Advertisement Banner

মোদি সরকারের ‘ঢালাও’ বিমানবন্দর নির্মাণ প্রকল্প কেন প্রশ্নের মুখে?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
মোদি সরকারের ‘ঢালাও’ বিমানবন্দর নির্মাণ প্রকল্প কেন প্রশ্নের মুখে?
নয়ডা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট উদ্বোধন করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ছবি: উইকিমিডিয়া

‘৪ হাজার ৩৯৯ দিনের ব্যবধান কী বদল এনে দিতে পারে’—মার্কেটিং স্লোগান হিসেবে এটি হয়তো কান লায়ন্স (চলচ্চিত্র উৎসব নয়, এটি একটি আন্তর্জাতিক সৃজনশীল উৎসব) জেতার মতো জাদুকরী কিছু নয়। এমনকি সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তোলার মতো আকর্ষণও নেই #LongestServingElectedPMModi হ্যাশট্যাগটিতে। তবে ভারতের সরকারি প্রচার বিভাগের একটি এক্স পোস্টে এই চটকদার প্রচারণার আড়ালে যে বাস্তব অর্জনের খতিয়ান তুলে ধরা হয়েছে, তা সত্যিই নজরকাড়া এবং অস্বীকার করার উপায় নেই। 

১২ বছর আগে নরেন্দ্র মোদি যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন, তখন দেশটিতে সচল বিমানবন্দর ছিল মাত্র ৭৪টি। আজ তার সরকার গর্ব করে বলছে যে, এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬৪-তে। আগামী পাঁচ বছরে আরও ৫০টি বিমানবন্দর খোলার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। 

সবচেয়ে নতুন বিমানবন্দরটি গত ১৫ জুন থেকে তার কার্যক্রম শুরু করেছে। রাজধানী দিল্লির দ্বিতীয় হাব হিসেবে পরিকল্পিত এই ‘নয়ডা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট’ বছরে ১ কোটি ২০ লাখ যাত্রী পরিচালনা করতে সক্ষম। ২০৪০ সালের মধ্যে এই সক্ষমতা ৭ কোটিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে, যা গত বছর সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি বিমানবন্দর দিয়ে যাতায়াত করা যাত্রীর সংখ্যার সমান।

ঘটনাটি ঘটেছে দিল্লির প্রতিবেশী রাজ্য উত্তর প্রদেশে-জনসংখ্যায় যা নাইজেরিয়ার সমান। আর মাথাপিছু আয়ে আফ্রিকার দেশ মালির সমপর্যায়ের। এই এক রাজ্যেই নিজের প্রধানমন্ত্রিত্বের মেয়াদে ১০টি নতুন বিমানবন্দর উদ্বোধন করেছেন মোদি। এর মধ্যে ২০২৪ সালের শুরুতে স্রেফ একদিনেই করেছেন ছয়টি! আর এর ঠিক এক মাসের মাথায় দেশটিতে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেটি অবশ্য নিখাদ এক ‘কাকতালীয়’ ব্যাপার ছাড়া আর কী-ই বা হতে পারে!  

এক বছর পর দেখা গেল, এই নতুন সুযোগ-সুবিধার অনেকগুলোই মারাত্মক পতনের মুখে পড়েছে। ভারতের অধিকাংশ মানুষ মানচিত্রে খুঁজে পাবে না-এমন সব প্রত্যন্ত এলাকার বিমানবন্দরগুলোতে হয় কখনোই কোনো ফ্লাইট নামেনি অথবা মাত্র গুটিকয়েক ফ্লাইট চলার পর সেগুলো বন্ধ হয়ে গেছে।

সাহারানপুরের মতো মূলত দরিদ্র মানুষের বসতিপূর্ণ এক ঘিঞ্জি শহরের পক্ষে একটি বিমানবন্দর টিকিয়ে রাখা সম্ভব-এমনটা ভাবা সবসময়ই ছিল চরমমাত্রায় অতি-আশাবাদের লক্ষণ।

মোদির সমালোচকরা এই ব্যর্থতাগুলোকে লুফে নিয়েছেন এবং একে দেশ শাসনের মূল বিষয়ের চেয়ে ভোট পাওয়ার চটকদার প্রচারণায় সরকারের ‘অবসেশন’ হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন।

তবে এই সমালোচনা ভুল পথে পরিচালিত। সব বিমানবন্দরকে এক পাল্লায় মাপা ঠিক নয়। যে বিমানবন্দরগুলো ব্যর্থ হয়েছে, সেগুলোর বেশির ভাগই ছিল সস্তা ও সাদামাটা শেড-সদৃশ, যা দিনে কেবল একটি বা দুটি ফ্লাইট পরিচালনার জন্য তৈরি। সাহারানপুরের বার্ষিক যাত্রী ধারণক্ষমতা ৫০ হাজারের সামান্য বেশি। এটি তৈরিতে খরচ হয়েছে ৫৭ লাখ ডলার। মুম্বাইয়ের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের দামের কাছাকাছি। 

তাছাড়া, ভারতের অভ্যন্তরীণ অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করতে সরকার এই অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি উড়োজাহাজ সংস্থাগুলোর জন্য একটি ভর্তুকি প্রকল্প চালু করেছিল। বর্তমানে পঞ্চম সংস্করণে চলা এই নীতিটি যেমন অনেকগুলো ব্যর্থতার জন্ম দিয়েছে, ঠিক তেমনি কিছু দুর্দান্ত সাফল্যও এনে দিয়েছে। অর্থাৎ বিমানবন্দরগুলো বিচ্ছিন্নভাবে গড়ে তোলা হয়নি।  

