন, কেবল গণতন্ত্রই প্রবৃদ্ধির নিশ্চয়তা দেয় না। ইকুয়েডর বা রোমানিয়ার মতো দেশে গণতান্ত্রিক উত্তরণ শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আনতে পারেনি। আলেসিনা ও তার সহ-গবেষকদের গবেষণায় দেখা যায়, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে গণতন্ত্র স্বৈরতন্ত্রের তুলনায় সবসময় নির্ভরযোগ্যভাবে ভালো ফলাফল করবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।
মূল নির্ধারক বিষয়টি হলো, ক্ষমতার এই আমূল পরিবর্তন সাধারণ পরিবার ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশ্বাস করাতে পারছে কি না যে, অর্থনৈতিক নিয়মগুলো সত্যিই বদলেছে এবং সেই পরিবর্তন দীর্ঘস্থায়ী হবে। তুর্কি-আমেরিকান অর্থনীতিবিদ দানি রড্রিক ১৯৯১ সালের এক গবেষণাপত্রে দেখান, কাগজে-কলমে যথাযথ দেখালেও সংস্কারের স্থায়িত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়।
এর উল্টো উদাহরণ ১৯৯০ সালের পর চিলি। সেখানে গণতন্ত্র ফিরে এলেও মধ্য-বামপন্থী সরকার পূর্ববর্তী অর্থনৈতিক কাঠামো বজায় রাখে। রাজকোষের শৃঙ্খলা, উন্মুক্ত বাজার এবং সম্পত্তির অধিকার অক্ষুণ্ন রাখার মাধ্যমে সরকার বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করতে পেরেছিল যে ‘খেলার নিয়ম’ বদলাবে না। ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অটুট থাকে এবং প্রবৃদ্ধি শক্তিশালী হয়।
২০০০ সালের অক্টোবরের সার্বিয়া প্রত্যাশা পুনর্গঠনের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। নির্বাচনে পরাজয় মেনে নিতে অস্বীকার করার পর স্লোবোদান মিলোসেভিচের পতন ঘটে। নতুন সরকার দ্রুত বিশ্ব অর্থনীতিতে পুনঃসংযোগ স্থাপন করে। আইএমএফ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুদ্ধার, বাণিজ্য উন্মুক্তকরণ এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা হয়। আগের পাঁচ বছরে যেখানে গড় বার্ষিক মুদ্রাস্ফীতি ছিল প্রায় ৫০ শতাংশ, পরবর্তী পাঁচ বছরে তা অর্ধেকেরও বেশি কমে আসে। প্রবৃদ্ধি গড়ে বছরে ৬ শতাংশের বেশি হয় এবং বিদেশি পুঁজি ফিরে আসতে শুরু করে। অনেক কাঠামোগত সংস্কার পরে এলেও, প্রাথমিক সাফল্যের মূল কারণ ছিল মানুষের বিশ্বাস।
এর বিপরীতে, ২০১১ সালের তিউনিসিয়ায় জেসমিন বিপ্লবের মাধ্যমে জাইন আল-আবিদিন বেন আলির পতন ঘটে। দ্রুত নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণীত হলেও অর্থনীতি রয়ে যায় ‘পুরনো বৃত্তে’। সরকার ভর্তুকি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কার এবং শ্রমবাজার উদারীকরণের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত এড়িয়ে চলে। উচ্চ ব্যয় ও সরকারি বেতন বাড়িয়ে জনরোষ শান্ত করার চেষ্টা হয়। দুর্নীতি ফিরে আসে পুরোনো রূপেই। ২০১৮ সালের মধ্যে সরকারের ওপর আস্থা অর্ধেকে নেমে আসে। বিনিয়োগকারীদের কাছে এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, পুরোনো অর্থনীতির ওপর কেবল নতুন রাজনীতির প্রলেপ দেওয়া হয়েছে। যুব বেকারত্ব কমেনি-যা ছিল বিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি।

লিবিয়ায় সরকার পতনের পর সবচেয়ে বিধ্বংসী দিক দেখা যায়। ২০১১ সালে মুয়াম্মার গাদ্দাফির দ্রুত পতনের পর দেশটিতে গৃহযুদ্ধে শুরু হয়। প্রতিদ্বন্দ্বী সরকার ও মিলিশিয়ারা ভূখণ্ড ও তেল রাজস্বের নিয়ন্ত্রণে লিপ্ত হয়। কর আদায়, ঋণ গ্রহণ বা চুক্তি কার্যকরের মতো মৌলিক রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা ভেঙে পড়ে। তেল উৎপাদন কখনো বাড়ে, কখনো ধসে পড়ে। যখনই বন্দর বা তেলক্ষেত্র অবরুদ্ধ হয়, মুদ্রাস্ফীতি বাড়ে এবং বিনিয়োগ কমে। সেখানে অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারিত হয় বন্দুকধারীদের ইচ্ছায়।
