রিতু চক্রবর্ত্তী

আপনি কি সাবঅল্টার্ন?
প্রশ্নটাই কেমন যেন লাগছে? উল্টো প্রশ্ন আসছে–সাবঅল্টার্ন? ওটা আবার কী? সে আলোচনায় যাব। তার আগে বলে নিই–কেন এই প্রসঙ্গ?
হুট করে সোশ্যাল মিডিয়ায় সাবঅল্টার্ন নিয়ে বিস্তর আলোচনা হচ্ছে। রাজনীতি সমাজবিজ্ঞানের বহুল চর্চিত এই তাত্ত্বিক আলোচনা নিয়ে প্রায় সবাই কথা বলছেন। কেউ কেউ নিজেকে বা সমগোত্রীয় কাউকে দিচ্ছেন সাবঅল্টার্ন তকমা।
ঘটনাটা আসলে কী?
ঘটনার শুরু ড. নাবিলা ইদ্রিসের একটি বক্তব্য থেকে। সম্প্রতি অক্সফোর্ড ইউনিয়নের প্যানেলে বক্তব্য দেন সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সংসদের ভিপি সাদিক কায়েম ও নাবিলা ইদ্রিস।
এ নিয়ে আলোচনা–তর্ক–বিতর্ক কম হয়নি। কিন্তু তাকে ছাপিয়ে গেছে নাবিলা ইদ্রিসের এক ফেসবুক পোস্টের কল্যাণে। নিজের ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে নাবিলা লিখেছেন- “The problem isn’t ‘Can the sub-altern speak?’ It is: ইন্নালিল্লাহ, the sub-altern is speaking.”
অর্থাৎ, নাবিলার ভাষ্য অনুযায়ী–সাবঅল্টার্নরা কথা বলতে পারে কি না–এটা কোনো সমস্যা না, বরং সমস্যা হচ্ছে–সাবঅল্টার্নরা এখন কথা বলছে।
ব্যাস! আর যায় কোথায়। সবাই নেমে গেল সাবঅল্টার্ন নিয়ে নিজের নিজের মত দিতে। এক পক্ষ সরাসরি নাবিলার পক্ষ হয়ে হাতা গুটিয়ে নেমে গেলেন। আরেক পক্ষ নাবিলা, হাসনাত বা সাদিক কায়েমরা যে সাবঅল্টার্ন নন, তা প্রমাণে ব্যস্ত হয়ে গেলেন।
এই সবই চলল এবং এখনো চলছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই।
আগে দেখা যাক–নাবিলা কেন তার পুরো পোস্ট বাংলায় লিখে শেষটা এমন ইংরেজিতে লিখলেন? না এমনি এমনি নয়। কারণ আছে। আর কারণটি হলো–‘Can the sub-altern speak?’ একটি বিখ্যাত প্রবন্ধ, যার লেখক গায়ত্রী স্পিভাক। এই প্রবন্ধকে ধরা হয় সাবঅল্টার্ন সম্পর্কিত তাত্ত্বিক আলোচনার অন্যতম ভিত হিসেবে।
নাবিলা সুস্পষ্টভাবেই স্পিভাকের তোলা প্রশ্নের একটি উত্তর দিতে চাইলেন। আর এই উত্তর বা মীমাংসা ঘিরেই যত আলোচনা বা তর্ক। কারণ, ওই দুই ইংরেজি বাক্যের আগের প্যারায় নাবিলা লিখেছেন–
ইউনিয়নে বক্তব্য দেওয়াটা প্রবলেম না। "তাঁরা" যদি দিতেন, এমনকি জুলাইয়ের পক্ষেও বলতেন, তবুও কেউ চিল্লাতো না। সমস্যা হয়ে গিয়েছে সোশ্যাল ক্লাসে। "তাঁরা" চোস্ত ইংরেজিতে আমাদের ভাগ্য নির্ধারণ করবেন, আর্ট-কালচার সংজ্ঞায়িত করবেন। আমরা তা “নমঃ নমঃ” বলে গ্রহণ করব।
কিন্তু একি! খাগড়াছড়ির মাদ্রাসার ছেলে আর কুমিল্লার রাজমিস্ত্রির ছেলে নিজেরাই দেখি পটর পটর কথা কয়।
নাবিলা এখানে কাদের কথা বলছেন? ঠিক ধরেছেন সাদিক কায়েম ও হাসনাত আব্দুল্লাহ। আর এখানেই আপত্তি উঠছে। আপত্তির কারণ–একজন ডাকসু ভিপি, একজন সংসদ সদস্য এবং একজন গুম কমিশনের সদস্য।
তো দেখা যাক। বিষয়টা আসলে কী? এখানে ছোট করে একটা নাম বলে রাখি–গাইয়অস জুলিয়াস ভেরাস ম্যাক্সিমাস। নামটা মনে রাখবেন। ফিরে আসব তার কাছে।
তার আগে একটু জেনে নেওয়া যাক সাবঅল্টার্ন বিষয়টা আসলে কী? তারা কথা বলতে পারে, নাকি পারে না? হাসনাত, সাদিক বা নাবিলারা কি এই বর্গে পড়েন? চলুন একটু দেখে নিই।
সাবআল্টার্ন আসলে কী?
