২০১৭ সালের এক শীতের সন্ধ্যায়, আমি আমার স্ত্রীকে সাথে নিয়ে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার পাশে ৩০০ ফিট রাস্তায় গিয়েছিলাম। ঢাকার এই চিরচেনা প্রসারিত পথটিতে শহরের অতিরিক্ত ভিড়ভাট্টা থেকে একটু মুক্তি পেতে আর একটু মুক্ত বাতাস নিতে অনেকেই ছুটে যান। এটি ছিল ঢাকার আর দশটি পরিবারের চেনা এক সাধারণ সন্ধ্যা। মানুষজন জনপ্রিয় সব স্ট্রিট ফুড খাচ্ছে, যুগলেরা হেঁটে বেড়াচ্ছে, আর বন্ধুরা মিলে বাড়ি ফেরার আগে মহাসড়কের পাশের অস্থায়ী দোকানগুলোতে আড্ডায় মেতেছে। আমাদের আশেপাশে অস্বাভাবিক কিছুই ঘটেনি। শহরটিকে ক্লান্ত, কোলাহলপূর্ণ এবং প্রাণবন্ত দেখাচ্ছিল।
এর ঠিক দুই দিন পর, অফিসের ডেস্কে বসে খবর পড়তে গিয়ে জানতে পারলাম যে—আমরা যে দিন যে সময়ে সেখানে ছিলাম, ঠিক সেই দিন সেই রাস্তা থেকেই ঢাকা বিমানবন্দরে যাওয়ার পথে নিখোঁজ হয়েছেন সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান। সেই চেনা রাস্তা, সেই সময়, এই শহর এবং বিমানবন্দরের পরিচিত পথটি হঠাৎ করেই এক তীব্র আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়াল। ততদিনে ঢাকার মানুষ ভয়ের এক অলিখিত ব্যাকরণ শিখে গেছে। একটি মাইক্রোবাস, সাদা পোশাকের কিছু মানুষ, হারিয়ে যাওয়া ফোন, অপেক্ষারত পরিবার, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কিছু না জানার অস্বীকৃতি, আর তার পরপরই নেমে আসা এক নিরেট নীরবতা।
বাংলাদেশের জুলাই অভ্যুত্থানের কথা ভাবলে এই স্মৃতিটাই আমার মনে বারবার ফিরে আসে। এই অভ্যুত্থানকে প্রায়শই একটি আকস্মিক বিস্ফোরণ হিসেবে বর্ণনা করা হয়, যার জন্ম কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে এবং যা পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার কারণে আরও ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু জুলাইয়ের এই ঘটনা আকস্মিক ছিল না। এটি ছিল ১৬ বছরের দুঃশাসনের নিচে জমা হওয়া তীব্র ক্ষোভের এক চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। জুলাইয়ের এই গণজোয়ার তৈরি হওয়াটা কোনো আশ্চর্যের বিষয় ছিল না; আসল আশ্চর্যের বিষয় ছিল যে, আওয়ামী লীগ বিশ্বাস করত তারা চিরকাল এই জুলাইকে এড়িয়ে যেতে পারবে।
আমি টানা সাতটি বছর ঢাকায় কাটিয়েছি। ২০১২ সালের শুরুর দিকে কৌতূহলবশত আমি রক্ষণশীল ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ি; এমন এক সময়ে যখন দেশের অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের রাজনীতি অনানুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ ছিল। খুব দ্রুতই সেই ভয় আমাদের সামনে এক বাস্তব রূপ নিয়ে হাজির হলো।
