ঘরে ঘরে এখন যে সাধারণ ফ্যান চালানো হয়, তার বদলে বিদ্যুৎসাশ্রয়ী বিএলডিসি (ব্রাশলেস ডাইরেক্ট কারেন্ট) ফ্যান ব্যবহার করলেই বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৮ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকার বিদ্যুৎ সাশ্রয় সম্ভব! এতে গ্রীষ্মকালে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদাও ২ হাজার ৫৯০ মেগাওয়াট পর্যন্ত কমানো যেতে পারে। এর ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর চাপ কমার পাশাপাশি লোডশেডিং পরিস্থিতি সামাল দেওয়াও সহজ হতে পারে।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ‘হাউসহোল্ড স্পেস কুলিং ইন বাংলাদেশ: রোল অব এনার্জি-এফিশিয়েন্ট ফ্যানস’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে ২০২৬ সালের ২ নভেম্বর। গবেষণায় দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ২৬টি জেলায় ৪৩৫টি পরিবারের ওপর জরিপ চালানো হয়।
বাংলাদেশে ঘর ঠান্ডা রাখতে যে বৈদ্যুতিক যন্ত্রগুলো সবচেয়ে বেশি চালানো হয়, তার একটি হলো ফ্যান। কিন্তু সাধারণ যে ফ্যানগুলো মানুষের ঘরে ঘরে দেখা যায়, এসব ফ্যান কতটা বিদ্যুৎ ব্যবহার করে?
আইইইএফএ-র গবেষণায় বেশি বিদ্যুৎ খরচ করা সাধারণ এসব ফ্যানকে বলা হচ্ছে ‘অদক্ষ’ ফ্যান। আর তাদের গবেষণা অনুযায়ী, একটি অদক্ষ ফ্যান ঘণ্টায় ৭০ ওয়াট বা তার বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। অন্যদিকে বিএলডিসি ফ্যানের বিদ্যুৎ খরচ প্রায় ৩৫ ওয়াট। অর্থাৎ একই ধরনের কাজের জন্য বিএলডিসি ফ্যান প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ ব্যবহার করে।
বিদ্যুতের চাহিদায় ফ্যানের ভূমিকা কতটা?
বাংলাদেশে গরমের সময় বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ার অন্যতম কারণ ফ্যানের ব্যবহার। ২০১৪ সালের মে মাসে শুধু বাসাবাড়িতে চালানো ফ্যানের বিদ্যুৎ চাহিদা ছিল প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট। তখন দেশের মোট বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি।
২০১৩-১৪ অর্থবছরে দেশের বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত ফ্যানগুলো মোট ৬ হাজার ১৮১ গিগাওয়াট-আওয়ার বিদ্যুৎ ব্যবহার করেছিল। একই সময়ে সব ধরনের গৃহস্থালি যন্ত্রের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহার ছিল ১৭ হাজার ৫৭০ গিগাওয়াট-আওয়ার। অর্থাৎ, বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির পেছনে যত বিদ্যুৎ খরচ হয়, তার প্রায় তিন ভাগের এক ভাগই যায় ফ্যানের পেছনে।
কিন্তু সেটা তো এক যুগ আগের হিসাব। এখনকার হিসাব কী বলে?
আইইইএফএ-র হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে ঘর ঠান্ডা রাখতে ব্যবহৃত ফ্যানের জন্য বিদ্যুতের চাহিদা ৩ হাজার ৩৬২ থেকে ৫ হাজার ২১২ মেগাওয়াটের মধ্যে। সন্ধ্যার দিকে এই চাহিদা সবচেয়ে বেশি হয়।
আর বর্তমানে বছরে দেশে ফ্যানের পেছনে বিদ্যুতের ব্যবহার আনুমানিক ১৩ হাজার ৯১৬ গিগাওয়াট-আওয়ার। খসড়া ন্যাশনাল কুলিং প্ল্যান অনুযায়ী, ২০৩৫ সাল নাগাদ এই অঙ্কটা বেড়ে ২২ হাজার ১৭৪ গিগাওয়াট-আওয়ারে পৌঁছাতে পারে।
বিএলডিসি ফ্যান: মুশকিলে আসান?
গবেষণায় বলা হয়েছে, বর্তমানে ব্যবহৃত অদক্ষ ফ্যানগুলোর জায়গায় শুধু বিএলডিসি ফ্যান লাগালেই গ্রীষ্মকালে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ২ হাজার ৫৯০ মেগাওয়াট পর্যন্ত কমানো সম্ভব। পাশাপাশি বছরে প্রায় ৬ হাজার ৯১৩ গিগাওয়াট-আওয়ার বিদ্যুৎ সাশ্রয় হতে পারে।
এই বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের কারণে কত টাকা বাঁচবে? আইইইএফএ-র গবেষণা বলছে, এর ফলে বছরে প্রায় ৮৯.৮৭ বিলিয়ন–অর্থাৎ, প্রায় ৮ হাজার ৯৮৭ কোটি–টাকা বাঁচবে। মার্কিন ডলারে অঙ্কটা প্রায় ৭৩০ মিলিয়ন!
