ads

ইরাকের প্রধানমন্ত্রী কেবল নামে, ক্ষমতায় নয়

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ইরাকের প্রধানমন্ত্রী কেবল নামে, ক্ষমতায় নয়
ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি। ছবি: সংগৃহীত

ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদির সাম্প্রতিক ওয়াশিংটন সফরটি বাগদাদের রাজনীতি, নিরাপত্তা ও অর্থনীতিকে নতুন রূপ দেওয়া তীব্র চাপকে প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে। আল জাজিরায় লেখা সাংবাদিক জসিম আল-আজাবির এক নিবন্ধে উঠে এসেছে এই রাজনৈতিক সমীকরণ। গত মঙ্গলবার ওভাল অফিসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেন ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি। তিনি এই পদের খেতাব বহন করলেও, তার প্রকৃত ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।

এর আগে কয়েক মাসের রাজনৈতিক অচলাবস্থার পর, সমন্বয় কাঠামো নামে পরিচিত শিয়া জোট মাত্র ২৫ মিনিটে তাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেছে নিয়েছিল। মূলত ওয়াশিংটনের তীব্র চাপের মুখেই এই আকস্মিক সমঝোতা তৈরি হয়।

Advertisement

মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ যখন নিউ জার্সি থেকে সেন্ট্রাল ব্যাংক অব ইরাকে পাঠানো ডলারের প্রবাহ আটকে দেয় এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী নুরি আল-মালিকির ওপর ভেটো প্রয়োগ করে, তখন কোনো রাজনৈতিক ভিত্তি না থাকা ৪০ বছর বয়সী ব্যাংকার আল-জাইদিই একমাত্র বিকল্প হিসেবে টিকে থাকেন। তবে তার অতীতও পুরোপুরি নিষ্কলুষ নয়। ২০২৪ সালে ইরানের কাছে অবৈধ ডলার পাচার রোধের অভিযানের অংশ হিসেবে তার নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ‘আল-জানুব ইসলামিক ব্যাংক’কে মার্কিন ডলারে লেনদেন করা থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। যদিও তার বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয়নি বা বর্তমানে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। তবুও এই ফাইলটি ওয়াশিংটনের হাতে তাকে নিয়ন্ত্রণ করার একটি বড় হাতিয়ার হিসেবে রয়ে গেছে।

বর্তমানে বাগদাদের প্রকৃত ক্ষমতা একজন ব্যক্তির হাতেই কেন্দ্রীভূত বলে মনে হচ্ছে। টম বারাক একই সাথে তুরস্কের রাষ্ট্রদূত, সিরিয়ার দূত এবং এখন ইরাকের দূত হিসেবে কাজ করছেন। তার এই প্রভাব কোনো কূটনৈতিক দক্ষতার কারণে নয়, বরং বাগদাদের ওপর ওয়াশিংটনের আর্থিক নিয়ন্ত্রণের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে। ইরাকের তেলের রাজস্ব জমা থাকে নিউ ইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে। গত এপ্রিলে সেখান থেকে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের একটি নগদ অর্থ চালান আটকে দেয় ওয়াশিংটন এবং সামরিক সহযোগিতাও আংশিক স্থগিত করে।

ইরাকের বাজেটের প্রায় ৯০ শতাংশই আসে তেল থেকে, ফলে সামরিক শক্তির হুমকি ছাড়াই ওয়াশিংটন ইরাককে কাবু করতে পারে। এদিকে, ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনার মার্কিন দাবি এখনো অধরা। শিয়া নেতা মুকতাদা আল-সদর মে মাসে তার মিলিশিয়া বাহিনী বিলুপ্ত করলেও এবং অন্যান্য গোষ্ঠীগুলো অস্ত্র সমর্পণের ঘোষণা দিলেও, ইরানপন্থি ‘কাতায়িব হিজবুল্লাহ’ এবং ‘হারাকাত আল-নুজাবা’ অস্ত্র ছাড়তে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এর জবাবে মার্কিন বিমান হামলায় বসন্তে বহু মিলিশিয়া যোদ্ধা নিহত হয়েছে এবং সাতজন কমান্ডারকে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। বাগদাদ আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অস্ত্র সমর্পণের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে, যা ইরাক থেকে অবশিষ্ট মার্কিন সেনা প্রত্যাহারেরও চূড়ান্ত তারিখ। তবে কট্টরপন্থি গোষ্ঠীগুলো এই সময়ের মধ্যে অস্ত্র ছাড়বে কিনা, তা এখনো এক বড় প্রশ্ন।