সাবঅল্টার্ন শব্দটি মূলত লাতিন শব্দ সাবঅল্টার্নাস থেকে এসেছে–যার অর্থ একাধিকের মধ্যে যে নিচু শ্রেণি। সামরিক পরিভাষায় তাকালে আরেকটু স্পষ্টভাবে বোঝা যাবে। সামরিক ক্ষেত্রে ‘সাবঅল্টার্ন’ শব্দটির একটি বিশেষ প্রয়োগ রয়েছে, যেখানে ক্যাপ্টেনের চেয়ে নিচের পদের কর্মকর্তাদের এই নামে অভিহিত করা হয়। তবে শব্দটির সাধারণ ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হলো–নিম্নপদস্থ বা অধস্তন।
সাবঅল্টার্ন শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেছিলেন ইতালির মার্ক্সবাদী বুদ্ধিজীবী আন্তোনিও গ্রামসি, তার প্রিজনার’স নোটবুকে। মূলত তার ‘কালচারাল হেজেমনি’ বা ‘সাংস্কৃতিক আধিপত্য’ সংক্রান্ত গবেষণার মধ্য দিয়েই এই ধারণার উৎপত্তি।
এই তত্ত্ব সমাজের এমন কিছু সুবিধাবঞ্চিত বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে, যারা প্রতিষ্ঠিত সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এবং যার ফলে সমাজে নিজেদের অধিকারের পক্ষে সোচ্চার হওয়ার ন্যূনতম সুযোগ থেকেও তারা বঞ্চিত হয়।
বলে নেওয়া ভালো গ্রামসি তার প্রিজনার’স নোটবুক সত্যিকার অর্থেই জেলে বসে লিখেছিলেন। ইতালির তৎকালীন শাসক বেনিতো মুসোলিনি লেখালেখির জন্যই কারাগারে নিয়েছিলেন গ্রামসিকে। তাই জেলে গ্রামসির লেখা ছিল ভীষণ নজরদারির মধ্যে।
ফলে বিভিন্ন শব্দকে ঘুরিয়ে ব্যবহার করতেন তিনি, যাতে মুসোলিনির রক্তচক্ষু থেকে বাঁচতে পারেন। এমনকি কার্ল মার্ক্সের নামও সরাসরি লিখতেন না। প্রিজনার’স নোটবুকে মার্ক্সবাদকে গ্রামসি বলেছেন, প্রাক্সিসের দর্শন, আর মার্ক্সকে বলেছেন প্রাক্সিসের দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা বা প্রাক্সিসের দার্শনিক।
এজন্যই সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণি বলতে মার্ক্সবাদী শব্দ প্রলেতারিয়েতও ব্যবহার করেননি তিনি। গৌতম ভদ্র ও পার্থ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘নিম্নবর্গের ইতিহাস’ বইয়ের ভূমিকায় পার্থ চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন, এক অর্থে সাবঅল্টার্নই প্রলেতারিয়েতের প্রতিশব্দ।
সাবঅল্টার্ন (ইতালীয়তে সুবলতের্নো) শব্দটি গ্রামসি ব্যবহার করেছেন অন্তত দুটি অর্থে। একটি অর্থে এটি সরাসরিভাবে ‘প্রলেতারিয়েত’-এর প্রতিশব্দ। পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় ‘সাবঅল্টার্ন শ্রেণি’ হলো শ্রমিকশ্রেণি। তবে মোটাদাগে পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় শুধু নয়, শ্রেণিবিভক্ত সমাজের অন্যান্য ঐতিহাসিক পর্বেও ‘সাবঅল্টার্ন’ শ্রেণির কথা বলেছেন গ্রামসি।