অন্তত রূপক অর্থে তো নয়ই। তবে আক্ষরিক অর্থে, ভারত ঠিক এই কাজটিই করে থাকে। দিল্লির নতুন বিমানবন্দরটি মূল শহর থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। সেখানে ভালো দিনেও গাড়িতে যেতে সময় লাগে ৯০ মিনিট। চালুর দিন সকালে সেখানে যাওয়ার জন্য ব্যক্তিগত গাড়ি বা চড়া ভাড়ার ট্যাক্সি ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।

ভারত সরকারের একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল যে, এটি হবে সড়ক, রেল, মেট্রো ও আঞ্চলিক ট্রানজিট ব্যবস্থার এক নিরবচ্ছিন্ন সমন্বয়ে গঠিত একটি বহুমুখী পরিবহন হাব। এতে এমন এক অলীক কল্পনা করা হয়েছে যে, দিল্লির দুটি বিমানবন্দর একটি সমন্বিত বিমান চালনা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করবে। বাস্তবে নতুন এই বিমানবন্দরে যাওয়ার উপায় কেবল দুটি-হয় আপনি গাড়ি চালিয়ে যান, না হয় হেঁটে যান। শহরের এই দুটি কেন্দ্রের মধ্যে সমন্বয় ঠিক ততটুকুই, যতটুকু উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে রয়েছে।

সরকার বিপুল অর্থ ঢেলে বিমানবন্দর বানায়, আর রাজনীতিবিদরা লাইনে দাঁড়িয়ে তা উদ্বোধন করেন। ছবি: উইকিমিডিয়া
সরকার বিপুল অর্থ ঢেলে বিমানবন্দর বানায়, আর রাজনীতিবিদরা লাইনে দাঁড়িয়ে তা উদ্বোধন করেন। ছবি: উইকিমিডিয়া

শুধু নয়ডাকে দোষ দেওয়াটা অন্যায় হবে। মুম্বাইয়ের দ্বিতীয় বিমানবন্দরটি, যা গত বড়দিনে চালু হয়েছে, সেটি নিয়েও একইভাবে হইচই করা হয়েছিল। যাত্রীদের অভিযোগ, বিমানবন্দর থেকে বের হওয়া বা সেখানে ঢোকার একমাত্র উপায় হলো ট্যাক্সি, আর সেটির জন্যই তাদের এক ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। এমনকি সেটাও বেশ ঝক্কির ব্যাপার। টার্মিনালটি খোলার পর কয়েক মাস ধরে সেখানে উবার ডাকার মতো কোনো ফোন নেটওয়ার্ক ছিল না। বিমানবন্দরের ওয়াই-ফাইও ছিল ত্রুটিপূর্ণ। সরকারের ধারণা হলো, ‘আগে অবকাঠামো গড়ে তোলো, মানুষ এমনিতেই আসবে।’ কিন্তু প্রশ্ন হলো, তারা আসবে ঠিকই, তবে ফিরবে কীভাবে?

নয়ডা ও মুম্বাই অন্তত এই বলে অজুহাত দিতে পারে যে তারা এখনো নতুন। কিন্তু ব্যাঙ্গালোর ও হায়দরাবাদের বিমানবন্দরগুলোর বয়স ১৮ বছর হয়ে গেছে। অথচ কোনোটিতেই এখনো মেট্রো লাইন নেই। আরেকটি অজুহাত হলো রাজ্য এবং কেন্দ্রের মধ্যে দুর্বল সমন্বয়। তবে এই যুক্তি নয়ডার ক্ষেত্রে খাটার কথা নয়। কারণ ২০১৭ সাল থেকেই উত্তর প্রদেশে মোদির দল ক্ষমতায় রয়েছে। এটা সত্যি যে রেল সংযোগ তৈরি করা বেশ ব্যয়বহুল। তা সত্ত্বেও খুব কম বিমানবন্দরের জন্যই পাবলিক বাসের ব্যবস্থা রয়েছে। অথচ এই উচ্চ মূলধন খরচের ভয় কিন্তু দেশের বিভিন্ন প্রাদেশিক প্রত্যন্ত অঞ্চলে মেট্রো লাইন চালুর ক্ষেত্রে সরকারকে দমাতে পারেনি, যার অনেকগুলোতেই এখন পরিকল্পিত যাত্রীসংখ্যার মাত্র সামান্য অংশ যাতায়াত করে।

বিমানবন্দরের মতোই মেট্রোও আধুনিকতার প্রতীক। সরকার এগুলো বাস্তবায়নে বিপুল পরিমাণ অর্থ ঢালে আর রাজনীতিবিদরা লাইনে দাঁড়িয়ে সেগুলোর উদ্বোধন করেন। এর মধ্যে অনেকগুলোই বিশ্বমানের, যা নাগরিকদের সামনে এক ভবিষ্যৎ ভারতের ঝলক তুলে ধরে। কিন্তু ঠিক বিমানবন্দরের মতোই, একজন যাত্রী স্টেশনে পৌঁছানোর আগে এবং স্টেশন থেকে বের হওয়ার পর কী পরিস্থিতির মুখোমুখি হবেন, সেই বিষয়টি তাদের মাথায় আসে না। সেখানে ফিডার বাস রুট, ভালো ফুটপাত বা সংযোগকারী যাতায়াত ব্যবস্থা থাকে না বললেই চলে। এজন্য বিমানবন্দরে মানুষ আসতে চায় না। মোদি ভারতের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বিমানবন্দর ও মেট্রো লাইন নির্মাণে ৪ হাজার ৩৯৯ দিন ব্যয় করেছেন। তবে এগুলোর মধ্যে সঠিক সংযোগ স্থাপন করাটা হবে আরও বড় এক অর্জন।

তথ্যসূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট  

সম্পর্কিত