যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে। ছবি: রয়টার্স
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরু করেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এই সংঘাত শুরুর পর থেকেই তেহরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে সমর্থন না দেওয়ায় ইউরোপীয় মিত্রদের সমালোচনা করে আসছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
গত বুধবার পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটের সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্প আবারও সেই অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
তবে সরাসরি যুদ্ধে না জড়ালেও পর্দার আড়াল থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তার দাবি করেছেন ন্যাটো মহাসচিব। এর পরপরই যুদ্ধে সরাসরি জড়িত বলে ন্যাটোকে অভিযুক্ত করে ইরান।
মার্ক রুটের সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্প জানান, ইতালি, যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও ফ্রান্স তাকে হতাশ করেছে। স্পেনের ভূমিকা নিয়েও তিনি তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
তবে রুটের দাবি, প্রকাশ্যে যুদ্ধে না নামলেও পর্দার আড়ালে যুক্তরাষ্ট্রকে অনেক সহায়তা করেছে ইউরোপ। বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি ইরান যুদ্ধের সময় ইউরোপের ভূমিকা তুলে ধরে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করেছেন।
রুটে বলেন, “একের পর এক মিত্র দেশ ইরান যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীকে তাদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছে।”
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, ন্যাটো মহাসচিবের এই অবস্থান থেকে বোঝা যায়, বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া যুদ্ধ চলাকালে ইউরোপের মিত্র দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে বিভিন্ন ধরনের লজিস্টিক সহায়তা দিয়েছে।
তবে গতকাল বৃহস্পতিবার বাহরাইনের রাজধানী মানামাতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও দাবি করেন, সংঘাতের সময় ইউরোপের সহযোগিতা প্রত্যাশার তুলনায় কম ছিল। ইউরোপের কিছু দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করতে না দেওয়ায় ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের জোট দুর্বল হয়েছে বলে ও মন্তব্য করেন তিনি।
এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে– ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর ট্রাম্প কেন অসন্তুষ্ট এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর অংশগ্রহণই বা কতটা ছিল।
যুদ্ধে ইউরোপ কীভাবে অংশ নিয়েছে?
রুটের মতে, যুদ্ধের সময় ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ছয় সপ্তাহে ইউরোপের ঘাঁটি থেকে প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার মার্কিন সামরিক বিমান উড্ডয়ন করেছে।
ন্যাটো জানান, ইরানের চালানো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক থিওরি’ চলাকালীন ইতালির ঘাঁটি থেকে প্রায় ৫০০টি মার্কিন বিমান উড্ডয়ন করেছে। তাছাড়া রোমানিয়াও তাদের বিমানবন্দর যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যবহার করতে দিয়েছে এবং প্রয়োজনে বাণিজ্যিক ফ্লাইট কমিয়ে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্তও নিয়েছিল।
রুটে আরও জানান, ইউরোপীয় মিত্ররা এখনো হরমুজ প্রণালিতে মাইন অপসারণসহ বিভিন্ন কাজে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করছে। আবার ইউরোপের দেশগুলোতে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর কৃতিত্বও তিনি ট্রাম্পকে দিয়েছেন।
এদিকে, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সরাসরি যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানান। তবে তিনি ভারত মহাসাগরের ডিয়েগো গার্সিয়া সামরিক ঘাঁটি কেবল প্রতিরক্ষামূলক কার্যক্রমের জন্য ব্যবহারের অনুমতি দেন।
আল জাজিরা বলছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানকে ইউরোপের বেশির ভাগ দেশ রাজনৈতিকভাবে সমর্থন করলেও তারা সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেয়নি। তাদের ভাষ্য ছিল, ‘এটি ইউরোপের যুদ্ধ নয়’।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ শুরুর আগে ইউরোপীয় ইউনিয়েনের সঙ্গে কোনো পরামর্শ না করা এবং অভিযানের স্পষ্ট আইনি ভিত্তি না থাকায় ইউরোপের দেশগুলো এতে সক্রিয়ভাবে জড়াতে অনাগ্রহ দেখায়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দাবি করেছিল, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব গোয়েন্দা সংস্থাও এই দাবি সমর্থন করেনি।
যুদ্ধ চলাকালে বেসামরিক মানুষ এবং স্কুল-হাসপাতালের মতো স্থাপনায় বারবার হামলার ঘটনাও ইউরোপীয় দেশগুলোর উদ্বেগ বাড়ায়। এসব কারণে পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলো যুদ্ধ বন্ধে আলোচনার ওপর জোর দেয় এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ইরানের হামলারও নিন্দা জানায়।
তবে স্পেনসহ কয়েকটি দেশ ট্রাম্পের যুদ্ধনীতির প্রকাশ্যে সমালোচনা করে। তারা দ্রুত যুদ্ধবিরতি এবং সব পক্ষকে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানায়। এর আগে গাজায় ইসরায়েলের অভিযানকেও ‘গণহত্যা’ বলে আখ্যা দিয়েছিল স্পেন।
ন্যাটোর মহাসচিবের বক্তব্যের পর ইরান অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধে ন্যাটো ‘সক্রিয়ভাবে জড়িত’ ছিল। ইরানের দাবি, এই যুদ্ধে দেশটিতে ৩ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং তেল স্থাপনা ও বেসামরিক অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এক্সে দেওয়া পোস্টে বলেন, “ন্যাটোর এই স্বীকারোক্তি প্রমাণ করে যে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবৈধ আগ্রাসনে তারা সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিল। এটি আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।”
এই ইরানি কর্মকর্তা আরও বলেন, ইরানে চালানো যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আগ্রাসনে সহায়তা করা ইউরোপের প্রতিটি দেশকে নিজেদের জনগণ ও বিশ্বের কাছে ব্যাখ্যা দিতে হবে যে কেন তারা এই আগ্রাসন এবং ইরানি জনগণের বিরুদ্ধে সংঘটিত ভয়াবহ হামলায় সহযোগিতা করেছে।
ইতালি কী বলেছে?