২০১৩ সালে আমরা দেখেছি কীভাবে ধর্মনিরপেক্ষ, আওয়ামী লীগপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলোর হাতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আবাসিক হলগুলোর ভেতরে আটকে রেখে জেরা এবং নির্যাতন করা হচ্ছে। পরবর্তীতে আমার প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা শেষ করে আমি মানবাধিকার বিষয়ক নথিপত্র তৈরির কাজে যুক্ত হই, যেখানে প্রতিদিনের গণমাধ্যম থেকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো সংগ্রহ করতে হতো। সেই কাজের টেবিলে বসে বাংলাদেশকে কোনো সাধারণ গণতান্ত্রিক দেশ বলে মনে হতো না, যেখানে কেবল মাঝেমধ্যে কিছু অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে। মনে হতো এটি এমন এক সমাজ, যাকে মূলত ভয়ের বশ্যতা স্বীকার করার প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
আর এই প্রশিক্ষণ দেওয়ার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র ছিল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। ছাত্র হলগুলো কেবল থাকার জায়গা ছিল না; সেগুলো ছিল একেকটি রাজনৈতিক চারণভূমি। সেখানে কার আনুগত্য কেমন তার ওপর নির্ভর করত কে রাতে শান্তিতে ঘুমাবে, কাকে মারধর করা হবে, কার গায়ে কোন ‘ট্যাগ’ এঁটে দেওয়া হবে এবং কাকে সাধারণ ছাত্রজীবন থেকে বহিষ্কার করা হবে।
‘সচ্চার’-এর মতো স্থানীয় তথ্যসংগ্রহকারী উদ্যোগগুলো নথিবদ্ধ করেছে যে কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নির্যাতনের ঘটনাগুলো সাধারণ শিক্ষার্থীদের লক্ষ্যবস্তু বানাত এবং প্রায়শই এগুলো আবাসিক হলের ভেতরেই ঘটত। এর সিংহভাগেরই পেছনে ছিল বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কর্মীরা। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ জুলাইয়ের এই অভ্যুত্থানের নেতৃত্বে ছিল এমন এক প্রজন্ম, যারা ভোটের মাধ্যমে রাজনীতি শেখার আগেই অসম্মান আর লাঞ্ছনার মধ্য দিয়ে রাজনীতিকে চিনেছিল।

গুম বা জোরপূর্বক নিখোঁজ করার এই সংস্কৃতি ছিল আরও ভয়াবহ। এটি কেবল মানুষকে সমাজ থেকে সরিয়েই দিত না; বরং এটি পুরো সমাজের চিন্তাভাবনাকেই বদলে দিয়েছিল। সাদা পোশাকের কিছু মানুষ যেকোনো সময় যে কাউকে তুলে নিয়ে যেতে পারত। প্রতিটি রাষ্ট্রীয় সংস্থা তা অস্বীকার করতে পারত। একটি পরিবার বছরের পর বছর থানা, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) কার্যালয়, আদালত প্রাঙ্গণ আর সংবাদপত্র অফিসগুলোতে ঘুরেও কোনো উত্তর পেত না। নিখোঁজ হওয়া কেউ কেউ কয়েক সপ্তাহ বা মাসখানেক পর ফিরে আসত এবং চিরতরে নীরব হয়ে যেত। কাউকে আবার পরে গ্রেপ্তার দেখানো হতো। আর কেউ কেউ তো আর কখনোই ফিরে আসেনি।
পরবর্তীতে ‘আয়নাঘর’ সেই ভয়কে একটি সুনির্দিষ্ট নাম দিয়েছিল। এটি কেবল কোনো গোপন বন্দিশালা ছিল না; বরং এটি এমন এক রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছিল যেখানে রাষ্ট্র একজন নাগরিককে চিরতরে মুছে দিতে পারত এবং পরে সেই মুছে দেওয়ার সত্যতাও অস্বীকার করতে পারত। আট বছরের বন্দিদশা শেষে আবদুল্লাহিল আমান আজমি এবং আহমদ বিন কাসেম আরমানের ফিরে আসা বহু পরিবারের বছরের পর বছর ধরে ফিসফিস করে বলা সেই আশঙ্কাই সত্যি প্রমাণ করেছিল। গুম কোনো গুজব ছিল না, এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত পদ্ধতি।
