এল সালভাদরের তরুণ প্রেসিডেন্ট নাইব বুকেলে। তিনি নিজের ভাবমূর্তি নিয়ে বেশ সচেতন। তিনি চান না, তাকে আর ১০ জন একনায়কের মতো মনে হোক। তাই তিনি শুধু ৬০ লাখ মানুষের দেশটির ‘ত্রাতা’ হিসেবে নিজেকে তুলে ধরছেন না, প্রযুক্তিনির্ভর একটি পরীক্ষাগারও গড়ে তুলছেন। তার দাবি, সেখান থেকে অন্য দেশও শিক্ষা নিতে পারবে।
ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, আগামী ফেব্রুয়ারিতে দেশটিতে নির্বাচন হওয়ার কথা। তবে ভোট নিয়ে বুকেলের খুব বেশি চিন্তার কারণ নেই। সাত বছর আগে সালভাদরবাসী তাকে প্রথমবার ক্ষমতায় বসানোর পর তিনি সংবিধান আদালতে নিজের ঘনিষ্ঠদের বসিয়েছেন, প্রেসিডেন্টের মেয়াদের সীমা তুলে দিয়েছেন, পৌরসভার সংখ্যা ২৬২ থেকে কমিয়ে ৪৪ করেছেন, আইনসভার আসন ৮৪ থেকে কমিয়ে ৬০ করেছেন এবং নির্বাচনী এলাকাগুলোর সীমানাও নতুন করে নির্ধারণ করেছেন। এসব পরিবর্তনই তার রাজনৈতিক স্বার্থে কাজে এসেছে।
এর পাশাপাশি তিনি এখনো সত্যিকার অর্থেই জনপ্রিয়। তবে নতুন কিছু সাফল্য দেখিয়ে ভোটারদের সামনে যেতে চান বুকেলে। এল সালভাদরের এক বিশ্লেষক পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রেসিডেন্ট নিজেকে ‘সমাজ বদলে দেওয়ার একজন গুরুর’ মতো নিজেকে তুলে ধরতে চান।
এই পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য হলো শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা। আর এতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গত বছর বুকেলে ১৭১টি স্কুলে পরীক্ষামূলকভাবে ইলন মাস্কের এআই প্রতিষ্ঠান এক্সএআইয়ের তৈরি চ্যাটবট গ্রোক ব্যবহার শুরু করেন। শিশুদের পড়াশোনায় সহায়তা করাই এর লক্ষ্য।
গ্রোক গণিত, বিজ্ঞান ও পড়াশোনার বিষয়ে শিক্ষার্থীদের একজন ব্যক্তিগত শিক্ষকের মতো সহায়তা করে। শিক্ষার্থী যে গতিতে শিখতে পারে, সেই অনুযায়ী এটি কাজ করে। তবে একজন শিক্ষক পুরো প্রক্রিয়াটি তদারক করেন। বিশ্বের আরও কয়েকটি জায়গায় এ ধরনের পরীক্ষা চলছে। যেমন কলম্বিয়ার গ্রামীণ এলাকাগুলোতে মেটার চ্যাটবট পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। তবে কর্মকর্তারা বলছেন, পুরো দেশে এ ধরনের ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ এল সালভাদরেই প্রথম। বুকেলে এখন এই প্রকল্প আরও বড় করছেন।
স্বাস্থ্যসেবাতেও একই ধরনের পরিবর্তন আনা হচ্ছে। গত নভেম্বরে গুগলের সঙ্গে কাজ করে বুকেলে ডক্টরএসভি নামে একটি অ্যাপ চালু করেন। এই অ্যাপের মাধ্যমে একটি বোতামে চাপ দিয়েই চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়। প্রথম ধাপে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তা নিয়ে চিকিৎসকেরা রোগ শনাক্ত করে, ওষুধ দেয় এবং বিনা খরচে বিভিন্ন পরীক্ষা করানোর নির্দেশ দেয় ও পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ করে।
সরকারের দাবি, এখন পর্যন্ত ১৫ লাখ সালভাদরবাসী এই অ্যাপে নিবন্ধন করেছেন এবং ২০ লাখ ইলেকট্রনিক প্রেসক্রিপশন দেওয়া হয়েছে। বুকেলে দাবি করছেন, এটি এক সময় ‘বিশ্বের সেরা চিকিৎসাব্যবস্থায়’ পরিণত হবে।
বুকেলের এখন আরেকটি সাফল্যের গল্প দরকার। দেশকে আরও নিরাপদ করার যে প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছিলেন, তা তিনি শুধু পূরণই করেননি, প্রত্যাশার চেয়েও বেশি করেছেন। তবে এর মূল্য ছিল গণতন্ত্র। তিনি মানবাধিকার স্থগিত করেছিলেন এবং দেশের প্রায় ২ শতাংশ মানুষকে কারাগারে পাঠিয়েছেন। অনেককে শুধু সন্ত্রাস গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহেই আটক করা হয়েছিল। তিনি ২০১৯ সালে ক্ষমতায় আসার আগেই হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা কমছিল। তবে ওই বছর প্রতি ১ লাখ মানুষের মধ্যে হত্যার হার ছিল ৩৮, যা ২০২৫ সালে নেমে আসে ১ দশমিক ৩-এ।