ন্যাটোর মহাসচিবের বক্তব্য ইতালিতে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ, ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি আগেই প্রকাশ্যে জানিয়েছিলেন, তার দেশ ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেবে না।
ইতালির প্রতিরক্ষামন্ত্রী গুইদো ক্রোসেটোর দাবি, অনুমোদিত সহায়তামূলক উড়োজাহাজ চলাচল ও যুদ্ধ পরিচালনার কার্যক্রমকে এক করে বিভ্রান্তিকর বার্তা দিয়েছেন মার্ক রুটে।
গুইদো ক্রোসেটো বলেন, সংবিধান, আন্তর্জাতিক চুক্তি এবং দেশটিতে থাকা মিত্রদেশগুলোর সামরিক ঘাঁটি-সংক্রান্ত নিয়ম মেনেই কাজ করেছে ইতালি। সরকার শুধু কারিগরি ও লজিস্টিক সহায়তার অনুমতি দিয়েছে, কোনো যুদ্ধ পরিচালনার নয়। তিনি জানান, ১৯৫৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র-ইতালি চুক্তি অনুযায়ী কিছু লজিস্টিক ও অযুদ্ধ (নন-কমব্যাট) কার্যক্রমের জন্য সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।
ইতালিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১২০টি সামরিক স্থাপনা রয়েছে। এর মধ্যে সিসিলির সিগোনেলা নৌ বিমানঘাঁটি এবং উত্তর ইতালির আভিয়ানো বিমানঘাঁটি উল্লেখযোগ্য।
ন্যাটো ১৯৪৯ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের হুমকি মোকাবিলায় গঠিত হয়। এতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা সদস্য রয়েছে।
দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফেরার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার ন্যাটো সদস্যদের প্রতিরক্ষা ব্যয় কম হওয়ার সমালোচনা করেছেন। তার অভিযোগ, ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার জন্য অতিরিক্তভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করছে।
ট্রাম্প চান, ন্যাটোর প্রতিটি সদস্য দেশ প্রতিরক্ষায় তাদের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশ ব্যয় করুক। তবে বেশির ভাগ দেশ ব্যয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও ট্রাম্পের চাওয়া অনুযায়ী ৫ শতাংশ বাড়াতে রাজি হয়নি। এরই মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসন জার্মানি থেকে কিছু মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণাও দিয়েছে।
আল জাজিরা বলছে, ইরান যুদ্ধের সময় এই মতবিরোধ আরও বেড়ে যায়। ট্রাম্প অভিযোগ করেন, ইউরোপীয় দেশগুলো হরমুজ প্রণালি নিরাপদ রাখতে যুক্তরাষ্ট্রকে যথেষ্ট সহযোগিতা করেনি। একপর্যায়ে তিনি ন্যাটো ছাড়ার হুমকিও দেন।
বুধবার হোয়াইট হাউসে রুটের পাশে বসে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের হয়তো কারো সহায়তা দরকার ছিল না। কিন্তু ইউরোপের দেশগুলো যদি সাহায্যের প্রস্তাব দিত, তাহলে ভালো লাগত।
এমন পরিস্থিতিতে রুটের এই যুক্তরাষ্ট্র সফরকে ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন কমানোর চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। আর মাত্র দুই সপ্তাহ পর তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় ন্যাটোর বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে। ছবি: রয়টার্স
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরু করেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এই সংঘাত শুরুর পর থেকেই তেহরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে সমর্থন না দেওয়ায় ইউরোপীয় মিত্রদের সমালোচনা করে আসছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
গত বুধবার পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটের সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্প আবারও সেই অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
তবে সরাসরি যুদ্ধে না জড়ালেও পর্দার আড়াল থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তার দাবি করেছেন ন্যাটো মহাসচিব। এর পরপরই যুদ্ধে সরাসরি জড়িত বলে ন্যাটোকে অভিযুক্ত করে ইরান।
মার্ক রুটের সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্প জানান, ইতালি, যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও ফ্রান্স তাকে হতাশ করেছে। স্পেনের ভূমিকা নিয়েও তিনি তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
তবে রুটের দাবি, প্রকাশ্যে যুদ্ধে না নামলেও পর্দার আড়ালে যুক্তরাষ্ট্রকে অনেক সহায়তা করেছে ইউরোপ। বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি ইরান যুদ্ধের সময় ইউরোপের ভূমিকা তুলে ধরে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করেছেন।
রুটে বলেন, “একের পর এক মিত্র দেশ ইরান যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীকে তাদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছে।”