এই কারণেই জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান অনিবার্য ছিল। বাংলাদেশ এর আগেও অন্য উপায়ে মুক্তির চেষ্টা করেছিল। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে ২০১৩ সালে বিরোধী দলের ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ রুখে দেওয়া হয়েছিল। ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনকে দমন করা হয়েছিল। একই বছর বাসের চাপায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর স্কুলশিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘নিরাপদ সড়ক আন্দোলন’-কেও বলপ্রয়োগ ও হামলার মাধ্যমে দমন করা হয়। প্রতিটি ঘটনাই নাগরিকদের এই শিক্ষা দিয়েছিল যে, শান্তিপূর্ণ ক্ষোভ ততক্ষণই সহ্য করা হবে যতক্ষণ না তা ক্ষমতার ভিতকে বিব্রত বা প্রশ্নবিদ্ধ করে।
২০২৪ সালের মধ্যে কোটা আন্দোলন আর কেবল কোটার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বহু পরিবারের কাছে সরকারি চাকরি ছিল আত্মমর্যাদা, স্থায়িত্ব এবং সামাজিক অবস্থানের উন্নতির এক বড় আশা। শিক্ষার্থীরা যখন দেখল যে ভবিষ্যৎ কেবল উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া বিশেষাধিকার আর রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে বণ্টন করা হচ্ছে, তখন তারা কেবল একটি নিয়োগ নীতিকেই প্রত্যাখ্যান করেনি; বরং তারা একটি রুদ্ধ ভবিষ্যৎকে প্রত্যাখ্যান করেছিল।
আর আন্দোলনকারীদের যখন ‘রাজাকার’ (যা চরম বিশ্বাসঘাতকতার সমার্থক) হিসেবে আখ্যায়িত করা হলো, তখন এই দ্বন্দ্বটি অন্য মাত্রা লাভ করল। বাংলাদেশে এই শব্দটি ১৯৭১ সালের এক গভীর ক্ষতকে বহন করে। দীর্ঘদিন ধরে দেশপ্রেমের একচেটিয়া ইজারাদার সেজে থাকা আওয়ামী লীগ হঠাৎ করেই আবিষ্কার করল যে, এক নতুন প্রজন্ম জাতীয় পরিচয়ের ক্ষেত্রে তাদের এই মাতব্বরি আর মেনে নিতে রাজি নয়।
এরপর এলেন আবু সাঈদ, একজন ছাত্র আন্দোলনকারী। তার দুই হাত প্রসারিত, বুক চিতিয়ে, সটান দাঁড়িয়ে আছেন সশস্ত্র পুলিশের মুখোমুখি। তার এই মৃত্যু কেবল এক নতুন ক্ষোভের জন্মই দেয়নি, বরং সেই পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে একটি অবয়ব দিয়েছিল। বছরের পর বছর ধরে মানুষ নিজের কণ্ঠস্বরকে নিচু করেছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পোস্ট মুছে ফেলেছে, ফোনে কথা বলা এড়িয়ে গেছে, হলের কক্ষগুলোকে ভয় পেয়েছে এবং নিখোঁজ হওয়া সন্তানদের জন্য মায়েদের অন্তহীন অপেক্ষা চেয়ে চেয়ে দেখেছে। আবু সাঈদ ভয়ের সেই দীর্ঘদিনের প্রশিক্ষণকে এক নিমেষে উল্টে দিয়েছিল। এটি মানুষকে বুঝিয়ে দিয়েছিল যে, ভয়কে আর ব্যক্তিগতভাবে আড়ালে পুষে রাখা সম্ভব নয়।
জুলাইয়ের দিনগুলোতে প্ল্যাকার্ডে ও দেয়ালে দেয়ালে একটি বাক্য বারবার ভেসে উঠেছিল: ‘প্রত্যেক ফেরাউনের জন্যই একজন মুসা থাকে।’ এর অন্তর্নিহিত শক্তি কেবল ধর্মীয় বিশ্বাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি এমন এক রাজনৈতিক দর্শনকে ব্যক্ত করেছিল যা সাধারণ মানুষ কোনো তাত্ত্বিক ভাষা ছাড়াই গভীরভাবে বুঝতে পেরেছিল। ক্ষমতা নিজেকে চিরস্থায়ী মনে করে। এটি গড়ে তোলে অনুগত গণমাধ্যম, নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন, দলীয় ক্যাডার বাহিনী, পুলিশের তৈরি করা ত্রাস এবং গোপন বন্দিশালা। কিন্তু প্রতিটি ফেরাউনের রাজনীতিই তার নিজের ধ্বংসের জন্য একজন করে ‘মুসা’ তৈরি করে। সেই মুসা সবসময় একক কোনো ব্যক্তি হিসেবে আসেন না, কখনো কখনো তা আসে এমন এক প্রজন্ম হিসেবে—যারা মাথা নত করতে অস্বীকার করে।
