Advertisement Banner

ফজলুর রহমানের বক্তব্যে কেন উত্তাপ ছড়াল সংসদে

চরচা প্রতিবেদক
চরচা প্রতিবেদক
ফজলুর রহমানের বক্তব্যে কেন উত্তাপ ছড়াল সংসদে
ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্য হয়ে জামায়াতে ইসলামী করা যায় না- বিএনপির সংসদ সদস্য ফজলুর রহমানের এমন বক্তব্যে সংসদে উত্তাপ ছড়িয়েছে।

আজ মঙ্গলবার কিশোরগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় বলেন, “আমি আবারও বলে রাখলাম, শহীদ পরিবারের লোক তো জামায়াত করতেই পারে না। আর জামায়াত করলে ডাবল অপরাধ করতেছে।”

এই বক্তব্যের পর বিরোধী দলের সদস্যরা দাঁড়িয়ে হইচই শুরু করেন।

পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে এক পর্যায়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ দাঁড়িয়ে সদস্যদের বসতে বলে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন।

বিএনপির সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান তার বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধ, ৫ আগস্টের অভ্যুত্থান, জামায়াত, আল বদর, রাজকার প্রসঙ্গ তোলেন।

এই মুক্তিযোদ্ধা বলেন, “আগস্ট কোনো বিপ্লব নয়, আগস্ট হল গণঅভ্যুত্থান। সেই গণঅভ্যুত্থানকে যারা মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে তুলনা করতে চায়, জুলাই যুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধ, তাদেরকে আমি বলব, সবাইকে আমি বলব, এই কথাটা বলাই অন্যায়।”

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হয়েছে অভিযোগ করে ফজলুর রহমান বলেন, “একটা গান হইতে পারে নাই, একটা নাটক হইতে পারে নাই, একটা লালনের গীতি হইতে পারে নাই, একটা বাউল গান হইতে পারে নাই। সবকিছু কালো শক্তি ধ্বংস করে দিয়েছিল।”

জামায়াতকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, “আমি হতভাগা ফজলুর রহমান বলেছিলাম, জামায়াত জোট যদি মেজরিটি পায়, তাহলে আমি বিষ খাব। এই কথাটা বলেছি, কথা সত্য। আমি বলে যাচ্ছি এবং তারা কোনোদিন যুদ্ধে জয় লাভ করতে পারে না, রাজনৈতিক যুদ্ধে। কারণ তাদের পূর্বপুরুষ বাংলাদেশ চায় নাই।”

তিনি বলেন, “যতদিন রয়েল বেঙ্গল টাইগার থাকবে, মুক্তিযোদ্ধা জিতবে। রাজাকার কোনোদিন এদেশে জয় লাভ করতে পারবে না। আমি চ্যালেঞ্জ করে বলে গেলাম।”

এরপর বিরোধী দলের নেতা শফিকুর রহমানকে ইঙ্গিত করে ফজলুর রহমান বলেন, “আমি তাকে অসম্মান করি না। সবসময় ‘মাননীয়’ বলে কথা বলি। অথচ বিরোধী দলের নেতার দলের লোকজন আমাকে ‘ফজা পাগলা’ বলে।”

এ সময় স্পিকার বলেন, “আপনাকে কেউ এই ধরনের উক্তি করেছে? আপনার সম্বন্ধে এরকম তো সংসদে কেউ বলে নাই।”

ফজলুর রহমান বলেন, “করেছে, করেছে, আছে এখানে।”

পরে তিনি বলেন, “বিরোধী দলের নেতা বলেছেন, উনি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের লোক এবং উনি শহীদ পরিবারের লোক এবং উনি জামায়াতে ইসলামী করেন। এটা ডাবল অপরাধ। মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের লোক কেউ জামায়াত করতে পারে না।”

তার এই বক্তব্যের সঙ্গে সঙ্গে বিরোধী দলের সদস্যরা দাঁড়িয়ে হইচই শুরু করেন।

স্পিকার বলেন, “মাননীয় সদস্যবৃন্দ উনাকে বলতে দেন। মাননীয় সদস্যবৃন্দ অর্ডার অর্ডার। আপনারা শৃঙ্খলা রক্ষা করুন মাননীয় সদস্যবৃন্দ, সংসদের শৃঙ্খলা রক্ষা করুন।”

এর মধ্যেই ফজলুর রহমান আবার বলেন, “আমি আবারও বলে রাখলাম, শহীদ পরিবারের লোক তো জামায়াত করতেই পারে না। আর জামায়াত করলে ডাবল অপরাধ করতেছে।”