স্পষ্টতই এখানে ‘সাবঅল্টার্ন-এর অর্থ শিল্পশ্রমিক শ্রেণি নয়। বরং যেকোনো শ্রেণিবিভক্ত সমাজে ক্ষমতাবিন্যাসের কয়েকটি সাধারণ বৈশিষ্ট্যের কথা উঠছে এখানে। এই বিন্যাসকে গ্রামসি দেখেছেন একটি সামাজিক সম্পর্কের প্রক্রিয়ার মধ্যে, যার এক মেরুতে অবস্থিত প্রভুত্বের অধিকারী ‘ডমিন্যান্ট’ শ্রেণি; অপর মেরুতে যারা অধীন, সেই ‘সাবঅল্টার্ন’ শ্রেণি।
তাহলে কী দাঁড়াল? অধৈর্য্য হবেন না। আরেকটু অপেক্ষা করতে হবে। ফাস্ট ফরোয়ার্ড করে চলে আসুন ১৯৮০-এর দশকে। ওই দশকের শুরুর দিকেই প্রখ্যাত তাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদ রণজিৎ গুহ ঔপনিবেশিক ভারতের প্রেক্ষাপটে সাবঅল্টার্নের ধারণা দিয়েছেন।
সে সময় রণজিৎ গুহ এবং একদল গবেষক ‘সাবঅল্টার্ন স্টাডিজ’ নামের এক নতুন ধারার লেখালেখি শুরু করেন, যা দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস লেখার ধরনে এক বড় বিপ্লব আনে। এর মাধ্যমে ইতিহাসের মূল নজর শাসক ও ধনীদের ওপর থেকে সরিয়ে সমাজের শোষিত, গরিব ও অবহেলিত সাধারণ মানুষের স্বাধীন ভূমিকার ওপর নিয়ে আসা হয়।
পরে ‘সাবঅল্টার্ন স্টাডিজ’ এর বাংলা করা হয় নিম্নবর্গের ইতিহাস। এই নিম্নবর্গ বা সাবঅল্টার্ন আসলে কারা?
এর উত্তর উদাহরণসহ শুনতে গেলে ক্লান্ত হয়ে যেতে পারেন। বরং উচ্চবর্গ কারা, তা জানা যাক। রনজিৎ গুহ উচ্চবর্গ বলতে সরকারি ও বেসরকারি–দুই ঘরানার উচ্চবর্গের কথা বলছেন। তার ভাষায়–এরা প্রভুস্থানীয়।
এই প্রভুর মধ্যে আবার দেশি আছে, বিদেশিও আছে। রনজিৎ গুহ ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসনামলের প্রেক্ষাপটে এটা বললেও এই বিশ্বায়নের যুগে এর তেমন নড়চড় নেই। এখনো তো দেশি প্রভু এবং বিদেশি প্রভু আছেন। সরকারি প্রভুর সাথে গলাগলি করে আছেন বেসরকারি প্রভুরা।
তো সরকারি প্রভু বললে তো কিছুটা বোঝা যায়। মানে সরকারের কর্তাব্যক্তিরা আরকি। এরা ছড়িয়ে থাকে প্রশাসনের নানা স্তরে। তাহলে বেসরকারি? হ্যাঁ বেসরকারি প্রভু হলো–ব্যবসায়ী, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উঁচু স্তরের কর্তা, বড় কৃষক, ধর্মীয় নেতা। বাকি যারা–তারাই নিম্নবর্গ। মোটাদাগে সাবঅল্টার্ন।
সোজা বাংলায়–ধরুন একজন রাজা বা রানি। পদাধিকারবলেই তো তিনি প্রভু। আর তার মন্ত্রী থেকে শুরু করে পাইক পেয়াদা–এরা সবাই সেই ক্ষমতার ধারক। এবার এই রাজত্বের এক ক্ষুদ্র কৃষক বা জেলে বা মাঝি বা শ্রমিকের কথা ভাবুন।