তুরস্কের পাঠকদের কাছে জুলাই মাসের অন্য একটি স্মৃতি রয়েছে। ২০১৬ সালের ১৫ জুলাই, ঘন ঘন সামরিক অভ্যুত্থানের ইতিহাস থাকা একটি দেশে সাধারণ মানুষ নিজেদের নির্বাচিত সরকারকে রক্ষা করতে ট্যাঙ্কের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। তবে বাংলাদেশের জুলাই ছিল ভিন্ন। এখানকার মানুষ ট্যাঙ্কের হাত থেকে কোনো নির্বাচিত শাসনব্যবস্থাকে রক্ষা করতে নামেনি। তারা রাষ্ট্রকে পুনরুদ্ধার করতে নেমেছিল এমন এক সরকারের হাত থেকে, যারা নিজেদেরকে গণতন্ত্রের চাদরে জড়িয়ে রেখেছিল, অথচ দেশ চালাত পুলিশি সহিংসতা, দলীয় পেশিশক্তি, নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন আর গুমের ওপর ভর করে। তা সত্ত্বেও, উভয় ঘটনার আবেগীয় কেন্দ্রবিন্দুটি ছিল একই। মানুষ বুক চিতিয়ে বিপদের মুখে দাঁড়িয়েছিল, কারণ তাদের কাছে নিজের মাতৃভূমি ভয়ের চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।
পরবর্তীতে জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় জুলাই-আগস্টের এই দমন-পীড়নকে অত্যন্ত নির্মম ও সুপরিকল্পিত হিসেবে বর্ণনা করেছে এবং ধারণা প্রকাশ করেছে যে এতে প্রায় ১ হাজার ৪০০ জনের মতো মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন। এ ধরনের পরিসংখ্যান অবশ্যই গুরুত্ব বহন করে, তবে কেবল সংখ্যা দিয়ে জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানকে পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়।

এর শুরুটা হয়েছিল অনেক আগেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের কক্ষগুলোতে, নিখোঁজ মানুষের সন্ধান চেয়ে সাঁটানো পোস্টারগুলোতে, মায়েদের অন্তহীন অপেক্ষায়, নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনে, নীরব হয়ে যাওয়া সংবাদপত্রগুলোতে, ফিসফিস করে করা ফোনে কথোপকথনে এবং সাধারণ মানুষের এই চেনা উপলব্ধিতে যে, আইনের সুরক্ষা বলয় থেকে যেকোনো নাগরিক যেকোনো মুহূর্তে চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে।
ঠিক এই কারণেই, জুলাই আসার অনেক আগেই বাংলাদেশের জুলাই অভ্যুত্থান অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। একটি রাষ্ট্র তার নাগরিকদের গুম করে দিতে পারে না, নির্বাচনকে সংকুচিত করতে পারে না, শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হতে পারে না, সাংবাদিকদের ভীত-সন্ত্রস্ত রাখতে পারে না, দেশপ্রেমকে নিজের একচেটিয়া সম্পত্তি বানিয়ে ফেলতে পারে না। একইসাথে সমাজ আজীবন নীরব থাকবে—এমন প্রত্যাশাও করতে পারে না। ২০২৪ সালে এসে ভয়ের গতিপথ বদলে গিয়েছিল। ব্যক্তিমানুষের একান্ত কোণে নীরবে কাঁপতে থাকা সেই ভয়টি হঠাৎ করেই প্রকাশ্য রাজপথে এক বজ্রকণ্ঠে রূপ নিয়েছিল।
লেখক: তুরস্কভিত্তিক বাংলাদেশি সমাজবিজ্ঞানী
(লেখাটি তুর্কি সংবাদমাধ্যম ডেইলি সাবাহ থেকে অনূদিত)