এর ফলে বুকেলের জনপ্রিয়তার হার প্রায় ৯০ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিকভাবেও প্রশংসা পেয়েছেন। এই পরিবর্তনে মানুষের জীবন বদলেছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। ৩৮ বছর বয়সী জোহানা ফিগুয়েরোয়া দ্য ইকোনমিস্টকে বলেন, এখন তার সন্তানরা বাসে কোথায় উঠবে বা কোথায় নামবে, তা নিয়ে চিন্তা করতে হয় না। তিনি বলেন, এই বিষয়টি না জানাই তার সন্তানদের জন্য ‘সৌভাগ্যের’।
তবে বুকেলের অন্য নীতিগুলো এতটা সফল হয়নি। তার সর্বশেষ বড় প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ ছিল ২০২১ সালে এল সালভাদরকে বিটকয়েনকে আইনগত মুদ্রা হিসেবে গ্রহণ করা বিশ্বের প্রথম দেশ বানানো। শেষ পর্যন্ত সেই উদ্যোগ তেমন কাজে আসেনি। সাধারণ মানুষ বিটকয়েনের তেমন কোনো ব্যবহার খুঁজে পায়নি। বুকেলে এটিকে নিজের ব্যক্তিগত প্রকল্পের মতো করে দেখেছেন। একবার তিনি মজা করে বলেছিলেন, বাথরুমে বসেই তিনি বিটকয়েন কিনেছিলেন।
তবে তিনি ক্ষমতা ছাড়লে দেশের হাতে থাকা বিটকয়েনের কী হবে, তা কেউ জানে না।
এদিকে কাগজে-কলমে অর্থনীতির অবস্থা যতটা ভালো দেখাচ্ছে, বাস্তবে মানুষের জীবনে তার প্রভাব ততটা দেখা যাচ্ছে না। বেশিরভাগ বিশ্লেষকের ধারণা, এ বছর দেশটির জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় ৫ শতাংশ হবে। তবে এই প্রবৃদ্ধির সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না।
সরকারি চুক্তির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা এতে বেশি লাভবান হচ্ছেন। তবে সাধারণ নাগরিকদের জন্য পরিস্থিতি ততটা ভালো নয়। দেশে বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগও তেমন বাড়েনি। বিষয়টি সাধারণ মানুষও বুঝতে পারছে।
সান সালভাদরের সেন্ট্রাল আমেরিকান ইউনিভার্সিটি (ইউসিএ) মে মাসে একটি জরিপ চালায়। এতে ৭০ শতাংশের বেশি মানুষ অর্থনৈতিক সমস্যাকে তাদের প্রধান উদ্বেগ হিসেবে উল্লেখ করেন। মাত্র ২ শতাংশ মানুষ অপরাধকে প্রধান উদ্বেগ হিসেবে উল্লেখ করেন।
এর ফলে বুকেলের ওপর মানুষের প্রত্যাশাও বেড়ে গেছে। ওই বিশ্লেষক বলেন, নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বুকেলের প্রতি মানুষের এতটাই আস্থা তৈরি হয়েছে যে, তারা এখন মনে করে অন্য যেকোনো সমস্যারও সমাধান করতে পারবেন তিনি।
নতুন উদ্যোগগুলো কতটা সফল হবে, তা বলার সময় এখনো আসেনি। তবে শিক্ষা খাতে পরীক্ষামূলক উদ্যোগটি শুরুতেই প্রশংসা পেয়েছে।
পিআইএসএ হলো ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের পড়া, গণিত ও বিজ্ঞানের দক্ষতা যাচাইয়ের একটি আন্তর্জাতিক পরীক্ষা। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে এই পরীক্ষায় এল সালভাদরের পরীক্ষামূলক প্রকল্পের স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষার্থীরা জার্মানি ও সুইডেনের গড় শিক্ষার্থীদের প্রায় সমান ফল করেছে। এই প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকও অর্থায়ন করছে।
তবে এই ফলাফলের পেছনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারই কারণ, এমন কোনো প্রমাণ নেই। কারণ, পরীক্ষামূলক প্রকল্পের জন্য বাছাই করা স্কুলগুলোর স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষার্থীরা এমনিতেই ভালো ফল করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে পড়তে পারে।