তার কোনো কথা কি শোনা যায়? তাকে নিয়ে যে হাজারটা পরিকল্পনা করা হয়, সেখানে তার চাওয়া জানতে চায় কেউ? এক কথায় উত্তর হলো না। সাবঅল্টার্ন হলো মৌচাকের সেই শ্রমিক মৌমাছিটি, যে রানি ও তার পাহারাদার মৌমাছিগুলোর পাশেই ঘেঁষতে পারে না। বলতে পারা তো দূর।
ঠিক এই প্রশ্নই করেছিলেন গায়ত্রী চক্রবর্ত্তী স্পিভাক–ক্যান দ্য সাবঅল্টার্ন স্পিক? সাড়া জাগানো এই প্রবন্ধের শেষে স্পিভাক প্রশ্নটির উত্তরও খুঁজে পেয়েছিলেন–সাবঅল্টার্নরা কথা বলতে পারে না। মানে, নিম্নবর্গের মানুষের মুখ থাকলেও তাদের কথাটি কান পর্যন্ত পৌঁছায় না।
তাহলে নাবিলা ইদ্রিস কী বলছেন? সাবঅল্টার্ন কথা বলছে–এটাই সমস্যা। আসলেই কি সাবঅল্টার্ন কথা বলছে?
মানবাধিকারকর্মী নাবিলা এ ক্ষেত্রে তার দুই সহযাত্রী হাসনাত আব্দুল্লাহ ও সাদিক কায়েমের কথা বলছেন। স্পষ্ট ইঙ্গিত যে, সাবঅল্টার্ন হয়ে অক্সফোর্ড ইউনিয়নে বক্তব্য দিয়েছেন হাসনাত ও সাদিক। আর এখানেই অন্যদের আপত্তি।
কেন? চলুন সেই নামটির কাছে। মনে রাখতে বলেছিলাম যার কথা, সেই গাইয়অস জুলিয়াস ভেরাস ম্যাক্সিমাসের কাছে। রোমের সম্রাট তিনি। তাহলে প্রভু তো বটেই।
নাবিলার কথা মানলে ম্যাক্সিমাসকেও কিন্তু সাবঅল্টার্ন বলতে হবে। কারণ, তিনি উঠে এসেছিলেন একেবারে সাধারণ প্রান্তিক এক পরিবার থেকে। তারপর সৈনিক। সামাজিক ও সামরিক পরিভাষা–উভয় বিবেচনাতেই যাকে সাবঅল্টার্ন বলা যায়।
কিন্তু তিনি যখন সম্রাট হয়ে বসেন–তখন কি আর সাবঅল্টার্ন থাকেন? নাকি সাবঅল্টার্নকে পুঁজি করে তিনি শাসক হন? এ প্রশ্ন ও এর উত্তরেই আছে–সাবঅল্টার্ন নিয়ে বাংলাদেশের সোশ্যাল মিডিয়ায় চলতে থাকা বিতর্কের কেন্দ্রটি।
তো এতক্ষণ ধরে আপনার কী মনে হচ্ছে? আপনি কি সাবঅল্টার্ন? আপনি কি কথা বলতে পারেন? মানে আপনার কথা কি শোনা যায়?
অথবা সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ, ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম কিংবা আলোচনার সূচনাবিন্দুতে থাকা মানবাধিকারকর্মী ও গুম কমিশনের সদস্য নাবিলা ইদ্রিস কি সাবঅল্টার্ন?

আপনি কি সাবঅল্টার্ন?
প্রশ্নটাই কেমন যেন লাগছে? উল্টো প্রশ্ন আসছে–সাবঅল্টার্ন? ওটা আবার কী? সে আলোচনায় যাব। তার আগে বলে নিই–কেন এই প্রসঙ্গ?
হুট করে সোশ্যাল মিডিয়ায় সাবঅল্টার্ন নিয়ে বিস্তর আলোচনা হচ্ছে। রাজনীতি সমাজবিজ্ঞানের বহুল চর্চিত এই তাত্ত্বিক আলোচনা নিয়ে প্রায় সবাই কথা বলছেন। কেউ কেউ নিজেকে বা সমগোত্রীয় কাউকে দিচ্ছেন সাবঅল্টার্ন তকমা।
ঘটনাটা আসলে কী?
