ads

জিয়া হত্যা: ৪৫ বছর পর গ্রেপ্তার মেজর মোজাফফর, সামনে নতুন প্রশ্ন

চরচা প্রতিবেদক
চরচা প্রতিবেদক
জিয়া হত্যা: ৪৫ বছর পর গ্রেপ্তার মেজর মোজাফফর, সামনে নতুন প্রশ্ন
৪৫ বছর পর গ্রেপ্তার জিয়া হত্যায় অভিযুক্ত মেজর মোজাফফর হোসেন। গ্রাফিক্‌স: চরচা

বৃহস্পতিবার ঢাকার ডিওএইচএস এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যায় অভিযুক্ত সেনা কর্মকর্তা মেজর মোজাফফর হোসেন। ৪৫ বছর আগে ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে একদল বিপথগামী সেনা কর্মকর্তার হাতে নৃশংসভাবে নিহত হন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।

মেজর মোজাফফরকে কালই সেনা আইন অনুযায়ী সেনাবাহিনী পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

Advertisement

মেজর মোজাফফর জিয়া হত্যার পর থেকেই পলাতক ছিলেন। জিয়া হত্যা নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন ঐতিহাসিক বয়ান অনুযায়ী এই মেজর মোজাফফর ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে জিয়া হত্যার অভিযানে অংশগ্রহণকারী সেনাকর্মকর্তাদের একজন ছিলেন। এমনকি ব্রিটিশ সাংবাদিক অ্যান্থনী মাসমারেনহাসের লেখা ‘লিগেসি অব ব্লাড’ বইয়ে উল্লিখিত তথ্যানুযায়ী মোজাফফর জিয়াউর রহমানকে হত্যা করার সময় তার খুব কাছে ছিলেন।

৪৫ বছর পর পলাতক এই অভিযুক্ত সেনা কর্মকর্তার গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আসছে। ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যার মোটিভ কি ছিল, তাতে অন্য সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে মেজর মোজাফফরের ভূমিকা কী ছিল? তিনি কার সহায়তায়, কোথায় এতদিন আত্মগোপনে ছিলেন?

জিয়া হত্যার সময় সেনাবাহিনীর অ্যাডজুটেন্ট জেনারেল বা এজি ছিলেন মেজর জেনারেল মঈনুল হোসেন চৌধুরী, বীরবিক্রম। তিনি ২০০০ সালে মওলা ব্রাদার্স প্রকাশিত তার বই—‘এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক’-এ মেজর মোজাফফরের সঙ্গে ব্যাংককে তার সাক্ষাতের কথা লিখেছেন। জিয়া হত্যার পর জেনারেল মঈনের চাকরি প্রেষণে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়। তিনি পরবর্তী ১২ বছর অস্ট্রেলিয়া, নিউজিলিল্যান্ড, ফিজি, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৯ সালে তিনি যখন থাইল্যান্ডে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত, তখন মেজর মোজাফফরের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়। ওই সাক্ষাতের কথা তিনি সে সময় বাংলাদেশ সরকারকে জানিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসলে মেজর মোজাফফরের সঙ্গে সাক্ষাতের কথা সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকেও জানিয়েছিলেন জেনারেল মঈন

মঈনের বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের ৩০ মে বিভিন্ন দাবি–দাওয়া নিয়ে চট্টগ্রামের ২৪ পদাতিক ডিভিশনের কর্মকর্তারা জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মনজুরের অজান্তেই রাষ্ট্রপতি জিয়াকে সার্কিট হাউজ থেকে অপহরণ করে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করেন। এই তথ্য মোজাফফরই জানিয়েছিলেন জেনারেল মঈনকে।

