ads

এশিয়ার ‘সবুজ বিপ্লব’ কি আফ্রিকায়ও ঘটবে?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
এশিয়ার ‘সবুজ বিপ্লব’ কি আফ্রিকায়ও ঘটবে?
আফ্রিকার কৃষকরা এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি ভুট্টা, চালসহ বিভিন্ন শস্য উৎপাদন করছেন। ছবি: রয়টার্স

এশিয়ার অর্থনীতিতে ১৯৬০-এর দশক থেকে যে ‘সবুজ বিপ্লব’ ঘটেছিল, আফ্রিকার অর্থনীতিবিদরা আজও সেটিকে ঈর্ষার চোখে দেখেন। সে সময় নতুন জাতের ধান ছোট ছোট পারিবারিক খামারে ব্যাপক সফল হয়। জনসংখ্যা বাড়তে থাকায় কৃষকেরা নতুন পদ্ধতি গ্রহণ করেন এবং সারসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণের ব্যবহার বাড়ান। গ্রামীণ মানুষের আয় বাড়লে তারা শিল্পপণ্যের চাহিদাও বাড়ান। ফলে অনেক মানুষ কৃষিকাজ ছেড়ে কারখানায় কাজ করতে শুরু করেন।

প্রশ্ন হলো, সাহারা-দক্ষিণ আফ্রিকাও কি একই পথে এগোচ্ছে?

Advertisement

ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, আফ্রিকার কৃষকরা এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি ভুট্টা, চালসহ বিভিন্ন শস্য উৎপাদন করছেন। ১৯৬০-এর দশকের তুলনায়, এখন উৎপাদন প্রায় পাঁচ গুণ। তবে এই বৃদ্ধির বেশিরভাগই এসেছে চাষের জমির পরিমাণ বাড়ানোর কারণে, যা অনির্দিষ্টকাল সম্ভব নয়।

একসময় জনসংখ্যা কম ছিল আফ্রিকায়, কিন্তু এখন সেখানে জনসংখ্যার চাপ দ্রুত বাড়ছে। ফলে প্রতি মানুষের জন্য আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ বহু বছর ধরে কমছে এবং এখন তা প্রায় বৈশ্বিক গড়ের সমান।

বিশ্লেষকদের মতে, কৃষকরা যদি প্রতি হেক্টরে বেশি ফসল ফলাতে পারতেন, তাহলে এটি খুব বড় সমস্যা হতো না। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উৎপাদনে যে ধীরগতির উন্নতি ছিল, সেটিও থেমে গেছে, এমনকি কোথাও কোথাও কমতেও শুরু করেছে।

ছবি: রয়টার্স
ছবি: রয়টার্স

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে শস্যের ফলন আর বাড়েনি। একইভাবে মোট উৎপাদনশীলতাও (টিএফপি) স্থির রয়েছে। অর্থাৎ শ্রম, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার করে কতটা দক্ষতার সঙ্গে উৎপাদন করা হচ্ছে, তাতে কোনো উন্নতি হয়নি। বরং আফ্রিকার বেশিরভাগ দেশে ২০২৩ সালে কৃষির উৎপাদনশীলতা ১০ বছর আগের তুলনায়ও কম ছিল।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি শুধু করোনা মহামারির সাময়িক প্রভাব নয় বলেই মনে হচ্ছে। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের টাফটস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ডগলাস গোলিন ও তার সহকর্মীরা ছয়টি আফ্রিকান দেশের ৫৫ হাজার ছোট কৃষি পরিবারের তথ্য বিশ্লেষণ করেন। তারা দেখেন, ২০০৮ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যেই ছোট খামারগুলোর উৎপাদন এবং উৎপাদনশীলতা প্রতি বছর ৩ থেকে ৪ শতাংশ করে কমছিল। তাদের হিসাবে এফএওর তুলনায় পতনের হার আরও বেশি। অবশ্য এর কারণ হতে পারে, তাদের গবেষণায় বড় খামার ছিল না বা সরকারি তথ্য পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য নয়।

এমন পরিস্থিতি কেন তৈরি হচ্ছে?

দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, এর পেছনে যুদ্ধ, মাটির উর্বরতা কমে যাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তনসহ অনেক কারণ থাকতে পারে। এল নিনোর প্রভাবে দক্ষিণ আফ্রিকায় আবার খরার আশঙ্কা দেখা দেওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি আরও গুরুত্ব পাচ্ছে।

ছবি: রয়টার্স
ছবি: রয়টার্স

একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৯৬১ সালের মতো জলবায়ু থাকলে আফ্রিকার কৃষি উৎপাদনশীলতা এখনকার চেয়ে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেশি হতে পারত। অনেক কৃষকই বলছেন, এখন তারা আর বুঝতে পারেন না ঠিক কখন বীজ বপন করবেন।

তবে গোলিন ও তার সহকর্মীরা এখনো জলবায়ুকেই প্রধান কারণ হিসেবে নিশ্চিত করতে পারেননি। তাদের ধারণা, কৃষকেরা আগের তুলনায় জমিতে কম সময় কাজ করছেন। বিশেষ করে যেসব কৃষক কিছুটা সচ্ছল ও শিক্ষিত, তারা অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। এতে কৃষিকাজে শ্রম কমে যাচ্ছে, যা উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ার একটি কারণ হতে পারে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি এই ধারণা সঠিক হয়, তাহলে এশিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া শিক্ষা নতুন করে ভাবতে হবে। এশিয়ায় জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কৃষকেরা একই জমিতে আরও বেশি পরিশ্রম করে উৎপাদন বাড়িয়েছিলেন। কিন্তু আফ্রিকায় দেখা যাচ্ছে, জনবহুল এলাকাতেই কৃষকেরা সবচেয়ে বেশি কৃষিকাজ ছেড়ে দিচ্ছেন, বিশেষ করে শহরের আশপাশে। এর একটি কারণ হতে পারে, শহরের মানুষের খাদ্যচাহিদার বড় অংশ আমদানি করা খাদ্য দিয়ে পূরণ হচ্ছে। ফলে স্থানীয় খাদ্যের দাম খুব বেশি না বাড়ায় কৃষকেরাও উৎপাদন বাড়ানোর তেমন উৎসাহ পাচ্ছেন না।

আরেকটি বড় পার্থক্য হলো, এশিয়ায় কৃষিতে উৎপাদনশীলতা বেড়েই অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল। কিন্তু আফ্রিকায় কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়ছে না, তবু মানুষ কৃষিকাজ ছেড়ে শহরমুখী হচ্ছে। গোলিনের মতে, তেলসহ বিভিন্ন খাত থেকে আসা অর্থ শহরের অর্থনীতি বড় করছে এবং সেখানে নানা ধরনের অনানুষ্ঠানিক চাকরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো খামারের আকার। এশিয়ায় ছোট খামারগুলো প্রতি হেক্টরে বড় খামারের তুলনায় বেশি উৎপাদন করত। আফ্রিকায়ও কিছু গবেষণায় একই ফল পাওয়া গেছে, আবার কিছু গবেষণা বলছে এটি তথ্যগত ভুলের কারণে দেখা যাচ্ছে।

২০১৯ সালে কেনিয়া নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখা যায়, খামারের আকার বাড়লে শুরুতে উৎপাদন কমে, তবে পাঁচ হেক্টরের বেশি হলে আবার বাড়তে শুরু করে। কারণ, বড় খামারে যন্ত্র ব্যবহার করা সহজ হয়। আবার অনেক ছোট খামার খুব উৎপাদনশীল হলেও এতটাই ছোট যে সেগুলো থেকে পর্যাপ্ত আয় করা কঠিন।

ছবি: রয়টার্স
ছবি: রয়টার্স

তবে আশার কথাও আছে। এশিয়ার মডেলের সমর্থকেরা বলছেন, ২০১০-এর দশকে আফ্রিকায় সারের ব্যবহার বেড়েছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে কিছু কৃষক উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। দ্রুত বাড়তে থাকা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাম থেকে শহরে কৃষিপণ্য পৌঁছে দিচ্ছে। মাংস, ডিম ও সবজির চাহিদার বেশির ভাগই স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্য দিয়ে পূরণ হচ্ছে। ২০০৫ সালের পর থেকে আফ্রিকার কৃষিপণ্যের বাজারমূল্য যে হারে বেড়েছে, তা দক্ষিণ এশিয়ার সমান এবং বিশ্বের অন্য সব অঞ্চলের চেয়েও বেশি।

তাই আফ্রিকার গ্রেট লেকস অঞ্চল বা ইথিওপিয়ার উঁচু ভূমির মতো জনবহুল এলাকাগুলো ভবিষ্যতে তাইওয়ান বা ভারতের পাঞ্জাবের মতো সফল হতে পারে।

তবে গবেষকদের মতে, আফ্রিকার ভবিষ্যৎ এশিয়ার পথই অনুসরণ করবে–এমনটা ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। আগে তা প্রমাণ করতে হবে।

ডগলাস গোলিন বলেন, “১৯৬০-এর দশকের এশিয়ার সময়ের সঙ্গে আজকের বিশ্বের অনেক পার্থক্য রয়েছে।” তাই আফ্রিকাকে নিজেদের বাস্তবতার সঙ্গে মানানসই উন্নয়নের পথ খুঁজে নিতে হবে।

সম্পর্কিত