রাশিয়ার ‘ওরেশনিক’ ক্ষেপণাস্ত্র কতটা ভয়ঙ্কর?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
রাশিয়ার ‘ওরেশনিক’ ক্ষেপণাস্ত্র কতটা ভয়ঙ্কর?
ওরেশনিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করেছে রাশিয়া। ছবি: রয়টার্স

রাশিয়া শুক্রবার জানিয়েছে, তারা ইউক্রেনের একটি লক্ষ্যবস্তুতে তাদের হাইপারসনিক ‘ওরেশনিক’ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। গত মাসে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের একটি বাসভবনে ইউক্রেনের কথিত ড্রোন হামলার প্রচেষ্টার জবাবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে রাশিয়া দাবি করেছে। যদিও কিয়েভ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

এর মধ্য দিয়ে দ্বিতীয়বার এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করল রাশিয়া। দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দাবি করেছেন, শব্দের চেয়ে ১০ গুণের বেশি গতির কারণে এই ক্ষেপণাস্ত্রকে বাধা দেওয়া অসম্ভব। এটি পারমাণবিক ওয়ারহেড বহনে সক্ষম। যদিও ২০২৪ সালে প্রথমবার পুরোপুরিভাবে ব্যবহার করা হয়নি।

এদিকে, ইউক্রেনীয় বিমান বাহিনী শুক্রবার নিশ্চিত করেছে, রাশিয়া কাস্পিয়ান সাগরের নিকটবর্তী কাপুস্টিন ইয়ার টেস্ট রেঞ্জ থেকে একটি ওরেশনিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।

ওরেশনিক কী?

‘ওরেশনিক’ শব্দের অর্থ হলো ‘হ্যাজেল গাছ’। এটি একটি মধ্যপাল্লার হাইপারসনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। এর আগে ২০২৪ সালের নভেম্বরে রাশিয়া একবারই এটি ইউক্রেনে ব্যবহার করেছিল। ইউক্রেনীয় সূত্রের মতে, সে সময় এতে কেবল ‘ডামি’ ওয়ারহেড ছিল এবং এটি ছিল মূলত পরীক্ষামূলক। যদি এবারের রাতের হামলায় বিস্ফোরক ওয়ারহেড ব্যবহার করা হয়ে থাকে, তবে এটিই হবে প্রথমবার ধ্বংসাত্মক উদ্দেশ্যে এর ব্যবহার। রাশিয়ার দাবি অনুযায়ী, তারা ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে এই হামলা চালিয়েছে।

এই ক্ষেপণাস্ত্র কতটা ভয়াবহ?

বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, ওরেশনিকের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এটি একাধিক ওয়ারহেড বহন করতে সক্ষম, যা একই সঙ্গে বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। এই প্রযুক্তি সাধারণত অনেক বেশি দূরপাল্লার আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের (আইসিবিএম) ক্ষেত্রে দেখা যায়।

ক্ষেপণাস্ত্রটি মূলত ‘আরএস–২৬ রুবেজ’ ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এটি পারমাণবিক এবং সাধারণ—উভয় ধরণের ওয়ারহেড বহন করতে পারে। ২০২৪ সালের হামলায় ক্ষেপণাস্ত্রটি দক্ষিণ রাশিয়া থেকে উৎক্ষেপণের পর লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে মাত্র ১৫ মিনিট সময় নিয়েছিল এবং এর গতি ছিল ঘণ্টায় প্রায় ১৩ হাজার ৬০০ কিলোমিটার।

ছবি: রয়টার্স
ছবি: রয়টার্স

পুতিন দাবি করেছেন, এই ক্ষেপণাস্ত্র আটকানো অসম্ভব এবং সাধারণ ওয়ারহেড থাকা সত্ত্বেও এর ধ্বংসক্ষমতা পারমাণবিক অস্ত্রের সমতুল্য।

কিছু পশ্চিমা বিশেষজ্ঞ পুতিনের এই দাবিকে অতিরঞ্জিত বলে মনে করেন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে একজন মার্কিন কর্মকর্তা বলেছিলেন, এই অস্ত্রটি যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো কিছু নয়। রাশিয়ার কাছে এই ধরণের হাতেগোনা কয়েকটি অস্ত্র আছে।

ক্যালিফোর্নিয়ার মিডলবারি ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের অন্তর্গত জেমস মার্টিন সেন্টার ফর ননপ্রোলিফারেশন স্টাডিজের ইস্ট এশিয়া ননপ্রোলিফারেশন প্রোগ্রামের পরিচালক জেফরি লুইস বলছেন, এই পাল্লার সব ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রই হাইপারসনিক এবং ইসরায়েলের ‘অ্যারো ৩’ বা আমেরিকার ‘এসএম–৩’ এর মতো ইন্টারসেপ্টরগুলো এগুলোকে ধ্বংস করার জন্যই তৈরি করা হয়েছে।

লুইসের মতে, এটি সামরিক কৌশলের চেয়ে মনস্তাত্ত্বিক কৌশল হিসেবে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে।

বর্তমানে রাশিয়া এই ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যাপক উৎপাদন শুরু করেছে এবং তাদের মিত্র দেশ বেলারুশকেও এটি সরবরাহ করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হচ্ছে।

পুতিন এখন এই অস্ত্র চালালেন কেন?

রুশ সামরিক বাহিনীর মতে, গত বছরের শেষের দিকে উত্তর রাশিয়ার নভগোরোডে পুতিনের একটি বাসভবনে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার প্রচেষ্টার জবাবে ওরেশনিক ছোড়া হয়েছে। তবে ইউক্রেন এই দাবিকে মিথ্যা বলে অভিহিত করেছে।

পুতিন এর আগেই হুমকি দিয়েছিলেন যে, ইউক্রেন যদি পশ্চিমা দূরপাল্লার অস্ত্র ব্যবহার করে রাশিয়ায় হামলা চালিয়ে যেতে থাকে, তবে তিনি ওরেশনিক ব্যবহার করবেন। এবারের হামলাটি হয়েছে পশ্চিম ইউক্রেনের এলভিভ অঞ্চলে, যার সীমান্ত ন্যাটো সদস্য দেশ পোল্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত। ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে একটি ‘বৈশ্বিক হুমকি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

সব মিলিয়ে রাশিয়ার নতুন এই ক্ষেপণাস্ত্র বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এই ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল যখন রাশিয়া ও ইউক্রেনকে একটি শান্তি চুক্তিতে রাজি করানোর চেষ্টা করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেই চেষ্টা যে এখন কিছুটা হলেও হোঁচট খাবে, তা বলাই যায়।

সম্পর্কিত