বিশ্বব্যাংক এই ফলাফলকে ‘অপ্রত্যাশিত এবং খুবই আশাব্যঞ্জক’ বলে উল্লেখ করেছে। রাজধানী সান সালভাদরের মার্সিডিজ কুইন্তেরো স্কুল থেকে সন্তানদের নিতে আসা অভিভাবকেরাও এই উদ্যোগের প্রশংসা করছেন।
জোহানা ফিগুয়েরোয়া বলেন, তার নয় বছর বয়সী মেয়ের পড়াশোনায় ‘উল্লেখযোগ্য’ উন্নতি হয়েছে। তিনি বলেন, “আগে শুধু বই আর বই ছিল। এখন আর তা না। এআই আছে। তাই পড়াশোনায় তার আগ্রহ বেড়েছে।”
ডক্টরএসভি অ্যাপটির কার্যকারিতা এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি। তবে লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের উন্নয়ন ব্যাংক এর জোরালো সমর্থন দিচ্ছে এবং প্রকল্পটিতে অর্থায়নও করছে। ব্যাংকটির দাবি, এল সালভাদর ‘আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর একটি সর্বজনীন ও টেকসই স্বাস্থ্যব্যবস্থা’ গড়ে তুলেছে।
অ্যাপটি ব্যবহারকারীরাও বেশ পছন্দ করছেন। ২৪ বছর বয়সী আন্দ্রেয়া ভার্গাস বলেন, “এটি দ্রুত কাজ করে। একদিন খুব অসুস্থ বোধ করছিলাম। অ্যাপটি আমাকে বিভিন্ন পরীক্ষা করাতে এবং ওষুধ নিতে পাঠায়। সবকিছুই বিনা খরচে হয়েছে।”
প্রেসিডেন্টের প্রাসাদ থেকেই বুকেলে এই দুই প্রকল্প পরিচালনা করছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, এসব প্রকল্পে সরকারি কর্মকর্তাদের অনেকটাই দূরে রাখা হচ্ছে। এমনকি পরীক্ষামূলক প্রকল্পের স্কুলগুলোতেও তাদের প্রবেশের সুযোগ খুব কম।
এদিকে অনেক শিক্ষককে চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সালভাদরের শিক্ষা বিশেষজ্ঞ অস্কার পিকার্দোর মতে, স্কুলের শিক্ষার মান উন্নত করার প্রমাণিত উপায় হলো শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, শুধু শিক্ষার্থীদের হাতে প্রযুক্তির যন্ত্র তুলে দেওয়া নয়।
এ ক্ষেত্রে তিনি সুইডেনের উদাহরণ টেনেছেন। দেশটি শ্রেণিকক্ষে বইয়ের ব্যবহার বাড়াতে আবার স্ক্রিনের ব্যবহার কমাতে শুরু করেছে। পিকার্দোর মতে, এটি এল সালভাদরের জন্য একটি সতর্কবার্তা হতে পারে।
চিকিৎসকদের বিভিন্ন সংগঠন এই অ্যাপকে ‘সাময়িক সমাধান’ বলে সমালোচনা করছে। তাদের মতে, এতে ওষুধ ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকটের সমাধান হচ্ছে না।
সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় কর্মরত হাজার হাজার কর্মীকে চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর একটি কারণ হলো সরকারি বেতন খাতে খরচ কমানো এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের শর্ত পূরণ করা।
এই প্রকল্পগুলোর খরচ নিয়েও পরিষ্কার তথ্য নেই। সরকারের সঙ্গে এক্সএআইয়ের চুক্তিতে কত টাকা ব্যয় হচ্ছে, সে বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটি কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি। এল সালভাদরের জাতীয় পরিষদ শিক্ষা কর্মসূচি এবং ডক্টরএসভির দ্বিতীয় ধাপের জন্য মোট ৫৭ কোটি ৬০ লাখ ডলারের ঋণ অনুমোদন করেছে। তবে এ নিয়ে কার্যত কোনো আলোচনা হয়নি।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, ক্ষমতা বাড়াতে পলিসি ব্যবহার করার নজির বুকেলের রয়েছে। কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, এই প্রযুক্তিনির্ভর পরীক্ষা আসলে শিশু ও রোগীদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে প্রেসিডেন্ট নিজে এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে তুলে দেওয়ার একটি উপায় হতে পারে।
দেশে ও বিদেশে অনেকেই চান, এসব উদ্যোগ সত্যিকার অর্থেই সফল হোক। তবে বুকেলে যদি অভিযোগ করেন যে, মানুষ তাকে যথেষ্ট আস্থা নিয়ে দেখছে না, তাহলে এর পেছনে কারণও রয়েছে।