দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় একক অবকাঠামো প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। নির্মাণ শুরুর ১০ বছর পর ২০২৬ সালের অক্টোবরেও জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়নি রূপপুরের বিদ্যুৎ। প্রকল্পের ব্যয় টাকার হিসাবে বেড়েছে। সময়ও বেড়েছে। সাথে আছে রাশিয়ার ঋণ, সুদ পরিশোধের সময়সূচি এবং নিষেধাজ্ঞাজনিত অর্থ স্থানান্তরের জটিলতা। জটিল আর্থিক হিসাব-নিকাশের পর শেষ পর্যন্ত কত দামে বিদ্যুৎ দেবে দেশের প্রথম এই পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র?
রূপপুর প্রকল্পের নির্মাণব্যয় ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার। ২০১৫ সালে নির্মাণ চুক্তি হয়, আর প্রথম ইউনিটের নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৭ সালে। মূল পরিকল্পনায় প্রথম ইউনিট ২০২৩ সালের অক্টোবর এবং দ্বিতীয় ইউনিট ২০২৪ সালের অক্টোবরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। এখন সেই সময়সীমা পেরিয়ে গেছে। এর মধ্যে টাকার হিসাবে প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে। রাশিয়ার ঋণ পরিশোধের সময়ও পিছিয়েছে।
মোট নির্মাণব্যয়ের ৯০ শতাংশ, অর্থাৎ ১১ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার, রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় ঋণ। বাকি ১০ শতাংশ বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়ন।
রাশিয়ার ঋণের ওপর চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত সুদ প্রযোজ্য। ঋণের সুদ পরিশোধ ঋণছাড়ের পর থেকেই করা হচ্ছে। এমনটাই প্রচলিত নিয়ম। সংশোধিত চুক্তি অনুযায়ী মূল ঋণ পরিশোধ শুরু হবে ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে। ১৫ মার্চ ও ১৫ সেপ্টেম্বর তারিখে বছরে দুটি কিস্তি করে, মোট ৩৮টি কিস্তিতে মূল ঋণ পরিশোধ করতে হবে।
ডলারের ঋণ, টাকার বোঝা
ঋণের বড় অংশ ডলারে হওয়ায় রূপপুর একটি আর্থিক চাপ তৈরি করছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের ব্যয়ের হিসাব বাংলাদেশি টাকায়ও করতে হয়। ফলে টাকার অবমূল্যায়ন হলে একই পরিমাণ ডলারের খরচ মেটাতে টাকার ওপরও চাপ বাড়ে।
২০১৫-১৬ সালের প্রাথমিক হিসাবে প্রকল্পের ব্যয় ছিল প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা। সংশোধিত হিসাবে তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা।
অর্থাৎ, টাকার হিসাবে বেড়েছে প্রায় ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, মূল নির্মাণব্যয় ডলারের হিসাবে যতটা না বেড়েছে, বিনিময় হার পরিবর্তনের কারণে তারচেয়ে বেশি হয়েছে। অর্থাৎ, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন নির্মাণব্যয় বৃদ্ধির পেছনের মূল কারণ।
এখানে একটা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ–টাকার হিসাবে প্রকল্পের ব্যয় বাড়া, আর ডলারে নির্মাণব্যয় বেড়ে যাওয়া কিন্তু এক কথা নয়।
নিষেধাজ্ঞার প্রভাব: টাকা ছিল, পথ ছিল না
রাশিয়ার ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা তৈরি করে নতুন জটিলতা।
রাশিয়ার কয়েকটি ব্যাংকের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং সুইফট (SWIFT) ব্যবস্থায় বিধিনিষেধের কারণে রূপপুর ঋণের সুদ ও অন্যান্য পাওনা রাশিয়ায় পাঠানো কঠিন হয়ে পড়ে। SWIFT হলো আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে নিরাপদ আর্থিক বার্তা আদান-প্রদানের বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক। রাশিয়ার কয়েকটি ব্যাংককে SWIFT থেকে বিচ্ছিন্ন করতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞা বড় ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশ সেই অর্থ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি এসক্রো অ্যাকাউন্ট বা আলাদা হিসাবে জমা রাখে। ২০২৫ সালের জুনে ওই হিসাবে প্রায় ১ দশমিক শূন্য ৩ বিলিয়ন ডলার ছিল বলে সরকারি সূত্রের বরাতে সংবাদ প্রকাশিত হয়।
অর্থাৎ, বাংলাদেশ টাকা আলাদা করে রাখলেও নিষেধাজ্ঞার কারণে নির্ধারিত পথে রাশিয়াকে তা পরিশোধ করা যাচ্ছিল না।
সমাধান ও ঋণ ছাড়
এই জটিলতার সমাধানে রাশিয়ার সরকারের নামে সোনালী ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার হিসাব খোলার ব্যবস্থা করা হয়। এই সমস্যা সমাধানে পরে দুই দেশের মধ্যে ঋণ চুক্তির শর্তও সংশোধন করা হয়।
রাশিয়া রূপপুরের ১১ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলারের ঋণের ব্যবহারকাল ২০২৭ সাল পর্যন্ত বাড়িয়েছে। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত রাশিয়া থেকে প্রায় ৭ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ছাড় হয়েছিল। বাকি অর্থও সংশোধিত সময়সূচি অনুযায়ী ছাড় হওয়ার কথা।