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, ন্যাটো মহাসচিবের এই অবস্থান থেকে বোঝা যায়, বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া যুদ্ধ চলাকালে ইউরোপের মিত্র দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে বিভিন্ন ধরনের লজিস্টিক সহায়তা দিয়েছে।
তবে গতকাল বৃহস্পতিবার বাহরাইনের রাজধানী মানামাতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও দাবি করেন, সংঘাতের সময় ইউরোপের সহযোগিতা প্রত্যাশার তুলনায় কম ছিল। ইউরোপের কিছু দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করতে না দেওয়ায় ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের জোট দুর্বল হয়েছে বলে ও মন্তব্য করেন তিনি।
এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে– ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর ট্রাম্প কেন অসন্তুষ্ট এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর অংশগ্রহণই বা কতটা ছিল।
যুদ্ধে ইউরোপ কীভাবে অংশ নিয়েছে?
রুটের মতে, যুদ্ধের সময় ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ছয় সপ্তাহে ইউরোপের ঘাঁটি থেকে প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার মার্কিন সামরিক বিমান উড্ডয়ন করেছে।
ন্যাটো জানান, ইরানের চালানো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক থিওরি’ চলাকালীন ইতালির ঘাঁটি থেকে প্রায় ৫০০টি মার্কিন বিমান উড্ডয়ন করেছে। তাছাড়া রোমানিয়াও তাদের বিমানবন্দর যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যবহার করতে দিয়েছে এবং প্রয়োজনে বাণিজ্যিক ফ্লাইট কমিয়ে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্তও নিয়েছিল।
রুটে আরও জানান, ইউরোপীয় মিত্ররা এখনো হরমুজ প্রণালিতে মাইন অপসারণসহ বিভিন্ন কাজে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করছে। আবার ইউরোপের দেশগুলোতে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর কৃতিত্বও তিনি ট্রাম্পকে দিয়েছেন।
এদিকে, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সরাসরি যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানান। তবে তিনি ভারত মহাসাগরের ডিয়েগো গার্সিয়া সামরিক ঘাঁটি কেবল প্রতিরক্ষামূলক কার্যক্রমের জন্য ব্যবহারের অনুমতি দেন।
আল জাজিরা বলছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানকে ইউরোপের বেশির ভাগ দেশ রাজনৈতিকভাবে সমর্থন করলেও তারা সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেয়নি। তাদের ভাষ্য ছিল, ‘এটি ইউরোপের যুদ্ধ নয়’।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ শুরুর আগে ইউরোপীয় ইউনিয়েনের সঙ্গে কোনো পরামর্শ না করা এবং অভিযানের স্পষ্ট আইনি ভিত্তি না থাকায় ইউরোপের দেশগুলো এতে সক্রিয়ভাবে জড়াতে অনাগ্রহ দেখায়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দাবি করেছিল, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব গোয়েন্দা সংস্থাও এই দাবি সমর্থন করেনি।
যুদ্ধ চলাকালে বেসামরিক মানুষ এবং স্কুল-হাসপাতালের মতো স্থাপনায় বারবার হামলার ঘটনাও ইউরোপীয় দেশগুলোর উদ্বেগ বাড়ায়। এসব কারণে পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলো যুদ্ধ বন্ধে আলোচনার ওপর জোর দেয় এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ইরানের হামলারও নিন্দা জানায়।
তবে স্পেনসহ কয়েকটি দেশ ট্রাম্পের যুদ্ধনীতির প্রকাশ্যে সমালোচনা করে। তারা দ্রুত যুদ্ধবিরতি এবং সব পক্ষকে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানায়। এর আগে গাজায় ইসরায়েলের অভিযানকেও ‘গণহত্যা’ বলে আখ্যা দিয়েছিল স্পেন।
ন্যাটোর মহাসচিবের বক্তব্যের পর ইরান অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধে ন্যাটো ‘সক্রিয়ভাবে জড়িত’ ছিল। ইরানের দাবি, এই যুদ্ধে দেশটিতে ৩ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং তেল স্থাপনা ও বেসামরিক অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এক্সে দেওয়া পোস্টে বলেন, “ন্যাটোর এই স্বীকারোক্তি প্রমাণ করে যে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবৈধ আগ্রাসনে তারা সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিল। এটি আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।”
এই ইরানি কর্মকর্তা আরও বলেন, ইরানে চালানো যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আগ্রাসনে সহায়তা করা ইউরোপের প্রতিটি দেশকে নিজেদের জনগণ ও বিশ্বের কাছে ব্যাখ্যা দিতে হবে যে কেন তারা এই আগ্রাসন এবং ইরানি জনগণের বিরুদ্ধে সংঘটিত ভয়াবহ হামলায় সহযোগিতা করেছে।
ইতালি কী বলেছে?