এমনকি গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ আলী আল-সিস্তানির কর্তৃত্বেরও একটি সীমা রয়েছে। ২০১৪ সালে তার ফতোয়ার মাধ্যমে পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস (পিএমএফ) গঠিত হলেও, তার আহ্বান ছিল রাষ্ট্রের অধীনে থেকে দেশ রক্ষা করা, কোনো স্বাধীন মিলিশিয়া গঠন করা নয়। কিন্তু কট্টরপন্থি গোষ্ঠীগুলো কখনই নাজাফের কথা শোনেনি, তারা মূলত তেহরানের নির্দেশ মেনে চলে। তবে ওয়াশিংটনের আসল লক্ষ্য মূলত মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা খনিজ সম্পদ। মার্কিন কোম্পানি শেভরন ইরাকের তেল খাতে তাদের পরিধি বাড়ানোর জন্য আলোচনা করছে, পাশাপাশি অন্যান্য মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং রপ্তানি অবকাঠামোর চুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করছে। ইরাক তাদের তেল উৎপাদন দৈনিক ৪৫ লাখ ব্যারেল থেকে ৭০ লাখ ব্যারেলে উন্নীত করতে চায়।

এছাড়া পশ্চিম ইরাকের বিশাল গ্যাস ক্ষেত্রগুলো ব্যবহার করে দেশটি আঞ্চলিক জ্বালানি পরাশক্তি হতে পারে, আর এই অর্থনৈতিক সুযোগের লোভ দেখিয়েই ওয়াশিংটন আল-জাইদির আনুগত্য নিশ্চিত করতে চাচ্ছে। অন্যদিকে, কুর্দিস্তানের ভবিষ্যৎ অবস্থান এখনো অস্পষ্ট। টম বারাক বাগদাদ-এরবিল ফেডারেল মডেলকে পুরোপুরি বিভাজন সৃষ্টিকারী ব্যবস্থা বলে অভিহিত করেছেন, যা ইরানের প্রভাব বাড়াতে সাহায্য করেছে বলে তিনি মনে করেন। তবে একই সাথে তিনি কুর্দিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মাসরুর বারজানিকে তাদের সংসদ ও মন্ত্রিসভা পুনর্গঠনের জন্য চাপ দিচ্ছেন, যা ইঙ্গিত করে যে ওয়াশিংটন কুর্দিস্তানকে একটি কার্যকর এবং মার্কিন বলয়ের ভেতরে থাকা অঞ্চল হিসেবে দেখতে চায়।

কূটনৈতিক আবরণ বাদ দিলে, ইরাকের জন্য ওয়াশিংটনের মূল পরিকল্পনাটি অত্যন্ত স্পষ্ট। তারা চায় ইরাকে কোনো স্বাধীন মিলিশিয়া থাকবে না। ইরাকি নীতিতে ইরানের কোনো ভেটো থাকবে না। বাগদাদে একক কোনো সম্প্রদায়ের আধিপত্য থাকবে না। ইরাকের অর্থনীতি মূলত মার্কিন জ্বালানি সংস্থাগুলোর স্বার্থ রক্ষা করবে। সহজ কথায়, এমন একজন প্রধানমন্ত্রী থাকবেন যিনি তার নিজের পার্লামেন্টের চেয়ে টম বারাকের কাছে বেশি দায়বদ্ধ থাকবেন।

দুই দশক ধরে ইরাক ছিল ইরান ও আমেরিকার প্রক্সি যুদ্ধ এবং নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্র। তবে এখন তীব্র মার্কিন চাপের মুখে দেশটির তেল, ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও মিলিশিয়া নীতি একযোগে পুনর্নির্ধারিত হচ্ছে। আর এই পুরো রূপান্তরের কেন্দ্রে রয়েছেন মাত্র ২৫ মিনিটে নির্বাচিত একজন ব্যাংকার-প্রধানমন্ত্রী, যাকে আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ফলাফল দেখাতে হবে। রিয়াদ, আবুধাবি বা দোহার মতো পারস্য উপসাগরীয় অর্থনৈতিক মডেল তৈরি হতে যেখানে কয়েক দশক লেগেছিল, ট্রাম্প প্রশাসন ইরাকে তা একটিমাত্র প্রেসিডেন্টের মেয়াদের মধ্যে সম্পন্ন করতে চায়। তবে এই তীব্র চাপে বাগদাদ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকবে, নাকি কেবল তার নিয়ন্ত্রক রাজধানী পরিবর্তন করবে, আলী আল-জাইদির ওয়াশিংটন সফর সেই প্রশ্নের কোনো উত্তর দিয়ে যেতে পারেনি।

সম্পর্কিত