অর্থাৎ, প্রকল্প শেষ করার সময় বাড়ার সঙ্গে ঋণের অর্থছাড়ের সময়ও বাড়ানো হয়েছে।
সময়ের মাশুলও গুনতে হবে
মূল চুক্তিতে প্রথম ইউনিটের সময়সীমা ছিল ২০২৩ সালের অক্টোবর, দ্বিতীয় ইউনিটের ২০২৪ সালের অক্টোবর। সংশোধিত সময়সূচিতে তা হয়েছে যথাক্রমে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর এবং ২০২৭ সালের ডিসেম্বর। প্রকল্পের সামগ্রিক সময়সীমা আরও বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং শুরু হয় ২৮ এপ্রিল, ২০২৬। শুরুতে জুলাই-আগস্টের মধ্যে গ্রিডে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু কমিশনিংয়ের সময় গুরুত্বপূর্ণ একটি সেফটি ভালভ-এ ত্রুটি ধরা পড়ে এবং গ্রিড সংযোগ পিছিয়ে যায়।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর ১৬ মেগাপাসকেল চাপের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা সফল হয়েছে। প্রথম ইউনিট গ্রিডে বিদ্যুৎ দেওয়ার আগে আরও তিনটি বড় পরীক্ষা বাকি আছে বলে প্রকল্প কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
সব পরীক্ষা সফল হলে চলতি বছরের শেষ নাগাদ বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর সম্ভাবনার কথা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এটি একটি ভালো খবর বটে।
পারমাণবিক জ্বালানি ও সরবরাহ-শৃঙ্খল
টাকার হিসাব ছাপিয়ে রূপপুরের জ্বালানির সরবরাহ-শৃঙ্খল নিশ্চিত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত হিসাব সম্প্রতি সামনে এসেছে।
পারমাণবিক জ্বালানি রাশিয়া থেকে বিমানে আনতে হয়। দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানির প্রথম চালান গত ২৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে আসার কথা থাকলেও তা পিছিয়ে যায়।
বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী বলেছেন, রাশিয়া থেকে আসা বিমানটি পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি পায়নি। অর্থাৎ, রূপপুরের ইউরেনিয়াম ও যন্ত্রপাতি সরবরাহ-ব্যবস্থায় পরিবহন ও অনুমোদনের ওপরও নির্ভরশীল। এ বিষয়ে পাকিস্তানের হাইকমিশন বিষয়টিকে প্রযুক্তিগত ও প্রক্রিয়াগত বিষয় হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। সে ব্যাখ্যা কূটনৈতিক চ্যানেলে গ্রহণযোগ্য হোক বা না হোক রূপপুরের সফল বাস্তবায়নে কূটনীতির জটিল হিসাবগুলোর মীমাংসিত একটি পথ থাকতে হবে।
রোসাটম জানিয়েছে, দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি সরবরাহ অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত একাধিক ফ্লাইটে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এখনও চূড়ান্ত ট্যারিফ নির্ধারিত হয়নি রূপপুরের বিদ্যুতের। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বাউবো) রূপপুরের মোট প্রকল্প ব্যয়, পরিচলন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়সহ প্রয়োজনীয় তথ্য চেয়েছে। মে মাসে বিউবো একটি প্রাথমিক হিসাবে প্রতি ইউনিটের দাম ৬ টাকা ৭২ পয়সা ধরেছিল। তবে এটি চূড়ান্ত ট্যারিফ নয়।
এপ্রিল মাসে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা প্রতি ইউনিট ৪ থেকে ৮ টাকা পর্যন্ত সম্ভাব্য ব্যয়ের কথা বলেছিলেন। অন্যদিকে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের হিসাব আরও বেশি, ১২ টাকা। তাই এখনই রূপপুরের বিদ্যুতের চূড়ান্ত দাম ৬ টাকা, ৮ টাকা বা ১২ টাকা—কোনোটিই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
এখন প্রশ্ন নিউক্লিয়ার ক্লাবে সদ্য প্রবেশ করা বাংলাদেশ তার প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে কত দরে বিদ্যুৎ পাবে?
১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প। এর ৯০ শতাংশ রাশিয়ার ঋণ। টাকার অবমূল্যায়নে প্রকল্প ব্যয়ে বাড়াতি টাকার বোঝা। নিষেধাজ্ঞায় অর্থ পরিশোধে জটিলতা। সময় বাড়ায় ঋণের অর্থছাড় ও পরিশোধের সময়সূচি বদলে যাওয়ারও আছে নেতিবাচক প্রভাব। এখন বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর পর প্রকল্পের আসল অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশের পর বোঝা যাবে দর কোথায় দাঁড়ায়। ট্যারিফ, পরিচলন ব্যয়, জ্বালানি এবং ঋণ পরিশোধের খরচ মিলিয়েই হবে সেই হিসাব।
রূপপুর ঘিরে এখন দুটি প্রশ্ন–এখান থেকে বিদ্যুৎ আসবে কবে? আর সেই বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি চূড়ান্ত দাম কত হবে–প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের বলা ৪ টাকা, বিপিডিবির প্রাক্কলিত ৬ টাকা, নাকি বিশেষজ্ঞদের শঙ্কার ১২ টাকা?
এই দুই প্রশ্নের উত্তর পেতে আমাদের অন্তত ২৭ সালের প্রথম প্রান্তিক পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।