ন্যাটোর মহাসচিবের বক্তব্য ইতালিতে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ, ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি আগেই প্রকাশ্যে জানিয়েছিলেন, তার দেশ ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেবে না।
ইতালির প্রতিরক্ষামন্ত্রী গুইদো ক্রোসেটোর দাবি, অনুমোদিত সহায়তামূলক উড়োজাহাজ চলাচল ও যুদ্ধ পরিচালনার কার্যক্রমকে এক করে বিভ্রান্তিকর বার্তা দিয়েছেন মার্ক রুটে।
গুইদো ক্রোসেটো বলেন, সংবিধান, আন্তর্জাতিক চুক্তি এবং দেশটিতে থাকা মিত্রদেশগুলোর সামরিক ঘাঁটি-সংক্রান্ত নিয়ম মেনেই কাজ করেছে ইতালি। সরকার শুধু কারিগরি ও লজিস্টিক সহায়তার অনুমতি দিয়েছে, কোনো যুদ্ধ পরিচালনার নয়। তিনি জানান, ১৯৫৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র-ইতালি চুক্তি অনুযায়ী কিছু লজিস্টিক ও অযুদ্ধ (নন-কমব্যাট) কার্যক্রমের জন্য সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।
ইতালিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১২০টি সামরিক স্থাপনা রয়েছে। এর মধ্যে সিসিলির সিগোনেলা নৌ বিমানঘাঁটি এবং উত্তর ইতালির আভিয়ানো বিমানঘাঁটি উল্লেখযোগ্য।
ন্যাটো ১৯৪৯ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের হুমকি মোকাবিলায় গঠিত হয়। এতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা সদস্য রয়েছে।
দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফেরার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার ন্যাটো সদস্যদের প্রতিরক্ষা ব্যয় কম হওয়ার সমালোচনা করেছেন। তার অভিযোগ, ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার জন্য অতিরিক্তভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করছে।
ট্রাম্প চান, ন্যাটোর প্রতিটি সদস্য দেশ প্রতিরক্ষায় তাদের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশ ব্যয় করুক। তবে বেশির ভাগ দেশ ব্যয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও ট্রাম্পের চাওয়া অনুযায়ী ৫ শতাংশ বাড়াতে রাজি হয়নি। এরই মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসন জার্মানি থেকে কিছু মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণাও দিয়েছে।
আল জাজিরা বলছে, ইরান যুদ্ধের সময় এই মতবিরোধ আরও বেড়ে যায়। ট্রাম্প অভিযোগ করেন, ইউরোপীয় দেশগুলো হরমুজ প্রণালি নিরাপদ রাখতে যুক্তরাষ্ট্রকে যথেষ্ট সহযোগিতা করেনি। একপর্যায়ে তিনি ন্যাটো ছাড়ার হুমকিও দেন।
বুধবার হোয়াইট হাউসে রুটের পাশে বসে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের হয়তো কারো সহায়তা দরকার ছিল না। কিন্তু ইউরোপের দেশগুলো যদি সাহায্যের প্রস্তাব দিত, তাহলে ভালো লাগত।
এমন পরিস্থিতিতে রুটের এই যুক্তরাষ্ট্র সফরকে ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন কমানোর চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। আর মাত্র দুই সপ্তাহ পর তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় ন্যাটোর বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।