ঘটনার শুরু ড. নাবিলা ইদ্রিসের একটি বক্তব্য থেকে। সম্প্রতি অক্সফোর্ড ইউনিয়নের প্যানেলে বক্তব্য দেন সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সংসদের ভিপি সাদিক কায়েম ও নাবিলা ইদ্রিস।
এ নিয়ে আলোচনা–তর্ক–বিতর্ক কম হয়নি। কিন্তু তাকে ছাপিয়ে গেছে নাবিলা ইদ্রিসের এক ফেসবুক পোস্টের কল্যাণে। নিজের ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে নাবিলা লিখেছেন- “The problem isn’t ‘Can the sub-altern speak?’ It is: ইন্নালিল্লাহ, the sub-altern is speaking.”
অর্থাৎ, নাবিলার ভাষ্য অনুযায়ী–সাবঅল্টার্নরা কথা বলতে পারে কি না–এটা কোনো সমস্যা না, বরং সমস্যা হচ্ছে–সাবঅল্টার্নরা এখন কথা বলছে।
ব্যাস! আর যায় কোথায়। সবাই নেমে গেল সাবঅল্টার্ন নিয়ে নিজের নিজের মত দিতে। এক পক্ষ সরাসরি নাবিলার পক্ষ হয়ে হাতা গুটিয়ে নেমে গেলেন। আরেক পক্ষ নাবিলা, হাসনাত বা সাদিক কায়েমরা যে সাবঅল্টার্ন নন, তা প্রমাণে ব্যস্ত হয়ে গেলেন।
এই সবই চলল এবং এখনো চলছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই।
আগে দেখা যাক–নাবিলা কেন তার পুরো পোস্ট বাংলায় লিখে শেষটা এমন ইংরেজিতে লিখলেন? না এমনি এমনি নয়। কারণ আছে। আর কারণটি হলো–‘Can the sub-altern speak?’ একটি বিখ্যাত প্রবন্ধ, যার লেখক গায়ত্রী স্পিভাক। এই প্রবন্ধকে ধরা হয় সাবঅল্টার্ন সম্পর্কিত তাত্ত্বিক আলোচনার অন্যতম ভিত হিসেবে।
নাবিলা সুস্পষ্টভাবেই স্পিভাকের তোলা প্রশ্নের একটি উত্তর দিতে চাইলেন। আর এই উত্তর বা মীমাংসা ঘিরেই যত আলোচনা বা তর্ক। কারণ, ওই দুই ইংরেজি বাক্যের আগের প্যারায় নাবিলা লিখেছেন–
ইউনিয়নে বক্তব্য দেওয়াটা প্রবলেম না। "তাঁরা" যদি দিতেন, এমনকি জুলাইয়ের পক্ষেও বলতেন, তবুও কেউ চিল্লাতো না। সমস্যা হয়ে গিয়েছে সোশ্যাল ক্লাসে। "তাঁরা" চোস্ত ইংরেজিতে আমাদের ভাগ্য নির্ধারণ করবেন, আর্ট-কালচার সংজ্ঞায়িত করবেন। আমরা তা “নমঃ নমঃ” বলে গ্রহণ করব।
কিন্তু একি! খাগড়াছড়ির মাদ্রাসার ছেলে আর কুমিল্লার রাজমিস্ত্রির ছেলে নিজেরাই দেখি পটর পটর কথা কয়।
নাবিলা এখানে কাদের কথা বলছেন? ঠিক ধরেছেন সাদিক কায়েম ও হাসনাত আব্দুল্লাহ। আর এখানেই আপত্তি উঠছে। আপত্তির কারণ–একজন ডাকসু ভিপি, একজন সংসদ সদস্য এবং একজন গুম কমিশনের সদস্য।
তো দেখা যাক। বিষয়টা আসলে কী? এখানে ছোট করে একটা নাম বলে রাখি–গাইয়অস জুলিয়াস ভেরাস ম্যাক্সিমাস। নামটা মনে রাখবেন। ফিরে আসব তার কাছে।
তার আগে একটু জেনে নেওয়া যাক সাবঅল্টার্ন বিষয়টা আসলে কী? তারা কথা বলতে পারে, নাকি পারে না? হাসনাত, সাদিক বা নাবিলারা কি এই বর্গে পড়েন? চলুন একটু দেখে নিই।
সাবআল্টার্ন আসলে কী?