এই সব উদাহরণ একটি মৌলিক শিক্ষার দিকে নির্দেশ করে-রাজনৈতিক আমূল পরিবর্তন তখনই অর্থনৈতিকভাবে অর্থবহ হয়, যখন তা একটি বিশ্বাসযোগ্য ভিত্তি তৈরি করে। অর্থাৎ কারা নিয়ম ঠিক করছে, কীভাবে তা প্রয়োগ হচ্ছে এবং সেই নিয়মগুলো দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না এই বিষয়ে স্বচ্ছতা থাকতে হয়।
আজকের ভেনেজুয়েলা ধার করা বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর টিকে আছে। যুক্তরাষ্ট্র তেলের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করছে এবং পুরোনো শাসনের নতুন মুখদের সঙ্গে কাজ করছে। এতে স্বল্পমেয়াদে বাণিজ্য চললেও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পুনরুজ্জীবিত হচ্ছে না। একইভাবে, ইরানে শাসন পতন ঘটলেও তা নিজে নিজে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের নিশ্চয়তা দেবে না।
এই বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি তিউনিসিয়ার সঙ্গেই বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ। ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টে ছাত্র-জনতার বিপ্লবে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের মাধ্যমে রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন এলেও, অর্থনৈতিক ভিত্তি এখনো বদলায়নি। হাসিনা আমলের ‘ক্লায়েন্টেলিজম’ বা সুবিধাভোগী ব্যবস্থা ভাঙা সম্ভব হয়নি। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও নবগঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি মূলত সেই শূন্যস্থান পূরণের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত।

ফলে বিনিয়োগকারীরা দেখছেন, রাজনীতির মুখ বদলালেও অর্থনৈতিক নিয়মগুলো এখনো রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নয়। পুলিশের সক্ষমতা হ্রাস, গত দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ খুনের হার এবং চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তাহীনতা বিনিয়োগকারীদের আস্থায় ফাটল ধরিয়েছে। পোশাক খাতে বিনিয়োগ কমেছে।
সার্বিয়ার উদাহরণ দেখায়, দ্রুত বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনা গেলে প্রবৃদ্ধি সম্ভব। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন এবং ‘জুলাই চার্টার’-এর গণভোট সেই সম্ভাব্য ইকোনমিক অ্যাঙ্কর। যদি এই প্রক্রিয়া গ্রহণযোগ্য না হয়, তবে এটি হবে ‘নতুন রাজনীতির প্রলেপ দেওয়া পুরনো অর্থনীতি’-যা তিউনিসিয়ার মতো দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা ডেকে আনতে পারে।
একই সঙ্গে ক্রমবর্ধমান মবজাস্টিস ও রাজনৈতিক সহিংসতা লিবিয়ার মতো চরম পরিণতির ক্ষুদ্র সংস্করণকেই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। কেন্দ্রীয়ভাবে আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত না হলে কোনো কার্যকর অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা সম্ভব নয়।
সবশেষে বলা যায়, স্বৈরাচারের পতনের পর অর্থনীতি মূলত বিশ্বাসযোগ্যতার লড়াই। এই বিশ্বাসযোগ্যতা বিদেশের মাটিতে জোর করে গড়া কঠিন, কিন্তু দেশের ভেতরে নীরবে হারিয়ে যাওয়া খুব সহজ।
তথ্যসূত্র: ইকোনমিষ্ট, রয়টার্স, সোলেসগ্লোবাল, বিবিসি

শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন বা রেজিম চেঞ্জকে প্রায়ই একটি অর্থনৈতিক মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা হিসেবে দেখা হয়। দীর্ঘদিনের দুঃশাসন, মূল্যনিয়ন্ত্রণ এবং রাষ্ট্রীয় অবক্ষয়ের পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই আশা জাগায়। তবে এতে কি খুব একটা পরিবর্তন ঘটে?