বিরোধী দলের সদস্যরা আবারও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলে স্পিকার ফজলুর রহমানকে অপেক্ষা করতে বলেন।

ফজলুর রহমান তখন বলেন, “আমি কিন্তু উনাদেরকে খারাপ কিছু বলি নাই।”

ফজলুর রহমানের বক্তব্যে বিরোধী দলের সদস্যরা দাঁড়িয়ে হইচই শুরু করলে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদও দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন।

স্পিকার বলেন, “এটি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ। এখানে প্রত্যেকেই নির্বাচিত হয়ে এসেছেন।”

বিরোধী দলের নেতা শফিকুর রহমানকেও আগে তাকে কথা বলতে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে স্পিকার বলেন, “মাননীয় বিরোধী দলের নেতা, আমি বলি তারপর আপনি বলেন।”

পরে ফজলুর রহমানকে তিন মিনিটে বক্তব্য শেষ করতে বলেন স্পিকার।

বক্তব্যে ফিরে ফজলুর রহমান ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের প্রসঙ্গ তোলেন।

তিনি বলেন, “১৯৭১ সনের ১৪ই ডিসেম্বরকে পালন করা হয় শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। সেই মুনীর চৌধুরী, আব্দুল আলিম চৌধুরী, শহীদুল্লাহ কায়সার থেকে ধরে শত শত বুদ্ধিজীবীকে যারা হত্যা করেছিল তাদেরকে বলা হয় আল বদর। এবং সেই আল বদর বাহিনী কার ছিল আপনারা জানেন।”

চলতি সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিন দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীদের নাম শোক প্রস্তাবে রাখায় আপত্তির কথাও তুলে ধরে এই মুক্তিযোদ্ধা বলেন, “আমি একা হইলেও এটা প্রতিবাদ করতাম। কিন্তু যেহেতু আমার দল এটা করছে, আমি চুপ কইরা ছিলাম। কথাটা খুব ক্লিয়ার।”

ফজলুর রহমানের বক্তব্যের পর বিরোধী দলের নেতা, জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান দাঁড়িয়ে তার বক্তব্যের প্রতিবাদ জানান।

শফিকুর রহমান বলেন, “তিনি পার্সোনালি আমাকে হার্ট করেছেন। তিনি বলেছেন যে আমি বলে থাকি আমি শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য। তাহলে ইনি এটাকে চ্যালেঞ্জ করছেন। দুই নম্বর, উনি বলেছেন কোনো মুক্তিযোদ্ধা কিংবা শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের কেউ জামায়াতে ইসলামী করতে পারে না। আমি এটার তীব্র নিন্দা জানাই।”

বক্তব্যের ওই অংশকে ‘অসংসদীয়’ আখ্যা দিয়ে তা এক্সপাঞ্জ করার অনুরোধ জানান বিরোধী দলের নেতা।

তিনি বলেন, “আমার আইডেন্টিটি নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে, এটা গুরুতর অপরাধ করেছেন উনি। আবার আমার আদর্শ সিলেকশনের ব্যাপারে উনি কথা বলেছেন। এটা বাড়তি অপরাধ করেছেন।”

পরে স্পিকার বলেন, ফজলুর রহমানের বক্তব্যে অসংসদীয় কিছু থাকলে তা এক্সপাঞ্জ করা হবে। একইভাবে বিরোধী দলের নেতার বক্তব্যেও অসংসদীয় কিছু থাকলে তা এক্সপাঞ্জ করা হবে।

এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দাঁড়িয়ে কথা বলতে চাইলে স্পিকার জানতে চান, তিনি কোন বিষয়ের ওপর বলবেন।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “আমি কোনো উত্তেজনা সৃষ্টি করব না সংসদের স্বার্থে। যে অ্যাটমসফিয়ারে আমরা এখানে আলাপ আলোচনা করি, মাঝেমধ্যে সেটা কিছু উত্তেজনা সৃষ্টি হবেই, সেটা স্বাভাবিক।”

ফজলুর রহমানকে ‘ইতিহাসে সমৃদ্ধ’ আখ্যা দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমরা এখন ভূগোলে আছি। আমরা বেশি ইতিহাস চর্চা করতে গেলে মাঝেমধ্যে কিছু ব্যত্যয় হবে।”

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “নতুন করে আমার মনে হয় যে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ভিত্তিতে জাতিকে আর বিভক্ত না করি।”

সম্পর্কিত