সাবঅল্টার্ন শব্দটি মূলত লাতিন শব্দ সাবঅল্টার্নাস থেকে এসেছে–যার অর্থ একাধিকের মধ্যে যে নিচু শ্রেণি। সামরিক পরিভাষায় তাকালে আরেকটু স্পষ্টভাবে বোঝা যাবে। সামরিক ক্ষেত্রে ‘সাবঅল্টার্ন’ শব্দটির একটি বিশেষ প্রয়োগ রয়েছে, যেখানে ক্যাপ্টেনের চেয়ে নিচের পদের কর্মকর্তাদের এই নামে অভিহিত করা হয়। তবে শব্দটির সাধারণ ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হলো–নিম্নপদস্থ বা অধস্তন।
সাবঅল্টার্ন শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেছিলেন ইতালির মার্ক্সবাদী বুদ্ধিজীবী আন্তোনিও গ্রামসি, তার প্রিজনার’স নোটবুকে। মূলত তার ‘কালচারাল হেজেমনি’ বা ‘সাংস্কৃতিক আধিপত্য’ সংক্রান্ত গবেষণার মধ্য দিয়েই এই ধারণার উৎপত্তি।
এই তত্ত্ব সমাজের এমন কিছু সুবিধাবঞ্চিত বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে, যারা প্রতিষ্ঠিত সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এবং যার ফলে সমাজে নিজেদের অধিকারের পক্ষে সোচ্চার হওয়ার ন্যূনতম সুযোগ থেকেও তারা বঞ্চিত হয়।
বলে নেওয়া ভালো গ্রামসি তার প্রিজনার’স নোটবুক সত্যিকার অর্থেই জেলে বসে লিখেছিলেন। ইতালির তৎকালীন শাসক বেনিতো মুসোলিনি লেখালেখির জন্যই কারাগারে নিয়েছিলেন গ্রামসিকে। তাই জেলে গ্রামসির লেখা ছিল ভীষণ নজরদারির মধ্যে।
ফলে বিভিন্ন শব্দকে ঘুরিয়ে ব্যবহার করতেন তিনি, যাতে মুসোলিনির রক্তচক্ষু থেকে বাঁচতে পারেন। এমনকি কার্ল মার্ক্সের নামও সরাসরি লিখতেন না। প্রিজনার’স নোটবুকে মার্ক্সবাদকে গ্রামসি বলেছেন, প্রাক্সিসের দর্শন, আর মার্ক্সকে বলেছেন প্রাক্সিসের দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা বা প্রাক্সিসের দার্শনিক।
এজন্যই সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণি বলতে মার্ক্সবাদী শব্দ প্রলেতারিয়েতও ব্যবহার করেননি তিনি। গৌতম ভদ্র ও পার্থ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘নিম্নবর্গের ইতিহাস’ বইয়ের ভূমিকায় পার্থ চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন, এক অর্থে সাবঅল্টার্নই প্রলেতারিয়েতের প্রতিশব্দ।
সাবঅল্টার্ন (ইতালীয়তে সুবলতের্নো) শব্দটি গ্রামসি ব্যবহার করেছেন অন্তত দুটি অর্থে। একটি অর্থে এটি সরাসরিভাবে ‘প্রলেতারিয়েত’-এর প্রতিশব্দ। পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় ‘সাবঅল্টার্ন শ্রেণি’ হলো শ্রমিকশ্রেণি। তবে মোটাদাগে পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় শুধু নয়, শ্রেণিবিভক্ত সমাজের অন্যান্য ঐতিহাসিক পর্বেও ‘সাবঅল্টার্ন’ শ্রেণির কথা বলেছেন গ্রামসি।
স্পষ্টতই এখানে ‘সাবঅল্টার্ন-এর অর্থ শিল্পশ্রমিক শ্রেণি নয়। বরং যেকোনো শ্রেণিবিভক্ত সমাজে ক্ষমতাবিন্যাসের কয়েকটি সাধারণ বৈশিষ্ট্যের কথা উঠছে এখানে। এই বিন্যাসকে গ্রামসি দেখেছেন একটি সামাজিক সম্পর্কের প্রক্রিয়ার মধ্যে, যার এক মেরুতে অবস্থিত প্রভুত্বের অধিকারী ‘ডমিন্যান্ট’ শ্রেণি; অপর মেরুতে যারা অধীন, সেই ‘সাবঅল্টার্ন’ শ্রেণি।