ভেনেজুয়েলায় বছরের পর বছর ধরে চলা বিশৃঙ্খলা ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পর আজ প্রতি ১০ জনের মধ্যে প্রায় সাতজন বিশ্বাস করেন যে, আগামী এক বছরে তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে কারণ নিকোলাস মাদুরোর অযোগ্য স্বৈরাচারী শাসনকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে। একই ধরনের আশা ইরানের বহু নাগরিকেরও। যারা ধর্মতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে জীবন বাজি রেখে প্রতিবাদ চালিয়ে যাচ্ছেন।
তবে ইতিহাস দেখায়, রাজনৈতিক পরিবর্তন হঠাৎ আসতে পারে, কিন্তু অর্থনৈতিক ফলাফল সাধারণত অনেক ধীরে এবং অসমভাবে সামনে আসে।
অর্থনীতিবিদরা বহু দশক ধরে বোঝার চেষ্টা করছেন-রাজনৈতিক অভ্যুত্থান বা আমূল পরিবর্তন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর কী প্রভাব ফেলে। ১৯৯০-এর দশকে, যখন দেশভিত্তিক প্রবৃদ্ধির তুলনামূলক বিশ্লেষণ জনপ্রিয় ছিল, তখন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আলবার্তো আলেসিনা ও তার সহ-গবেষকরা দেখান যে, ঘনঘন সরকার পরিবর্তন সাধারণত ধীরগতির প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত। একই সময় হার্ভার্ডের আরেক অধ্যাপক রবার্ট ব্যারো দেখান, বিপ্লব ও অভ্যুত্থান দুর্বল বিনিয়োগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। কারণ এসব ঘটনা প্রায়শই সম্পত্তির অধিকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

গড় হিসাবে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ব্যবসা ও বিনিয়োগের জন্য ক্ষতিকর বলেই বিবেচিত হয়েছে। তবে এই গড় হিসাবের আড়ালে রয়েছে বিস্ময়কর বৈচিত্র্য। ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে রাশিয়ার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উত্তরণ শেষ হয়েছিল গভীর পতনের মাধ্যমে। বিপরীতে, দক্ষিণ কোরিয়া (১৯৮৭-এর পর) এবং পোল্যান্ড (১৯৮৯-এর পর) চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা সত্ত্বেও শক্তিশালীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছিল। একই ধরনের রাজনৈতিক ধাক্কা ভিন্ন ভিন্ন দেশে সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থনৈতিক ফলাফল তৈরি করেছিল।
গণতন্ত্রই কি যথেষ্ট? এই বৈচিত্র্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অর্থনীতিবিদরা দেখেছেন, কেবল গণতন্ত্রই প্রবৃদ্ধির নিশ্চয়তা দেয় না। ইকুয়েডর বা রোমানিয়ার মতো দেশে গণতান্ত্রিক উত্তরণ শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আনতে পারেনি। আলেসিনা ও তার সহ-গবেষকদের গবেষণায় দেখা যায়, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে গণতন্ত্র স্বৈরতন্ত্রের তুলনায় সবসময় নির্ভরযোগ্যভাবে ভালো ফলাফল করবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।
মূল নির্ধারক বিষয়টি হলো, ক্ষমতার এই আমূল পরিবর্তন সাধারণ পরিবার ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশ্বাস করাতে পারছে কি না যে, অর্থনৈতিক নিয়মগুলো সত্যিই বদলেছে এবং সেই পরিবর্তন দীর্ঘস্থায়ী হবে। তুর্কি-আমেরিকান অর্থনীতিবিদ দানি রড্রিক ১৯৯১ সালের এক গবেষণাপত্রে দেখান, কাগজে-কলমে যথাযথ দেখালেও সংস্কারের স্থায়িত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়।
