ads

যুক্তরাষ্ট্রের টানা হামলার মধ্যে আবার কোন কোন দেশে হামলা চালাল ইরান?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের টানা হামলার মধ্যে আবার কোন কোন দেশে হামলা চালাল ইরান?
ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার সময় অজ্ঞাত একটি স্থানে বিস্ফোরণের পর ধোঁয়া উড়তে দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের ১৭ জুলাই প্রকাশ করা একটি ভিডিও থেকে ছবিটি নেওয়া। ছবি: রয়টার্স

ইরানের সামরিক স্থাপনা, বিশেষ করে রসদ অবকাঠামো লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র টানা সপ্তম রাতের মতো হামলা চালানোর পর আজ শনিবার উপসাগরীয় অঞ্চলে আমেরিকার মিত্র দেশগুলোর ওপর নতুন করে হামলা শুরু করেছে ইরান। এক সপ্তাহ আগে নাজুক যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভেঙে পড়ার পর এ সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।

Advertisement

দুই পক্ষই সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচলকেও লক্ষ্যবস্তু করেছে। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তারা ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ কার্যকর করছে। অন্যদিকে ইরানের দাবি, হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল সংক্রান্ত তাদের নির্ধারিত নিয়ম লঙ্ঘনকারী জাহাজগুলোকে তারা লক্ষ্যবস্তু করেছে। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।

শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ৪ শতাংশের বেশি বেড়ে এক মাসেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এতে নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় কংগ্রেস নির্বাচনের আগে ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টায় থাকা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার রিপাবলিকান পার্টির ওপর রাজনৈতিক চাপ বেড়েছে।

গত সপ্তাহে যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে ওয়াশিংটন ও তেহরান ক্রমাগত উত্তেজনার মাত্রা বাড়াচ্ছে, যা পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি করেছে।

ইরান জানিয়েছে, তারা বাহরাইন, কাতার, কুয়েত ও জর্ডানসহ যেসব উপসাগরীয় দেশে মার্কিন বিমানঘাঁটি রয়েছে, সেসব দেশে হামলা চালিয়েছে। পাশাপাশি উত্তর ভারত মহাসাগরে একটি মার্কিন জাহাজকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

সৌদি আরবের সিভিল ডিফেন্স অন্তত দুটি স্থানে কয়েক মাসের মধ্যে প্রথমবারের মতো আগাম সতর্কতা জারি করে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। যুদ্ধের শুরুতে ইরান সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনাগুলোর কিছু অংশেও হামলা চালিয়েছিল।

কুয়েত কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইরানের হামলায় দেশটির একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সমুদ্রের পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে অগ্নিকাণ্ডের পাশাপাশি বহু বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিটের কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। পরে কুয়েতের সেনাবাহিনী জানায়, তারা ইরানের ড্রোন হামলার জবাব দিচ্ছে।

আইআরজিসি দাবি করেছে, তারা বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন সংরক্ষণাগারে হামলা চালিয়েছে এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সাহায্যে দেশটির প্রধান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) কেন্দ্র ধ্বংস করেছে।

রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা জানায়, উত্তর ভারত মহাসাগরে অবস্থানরত একটি ‘শত্রু’ আমেরিকান জাহাজ লক্ষ্য করে ইরানের নৌবাহিনী উপকূল থেকে সমুদ্রে নিক্ষেপযোগ্য একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। ইরানের সেনাবাহিনীর দাবি, এ হামলায় আমেরিকান জাহাজে ‘ভয় ও আতঙ্ক’ সৃষ্টি হয় এবং সেটি ইরানি নৌবাহিনীর পাল্লার বাইরে সরে যেতে বাধ্য হয়।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তাদের সর্বশেষ হামলায় নজরদারি কেন্দ্র, সামরিক রসদ অবকাঠামো, ভূগর্ভস্থ অস্ত্রভাণ্ডার এবং সামুদ্রিক সক্ষমতা লক্ষ্য করে আঘাত হানা হয়েছে।

এক বিবৃতিতে সেন্টকম জানায়, “যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী যুদ্ধবিমান, ড্রোন, যুদ্ধজাহাজসহ বিভিন্ন সামরিক সক্ষমতা ব্যবহার করেছে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ৫০ হাজারের বেশি আমেরিকান সেনা মোতায়েন রয়েছে এবং তারা সর্বোচ্চ সতর্ক, যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ও প্রাণঘাতী সক্ষমতা বজায় রেখেছে।”

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, শনিবার দক্ষিণাঞ্চলীয় জাস্ক শহরের বিদ্যুৎ স্থাপনা ও সমুদ্রের পানি বিশুদ্ধকরণ পাম্পে কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। স্থানীয় এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়, হামলার কারণে জাস্কের কয়েকটি গ্রামের পানীয় জলের সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, নৌ অবরোধ কার্যকর করতে তারা চারটি বাণিজ্যিক জাহাজের গতিপথ পরিবর্তনে বাধ্য করেছে, একটি জাহাজ অচল করেছে এবং আরেকটিতে অভিযান চালিয়ে নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।

এর জবাবে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানায়, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সমন্বিত অভিযানের মাধ্যমে তাদের নৌ চলাচলবিষয়ক নিয়ম লঙ্ঘনকারী চারটি জাহাজকে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে বাধা দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া, আইআরজিসির বরাত দিয়ে ইরানি গণমাধ্যম জানায়, প্রণালির দক্ষিণে মাইন পাতা একটি পথ দিয়ে যাওয়ার সময় দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে বিস্ফোরণ ঘটে এবং সেগুলোতে আগুন ধরে যায়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এ দাবিকে ‘মিথ্যা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে।

এদিকে ইয়েমেন উপকূলের কাছে সশস্ত্র ব্যক্তিরা আরেকটি জাহাজ দখল করেছে। এতে লোহিত সাগরের প্রবেশমুখে অবস্থিত মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন আইআরজিসির বরাত দিয়ে জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের ‘আগ্রাসন’ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত এ অঞ্চল থেকে রাসায়নিক সার কিংবা ‘এক ফোঁটা তেল ও গ্যাসও’ রপ্তানি করা সম্ভব হবে না।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা মোহসেন রেজায়ি শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রকে উত্তেজনা আরও বাড়ানো কিংবা ইরানের ভূখণ্ড দখলের যেকোনো চেষ্টা থেকে বিরত থাকার হুঁশিয়ারি দেন।

অবকাঠামো নিয়ে উদ্বেগ

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সংঘাতের এই নতুন উত্তেজনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মুখপাত্র বলেন, বিশেষ করে ‘ইরান ও পুরো অঞ্চলের বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলা’ নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন।

সেন্টকম জানিয়েছে, তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ‘সামরিক রসদ অবকাঠামো’ও ছিল। এক সপ্তাহের বেশি সময়ের মধ্যে প্রথমবারের মতো তারা অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে উল্লেখ করল।

ইরানি গণমাধ্যম জানায়, শনিবার ভোরে হরমুজ প্রণালির ইরানি অংশসংলগ্ন উপকূলীয় হরমোজগান প্রদেশে হামলা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের তথ্য অনুযায়ী, এতে তিনজন নিহত ও আটজন আহত হয়েছে। এ ছাড়া, দুটি সেতু ও একটি সড়ক সুড়ঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

শুক্রবার গভীর রাত থেকে শনিবার ভোর পর্যন্ত সিরিক, আহভাজ, ইয়াজদ, জাস্ক ও খোররমাবাদ এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বা হামলার খবর পাওয়া গেছে বলে ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে।

সম্পর্কিত