তাহলে কী দাঁড়াল? অধৈর্য্য হবেন না। আরেকটু অপেক্ষা করতে হবে। ফাস্ট ফরোয়ার্ড করে চলে আসুন ১৯৮০-এর দশকে। ওই দশকের শুরুর দিকেই প্রখ্যাত তাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদ রণজিৎ গুহ ঔপনিবেশিক ভারতের প্রেক্ষাপটে সাবঅল্টার্নের ধারণা দিয়েছেন।
সে সময় রণজিৎ গুহ এবং একদল গবেষক ‘সাবঅল্টার্ন স্টাডিজ’ নামের এক নতুন ধারার লেখালেখি শুরু করেন, যা দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস লেখার ধরনে এক বড় বিপ্লব আনে। এর মাধ্যমে ইতিহাসের মূল নজর শাসক ও ধনীদের ওপর থেকে সরিয়ে সমাজের শোষিত, গরিব ও অবহেলিত সাধারণ মানুষের স্বাধীন ভূমিকার ওপর নিয়ে আসা হয়।
পরে ‘সাবঅল্টার্ন স্টাডিজ’ এর বাংলা করা হয় নিম্নবর্গের ইতিহাস। এই নিম্নবর্গ বা সাবঅল্টার্ন আসলে কারা?
এর উত্তর উদাহরণসহ শুনতে গেলে ক্লান্ত হয়ে যেতে পারেন। বরং উচ্চবর্গ কারা, তা জানা যাক। রনজিৎ গুহ উচ্চবর্গ বলতে সরকারি ও বেসরকারি–দুই ঘরানার উচ্চবর্গের কথা বলছেন। তার ভাষায়–এরা প্রভুস্থানীয়।
এই প্রভুর মধ্যে আবার দেশি আছে, বিদেশিও আছে। রনজিৎ গুহ ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসনামলের প্রেক্ষাপটে এটা বললেও এই বিশ্বায়নের যুগে এর তেমন নড়চড় নেই। এখনো তো দেশি প্রভু এবং বিদেশি প্রভু আছেন। সরকারি প্রভুর সাথে গলাগলি করে আছেন বেসরকারি প্রভুরা।
তো সরকারি প্রভু বললে তো কিছুটা বোঝা যায়। মানে সরকারের কর্তাব্যক্তিরা আরকি। এরা ছড়িয়ে থাকে প্রশাসনের নানা স্তরে। তাহলে বেসরকারি? হ্যাঁ বেসরকারি প্রভু হলো–ব্যবসায়ী, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উঁচু স্তরের কর্তা, বড় কৃষক, ধর্মীয় নেতা। বাকি যারা–তারাই নিম্নবর্গ। মোটাদাগে সাবঅল্টার্ন।
সোজা বাংলায়–ধরুন একজন রাজা বা রানি। পদাধিকারবলেই তো তিনি প্রভু। আর তার মন্ত্রী থেকে শুরু করে পাইক পেয়াদা–এরা সবাই সেই ক্ষমতার ধারক। এবার এই রাজত্বের এক ক্ষুদ্র কৃষক বা জেলে বা মাঝি বা শ্রমিকের কথা ভাবুন।

তার কোনো কথা কি শোনা যায়? তাকে নিয়ে যে হাজারটা পরিকল্পনা করা হয়, সেখানে তার চাওয়া জানতে চায় কেউ? এক কথায় উত্তর হলো না। সাবঅল্টার্ন হলো মৌচাকের সেই শ্রমিক মৌমাছিটি, যে রানি ও তার পাহারাদার মৌমাছিগুলোর পাশেই ঘেঁষতে পারে না। বলতে পারা তো দূর।
ঠিক এই প্রশ্নই করেছিলেন গায়ত্রী চক্রবর্ত্তী স্পিভাক–ক্যান দ্য সাবঅল্টার্ন স্পিক? সাড়া জাগানো এই প্রবন্ধের শেষে স্পিভাক প্রশ্নটির উত্তরও খুঁজে পেয়েছিলেন–সাবঅল্টার্নরা কথা বলতে পারে না। মানে, নিম্নবর্গের মানুষের মুখ থাকলেও তাদের কথাটি কান পর্যন্ত পৌঁছায় না।
তাহলে নাবিলা ইদ্রিস কী বলছেন? সাবঅল্টার্ন কথা বলছে–এটাই সমস্যা। আসলেই কি সাবঅল্টার্ন কথা বলছে?