এর উল্টো উদাহরণ ১৯৯০ সালের পর চিলি। সেখানে গণতন্ত্র ফিরে এলেও মধ্য-বামপন্থী সরকার পূর্ববর্তী অর্থনৈতিক কাঠামো বজায় রাখে। রাজকোষের শৃঙ্খলা, উন্মুক্ত বাজার এবং সম্পত্তির অধিকার অক্ষুণ্ন রাখার মাধ্যমে সরকার বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করতে পেরেছিল যে ‘খেলার নিয়ম’ বদলাবে না। ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অটুট থাকে এবং প্রবৃদ্ধি শক্তিশালী হয়।
২০০০ সালের অক্টোবরের সার্বিয়া প্রত্যাশা পুনর্গঠনের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। নির্বাচনে পরাজয় মেনে নিতে অস্বীকার করার পর স্লোবোদান মিলোসেভিচের পতন ঘটে। নতুন সরকার দ্রুত বিশ্ব অর্থনীতিতে পুনঃসংযোগ স্থাপন করে। আইএমএফ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুদ্ধার, বাণিজ্য উন্মুক্তকরণ এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা হয়। আগের পাঁচ বছরে যেখানে গড় বার্ষিক মুদ্রাস্ফীতি ছিল প্রায় ৫০ শতাংশ, পরবর্তী পাঁচ বছরে তা অর্ধেকেরও বেশি কমে আসে। প্রবৃদ্ধি গড়ে বছরে ৬ শতাংশের বেশি হয় এবং বিদেশি পুঁজি ফিরে আসতে শুরু করে। অনেক কাঠামোগত সংস্কার পরে এলেও, প্রাথমিক সাফল্যের মূল কারণ ছিল মানুষের বিশ্বাস।
এর বিপরীতে, ২০১১ সালের তিউনিসিয়ায় জেসমিন বিপ্লবের মাধ্যমে জাইন আল-আবিদিন বেন আলির পতন ঘটে। দ্রুত নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণীত হলেও অর্থনীতি রয়ে যায় ‘পুরনো বৃত্তে’। সরকার ভর্তুকি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কার এবং শ্রমবাজার উদারীকরণের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত এড়িয়ে চলে। উচ্চ ব্যয় ও সরকারি বেতন বাড়িয়ে জনরোষ শান্ত করার চেষ্টা হয়। দুর্নীতি ফিরে আসে পুরোনো রূপেই। ২০১৮ সালের মধ্যে সরকারের ওপর আস্থা অর্ধেকে নেমে আসে। বিনিয়োগকারীদের কাছে এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, পুরোনো অর্থনীতির ওপর কেবল নতুন রাজনীতির প্রলেপ দেওয়া হয়েছে। যুব বেকারত্ব কমেনি-যা ছিল বিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি।

লিবিয়ায় সরকার পতনের পর সবচেয়ে বিধ্বংসী দিক দেখা যায়। ২০১১ সালে মুয়াম্মার গাদ্দাফির দ্রুত পতনের পর দেশটিতে গৃহযুদ্ধে শুরু হয়। প্রতিদ্বন্দ্বী সরকার ও মিলিশিয়ারা ভূখণ্ড ও তেল রাজস্বের নিয়ন্ত্রণে লিপ্ত হয়। কর আদায়, ঋণ গ্রহণ বা চুক্তি কার্যকরের মতো মৌলিক রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা ভেঙে পড়ে। তেল উৎপাদন কখনো বাড়ে, কখনো ধসে পড়ে। যখনই বন্দর বা তেলক্ষেত্র অবরুদ্ধ হয়, মুদ্রাস্ফীতি বাড়ে এবং বিনিয়োগ কমে। সেখানে অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারিত হয় বন্দুকধারীদের ইচ্ছায়।
এই সব উদাহরণ একটি মৌলিক শিক্ষার দিকে নির্দেশ করে-রাজনৈতিক আমূল পরিবর্তন তখনই অর্থনৈতিকভাবে অর্থবহ হয়, যখন তা একটি বিশ্বাসযোগ্য ভিত্তি তৈরি করে। অর্থাৎ কারা নিয়ম ঠিক করছে, কীভাবে তা প্রয়োগ হচ্ছে এবং সেই নিয়মগুলো দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না এই বিষয়ে স্বচ্ছতা থাকতে হয়।