এ তো গেল শুধু বিদ্যুৎ বাঁচানো টাকার হিসাব। গবেষণাটি বলছে, ফ্যানের বিদ্যুৎ চাহিদা কমলে ভবিষ্যতে নতুন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৪ বিলিয়ন বা ৪০০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগের প্রয়োজনও এড়ানো যেতে পারে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এই অর্থের পরিমাণ প্রায় ৪৯ হাজার ১৬০ কোটি টাকা।
তাহলে বিএলডিসি ফ্যান ব্যবহার করে না কেন?
বিএলডিসি ফ্যানের সুবিধা থাকলেও দেশে এর ব্যবহার এখনো খুব কম। আইইইএফএ-র জরিপে দেখা গেছে, মোট গৃহস্থালি ফ্যানের মাত্র ১.৪ শতাংশ বিএলডিসি প্রযুক্তির।
জরিপে অংশ নেওয়া ৭৫ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, তারা বিএলডিসি ফ্যানের বিষয়ে আগে জানত না। তবে এর বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের সুবিধা জানার পর ৯৬ শতাংশ পরিবার এই ফ্যান ব্যবহারে আগ্রহ দেখিয়েছে।
তবে এই ফ্যানের দাম এটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটা বড় বাধা হয়ে দাড়াতে পারে। সাধারণ একটি ফ্যানের দাম প্রায় ২ হাজার টাকা। অন্যদিকে বিএলডিসি ফ্যানের দাম ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার ৩০০ টাকার মধ্যে। অর্থাৎ বিদ্যুৎ বিল কমালেও এই বিএলডিসি ফ্যান কিনতেই শুরুতে প্রায় তিনগুণ বেশি টাকা লাগবে।
যুক্তি আসতে পারে, শুরুতে বাড়তি খরচ হলেও পরে তো দীর্ঘমেয়াদে এই ফ্যান বিদ্যুতের খরচ কমাবে! সে হিসাবও করা হয়েছে গবেষণায়। বিদ্যুৎ বিল কমার কারণে ফ্যান কেনার সময়ের এই বাড়তি খরচ পুষিয়ে নিতে কত সময় লাগবে? গবেষণাটি বলছে, মাসে ২৫ হাজার টাকার কম আয় করা পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে ৭ দশমিক ৭ থেকে ৯ দশমিক ৬ বছর লাগতে পারে। অন্য আয়শ্রেণির পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে সময় লাগবে ৬ বছরের কম।
কীভাবে বাড়ানো যেতে পারে ব্যবহার?
গবেষণায় বিএলডিসি ফ্যানের ব্যবহার বাড়াতে কয়েকটি উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বড় পরিসরে ফ্যান কেনার ব্যবস্থা, কিস্তিতে দাম পরিশোধের সুযোগ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পণ্যের মান নিশ্চিত করা।
এ ক্ষেত্রে ভারতের এলইডি বাল্ব কর্মসূচির উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। বড় পরিসরে বাল্ব কেনার মাধ্যমে দেশটিতে এলইডি বাল্বের প্রাথমিক দাম ৮৭ শতাংশ কমানো সম্ভব হয়েছিল। বাংলাদেশেও একই ধরনের উদ্যোগ নিলে বিএলডিসি ফ্যানের দাম কমতে পারে।
এ ছাড়া অন-বিল ইনস্টলমেন্ট ফাইন্যান্সিংয়ের মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে কিস্তিতে ফ্যানের দাম পরিশোধের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। ভবিষ্যতে কার্বন ক্রেডিট বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থও এই কর্মসূচিতে ব্যবহার করা সম্ভব। গবেষণায় বলা হয়েছে, অদক্ষ ফ্যান প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে প্রায় ৮ কোটি ৬০ লাখ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
দেশের প্রায় ৪ কোটি ১০ লাখ পরিবারের কাছে এই উদ্যোগ পৌঁছে দিতে একটি সুপার ইএসসি (এনার্জি সার্ভিস কোম্পানি) গঠনের প্রস্তাবও দিয়েছে আইইইএফএ। পাশাপাশি টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) মাধ্যমে পণ্যের মান, এনার্জি এফিশিয়েন্সি লেবেল, বাজার তদারকি এবং প্রচার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে, ফ্যানের মতো নিত্যব্যবহৃত একটি যন্ত্রে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের প্রযুক্তি যুক্ত করতে পারলে দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা কমানোর বড় সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে গবেষণায় উল্লেখ করা সাশ্রয় ও চাহিদা কমার পরিমাণ সম্ভাব্য হিসাব। বাস্তবে তা কতটা অর্জন করা যাবে, সেটা নির্ভর করবে কম দামে বিএলডিসি ফ্যানের সরবরাহ, মান নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষের কাছে এর সুবিধা কতটা পৌঁছে দেওয়া যাচ্ছে, তার ওপর।