মানবাধিকারকর্মী নাবিলা এ ক্ষেত্রে তার দুই সহযাত্রী হাসনাত আব্দুল্লাহ ও সাদিক কায়েমের কথা বলছেন। স্পষ্ট ইঙ্গিত যে, সাবঅল্টার্ন হয়ে অক্সফোর্ড ইউনিয়নে বক্তব্য দিয়েছেন হাসনাত ও সাদিক। আর এখানেই অন্যদের আপত্তি।
কেন? চলুন সেই নামটির কাছে। মনে রাখতে বলেছিলাম যার কথা, সেই গাইয়অস জুলিয়াস ভেরাস ম্যাক্সিমাসের কাছে। রোমের সম্রাট তিনি। তাহলে প্রভু তো বটেই।
নাবিলার কথা মানলে ম্যাক্সিমাসকেও কিন্তু সাবঅল্টার্ন বলতে হবে। কারণ, তিনি উঠে এসেছিলেন একেবারে সাধারণ প্রান্তিক এক পরিবার থেকে। তারপর সৈনিক। সামাজিক ও সামরিক পরিভাষা–উভয় বিবেচনাতেই যাকে সাবঅল্টার্ন বলা যায়।
কিন্তু তিনি যখন সম্রাট হয়ে বসেন–তখন কি আর সাবঅল্টার্ন থাকেন? নাকি সাবঅল্টার্নকে পুঁজি করে তিনি শাসক হন? এ প্রশ্ন ও এর উত্তরেই আছে–সাবঅল্টার্ন নিয়ে বাংলাদেশের সোশ্যাল মিডিয়ায় চলতে থাকা বিতর্কের কেন্দ্রটি।
তো এতক্ষণ ধরে আপনার কী মনে হচ্ছে? আপনি কি সাবঅল্টার্ন? আপনি কি কথা বলতে পারেন? মানে আপনার কথা কি শোনা যায়?
অথবা সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ, ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম কিংবা আলোচনার সূচনাবিন্দুতে থাকা মানবাধিকারকর্মী ও গুম কমিশনের সদস্য নাবিলা ইদ্রিস কি সাবঅল্টার্ন?

সরকার গঠনের পর এই প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে বিদেশে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি মালয়েশিয়া হয়ে যাবেন চীনে।তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরের এ মুহূর্তে তার বাবা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রথম সফর কোথায় ছিল, সেই ইতিহাসও আগ্রহের সৃষ্টি করেছে।

অবতার কৃষ্ণ কৌলের জন্ম ১৯৩৯ সালে, জম্মু-কাশ্মীরের শ্রীনগরে। শুরুতে অবতার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কাজ করতেন। পরে তাকে পাঠানো হয় নিউইয়র্কে ভারতীয় দূতাবাসে। ১৯৬০ সালে সেই চাকরি ছেড়ে তিনি সিনেমা তৈরি শিখতে ভর্তি হন নিউইয়র্কের ইনস্টিটিউট অব ফিল্ম টেকনিকস-এ।

মামলা সূত্রে জানা যায়, সালমানের মা চিৎকার করে তাকে হাসপাতালে নেওয়ার অনুরোধ করেন। পথে তারা সালমানের গলায় দড়ির দাগ এবং মুখমণ্ডল ও পায়ে নীলচে দাগ দেখতে পান। পরে তাকে হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান, সালমান শাহ অনেক আগেই মারা গেছেন।