আজকের ভেনেজুয়েলা ধার করা বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর টিকে আছে। যুক্তরাষ্ট্র তেলের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করছে এবং পুরোনো শাসনের নতুন মুখদের সঙ্গে কাজ করছে। এতে স্বল্পমেয়াদে বাণিজ্য চললেও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পুনরুজ্জীবিত হচ্ছে না। একইভাবে, ইরানে শাসন পতন ঘটলেও তা নিজে নিজে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের নিশ্চয়তা দেবে না।
এই বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি তিউনিসিয়ার সঙ্গেই বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ। ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টে ছাত্র-জনতার বিপ্লবে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের মাধ্যমে রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন এলেও, অর্থনৈতিক ভিত্তি এখনো বদলায়নি। হাসিনা আমলের ‘ক্লায়েন্টেলিজম’ বা সুবিধাভোগী ব্যবস্থা ভাঙা সম্ভব হয়নি। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও নবগঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি মূলত সেই শূন্যস্থান পূরণের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত।

ফলে বিনিয়োগকারীরা দেখছেন, রাজনীতির মুখ বদলালেও অর্থনৈতিক নিয়মগুলো এখনো রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নয়। পুলিশের সক্ষমতা হ্রাস, গত দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ খুনের হার এবং চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তাহীনতা বিনিয়োগকারীদের আস্থায় ফাটল ধরিয়েছে। পোশাক খাতে বিনিয়োগ কমেছে।
সার্বিয়ার উদাহরণ দেখায়, দ্রুত বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনা গেলে প্রবৃদ্ধি সম্ভব। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন এবং ‘জুলাই চার্টার’-এর গণভোট সেই সম্ভাব্য ইকোনমিক অ্যাঙ্কর। যদি এই প্রক্রিয়া গ্রহণযোগ্য না হয়, তবে এটি হবে ‘নতুন রাজনীতির প্রলেপ দেওয়া পুরনো অর্থনীতি’-যা তিউনিসিয়ার মতো দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা ডেকে আনতে পারে।
একই সঙ্গে ক্রমবর্ধমান মবজাস্টিস ও রাজনৈতিক সহিংসতা লিবিয়ার মতো চরম পরিণতির ক্ষুদ্র সংস্করণকেই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। কেন্দ্রীয়ভাবে আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত না হলে কোনো কার্যকর অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা সম্ভব নয়।
সবশেষে বলা যায়, স্বৈরাচারের পতনের পর অর্থনীতি মূলত বিশ্বাসযোগ্যতার লড়াই। এই বিশ্বাসযোগ্যতা বিদেশের মাটিতে জোর করে গড়া কঠিন, কিন্তু দেশের ভেতরে নীরবে হারিয়ে যাওয়া খুব সহজ।
তথ্যসূত্র: ইকোনমিষ্ট, রয়টার্স, সোলেসগ্লোবাল, বিবিসি

শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন বা রেজিম চেঞ্জকে প্রায়ই একটি অর্থনৈতিক মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা হিসেবে দেখা হয়। দীর্ঘদিনের দুঃশাসন, মূল্যনিয়ন্ত্রণ এবং রাষ্ট্রীয় অবক্ষয়ের পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই আশা জাগায়। তবে এতে কি খুব একটা পরিবর্তন ঘটে?