মোজাফফরের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোর ৪টার দিকে সেনারা চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজ আক্রমণ করে। সার্কিট হাউজের ফটক উড়িয়ে দেওয়া হয় রকেট লঞ্চার দিয়ে। অফিসাররা কয়েকটি গ্রুপে ভাগ হয়ে সার্কিট হাউজে ছড়িয়ে পড়ে। গুলির শব্দ শুনে রাষ্ট্রপতি জিয়া তার কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসেন। এ সময় লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমান একটি চাইনিজ সাব মেশিনগান গিয়ে রাষ্ট্রপতিকে গুলি করেন। তিনি উন্মত্ত অবস্থায় সাব মেশিনগানের ২৮টি বুলেটই শেষ করে দেন। ঘটনার আকস্মিকতায় উপস্থিত অন্যরা নাকি হতবাক হয়ে যান।

এদিকে অ্যান্থনী মাসকারেনহাস তার বইয়ে লিখেছেন, “হামলাকারীরা সার্কিট হাউসের কক্ষগুলোতে জিয়াউর রহমানকে খুঁজছিলেন। গোলাগুলির শব্দ শুনে জিয়া কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলে তাঁর সবচেয়ে কাছে ছিলেন মেজর মোজাফফর ও লেফটেন্যান্ট মোসলেহউদ্দিন।”

সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যা করে একদল বিপথগামী সেনা। ছবি: সংগৃহীত
সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যা করে একদল বিপথগামী সেনা। ছবি: সংগৃহীত

মাসকারেনহাস ও অন্যান্য ঐতিহাসিকের বর্ণনা অনুযায়ী মোজাফফর জিয়া হত্যা পরবর্তী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। পরবর্তী দুইদিন জিওসি জেনারেল মনঞ্জুরের দপ্তরে বিপ্লবী পরিষদ গঠনসহ বিভিন্ন পরিকল্পনায় সক্রিয়ভাবে উপস্থিত থাকার কথা জানা যায়। বিদ্রোহ ব্যর্থ হলে ১৯৮১ সালে ১ জুন ভোরে চট্টগ্রাম সেনানিবাস থেকে যেসব সেনা কর্মকর্তারা পালিয়েছিলেন, তাদের সঙ্গেও ছিলেন মোজাফফর। জিয়াকে গুলি করা লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমানের সঙ্গে এক জিপে ছিলেন মোজাফফর। সঙ্গে ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহবুব, ক্যাপ্টেন মুনীর।

পথে সরকার-অনুগত সেনাদের সঙ্গে গোলাগুলিতে মতিউর রহমান ও মাহবুব নিহত এবং মুনীর গ্রেপ্তার হন। গোলাগুলির মধ্যে মোজাফফর পালিয়ে যান। এরপর থেকে তিনি বিভিন্ন দেশে ফেরার জীবন যাপন করছেন।

১৯৮১ সালের ১ জুন ইত্তেফাক পত্রিকার প্রথম পাতা। ছবি: সংগৃহীত
১৯৮১ সালের ১ জুন ইত্তেফাক পত্রিকার প্রথম পাতা। ছবি: সংগৃহীত

১৯৮১ সালেই জিয়া হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে ১৮ সেনা কর্মকর্তার বিচার হয়। এর মধ্যে ১৩ জনকে দোষীয় সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ১৯৮১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৮৩ সালের মধ্যে ১৩ জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয় দেশের বিভিন্ন কারাগারে। তবে চট্টগ্রাম ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মনজুরকে ১৯৮১ সালের ১ জুন গ্রেপ্তার করে রহস্যজনক ভাবে হত্যা করা হয়। রাষ্ট্রপতি জিয়া হত্যার রহস্য উদ্‌যঘাটন না করে জিওসি জেনারেল মনজুরকে হত্যা, এখনো রহস্যাবৃত। ১৯৯৪ সালে মনজুর হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। সে সময়ের সেনাবাহিনী প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদকে করা হয় প্রধান আসামী। এই মামলা এখনো চলছে। মৃত্যুর কারণে মামলা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে জেনারেল এরশাদের নাম।

সম্পর্কিত